শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৪৫
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘গুরু’

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ১৫৭৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫

সকালের চা খেয়ে বাজারে যেতে হবে আজ। নাহলে রান্না করা যাবে না। আনাজ, আলু প্রায় কিছুই নেই। রান্নার মাসি এসে যদি হাতের কাছে সব না পায় তবে গজগজ করে মাথা খারাপ করে দেবে। একটু সকাল সকাল যদি আসে তবে চা টা নিজে করে খেতে হয় না। কিন্তু না! উনি নিজের সংসারের কিছু কাজ করে তবে আসবেন। কাজের লোকদের এখন কিছু বলার নেই, ওদের মর্জি মাফিক ওরা চলে। চা খেতে খেতে কাগজটা উড়ে এসে বারান্দায় পড়ল। ছেলেটা সাইকেল থেকে কাগজ ছুঁড়ে দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল। কি দারুণ টিপ! কোনোদিন বাইরে পড়ে না কাগজটা! শিবম মনে মনে রোজ তারিফ করে ছেলেটার। সে যদি ওরকম সাঁ করে সাইকেল চালাতে পারত, কি যে ভাল হত।

আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে রাস্তায় বেরল শিবম। দুটো গলি, দুটো মোড় পেরোলেই বড় রাস্তা। আরও কিছুদূর গেলে জি টি রোড। মোড় পেরিয়ে রাস্তায় নামতেই চোখ গেল খোকনের দিকে। মেজাজ বিগড়ে গেল শিবমের। সক্কাল সক্কাল কারো পেছনে কাঠি করছে নিশ্চয়ই। খোকনের নতুন কেনা দামী ঝকঝকে বাইকটা একপাশে দাঁড় করানো। পাশেই সাইবার কাফে থেকে একগাদা কাগজ পত্র জেরক্স করে ওর চ্যালার হাতে ধরাচ্ছে। দুদিন আগে পর্যন্ত মালটা চাকরির জন্য ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াত, আর আজ ওর রেলা দেখে কে! হঠাৎ করেই একজন প্রোমোটারের পোঁ ধরে বেশ কিছু দিন ঘষটালো। তারপর এই মফঃস্বলে শুধু ঘাঁতঘোঁত বুঝে টোপ ফেলে বসে থাকা, কখন ছিপে মাছ এসে নিজেই গাঁথে। মানে, পুরোনো লজঝড়ে বাড়ি এ অঞ্চলে অনেক না হলেও বেশ কিছু আছে। যেগুলো অন্ততঃ চল্লিশ পঞ্চাশ বছরের পুরোনো, এখন যারা সেগুলোতে বাস করে তাদের বাড়ি সারাবার ক্ষমতা নেই, এরকম দেখে দেখে সেখানে টোপ দেওয়া। খোকনকে দেখলে এখন শিবমের একটা শিয়াল ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। সব সময় সুযোগ সন্ধানী দুটো চোখ। এই খোকন আর প্রোমোটার রাজীবের হাত ধরেই মফঃস্বলে প্রথম ফ্ল্যাট উঠল। তার পরেই আস্তে আস্তে খোকনের ভোলবদল ঘটতে লাগল একটু একটু করে সকলের চোখের সামনে। এখন ঝাঁ চকচকে হিরো হন্ডা নিয়ে চোখে সানগ্লাস দিয়ে যখন দাঁড়ায়, কে বলবে কদিন আগেই মুখ শুকিয়ে ঘুরছিল এ ছেলে। অবশ্য মুখ শুকিয়ে কেউ ঘুরুক এটা শিবম কোনোদিন চায় না। আর তাতে খোকন ওর ছেলেবেলার বন্ধু, যদিও এখন শিবম ওর সঙ্গে কথা বলে না চোখোচোখি না হলে। আজও শিবম পাশ কাটিয়ে চলে যাবার উদ্যোগ নিতে গিয়েই একেবারে চোখোচোখি খোকনের সঙ্গে।

“কি রে শিবু? কিছু ভাবলি? বড্ড ভাবিস তুই আজকাল।” শিবম গম্ভীর মুখে বলল, “না রে, ভাবার অবকাশ পাই নি। তাছাড়া আমি তো বলেছি, আমি দেব না।”

“আরে! বোকার মত কথা বলিস না শিবু। তুই আমার ছোট বেলার বন্ধু, তাই তোর ভালোর জন্যে বলছি, তুই একা মানুষ। কাকু কাকীমা গত হয়েছেন। অত বড় বাড়ি নিয়ে কি করবি? শুদুমুদু একগাদা টাকা নষ্ট ওই বাড়ির মেনটেন্যান্সে। ঠিক কিনা তুই বল?”

“আমার অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে, বাজার করতে হবে, আমি চলি।”

শিবম আর কথা বলার অবকাশ দেয় না। মাথাটা ভীষণ গরম হয়ে গেছে। ধূর্ত শিয়ালটা যেখানেই একটু সুযোগ বোঝে সেখানেই ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করে। নিজের মতো করে কেউ নিজের বাড়িতে থাকতে পারবে না এদের জ্বালায়। মা বলত খুব রেগে গেলে ইষ্টনাম জপ করতে। ধুর! রেগে গেলে নিজের নামই মনে আসে না। মাও ছিল এক ধরণের। নিজেরা দীক্ষা নিচ্ছ নাও, তা নয়, শিবমকেও জোর করে দীক্ষা দিয়ে দিল। এত ছোটোতে কেউ দীক্ষা নেয়! সেই থেকে রোজ জপ করতে হয় শিবমকেও। ও নিতান্ত কুঁড়ে মানুষ। নিজের মধ্যে নিজে থাকতে ভালবাসে। ওর কুঁড়েমি নিয়ে বেঁচে থাকতে মা বাবা দুজনই গজগজ করত। তারপর তো দুজনেই চলে গেল পরপর। প্রথম প্রথম খুব নাটাঝামটা খেয়েছে শিবম। কাকা কাকীমা মাঝে মাঝে এসে থেকেছে তখন। পিসিও এসে সংসার সামলে দিয়ে যেত। তারপর শিবমের কেমন অভ্যাস হয়ে গেল একা থাকার। দুজন কাজের মহিলা আছে। সীমা আর কৃষ্ণামাসি। রান্নাবান্না করে দিয়ে যায়, ঘরদোর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। অফিসটুকু ছাড়া বাকি সময় নীরব একলা যাপন শিবমের। আছে কিছু রাস্তার পোষ্য। আর বাগানের মায়ের পোঁতা কিছু গাছ। এরাই শিবমের সঙ্গী। আর আছে লিটল ম্যাগাজিনে কিছু কিছু প্রবন্ধ লেখা। সেটাও শাশ্বত মিত্র জোর করে আদায় করে নেন। নাহলে শিবম কবে যে লেখা দেবে তার ঠিক থাকে না কোন। শাশ্বতদা সমানে ওর পিছনে লেগে থেকে লেখা আদায় করেন। বকাবকিও করেন খুব কুঁড়েমির জন্যে।

বাজারে ঢুকে আনাজওলা দীপুর কাছে দাঁড়াতেই দীপু এক গাল হেসে ওকে একটু দাঁড়াতে বলে সামনের বৌদিকে বাজার গুছিয়ে দিল। বৌদি বাজার নিয়ে সরে যেতেই দীপু বলল, “দাদা, ভাল কপি উঠেছে, আর নতুন মটরশুটি এসেছে, নিয়ে যান।” শিবম কপি নিয়ে দাম চুকিয়ে মাছের দিকে এগোতে যেতেই দীপু বলল, “দাদা, বাড়িটা তাহলে রাজীব গুপ্তকে দিয়েই দিলেন। অবশ্য আপনি একা মানুষ, অত বড় বাড়ি নিয়ে করবেন কি? বরং ফ্ল্যাট হলে টাকাও পাবেন, আর ফ্ল্যাটও।” শিবম প্রচণ্ড অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, আবার ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, “কি বললে?”

“কেন দাদা! আপনি বাড়িটা দিয়ে দিয়েছেন… সেই কথা বললাম। ”

“কোত্থেকে শুনলে?”

“খোকনের কোন বন্ধু হবে হয়ত… বলাবলি করছিল রাস্তার মোড়ে, খগেনের চায়ের দোকানে।”

“সব ভুল শুনেছ, আমি কাউকে বাড়ি দিই নি, দেবও না কোনদিন। বুঝলে? এবারে কাউকে বলতে শুনলে বলে দিও যে সত্যিটা তুমি জানো।”

দীপু একটু থতমত খেয়ে ঘাড় নাড়ে। সত্যিই তো, না জেনে কোন কথা বলা উচিত নয়।

মাছের বাজারেও একই অভিজ্ঞতা হল শিবমের। মাছওলা বিশু ছাড়াও আরও দুজন জিজ্ঞাসা করল বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে। আশ্চর্য এটা যে সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছে যে শিবম যেহেতু একা থাকে, তাই বড় বাড়ি বিক্রি করে দেওয়াই ঠিক কাজ। যেন বড় বাড়িতে একা মানুষ থাকতে পারে না। মাথাটা আরও একটু গরম হল শিবমের। যথারীতি মায়ের ইষ্টনামজপের কোন প্রচেষ্টাও কাজে এল না। বাড়ি ফিরে সোজা রান্নাঘরে সীমাদির কাছে বাজার ফেলে দিয়েই বাথরুমে ঢুকে মাথায় জল ঢালতেই নিমেষে মাথা ঠান্ডা। একটু পরে সীমাদির তৈরি গরম গরম পরোটা আলুচচ্চরি আর চা খেয়ে কম্পিউটার নিয়ে কাজে বসে পড়ল।

এই একটা মস্ত সুবিধা হয়েছে কোভিড পরবর্তী যুগে। বিশেষ করে শিবমের। আদন্ত কুঁড়ে মানুষ শিবমের অফিস যেতে কোনোদিনই খুব ভাল লাগে না। অথচ যেতে হয়। করোনা এসে সকলে বেরোতে না পেরে হায় হায় করলেও, শিবম বাড়ি থেকে কাজ করতে পেরে খুব খুশি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বেশ কাজ করা যায়, দুপুরে সীমাদির হাতের গরম ভাত মাছের ঝোল পাওয়া যায়। ব্যস, আর কি চাই? মা বাবা অবশ্য ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখত, তারপর যখন দেখল, শিবম অতি সাধারণ একটা ছেলে, এর দ্বারা অন্যতম হওয়া কখনো সম্ভব নয়, তখন দুজনেই হতাশায় ভুগতে লাগল। তারপর দুম করে মা চলে গেল, আর মায়ের এভাবে চলে যাওয়ার পর বাবা কিছুদিন গুম মেরে থাকল, তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শিবম বাবাকে আর কোথাও খুঁজে পেল না। একটা চিঠি লিখে রেখে গেছিলেন শুধু, ‘আমি চললাম, শান্তির খোঁজে। খোঁজ কোরো না।’

শিবম কান্নাকাটি করলেও ছোটাছুটি করে খোঁজখবর আর করেনি। সবার মতো শিবমও মেনে নিয়েছে যে বাবা সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। ওরা যে সঙ্ঘ থেকে সবাই দীক্ষা নিয়েছে, সেই সঙ্ঘে গিয়ে একটু আধটু খোঁজ নিয়ে দেখেছে, বাবা ওখানে গেছেন কি না, কিন্তু কোনো সদুত্তর মেলেনি। শিবম তাই আর ঢেউ না তুলে সব শান্ত হতে দিয়েছে, আর তাতে শান্তিও পেয়েছে। সত্যি বলতে এই একলা যাপন ওকে আনন্দ দেয়। ও নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়। নিজের মতো থাকে, নিজের মত সময় কাটায়, কারো অভাব বোধ করে না। কিন্তু এই খোকন আর রাজীব গুপ্ত ওর সেই সুখে কাঁটা হয়ে বিঁধছে। ওরা আটঘাট বেঁধেই এগোচ্ছে। নাহলে বাজারে সবাই জানতো না যে শিবমের বাড়ি বিক্রি হচ্ছে। শিবম এটা আগেও খেয়াল করে দেখেছে, এই খোকন যে বাড়ির ওপর নজর দেয়, এটা রটিয়ে দেয় যে ওই বাড়ি তাদের হাতে এসে গেছে। হয়তো সেই বাড়ির লোক বিক্রি করতে চায় না… তবু লোকমুখে শুনতে শুনতে কখন খোকনের প্রস্তাব মেনে নেয়।

অফিসের কাজের ফাঁকে শাশ্বতদার ফোন এল।

“কি রে! এবার একটা ছোটগল্প চাই ম্যাগাজিনের জন্য, পারবি তো দিন তিনেকের মধ্যে দিয়ে দিতে? তুই যা কুঁড়ে! আজই অফিস শেষ করে লিখতে বসবি।”

“আমি খুব প্রবলেমের মধ্যে আছি। এখন লিখতে ফিকতে পারব না।” শিবম গম্ভীর হয়ে বলে।

“কেন? কি হলো আবার? থাকিস তো একা। বিয়েও করিস না কাজ বাড়ার ভয়ে।”

“ইয়ার্কি দিও না শাশ্বতদা। প্রোমোটার লেগেছে পেছনে। চারিদিকে রটিয়ে দিচ্ছে আমি নাকি বাড়ি দিয়ে দিয়েছি। এরপর কোনদিন শুনবে আমি হয়ত খুন অথবা নিখোঁজ হয়ে গেছি।”

“এই হচ্ছে তোর মতো হদ্দ কুঁড়েদের সমস্যা। যতো আগডুম বাগডুম চিন্তা। শোন, আমাকে তো তুই গুরু মানিস, মাঝে মাঝে নিজেই বলিস, কি বলিস তো?”

“ঝেড়ে কাশো।”

“শোন, অত বড় বাড়ি নিয়ে একা মানুষ থাকলে আজকের দিনে শকুনের চোখ পড়বেই। বুদ্ধি করে চলতে হবে। বিয়ে তো তুই করবি না। সুতরাং অন্য উপায় ভাবতে হবে, রাতে অফিস শেষ হলে কথা বলবো। এখন গল্পটা যেন তিন দিনের মধ্যে পাই।”

রাতে সীমাদির করা ফুলকপি দেওয়া খিচুড়ি খেয়ে গায়ে হাল্কা কম্বল টেনে ল্যাপটপে ওয়েব সিরিজ খুলে বসল শিবম, পাশে হুলো গদাই। খুব বিশ্বস্ত। আর রাস্তার নেড়ি ভুলো, মেঝেতে পাপোশের ওপর। মাঝে মাঝে জুলজুল করে গদাইকে দেখে হিংসেতে কানটা ফতফত করে নেড়ে নিয়ে, পিছনের দিকের দু-একটা এঁটুলি কামড়ে খেয়ে নিয়ে আবার পাপোশের ওপর শয়ন। সিরিজের বেশ উত্তেজনাময় একটা সময়ে ফোন বাজল। বিরক্ত হলেও শিবম ধরল।

“কি রে, গল্প লিখছিস?”

“ধুর! প্রবন্ধ হলেও কথা ছিল, আমার মাথায় গল্প আসছে না শাশ্বতদা।”

“তাহলে আমার পক্ষেও তোর বাড়ি রক্ষার ব্যাপারে কিছু ভাবা সম্ভব নয়।” ফোন কেটে দিল শাশ্বতদা। অগত্যা শিবমই আবার ফোন করে। অনেক তেল মারার পর শাশ্বতদা মুখ খোলে। কিন্তু যে বুদ্ধি দেয় তাতে শিবমের মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে যায়। এ যে ভয়ানক পরিশ্রমের ব্যাপার। শাশ্বতদা এটা ছাড়া আর কোন প্ল্যান দিতে পারল না। সিরিজ দেখা মাথায় উঠল শিবমের।

দুদিন পর থেকেই দেখা গেল শিবমের বাড়িতে মিস্ত্রি লেগেছে, টুকিটাকি সারানো, তার সঙ্গে বাবা মায়ের চলে যাবার পর এই প্রথম বাড়িতে রঙের কাজ শুরু হলো। বড় বাড়ি, জনা দশেক রঙের মিস্ত্রি… সে এক হল্লা শুরু। বাড়ির গায়ে রঙের পোঁচ পড়তেই শিবমের বেশ ভাল লাগতে শুরু করেছে। এত হৈ হৈ বেশ লাগছে। মরা বাড়িটা যেন নতুন প্রাণ পেয়েছে। নতুন করে গেট বসানো, আর তার সঙ্গে একটা সাইনবোর্ড… “BABIES HOUSE”।

“সীমাদি, কৃষ্ণামাসি তোমরা তোমাদের পাড়ায় সব বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলেছ তো?” রান্নাঘরে ঢুকে শিবম জিজ্ঞেস করল।

“ওসব নিয়ে তুমি ভেবোনি গো দাদাবাবু। ঠিক সময়ে সব হয়ে যাবে।” ঘর মুছতে মুছতে কৃষ্ণামাসি বলে উঠল।

যাক নিশ্চিন্ত। তবে পরিশ্রম হচ্ছে খুব। সব তদারকি করা, অফিস, আবার শাশ্বতদার গল্প। আর পারা যায় না। এসবের মধ্যেই একটা ফোন আসে, আননোন নাম্বার।

“হ্যালো। আমি রাজীব বলছি। বাড়ি রঙ করছেন, বিয়ে করছেন নাকি! আপনাকে ভাল অফার দেব, তিনটে ফ্ল্যাট, গ্যারাজ, আর তার সাথে ভাল নগদ। রাজি হয়ে যান ভাই, নতুন বিয়ে করে নতুন ফ্ল্যাটে থাকুন।”

শিবম শুধু শুনে ধন্যবাদ বলে ফোন কেটে দেয়। বাজার যাবার পথে একটা বাইক হাল্কা ধাক্কাও মারে একদিন। শিবম শাশ্বতদার কাছে পরামর্শ চায় পায়ে বরফ ঘষতে ঘষতে।

“এটুকু তো হবেই ব্রাদার, সাহস না থাকলে করিস না।”

“এত পরিশ্রম পোষায়?”

“তাহলে বলতে এলি কেন? মা বাপের বাড়িটা দিয়ে দিলেই পারতিস।” রেগে ফোন কেটে দেয় শিবম। আবার ফোন বেজে ওঠে “গল্পটা লিখতে থাক।” আরও রেগে শিবম ফোন কেটে দেয়।

সীমাদির কাছেই শুনেছিল এই কোভিড পরিস্থিতিতে ওদের বাচ্চাগুলো অনলাইন ক্লাস করতে খুব অসুবিধা হচ্ছে, পড়াশোনা প্রায় কিছুই হচ্ছে না। ভাল ফোন কারোরই নেই, আর ল্যাপটপের তো গল্পই নেই। শুনে শিবমের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল। কিন্তু ওই, ওই পর্যন্তই। কুঁড়ে মানুষ, ভুলেও গেছিল সব কিছু। কিন্তু বাড়িটা রাখতে গিয়ে শাশ্বতদার কথা শুনে এখন শিবমের নাইবার খাবার সময় নেই। নিচের তলার ঘরগুলোতে সুন্দর সুন্দর চেয়ার টেবিল, বোর্ড, ল্যাপটপ সব এসেছে। প্রথমে ছজন বাচ্চা দিয়ে শুরু হয়ে এক মাসের মধ্যে আঠারো জন ছেলে মেয়ে ক্লাস করতে আসছে শিবমের কাছে। সন্ধের পর ক্লাস শুরু হয়, ছুটির দিনে সকাল সাড়ে দশটা থেকে। শাশ্বতদার মাসতুতো বোন ছুটি এরকম একটা মহান কাজে নিজে থেকে যোগ দিতে চায় বলে ফোন করেছিল কাল শিবমকে।

মনে হচ্ছে শিবমের ছুটির দিনের ছুটি হয়ে এসেছে। আর একটা কথা শিবমের বাড়ি রঙ করার পর থেকেই মনে হচ্ছে… কে যেন বলেছিল কংখলের আশ্রমে তার বাবার মতো কাউকে দেখেছিল। শিবম তখন গা করেনি। এখন ভাবছে একবার কংখলে গিয়ে দেখেই আসবে… নতুন বাড়িটা দেখলে বাবা নিশ্চয়ই আর চলে যাবেন না। বাড়ির সঙ্গে শিবমেরও যে বদল ঘটছে।


আপনার মতামত লিখুন :

3 responses to “মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘গুরু’”

  1. এ. Sen says:

    থিম ta খুব সুন্দর..বেশ ভালো লাগলো.

    👍

  2. Kalyan Chakrabarty says:

    Good theme…..a silent protest against present Promoter-ship & Brokers….. feeling really good….. worth reading….

  3. Nandini Adhikari says:

    ভালো লাগলো মৈত্রেয়ী

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন