ফাইল থেকে মুখ তুলে রিভলবিং চেয়ার সুদ্ধ পুরো বিপরীত দিকে ঘুরে গেল নোমা। কাচের ওপাশে তালগাছটা যেমন দাঁড়িয়ে থাকার তেমনই একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু পড়ে আছে শূন্য বাসাটা। কাক দম্পতি তাদের সদ্য উড়তে শেখা বাচ্চা দু’টো নিয়ে উড়ে গেছে। গত তিন বছর এমনটাই দেখে এসেছে নোমা। বসন্তের শুরুতে তেইশ নম্বর ক্যামাক স্ট্রিটের বাদাম গাছটার শুকনো ডাল ফুড়ে উঁকি দেয় লাল বেগুনি পাতা। গোটা শীতটা পাতা ঝরা চর্মসার গাছটাকে বিশ্রী লাগে। দেখতে দেখতে ক্লান্তি আসে। একদিন হঠাৎ ক্যাপসুল লিফটে উঠতে গিয়ে দেখে গাছটায় জীবন ফিরে এসেছে। নোমা বুঝতে পারে ঠোঁটে ছোট ছোট খড়ডাল নিয়ে কাক দম্পতি আসবে দু’এক দিনের মধ্যে। তালগাছটাও শীতের চাদর নামিয়ে সজিব ডাল উন্মুক্ত করে দেয় কাক-কাকিনীদের জন্য। তবে একই কাক দম্পতি আসে কিনা বুঝতে পারে না নোমা। তারপর কলকাতার এই পশ এলাকায় নিভৃতে কাক দম্পতি জনন কার্য করে, ডিম পাড়ে, ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা নিয়ে উড়ে যায়। নোমার ফাইলে মাথা ভারি হয়ে গেলে চেম্বার ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের মাথায় কাকের সংসার দেখে। দেখে কর্তা-গিন্নির সোহাগ ভালোবাসা। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরুলেই মা-বাবা অতন্দ্র সন্তানদের মঙ্গল কামনায়। নোমা ভাবে, বাচ্চার আগুন লাল ঠোটের মধ্যে যে আদরে কাক উগরে দেয় খাবার, মানুষ কি পারে অমন নিঃস্ব করে দিতে সব? গত দু’বছর দেখে এসেছে বাচ্চার ডানা শক্ত হলে পড়ে থাকে পরিত্যক্ত বাসা। শূন্যবাসাটা দেখে নোমার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। শূন্য বাসাটা তো অন্য কেউ দখল নেয়নি। অথচ তার ফেলে আসা সংসার কি ফাঁকা আছে? নোমার মাথার মধ্যে ঝিনঝিন করে উঠল— উড়ে যাওয়া পাখিরা কি চিরকাল যাযাবর থেকে যায়?
অফিস থেকে বেরুনোর সময় নোমা ড্রাইভারকে বলল— হগ মার্কেট চল। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল ম্যাডাম, হগ মার্কেটটা কোথায়?
— কেন, হগ মার্কেটটা হগ মার্কেটে। আরে টোমরা যেটা নিউ মার্কেট বল।
— ম্যাডাম, ওখানে এখন পার্কিং পাওয়া যাবে না। ড্রাইভার নিরুৎসাহি গলায় বলল। রোজকার মতো আজও অফিস থেকে বেরুতে দেরি করেছে তার বস। সাতটা আটটার আগে ম্যাডামের বেরুনোর তাগিদই থাকে না। তারপর হগ মার্কেট হয়ে তাকে নামিয়ে বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। বাড়ি ঢুকলেই বউ বলে উঠবে— ম্যাডামের খেদমত খেটে দিন চললে বিয়ে করার কি দরকার ছিল?
নোমা ড্রাইভারের কথায় গুরুত্ব দিল না। বলল — ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ফুড কর্পোরেশনের অফিসে গাড়ি রাখ। সরকারি অফিসে অন ডিউটি লেখা গাড়ি রাখতে কেউ বাধা দেবে না।
হগ মার্কেটের সামনে নোমাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা খাদ্যভবনের দিকে চলে গেল। নোমার মনে হল এখানে কেন এসেছি? হগ মার্কেটে আগে আসতে যে প্রাণের তাগিদ অনুভব করত তা তো হচ্ছে না। ভাললাগা গন্ডির মধ্যে আগে তো হগ মার্কেট প্রায় এক নম্বরে ছিল। সারা কলকাতায় অ্যাংলোদের আসা-যাওয়ার পরিধিই বা কতটুকু? চৌরঙ্গী, পার্কস্ট্রিট, বো ব্যারাক, লিনডসে স্ট্রিট আর হগ মার্কেট ব্যাস পৃথিবী শেষ বাকি সব অচিন পরবাস। আত্মীয়তার অনুভূতিতে জড়িয়েছিল হগ মার্কেট। হগ মার্কেটে দীন মহম্মদ অ্যাঙ্কেলের অ্যাংলো স্নাক্স সপ ছিল হগ মার্কেটে অ্যাংলোদের প্রাণকেন্দ্র। আর নাহুম অ্যান্ড সন্স কনফেকসনার্স। ইহুদিদের দোকান। সেই ১৯০২ সাল থেকে ইহুদী অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মিলেমিশে স্মৃতি মেদুর করে রেখেছে। অথচ নাহুম ইজরাইল এসেছিল বাগদাদ থেকে। সে যেন এলাম দেখলাম জয় করলাম-এর মতো। নাহুমদের পামকেক, ফ্রুটকেকে রসনার তৃপ্তিতে বেধে ফেলল—বাঙালি, অ্যাংলো আর গোটা কলকাতাকে। আঃ কী গন্ধ, কী স্বাদ! শেষ বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে দোকান সামলাত ডেভিড ইলিয়াস নাহুম, দ্য গ্রেট পা। সেও চলে গেল নারকেলডাঙ্গা বেরিয়ালে। এখন ওই দিকটায় যেতে মনের মধ্যে হু হু করে। অথচ লোকটার গায়ে তো এক ফোঁটাও ইউরোপিয়ান রক্ত ছিল না। কিছু কিনুক না কিনুক নোমার মা অ্যাঞ্জেলা মেয়েকে নিয়ে হগ মার্কেটে এলে দীন অ্যাঙ্কেলের দোকান একবার ঘুরে যেত। দোকানটা যেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের আত্মীয়ঘর। দীন মহম্মদ ছিল চমৎকার মানুষ। গায়ে ইউরোপিয়ান রক্ত বইছে। দোকানে যেতে যেতে দীন মহম্মদের সুদর্শন স্মার্ট ছেলে ফেড্রিকের সাথে প্রেম হয়েছিল নোমা জোনসের।
নোমা দরজা দিয়ে দেখল ফেড্রিক ক্যাশে বসে দোকান তদারকি করছে। তার বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠল। দোকানে ঢুকতে গিয়ে বুঝতে পারল পায়ে দ্বিধা এসেছে — ঢুকব কী ঢুকব না। এই সময়টায় খুব বেশি ভীড় থাকে না। দু’টো মুখ চেনা অ্যাংলো ফ্যামিলি কেনাকাটা করছে। দ্বিধা কাটিয়ে নোমা সোজা ফেড্রিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফেড্রিক মনোযোগ দিয়ে টাকা গুছাচ্ছিল। সে মাথা তুলে নোমাকে দেখে হকচকিয়ে গেল। উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠল, তারপর উদাসীন হতে হতে বসে পড়ল — ইয়ু?
— ইয়েস, অ্যাই কেম টু সি ইয়ু। হাউ আর ইয়ু?
— অ্যাই অ্যাম অ্যাবসোলুটলি ফাইন। হি ম্যান হ্যাচ কাম উইথ ইয়ু।
— নো, নো, আই লিভ সিঙ্গল টিল নাউ।
ফেড্রিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দোকান কর্মচারী বিনোদ সেখ, আকিব, মুশারা ড্যাব ড্যাব করে তাদের দেখছে। খরিদ্দার অ্যাটেন্ড করার তাগিদ নেই। তাদের চোখে কৌতূহল এবং অবিশ্বাস। নোমার কাছে গোটা দোকানটাই কেমন বদলে যাওয়া, অচেনা মনে হল। দীন অ্যাঙ্কেলের বয়স বেড়ে যাওয়ায় দোকানের রাস একটু একটু করে ধরছিল ফেড্রিক। ফেড্রিকের প্রাণবন্ত চেহারা আর কথার জাদু টেনে আনত নোমাকে ৷ দোকানটা মনে হত নিজের। কর্মচারীরা বিয়ের আগেই একটু একটু করে তাকে মালকিন হিসাবে মেনে নিচ্ছিল। নোমা খেয়াল করল ফেড্রিক একবারও বসতে বলল না। তখন তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, নোমা অফিস ফেরত পথে কখনও সখনও চলে আসত দোকানে। বসত ফেড্রিকের পাশে, ক্যাশে। ফেড্রিকের অবর্তমানে গোটা দোকানটাই চলত তার কথায়। নোমার অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হল — এখন দোকানের চুলটি পর্যন্ত নড়বে না তার কথায়। মুশা ছিল সব চাইতে বেশি বাধ্য। দোকানে এলে ছুটে এসে বলত — আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম। প্রথম প্রথম প্রতিউত্তর কী দিতে হবে নোমা বুঝে উঠতে পারত না। ফেড্রিক এগিয়ে এসে বলত সে হিম ওয়ালেকুম সালাম। নোমা চেষ্টা করত — ওয়ালকুম সলম। ফেড্রিক শুধরে দিত কিন্তু প্রতিবারই হয়ে যেত ওয়ালকুম…. দু’জনে হেসে উঠত হা-হা-হা করে। মুশার সাথে ঘুরে ঘুরে দোকান দেখত। মুশাকে নোমা বলত, চিজটা এখানে রাখ। খাবারের পাশে পাশে ফুল আর ফল সাজিয়ে অন্য রকম লুক দিতে হয়। দীন অ্যাঙ্কেলের অ্যাংলো সপ তখনই ছিল ছোটখাট ফুডমল। নোমা তাকিয়ে দেখল—দোকানটা অনেকটা এলোমেলো হয়ে গেছে। নোমার ভাবনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেড্রিক ক্যাশ কাউন্টার ছেড়ে এসে বলল — লেট আস সিট ইন কারকো হেরিটেজ কাফে
— ওকে, নাইস। নোমা মনে মনে স্বস্তি পেল। দোকানটায় সবই আছে আগের মতো কিন্তু তার নিজেকে কেমন বেমানান লাগছে। পরিবেশটা তার উপস্থিতি চাইছে না।
হগ মার্কেটের উত্তরাংশ একতলায় কারকো হেরিটেজ। এই দিকটাকে লোকে বলে নিউমার্কেট। যদিও হগ মার্কেটের অ্যানেক্স বিল্ডিং এটা। এদিকটায় অ্যাংলোরা খুব একটা আসে না। খানিকটা হিন্দুস্থান পাকিস্থান ভাব। ফেড্রিকের সাথেই এদিকটা নোমার যতটুকু চেনা। তাও কাফে কারকোর কল্যাণে। তারা দু’জনে মুখোমুখি বসল। কোনার দিকের তাদের প্রিয় টেবিলটা ফাঁকা ছিল। ফেড্রিক ওয়েটারকে দু’প্লেট রেশমি কাবাব আর কফি অর্ডার দিল। ফেড্রিকের দিকে নোমা চেয়ে দেখল চেহারায় আরো জেল্লা লেগেছে। বিচ্ছেদের ক্লান্তি তার চোখে মুখে নেই। বহুবার কাফে কারকোতে এসেছে তারা। প্রতিবারই খাবার নির্বাচন নিয়ে অসুবিধা হত। নোমা চাইত ফেড্রিকের প্রিয় মোঘলাই খাবার বাছতে আর ফেড্রিক চাইত কন্টিনেন্টাল খাবার অর্ডার দিতে। নোমাকে খুশি করতে ফেড্রিক মরিয়াভাব দেখাত। ফেড্রিক কি সব এর মধ্যে ভুলে গেল? বার্গার আর কাবাবের মেকি লড়াই চলত খানিকক্ষণ। তখন নোমা বলত-না, না, আমি ইন্ডিয়ান ফুড হেবিট করতে চাই। কাবাত সরি কাবাব খাব।
— ফেড্রিক বলত — ইয়ু আর অলরেডি ইন্ডিয়ান ম্যাম।
— রাইট কিন্তু ভুল হয়ে যায়।
ওয়েটার গরমাগরম কাবাব দিয়ে গেল। ফেড্রিক কাটাচামচে গেথে কাবাব মুখে দিতে দিতে বলল — হটাৎ আমার দোকানে এলে?
— অ্যাকচুয়ালি, না মানে… নোমা কথা হারিয়ে ফেলল। সত্যিই তো কিসের জন্য এসেছে তা ভাবা হয়নি। ফেড্রিকের বলা আমার দোকান কথাটা তার কানে লেগেছে। দোকানটা তার এখনও মনে হয় দীন মুহম্মদ অ্যাঙ্কেলের। অল্প দিনের ব্যবধানে কত পরিবর্তন হয়ে গেছে। ভেবে দেখল কোনো কিছুর মধ্যে নোমা নেই। সে ফেড্রিকের খাওয়া দেখতে দেখতে বলল— টুমি কি বিয়ে করেছ?
— হ্যাঁ, আমাদের সেপারেশনের দু’মাস পারে বিয়ে করেছি। ফেড্রিক নির্লিপ্তভাবে বলল। প্রতিটা শব্দ নোমার বুকের মধ্যে ধক্ ধক্ করে আছড়ে পড়ছিল। নোমা মনে মনে তো এমনটাই কল্পনা করে এসেছে। তবু বুঝতে পারল না, হৃদয়ের ধড়ফড়ানিটা এমন করে বেড়ে গেল কেন?
— কাকে?
— নিলোফারকে। সি ইস অ্যা সুইট লেডি। তুমি কি তাকে দেখতে চাও? ফেড্রিকের গলায় কোনো উষ্ণতা ছিল না। তবু নোমা বিষণ্ণ বদনে মাথা নাড়ল।
— ওকে। তা হলে তোমাকে আমাদের বাড়ি যেতে হবে।
***
অ্যাঞ্জেলা ডাইনিং টেবিলে পরিষ্কার করে ধোয়া দু’টো কাচের গ্লাস সাজিয়েছে। গ্লাসের গায়ে জলবিন্দুতে আলোর হাল্কা বিচ্ছুরণ হচ্ছিল। পুরো টেবিলটা অত্যন্ত পরিপাটি করে সাজানো। টেবিলের মাঝখানে ফুলদানিতে বিকেলের কেনা টাটকা রজনিগন্ধা স্টিক থেকে মিষ্টি গন্ধ ঘর ম ম করছে। পুরো ঘরটাই সাজানো গুছানো। অ্যাঞ্জেলার একটা সময় ছিল দিন আনি দিন খাই অবস্থা। তবু অধিকাংশ অ্যাংলোদের মতো সামান্য আসবাবপত্রের দারিদ্রমাখা ঘরও থাকত সযত্নে ঘুছানো। রোজকার মতো রেঞ্জার ক্লাব থেকে ফেরার পথে অ্যাঞ্জেলা গ্রিলড চিকেন নিয়ে এসেছে। মাইক্রোওভেনে গরম করে মেয়েকে ডাকল — নোমা, কাম, ডিনার ইস রেডি।
নোমা পাশের ঘরে চোখ বুজে শুয়েছিল। হগ মার্কেট থেকে এসে ড্রেস পর্যন্ত পাল্টায়নি। তখনও পরনে জিনস, টপ সার্ট। অন্যদিন ফিরে ফ্রেস হয়ে এই সময়টা ব্যয় করে সোসাল নেটওয়ার্কিং-এ। নেট সার্চ করতে করতে এককাপ কফি আর হাল্কা স্নাক্স খায়। দিনের ক্লান্তি খানিকটা ঝরে যায়। সেদিন তার কিছু ভাল লাগছিল না। তার ঘরটায় একটা লাল রঙের ডিম লাইট জ্বলছিল ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মাথার উপর। এই আলোতে যিশুকে দেখতে নোমার খুব ভাললাগে। মনে হয় ঈশ্বর পুত্রের আভা বিচ্ছুরণ হচ্ছে। এখন যেন ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মুখ রক্তিম আভায় বেদনাহত। নোমা চোখ বোজা অবস্থায়ই বলল—আই হ্যাভ নো অ্যাপিটাইট। তুমি খেয়ে নাও মা। আমার জন্য দু’টো মাত্ৰ স্যান্ডউইচ রেখ। পরে খেয়ে নেব।
ঘরের সব আলো যেন অ্যাঞ্জেলার উপর পড়ছে। তার সুতির ফুলফুল প্রিন্টেট স্কাটে উঁকি দিচ্ছে ক্লান্ত অবসন্ন চেহারা। পাকা চুলে কদমফুলের মতো লাগছে মাথা। গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে, চোখে ব্যাগি। সে একটা গ্লাস এগিয়ে নিয়ে স্কচ ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করল — বিকেলে কোথায় গিয়েছিলি?
হগ মার্কেটে।
— ব্লাডি ফেড্রিকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি? আমরা ইংরেজ, কিছুতেই মিশ খাবে না। বুঝতে চাও না কেন নোমা, তেলে জলে কখনও মিশে? নোমা উত্তর দিল না। প্রসঙ্গ ঘুরাতে চেষ্টা করল — সিডনি থেকে একটা ই-মেল পেয়েছি। চ্যাপলিন ইনভাইটেড আস ওখানে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের অ্যানুয়াল মিট হবে। অ্যাসোসিয়েশনের ষাট বছর পূর্তি। সারা অস্ট্রেলিয়া, বলতে পার সারা বিশ্বের অ্যাংলো- ইন্ডিয়ানরা পার্টিসিপেট করবে। আমাদের ইনভাইট করেছে চ্যাপলিন।
কথাটা শোনার পর অ্যাঞ্জেলা চার্জড হয়ে উঠল। তার বাদামি চামড়ার মুখে খেলে গেল উজ্জ্বল ঝিলিক — ও নাইস চ্যাপলিন! একেই বলে রক্তের টান। আমার ভাইপো আমাদের মনে রেখেছে। আমি যেতে চাই। কতবার বলেছি পাশপোর্ট তৈরি কর। আমার কথা শুনলে না। এবার আমরা তল্পিতল্পা সহ যাব। আমরা ইংরেজ, আমরা নেটিভদের মতো ইন্ডিয়াতে মরতে পারি না। অস্ট্রেলিয়ায় ইন্ডিয়া থেকে কত অ্যাংলো মাইগ্রেট করেছে হিসেব রাখ? কিন্তু তুমি আমার কথায় কখনই কান দাওনি। আমি একটা মিশনারি স্কুলের প্রাইমারি সেকশনের টিচার ছিলাম। কত কষ্ট করে তোকে দার্জিলিং লরেটো স্কুলে পড়িয়েছি। বোডিং স্কুলে পড়ানোর ক্ষমতা আমার ছিল না, তবু আমি দিন-রাত পরিশ্রম করে যা সামান্য টাকা আয় করতাম প্রায় সব তোকে পাঠাতাম। তুই যাতে ইউরোপিয়ানদের মতো শিক্ষা দীক্ষায় হতে পারিস তার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি কিছুতে ইন্ডিয়া ত্যাগ করতে চাইলে না। অ্যাঞ্জেলা আর এক পেগ স্কচ ঢেলে জল, আইস কিউব মিশাল। গলায় এক ঢোক ঢেলে দিয়ে বলল — উই আর ইংলিশ পিপল। ইন্ডিয়া ইস নট আওয়ার ফাদারল্যান্ড।
নোমা চুপ করে মায়ের কথাগুলো শুনে গেল। প্রথমে মনে হল কী আর উত্তর দেবে। মা রোজ বাইবেল পাঠের মতো দেশ ত্যাগের কথা বলে আর বিভোর হয়ে যায় ইংরেজ রক্তের স্বপ্নরাজ্যে। মায়ের কিছু কথার উত্তর দেওয়া যায় আবার হয়ত কিছু কথার উত্তর নেই। তবে তাকে মানুষ করতে মা নিজেকে নিংড়ে দিয়েছে তাতে কোনো খাদ নেই। নোমার মাথার মধ্যে উঁকি দেয় ফেলে আসা দিনগুলো। তারা থাকত মধ্য কলকাতার বো ব্যারাকে। বো ব্যারাক যা ছিল কিনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যারিশন মেস। সৈন্য ঘাঁটি। তাতেই ঠাঁই হল অ্যাংলোদের। যেন অবাঞ্চিতদের গুঁজে দেওয়া। বো ব্যারাকে নোমাদের তিন পুরুষের বাস। দাদু পিটার জোনস্ ছিল ইন্ডিয়ান সৈন্য বাহিনীতে অ্যার্টিল্যারি ম্যান। গোলন্দাস সৈনিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পিটার বার্মা ফ্রন্টে লড়েছে জাপানের বিরুদ্ধে। আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিরুদ্ধেও নাকি দাদু লড়েছিল। দাদুর গায়ে খোদ ব্রিটিশ রক্ত। ঠাম্মা ছিল শৈলবালা বিশ্বাস। যুদ্ধ শেষে দাদুদের আস্তানা হল বো ব্যারাকে। পদমর্যদা অনুসারে কামরা। পিটার জোনস সাধারণ সৈনিক সুতরাং দুই কামরার অপরিসর ঘর। বাথরুম কমন। নোমার দাদুকেই বেশি মনে আছে। বাবাকে সেই অর্থে তার মনে নেই। বয়স তখন সাত-আট, বাবা মা তাকে দার্জিলিং বোডিং স্কুলে ইতিমধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছে তাকে। ছুটিতে বাড়ি এলে বাবা মা’র মধ্যে তুমুল কথা কাটাকাটি শুনতে পেত। বাবা নেশায় চূড় হয়ে থাকত। কাজ করত পোস্টাল ডিপার্টমেন্টে কেরানির চাকরি। ইন্ডিয়া স্বাধীন হওয়ার পরও কিছুদিন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য ডাক ও তার, কাস্টমস আর রেলওয়ের মতো বিভাগে চাকরিতে সংরক্ষণ ছিল। বাবা-মা’র কথায় ভেসে আসত শেলী ব্রাউনের নাম। বো ব্যারাকের ডি ব্লকে থাকত শেলী অ্যান্টি। মা একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলছিল — তুমি তো শেলীকে নিয়েই ভাল আছ। তার রূপ যৌবনে মজে আছ। ওই সেক্সি হোরটাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পার না। পরের ছুটিতে এসে শুনল বাবা শেলী অ্যান্টিকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। বো ব্যারাকের বাড়িটা আর ভাললাগত না নোমার। ইচ্ছা হত হোস্টেলে পালিয়ে যেতে। বাবার সাথে নোমার সম্পর্কটা ছিল আলো-ছায়ার মতো। তবু বাবা চলে যাওয়ায় শূন্য শূন্য লাগত তার। দাদু মানুষটা খানিকটা নির্জীব নির্লিপ্ত। অধিকাংশ অ্যাংলো হুল্লোরবাজ — খাও, পিও জিও মন্ত্রে মজে আছে। বড়দিন বা কোনো উৎসবই দাদুকে ছুঁতো না। বারান্দায় চেয়ার টেবিল পাতা ছিল, সেখানে সস্তার মদ নিয়ে কাটিয়ে দিত সারাদিন। ভারতীয়রা দাদুকে প্যাক দিত ইংরেজদের চামচা বলে। হাফ প্যান্ট, গায়ে গেঞ্জি পরে কেমন অবাক মৃত্যুর দিন গুণত। নোমা দাদুর এই ছবিটা এখনও চোখের সামনে দেখতে পায়। দাদু একটা শেষ ইচ্ছা গোপনে বয়ে বেড়াত, ইংল্যান্ডের মাটিতে মরবে। দাদুর স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নোমা মল্লিকবাজারে দাদুর বেরিয়াল ছুঁয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে — দাদু, এ মাটিতে কেমন আছ?
মা’র অতসব ভাবার ফুরসৎ ছিল না। মেয়েকে যে করে হোক যথার্থ ইংরাজি শিক্ষা দিতে হবে। তারপর মেয়ের ডানায় ভর করে উড়ে যাবে ইংরেজ রাজ্যে। তবু মা বো ব্যারাকের ভাঙাচোরা ঘরে দুঃখ কান্নার চাপা স্রোতে মিশে ছিল। সেই ঘরটাই একদিন পরবাস করে দিল কোলকাতা কর্পোরেশনের মালিকের উদ্দেশ্যে একটি নোটিশ। মালিক কলকাতা ইমপ্রোভমেন্ট ট্রাস্ট। গোটা ব্যারাক কনডেমন্ড ঘোষিত হয়েছে। বসবাসের পক্ষে বিপজ্জনক। কর্পোরেশন বলেনি উঠে যাও বা থাক। অনস্তিত্বের টানাপোড়েনে অনিশ্চিত ১৩২টা পরিবার। অ্যাঞ্জেলার উপলব্ধিতে প্রতিনিয়ত মিশে থাকত শিতল অবহেলার ব্যথা। পাঁচ পুরুষের বাসস্থানের উপর কোনো অধিকার নেই? নোমার চোখে ভেসে উঠত একটা কাল্পনিক দৃশ্য — একবহর বুলডজার কামানের মতো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বো ব্যারাকের পাঁজর থেকে এক একটা ইট। আর বো ইউনাইটেড অরগানাইজেশনের ক্রিল ব্রুস লিনডসে, স্টিফেন সেকেরিয়ারা প্রশাসনের দরজায় মাথা ঠুকে মরছে — বো বারাক বাঁচাও। দয়া করে আমাদের বাস্তুচ্যুত কর না। নোমা ভাবনা থেকে ফিরে আসে মায়ের স্কচ ঢালার শব্দে। নোমা মাকে জিজ্ঞেস করল — অস্ট্রেলিয়া যাবে কেন মাদার? তোমার বাবা সাইমন ছিল ইংরেজ। ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে না কী দাদুর ব্যাপ্টিজম হয়েছিল। তোমার তো ইংল্যান্ডে যাওয়া উচিত।
অ্যাঞ্জেলা জোসের মাথা ঝিম ধরে ভারি হয়ে এসেছে। মুখ খানিকটা টেবিলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সে জড়ানো গলায় বলল — দে আর অল চিটার্স। আমাদের বাপ ঠাকুরদাদের সাম্রাজ্য চালানোর জন্য ইন্ডিয়ায় এনেছিল। জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য রক্তের মিশ্রন ঘটাল। ইন্ডিয়ান গার্লদের বিয়ে করতে মদত দিল। যেই শঙ্কর হয়ে এই মাটিতে পূর্বপুরুষরা জন্মাল অমনি অচ্ছুত হয়ে গেল তারা। ব্রিটিশরা আমাদের বিশ্বাসও করত না, পাতেও নিত না। মনে করত আজর জীব। অথচ আমরা মনে মনে রয়ে গেলাম ইংরেজ। নেটিভরা আমাদের সন্দেহ করত আর খাঁটি সাহেবরা আমাদের ছোঁয়া এড়িয়ে চলত। আমরা জাঁতাকলে কাটা সাহেব। ইংল্যান্ডে কি আমাদের জন্য রয়াল রিসেপশনের ব্যবস্থা আছে? ওখানে গেলে আমাদের কুলি কামারের কাজ ছাড়া আর কি জোটে? ওদের দেশে ভাল থাকা না থাকার মধ্যেও চামড়ার রঙ দেখা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় শুনেছি ওরা ভাল আছে।
নোমা বলল — অস্ট্রেলিয়ায় যদি ওরা ভালই থাকবে তবে প্রতিবছর ঘটা করে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহাসম্মেলন করার কি দরকার? কেন বলতে পারছে না ওরা অস্ট্রেলিয়ান? শুনেছি ওরা আমাদের বো ব্যারাক বা চৌরঙ্গীর মতো সিডনির কোনো কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় গন্ডিবদ্ধ। সেখানেও কি ওরা বাত্যজন নয়?
নোমা তার রুম ছেড়ে মায়ে মাথার কাছে এসে দাঁড়াল। মায়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল — মা এখন ওঠো। আমরা এখানে তো ভাল আছি। এই দেখ আমি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় চিফ পাবলিক রিলেশন অফিসার। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা বিমান বাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে চাকরি করছে। ইন্ডিয়ানরা যা যা গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে আমরা তা সব ভোগ করি। আমাদের সমস্যা আমরা মনে প্রাণে কিছুতেই দেশটাকে নিজের দেশ ভাবতে পারি না। নিজেদের একটা গন্ডির মধ্যে বন্দি করে রাখি। অথচ এদেশেই আমাদের জন্ম মৃত্যু। পৃথিবীর কোথায়ও আমাদের জন্য রাজ সিংহাসন সাজানো নেই। এখানে আমাদের জন্য সব আছে। আমার অবশ্য একবার অস্ট্রেলিয়া গিয়ে দেখে আসতে ইচ্ছা হয়—বাবা আমাদের ছেড়ে ওখানে কি সুখে আছে?
অ্যাঞ্জেলা ভাবল — ঠিকই তো ইন্ডিয়ায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের অসীম দারিদ্র যেমন আছে তেমনি মন্ত্রী সান্ত্রীও আছে। মেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় চাকরি করে তিলজলায় ফ্ল্যাটটা কিনেছে। এখানে নাগরিক স্বচ্ছন্দ অনেক বেশি। বো ব্যারাক, রিপন স্ট্রিট, লিনডসে স্ট্রিট বা চৌরঙ্গীর মতো অ্যাংলো বাড়িঘরের ঘিঞ্জিজীবন নেই। তবু এটাকে তার বাড়ি মনে হয় না। বো ব্যারাকটাকে বাড়ি মনে হয় অথচ ইন্ডিয়াকে দেশ মনে হয় না। তার মনে হল — মেয়ে যে সারাক্ষণ নিজেকে ইন্ডিয়ান ইন্ডিয়ান জাহির করে, ভিতরে তার একটুও টানাপোড়েন নেই? অ্যাঞ্জেলা মেয়ের দিকে মাথা ঘুরাল–আচ্ছা নোমা, তুই একদিন বলছিলি না, আড়ালে আবডালে অফিসের লোক তোকে হাইব্রিড মাল বলে। ভেবে দেখ, ফেড্রিক মহম্মদের শরীরেও আইরিশ রক্ত বইছে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বা ইউরেসিয়ান কিছু একটা তো হবেই। তবু তোরা ম্যারেজটাকে টিকিয়ে রাখতে পারলি না। ফেড্রিক তোকে মানিয়ে নিতে পারল না। এক বছরের মধ্যে সংসার ছেড়ে চলে এলি, এখনও সারা জীবন সামনে। পারবি ইন্ডিয়ায় বাঁচতে? মরদটার কথা ভেবে ভেবে রাতে ঘুম হয় না। অস্ট্রেলিয়া গেলে তবু মনে হত, লোকটা ধারে কাছে কোথাও তো আছে। অ্যাঞ্জেলার স্বর জড়িয়ে গেল।
নোমা মায়ের কথার উত্তর খুঁজে পেল না। অফিসে তার যা স্বীকৃতি তা কাজের জন্য। ঢুকেছিল সামান্য রেসেপশনিষ্ট হিসেবে। উন্নতির সিঁড়িগুলি ভাঙতে খুব বেশি জটিল অংক কষতে হয়নি। ঈর্ষা করে কিছু লোক তাকে আড়ালে আবডালে বলে হাইব্রিড লেডি। প্রথম প্রথম নোমা ভাবত, তার দ্রুত উত্থানের জন্যই বোধহয় এমনটি বলে। কিন্তু এখন মনে হয় পিছনে অন্য খোঁচাও আছে, রক্তের শঙ্করায়ণকে নিশানা করে তারা। হিউম্যান রিসোর্স ইন-চার্জ এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর একদিন বলেছিল — মাদাম শুনেছি আপনারা নাকি ভারতীয় খাবার দাবার পছন্দ করেন না, সব ইম্পোর্টেড খাবার খান। নোমা এসব কথার মানে বোঝে, উত্তরের ভাষা হাতড়াতে হয়। মায়ের কথার উত্তর দিতে ইচ্ছা হল না তার। নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে প্রিয়সঙ্গী বেহালা নামিয়ে নিল। ক্রুশবিদ্ধ যিশুর পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বেহালার তারে বিটোফেনের সিম্ফোনীর সুর তুলল। সুরে ভাসাতে চায় আজন্ম লালিত ব্যথা।
এক ঝাঁপটা কালবৈশাখী বয়ে গেছে ক্যামাক স্ট্রিটের উপর দিয়ে। বাদাম গাছটার দু’টো ডাল ভেঙেছে। কিছু ঝরা পাতা হাওয়ায় গড়িয়ে গেল ক্যামাক স্ট্রিট ধরে। আর সব ঠিকই আছে। ক্যামাক স্ট্রিট আছে ক্যামাক স্ট্রিটে। বেনিয়া পাড়াটার নাম পালটে দেওয়া হয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরণী কিন্তু তার বেনিয়া সত্তায় একটুও শিল্প ছোঁয়া লাগেনি। নোমার বরঞ্চ মনে হয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ক্যামাক স্ট্রিটে বড় কষ্টে আছে। তাঁর ভাষা কেউ বোঝে না, শুধু নগরীর বাণিজ্যিক কোলাহল।
ফাইল পত্র তেমন নেই। প্রায় শেষ করে এনেছে। নোমা দিনের কাজটা দিনে করে বাড়ি ফেরে। ক্যান্টিন বয় চা দিয়ে গেল। চায়ের কাপ প্লেট হাতে সে ঘুরে গেল তালগাছটার দিকে। দেখল কালবৈশাখীর দাপটে কাকের বাসাটার খড়কুটো উড়ে গেছে। ভাঙা শূন্যবাসা। নোমার মনে তড়িৎ গতিতে খেলে গেল ভাঙা প্লেটটার কথা। নিলোফারের হাত থেকে পড়ে গিয়ে বোনচায়নার প্লেট সেটের কয়েকটা ভেঙে টুকরো হয়ে গেল এক নিমেষে। নোমা ভাবল তুলনাটা কেমন বৈসাদৃশ্য। তবু দু’টোর মধ্যে কেমন যেন অন্তঃসলীলা একটা ভাঙা বোধ বয়ে গেল তার দগদগে অন্তরে।
খুব ইচ্ছা ছিল নিলোফারকে দেখার। ফেড্রিককে যেচে ফোন করেছিল নোমা। ফেড্রিক দ্বিতীয় কোনো শর্ত চাপায়নি। পার্ক সার্কাস এলাকায় বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান সরণীতে ফেড্রিকের বাড়ি নুর মঞ্জিল, তেমনই দাঁড়িয়ে আছে রক্ষণশীল বনেদিয়ানার অহংকারে। দরজা খুলে দিল আমিন চাচা, বহুদিনের পুরনো বিশ্বস্ত দারোয়ান। নোমাকে দেখে যেন ভূত দেখছে আমিন চাচা। আগে বলত — আদাব, ছোট আপা। ফোঁকলা দাঁতে একগাল হাসত। এখন বিস্ফোরিত চোখে তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল। মুখে কিছু বলল না। ফেড্রিক এসে নোমাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসতে দিল ড্রয়িং রুমে। গেষ্ট এলে এখানে বসতে দেওয়া হয়। অন্দরমহল বেশ খানিকটা ভিতরে। খুব পরিচিত লোকজন না এলে নোমার এখানে আসা নিষেধ ছিল। নোমাকে রেখে ফেড্রিক চলে গেল অন্দরমহলের দিকে। তার ভিতরে চলে যাওয়া দেখে নোমার তীব্র ইচ্ছা হল একবার দেখে আসে তাদের পুরনো বেডরুম। বছর খানেক আগেও বেডসিট মায় পুরো ঘরটায় মেখে থাকত নোমা-ফেড্রিকের গন্ধ। নিলোফার ঘরদুয়ারে অ্যাংলো ছোঁয়া ঝেড়ে ফেলে কি বন্য গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছে সবখানে? কিন্তু নোমা ড্রয়িং রুমে বসাতক বুঝে গেছে তার চারদিকে দন্ডিকাটা লক্ষণরেখা টানা হয়ে গেছে। অধিকারের জোরটুকুও নেই যে দন্ডি ডিঙ্গিয়ে অন্দরমহলে যাওয়া যাবে।
ফেড্রিক ফিরে আসছে একা। তার আসা পথ দেখতে দেখতে নোমা আবার স্মৃতি জড়তায় আক্রান্ত হল। প্রেমিক হিসেবে মানুষটা কী চমৎকার ছিল। সেখানে ধর্মের কোনো অনুশাসন ছিল না। চার্চে সবার সাথে দাঁড়িয়ে পড়ত প্রার্থনা লাইনে। প্রার্থনা শেষে ফেড্রিক সবার সাথে সমস্বরে বলত — আমেন। গোটা মানুষটার সাথে নিজেকে এক ভাবত সে। বিয়ের পর শরীরের সাথে শরীরের সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক। ওই সময়টা মনে হত মানুষটার প্রতিটা লোমকুপের উপর তার অধিকার আছে। বাকি সময়টা ফেড্রিক নুর মঞ্জিলের অনুগত সন্তান। নুর মঞ্জিলের ভাবি মালিক। অথচ সেই একই ফেড্রিক বারে বসে নোমার সাথে হুইস্কি খেতে দ্বিধা করত না। বিয়ের পরও দেখেছে বাইরে মানুষটা আলাদা। সমাজ আর মঞ্জিলে মানুষটা আরেক। ফেড্রিক আবদুল মহম্মদ এসে নোমার সামনে পুরনো দিনের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে বলল — সি ইস কামিং একটুখানি বসো।
নিলোফার এল। ট্রেতে চা কফির পট। এ বাড়ির যা চলন তাতে নিলোফারের চা আনার কথা নয়। কাজের লোকদেরই মেহমানদের চা কফি দেওয়ার কথা। নোমা ভাবল ভাগ্য ভাল বাড়ির নতুন বউ চা বয়ে এনেছে। তখনই ঝনাত করে ওঠা শব্দে নোমা চমকে গেল। চোখের সামনে বোনচায়না ট্রে সহ টি সেটটা মেঝের উপর আছড়ে পড়ল। পরন্ত কাপ প্লেট দেখে নোমা চিনতে পারল, সেটটা সে আর ফেড্রিক হগ মার্কেট থেকে কিনেছিল। তার প্রাণের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের আসন ছেড়ে ভাঙাচোরা কাপ প্লেটের টুকরো কুড়তে যাচ্ছিল আর মুখে বলে উঠল — উঃ ফেড্রিক এটা আমাদের…। নোমার সম্মিত ফিরে এল। নিজের সিটে বসে পড়ল। নিলোফারের চোখে মুখে কোনো অনুতাপ নেই। সে অন্দরমহলের উদ্দেশ্যে ডাকল — নাদিরা, নাদিরা জঞ্জালগুলো পরিষ্কার করে দিয়ে যা। বলে ফেড্রিকের গা ঘেঁষে বসল। ফেড্রিক পরিচয় করিয়ে দিল — মাই ওয়াইফ নিলোফার। আমি অবশ্য ওকে ডাকি আফিয়া বলে। আফিয়া মানে ছায়া। আই মিন স্যাডো, আমার ছায়া। আর আফিয়া, তোমাকে নোমার কথা বলেছি আগে। এই সেই নোমা। তোমাকে দেখতে এসেছে। এখন শুধু আমার বন্ধু।
নোমা খেয়াল করল বন্ধু শব্দটি শুনে আফিয়ার ভ্রু কুচকে গেল। তবু আফিয়াকে বন্য গোলাপের মত সুন্দরী মনে হল তার। কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে। সারা বডিতে সুতোর কাজ। কালো পোশাকে আরো বেশি ফর্সা লাগছে আফিয়াকে। এমনিতেই টুকটুকে ফর্সা, তার উপর একটা কমনীয় ভাব আছে। কর্তা গিন্নীকে মানিয়েছে জব্বর। সত্যিই নুর মঞ্জিল হল আফিয়ার ঘর। ছায়ার ঘর। আফিয়া পারবে এখানে মানিয়ে নিতে। নোমার হৃদয়ে করুন সুর বইতে লাগল। নোয়েল সিলি যা পারল নোমা জোন্স তা পারল না কেন? চার-পাঁচ পুরুষ আগে আইরিশ নোয়েল সিলি বিয়ে করেছিল দীন মহম্মদের দাদু আসরাফ আলি খানকে। সে নিয়ে মুসলিম আর ইউরোপীয় সমাজে কম তোলপাড় হয়েছিল? অনেক ইংরেজ মেয়েদের সাথে নোয়েলও এসেছিল রেজিমেন্টাল বাজার বা সেন্ট্রাল বাজারে ইংরেজ সৈনিক আর এলিট ইংরেজ রাজকর্মচারীদের ভোগ্য হতে। নোয়েল বেঁকে বসেছিল। স্বাধীনচেতা আইরিশ মেয়ের জাত্যাভিমানে ঘা লেগেছিল ইংরেজদের অপকর্মে। লিনডসে স্ট্রিটে থাকতে শুরু করল একটা আইরিশ ফ্যামিলিতে। আর প্রেমে পড়ল আসরাফ আলির সাথে। নোয়েল সিলি নোয়েল বিবি হয়ে একটু একটু করে মিশে গেল ভারতের সমাজে। ফেড্রিকের সাগর পারে কোনো টান নেই। ফেড্রিক নোমাকে বলেছিল— আমার গায়ে ইউরোপীয় রক্ত বইলেও আমি ভারতীয়। বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষ ভারতীয়। নোয়েলের একটা ছবি এখনও নুর মঞ্জিলে আছে। নোমা মাঝে মাঝে তার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলত—গ্রেট গ্রান্ডমাদার, তুমি কি করে পারলে? আমি কেন পারি না? আমার গ্রেট গ্রান্ড পা’র জন্মভূমি ব্রিটেন বলেই কি আমরা যন্ত্রণার দাগ বয়ে বেড়াই? অথচ দেখ সংবিধান পর্যন্ত আমাদের বানিয়ে দিল অ্যাংলো- ইন্ডিয়ান আর তোমার নাতিপুতিকে বানিয়ে দিল ইন্ডিয়ান। ভারতীয়। নোমার দমবন্ধ হয়ে আসত। সংঘাতের জায়গাগুলো ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছিল।
— ফেড্রিক বলত — এ বাড়িতে অভাব নেই, তোমার চাকরি করার কি প্রয়োজন?
নোমা, বলত — চাকরিটা হয়ত তোমার সংসারে প্রয়োজন নেই। কিন্তু চাকরির জায়গাটা আমার শ্বাসের জায়গা। বিয়ের আগে তো আমার চাকরি নিয়ে তোমার সমস্যা ছিল না।
নুর মঞ্জিলকে দেখ, বড় নানি নোয়েলের কথাও তোমাকে বলেছি। ভারতীয় সমাজের একটা নিজস্ব নিয়ম কানুন আছে। পোশাক-আশাকের অলিখিত কোড আছে নোমা। বড় নানী তো শুনেছি কখনও কখনও বোরখা পরত। জিনস্ স্নিকারে কেতাদুরস্ত ফেড্রিকের কথা শুনে হা হয়ে যেত নোমা।
— নোমার রক্তে কখনও কখনও নেশা চাগাড় দিত। আজন্ম মা-বাবার সাথে বসে দু-এক পেগ ওয়াইন খেয়েছে। কোনোদিন বেলেল্লাপানা করেনি। কিন্তু নুর মঞ্জিলের চৌহাদ্দির মধ্যে মদ শব্দটিই নিষিদ্ধ। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজের উৎসবের কথা মনে পড়লে ভিতরে ভিতরে অস্থির অস্থির লাগত। ফেড্রিককে বললে কোনো কাজ হত না। কানে আঙ্গুল চাপা দিত — নুর মঞ্জিলের অন্দরমহলে এমন কথা আলোচনা করাও হারাম। সরবৎ খেয়ে আস্তে আস্তে নেশাকে বশ মানাও। নোমা ঠিক করে উঠতে পারত না তার ধর্মীয় আচরণ কী হওয়া উচিত। পাশাপাশি বিপরীত ধর্মীয় বিশ্বাস থাকতে পারে না? ইচ্ছা হত অন্তত তাদের বেডরুমে একটা ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ছোট্ট মূর্তি টাঙ্গিয়ে দিতে। পায়ের কাছে জলের মধ্যে মোমবাতি ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু তার ইচ্ছার কথাটা প্রকাশ করতে ভয় হত। রবিবার প্রাণের মধ্যে অবিরত বেজে চলত চার্চের ঘণ্টা ঢং ঢং। পায়ের নিচে যেন সরষে নড়ত। নুর মঞ্জিলের প্রতিটা দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেখেছে যেন গারদের পাঁচিল। আবার বেজে চলত চার্চের ঘণ্টা ঢং ঢং
নোমা বুঝতে পারত এক আধ পেগ মদ খাওয়া বা রবিবারের চার্চে যাওয়া বড় কথা নয়। বিশ্বাস সংস্কার হয়ত অনেকটা আচরণে পাল্টে ফেলা যায় কিন্তু পায়ের বেড়ি প্রতিনিয়ত চাগিয়ে তোলে আজন্ম লালিত পালিত আচার-আচরণের স্বাধীনতা বোধ। ফেড্রিক ভিতর ও বাইরের মানুষ এত বিপরীত যে নোমা কিছুতেই মিলাতে পারত না। শেষ দিনের ঘটনাটা কত তুচ্ছ ছিল, নোমার অফিস ছুটি ছিল। বাড়িতে স্লিপলেস গাউন পরেছিল। ফেড্রিক দোকান থেকে ফিরে নোমাকে ওই পোশাকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ — এ কি পরেছ নোমা?
হোয়াই, গাউন পরেছি। অনেকদিন পরিনি। জান, দেখে খুব ইচ্ছা হল একবার পরি। এই পোশাকটা পরে আগে কতবার ক্রিস্টমাস, ব্যাপটিজম পার্টিতে নেচেছি। নাচটা আমি ভালই পারি তুমি জান — নোমা খুশিতে ডগমগ অবস্থায় বলল।
— ফেড্রিক ক্রুদ্ধভাবে বলল — দিস ইস টু মাচ, আনএথিক্যাল, অ্যান্টি-ইসলামিক। এখন থেকে জেনানা প্রথা মানবে তুমি নোমা।
— নোমা অবাক চোখে ফেড্রিক আবদুল মহম্মদের দিকে তাকিয়ে বলল — তুমি জিন্স পরেছ, টি সার্ট-স্নিকার পরেছ, এর কোনটা ইসলামি মতের?
নোমা, আর ইয়ু ডিমানডিং মাই এক্সপ্লানেশন? ব্লাডিহোর, আমি তোমাকে তালাক দিলাম। তালাক, তালাক, তালাক—
মিশাইলে বারুদ মজুদই ছিল। তালাক নিক্ষেপণে গুঁড়িয়ে গেল নোমার সংসার। স্বামীর শরীরগন্ধ তখনও ছিল তার নাকে। কয়েক মুহূর্ত আগেও অন্তত একটা সম্পর্কের অধিকার ছিল। বাকরুদ্ধ নোমার বুক ফেটে যাচ্ছিল ব্যথায়। ফেড্রিক কনভেন্ট এডুকেটেড, অথচ প্রয়োগ করল সেই আদিম একমুখী অস্ত্র। যেখানে যুক্তির প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। নোমা ভাবতে ভাবতে সামনে বসা দম্পতির দিকে চোখ তুলল — আফিয়া আরও গভীর ভাবে লগ্ন হয়ে আছে ফেড্রিকের গায়ে। নোমার বিশ্বাস গাঢ় হল — নুর মঞ্জিলটা আসলে ছায়ার ঘর। আর নোমা হল ছায়াবৃত্তে পথহারা এক আগন্তুক। ফেড্রিক উঠে গেল — তোমরা কথা বল। নাদিরাকে চা দিতে বলি এতক্ষণ আফিয়া একটাও কথা বলেনি। ফেড্রিক চলে যেতেই একটু নিচু স্বরে সে বলল — আবার কেন এসেছেন ?
— তোমাকে দেখতে এসেছি। এন্ড টু উইশ ইয়ু হ্যাপি কনজুগাল লাইফ।
— কিন্তু আমি চাই না আপনি আর কখনও আমার স্বামীর সাথে যোগাযোগ রাখুন।
— ডিভোর্সের পর বন্ধুত্ব রাখতে অসুবিধা কি?
— আমি বিশ্বাস করি না পুরনো স্বামী বন্ধু হতে পারে। আপনাদের শারীরীক টান আবার জেগে উঠবে। আপনাদের তো ন্যায় নীতির বালাই নেই। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের সব কিছু উল্লম-খুল্লম। আপনারা ভারতীয় সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারবেন না। এভাবে সংসার ভাঙতে আর আসবেন না, প্লিজ।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে ক্যামাক স্ট্রিটে। নিচ দিয়ে চিতাচোখে ছুটে যাচ্ছে বাবুদের গাড়ি। তালগাছটা নিঃসঙ্গ অন্ধকার মাথায় দাঁড়িয়ে আছে একা। নোমার ভাবনা একে একে খসে যাচ্ছে কাক দম্পতির রেখে যাওয়া বাসার খড়কুটোর মতো। ভাঙা বাসায় নোমা ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কেবল-ই তার মাথার মধ্যে বেজে চলছে শূন্যপথে হাঁটার গান —
…আমরা ঘুরে বেড়াই যেমন অন্য পথিকের বেশ
কোথাও ফিরি না আর;
শব্দের গড়া অচিন আমাদের আছে একটি দেশ…