বড় গোস্বামী বাড়ির অদ্বৈত অঙ্গনে লক্ষ্মীমণি শিখা, তটিনী, রাণীরা পা ছড়িয়ে বসে কলকল করছিল। গলায় তাদের তুলসীমালা, নাকে তিলক মাটির রসকলি। ক্যানিং থেকে শান্তিপুর, শুধুমাত্র রাধারমণের রাস দেখবে বলে তিনদিন তারা খোলা আকাশের নিচে কাটিয়ে দেবে। মঠের প্রসাদ পেতে অসুবিধে নেই তবু এরই মধ্যে কেউ কেউ কাঠকুঠো জ্বেলে দুটো চালডাল ফুটিয়ে নিচ্ছে। রাণীর মেয়ের সামনের মাঘেই বিয়ে। সে যাবার সময় সূত্রগঢ়ের তাঁতের হাট থেকে বিয়ের বাজার করে নিয়ে যাবে। আমি তাদের সঙ্গে রসিকতা করে বললাম, তোমরাই তো গোপিনী গো! এদ্দূর থেকে রাসবিহারীর সঙ্গে লীলা করবে বলে এসেছ! শুনে তারা খিলখিলিয়ে হেসে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ল।

মন্দিরের চাতালে তখন মুর্শিদাবাদের আনোয়ার সানাইয়ে ফুঁ দিয়েছে। সঙ্গত দিচ্ছে ঢাকি। সেবাইতরা রাসেশ্বর-রাসবিলাসিনীদের শৃঙ্গারের ফাইনাল টাচ দিচ্ছেন।

সেই কোন পাঁচশ বছর আগে অদ্বৈতাচার্য শান্তিপুরে রাসোৎসবের সূচনা করলেন। সে সময়টায় নবদ্বীপ -শান্তিপুর জ্ঞানচর্চার গরিমায়, সমৃদ্ধির ঔজ্জ্বল্যে ঝলমলে। কয়েক দশক আগেই ফুলিয়ার পুণ্য তীর্থে দ্বিজোত্তম কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ লিখে খ্যাতকীর্তি। ন্যায়-দর্শনের তর্কসভা ছেড়ে নিমাই আচন্ডালে কোল দিয়েছেন। নবদ্বীপের পথে পথে তখন নাম সংকীর্তনের মধুর ধ্বনি।শান্তিপুরের ঘরে ঘরে তাঁত বোনার শব্দ খট্ খট্ খট্ খট্। গঙ্গায় বড় বড় বাণিজ্য পোত চলে। বিদেশি বণিক, বিদ্বৎজন, অভিজাত মানুষেরা গঙ্গার মূলঘাটে পা রাখবার আগে আজকের দীর্ণশীর্ণ চূর্ণী নদীতে তাদের বজরা থামিয়ে বেশ বিন্যাস করে নেয়।

ভক্তি আন্দোলনের প্রাবল্যে রাস উৎসব ছড়িয়ে পড়ছে বৃন্দাবনের রাসবন থেকে বাংলার নবদ্বীপ-শান্তিপুর আসামে, মণিপুরে। পরমভক্ত বৈষ্ণবেরা বলেন রাসলীলা লীলাময়ের শ্রেষ্ঠ লীলা। রাসেশ্বর শ্রীমাধব স্বয়ং সচ্চিদানন্দ স্বরূপ। পুরাণকার কিন্তু এখানে দুষ্টুমির গল্প ও শুনিয়েছেন। দেবাদিদেবের সাধনার জগৎ শ্রীকৃষ্ণের লীলাক্ষেত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। তাঁর নৃত্যগীত শ্মশানেমশানে ভূতপ্রেতেদের সঙ্গে। তবে তাঁরও তো রাসলীলা দেখার শখ হতে পারে! এ কৌতুহল পূরণ করতে স্বয়ং কৃষ্ণ সেজে তিনি রাসের গোপিকাদের নাচের দলে ঢুকে পড়লেন। রাসবিহারী মহাদেবের এ ছলনা ধরতে পেরে রণে ভঙ্গ দিলেন। অগত্যা তখন স্বয়ং রাধিকা সাজলেন রাসেশ্বর সাজে। শান্তিপুরের ভাঙ্গারাস অর্থাৎ শেষদিনে এই “রাইরাজা” শৃঙ্গার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কুমারী মেয়েদের ফুল সাজে সাজিয়ে নগর পরিক্রমা করানো হয়। কালের নিয়মে এ শহরের রাস উৎসবে পরিবর্তন এসেছে। মঠবাড়ির ঐতিহ্য থেকে রাস এখন শান্তিপুরের প্যান্ডেল প্যান্ডেলের জাঁকজমক। চেনাজানা সব দেবদেবীর মূর্তি পূজিত হন বারোয়ারি তলায়। মাইকে বাজছে শরীর দোলানো গান, ‘বিন্দাস হয়ে নাচো রে’ ।

সদ্য কিশোরীর গাল লাল হয়ে উঠছে ‘লিসন টু মি, ইউ আর মাই লাভ, জানো তুমি’ শুনে।

বহুদিন পর ছেলেমেয়ের হাত ধরে বাপের বাড়ি শান্তিপুরে রাস দেখতে এসেছে মিতালি। বিয়ের আগে সে বান্ধবীদের সঙ্গে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরত। শুভজিতের সঙ্গে তখন তার দুর্বার প্রেম। বন্ধুরাই সুযোগ করে দিল সেদিন তাদের দেখা করার। চাঁদ তখন আকাশে মুঠো জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে। নির্জন গঙ্গার চর। শুভজিৎ মিতালির কপালে এঁকে দিয়েছিল থরথর চুম্বনের একটি রেখা। সিগারেটের সে পৌরুষ গন্ধ, সেই ক্ষণিক সুখ আজও আলোড়িত করে মিতালিকে। মিতালির শরীরে সেদিন যূঁইফুলের সুরভি। সে মৃদু, স্নিগ্ধ সৌরভ এখনো মিলিয়ে যায় নি শুভজিতের চেতনা থেকে! তারপরে আর কোনোদিন তাদের দেখা হয় নি। শুভজিত চাকরি নিয়ে চেন্নাই চলে গেলে মিতালির ও বিয়ে হয়ে যায় নৈহাটির এক ব্যবসায়ী পরিবারে। আজ কতকাল পরে আবার দুজনের দেখা হল রাস পূর্ণিমার মধু যামিনীতে! ধর্মীয় প্রেমের সীমা ছাড়িয়ে দুটি মানুষী হৃদয় আবার ভেসে গেল উৎসবের জনসমুদ্রে, নিয়ন আলোয়, শত কোলাহলের মাঝখানে!
খুব ভালো লাগলো লেখার সাবলীলতায়।
একটা সুন্দর কোমল পাখির পালক যেন মন ছুঁয়ে গেল। তথ্যনির্ভর ঝরঝরে লেখা, এ নন্দিনীর পক্ষেই সম্ভব।
খুব সুন্দর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখেছিস। দারুণ ভালো লাগলো মনে হচ্ছে যেন আমিও ঐ রাসের মেলায় চলে গেছি।
খুব ভালো লিখছিস।
এমনভাবেই লিখতে থাক।
প্রাণিত হলাম দাদা🙏