রোহিঙ্গা সংকট আট বছর পেরিয়ে গেলেও এই সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। গত এক বছরে মিয়ানমার ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় এই সংকট সমাধানে মিয়ানমার প্রান্তে কোন উদ্যোগ কার্যকরী হয় নাই। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সহায়তা ও চাপের মুখে পড়ে। বাংলাদেশ সরকারের নেয়া বেশ কিছু পদক্ষেপ পরিস্থিতি সাময়িক ভাবে উত্তরণে সহায়তা করে। সংকট সমাধানে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার ফলে বৈশ্বিক নানা জটিল সমস্যার মধ্যে ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান ১৬ জানুয়ারি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেন। জাতিসংঘ মহাসচিব ১৪ মার্চ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর সংকট সমাধানে তার গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও দিকনির্দেশনা সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজন এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে রাখাইনে স্থিতিশীলতা আনতে মিয়ানমারকে আরো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে জানান। বাংলাদেশের চেষ্টায় প্রথম ধাপে মিয়ানমার সরকার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়, কার্যকর না হলেও এটি ছিল রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের একটি দৃশ্যমান উদ্যোগ।
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সক্রিয় সব স্টেকহোল্ডারসহ ৪০টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রোহিঙ্গা ইস্যু বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তর একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর রূপরেখা প্রণয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফান্ড গঠন, গণহত্যার বিচার, খাদ্য ও মানবিক সহায়তা এবং রোহিঙ্গাদের মানসিক শক্তি ও মনোবল বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পাশে থাকা পশ্চিমা বিশ্বের ১১টি দেশ আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে এবং প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানায়।
রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ২০২৫ সালের জেআরপিরতে ৯৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তার বিপরীতে অর্ধেক সহায়তাও পাওয়া যায় নাই। বাংলাদেশ দাতাদের কাছে এই তহবিল ঘাটতি পূরণ করতে তাদের অঙ্গীকার বাড়ানোর জন্য আবেদন জানায়। এই লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাজ্য এবং কাতার যৌথভাবে ১১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৬৮ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিতে সম্মত হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তহবিল হ্রাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াসহ অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সামনে কি ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে সে সব নিয়ে একটা অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি ও তা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এই সংকট মোকাবিলায় তহবিল হ্রাসের প্রেক্ষিতে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাজেট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। রোহিঙ্গাদের কারণে দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিকভাবে নিরাপত্তা সংকট, মাদক ব্যবসা, অপহরণের ঘটনায় পর্যটন শিল্পের উপর হুমকি বাড়ছে। মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে আন্তঃ সীমান্ত অপরাধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচার, বাংলাদেশের ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের উত্থানের মত নিরাপত্তা সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির সাথে কোন সমঝোতা না হওয়ায় টেকনাফ বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে পরাশক্তিগুলোর উপস্থিতি ও বিনিয়োগ এবং স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগের সাথে বাংলাদেশকেও নিজস্ব স্বার্থরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ বেশী ক্ষতিগ্রস্থ এবং এই সমস্যা সমাধান ও বহির্বিশ্বে এর অগ্রগতি ও প্রচার চালিয়ে যেতে বাংলাদেশকেই অগ্রণী ভুমিকা নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের বাসভূমি মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে তারা তাদের রাখাইন ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। একদিকে রাখাইন রোহিঙ্গা শূন্য হওয়ার পথে অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারনে স্থানীয় জনগণ সংখ্যালঘু জনগুষ্ঠিতে পরিণত হয়েছে। দ্রুত এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরন দরকার। মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের অধিকার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। মিয়ানমার ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি করা এর মূল লক্ষ্য।
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও রাখাইনে তাদের গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে গেলে বাংলাদেশকে আরাকান আর্মির সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। চলমান সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মিয়ানমারের ভূমিকম্পের পর প্রধান উপদেষ্টার দিক নির্দেশনায় দ্রুত মানবিক সহায়তা পাঠায় এবং প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক নিশ্চিত করে।
মিয়ানমারের সাধারণ জনগণ পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের কারনে চরম বিপর্যস্ত এবং এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে। থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্সের সদস্য এমএনডিএএ ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি চীনের মধ্যস্থতায় নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে টি এন এল এ চীনের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এই যুদ্ধবিরতির পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী মান্দালয়, কাচিন, চিন, কারেন এবং রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সৈন্য সমাবেশের সুযোগ পায়। মিয়ানমার জান্তা তাদের যুদ্ধকৌশলেও পরিবর্তন এনে বিদ্রোহীদের উপর চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত ড্রোন আর জ্যামার ব্যবহার শুরু করেছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের উপর চালানো নির্মম নির্যাতন ও সহিংসতার জেরে আর্জেন্টিনায় রোহিঙ্গাদের একটি অ্যাডভোকেসি গ্রুপের দায়ের করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী আর্জেন্টিনার একটি আদালত মিন অং হ্লাইং, সাবেক প্রেসিডেন্ট টিন কিয়াও এবং অং সান সু চিসহ বেশ কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সময়ে এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি বিজয়।
মিয়ানমারে এক মাস ধরে তিন দফায় চলমান নির্বাচন ২৫ জানুয়ারী শেষ হয়েছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় দল এন এল ডি সহ বিরোধী দলগুলি নির্বাচন বয়কট করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার একটি উদ্যোগ বলে জানায় এবং ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাজ্য এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমারের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে এখনও কোন মন্তব্য করার সময় আসেনি। মিয়ানমারের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক সমস্যা, এবং রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার ও রাখাইনে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা আবশ্যক। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রতি আরাকান আর্মির মনোভাব পরিবর্তন জরুরী। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে মিয়ানমার ও আরাকান পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপর প্রভাব ফেলবে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নতুন করে আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে এবং এখনও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশে বেশ তৎপর কিন্তু মিয়ানমারের ভেতরে তাদের তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। আরাকান আর্মি প্রধান জানায় যে, যেসব অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সেসব এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে বৈঠকে করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে একমত হয়েছে। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও মানসিকতার পরিবর্তনে সময়ের দরকার, চাপ প্রয়োগ কিংবা দ্রুত এই সমস্যা সমাধান সম্ভব না। রাখাইনের উন্নয়নের চাকা ত্বরান্বিত করতে হলে রোহিঙ্গা রাখাইন সংঘাত বন্ধ করে সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। আরাকান আর্মিকে রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গা রাখাইন সহবস্থানের জন্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার দূরত্ব কমিয়ে সহনশীলতা ও আস্থার জায়গা তৈরিতে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।
রাখাইন অঞ্চলে চীনের অর্থনীতিক ও ভুরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ভারত রাখাইনে কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত আরাকানে চীনের উপস্থিতি ঠেকাতে এবং ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণে চকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী। রাখাইনে মিয়ানমারের নির্বাচনের ফলাফল তেমন গুরুত্ব না পেলেও এই অঞ্চলে চীনের স্বার্থ রক্ষায় রাখাইনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নির্বাচন পরবর্তী সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার রাখাইনে রাজনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করলে এই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব ১৩ থেকে ১৫ মার্চ বাংলাদেশ সফরের সময় ১৪ মার্চ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের সাথে মতবিনিময় করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য সহায়তা কমানোকে একটি ‘অপরাধ’ বলে বিবেচনা করে তিনি এই সহায়তা বাড়াতে কাজ করার জোরালো আশ্বাস দেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের নেয়া উদ্যোগের ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে জাতিসংঘ মিয়ানমার বিষয়ক দূত, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রধান এবং জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করে। বর্তমানে এই সংকটের কথা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধান সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার নেতৃত্বে আসিয়ানের ভুমিকা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রও সরাসরি সম্পৃক্ত। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য মালয়েশিয়া ও কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ মিয়ানমারে একটি যৌথ মিশন পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করছে। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।। আশা করা যায় যে এই সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সহায়ক হবে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রোহিঙ্গাদের বিষয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেছে। এ প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং তাদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য নতুন করে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। বিশ্বের ১০৫টি দেশ এ প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এর ফলে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উঠে এসেছে।
রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমার জান্তা রাজনৈতিক ভাবে সংকট সমাধান না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরাকান আর্মি মিডিয়াতে রোহিঙ্গারা তাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করছে বলে প্রচারনা চালাচ্ছে। এর বিপরীতে সঠিক তথ্য নির্ভর প্রচারনা চালাতে হবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং বিভিন্ন মানবাধিকার ফোরামে তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরতে রোহিঙ্গাদের ভেতরে দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দরকার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে রোহিঙ্গাদেরকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রোহিঙ্গাদেরকেও তাদের নিজ দেশে অধিকার বুঝে নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া, এন ইউ জি, আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ ও অন্যান্য সকল স্টেকহোল্ডারদের সাথেও তাদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ ও বিদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠনের নেতাদেরকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির অত্যাচারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অবহিত করতে হবে ও এর বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে হবে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর আইনগত ভিত্তি ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে এই সংকটকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে হবে যাতে রোহিঙ্গাদের দাবীগুলো সংকট সমাধানের মূল জায়গাগুলোতে পৌঁছাতে পারে।
সামনের দিনগুলোতে আরাকান আর্মিকে রাখাইনের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গাদের আস্থায় আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সবাইকে মূল ধারায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য যেকোনো উদ্যোগে আরাকান আর্মি এখন অপরিহার্য অংশীদার হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি, আরাকান আর্মি এবং এনইউজি’র সাথেও সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিকে সামনে রেখে ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে এটাই কাম্য।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউ সি, পিএসসি, এমফিল (অবঃ) মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।