আর কয়েক সপ্তাহ পরেই পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের সুভাষ আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিমানে উড়ে যাবে। উচ্ছ্বসিত সাতমাইল হাইস্কুলের ছাত্রাবাসের সহপাঠী থেকে আশ্রমের সহ আবাসিকরা। তাদের সুভাষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেবে। গায়ে চিমটি কেটেও হুঁশ হচ্ছে না তাদের, এটা স্বপ্ন না বাস্তব!
এখনও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডী পার হয়নি পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের আবাসিক সুভাষ বিশ্বকর্মা। এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী সে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক কেন, মাধ্যমিক স্তরে পড়ার আগেই অনাথ আশ্রমের হয়ে সর্বভারতীয় রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় সর্বভারতীয় স্তরে দলগত ভাবে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পর এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক রোবটিক্স প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত এলাকার পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের ‘রোবট মাষ্টার’ সুভাষ বিশ্বকর্মা। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আগামী মে-জুন মাসে আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতামূলক আসরে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উড়ে যাবে পূর্ব মেদিনীপুরের অত্যন্ত প্রান্তিক এলাকা পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের আবাসিক সুভাষ বিশ্বকর্মা।

ইতিমধ্যে ‘ইন্ডিয়ান স্টেম ফাউন্ডেশন’ এর উদ্যোগে হরিয়ানার গুরুগ্রামে আয়োজিত ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে’ সর্বভারতীয় স্তরের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যোগ দেওয়া ৭৭টি স্কুলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের আবাসিক স্কুল ছাত্র সুভাষ বিশ্বকর্মা অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের আরও তিন মাধ্যমিক স্তরের স্কুল ছাত্র প্রদ্যুৎ রায়, নিতাই দাস, উদয় বর্মনের ‘অন্ত্যোদয় রোবট মাষ্টার’ দল প্রতিযোগিতার রোবোটিক্স প্রযুক্তি বিভাগে রোবট বানিয়ে রানার্স বা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের গৌরব মুকুটে সাফল্যের পালক যুক্ত করতে পেরেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় সুভাষের যাওয়া নিয়ে রীতিমত উচ্ছ্বসিত পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের কর্ণধার ও প্রাণপুরুষ বলরাম করণ। তাঁর কথায়, সুভাষ বিশ্বকর্মার আদি বাড়ি উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতে। একদম শিশু অবস্থাতেই সুভাষের দিদিমা কোন এক অজ্ঞাত কারনে সুভাষ কে তার বাবা মায়ের কাছ থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের মান্দারমণিতে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। পরে ২০১১ সাল নাগাদ সুভাষের বয়স যখন তিন, সাড়ে তিন বছরের মত তখন তার দিদিমা সুভাষকে আশ্রমে এনে রেখে দিয়ে যান। সুভাষের বাবা বা মায়ের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। বাবা মায়ের মুখটা ভালো করে মনে পড়েনা সুভাষের। তারপর থেকে বাবা মা থেকেও কার্যত অনাথ সুভাষ আশ্রমেই বড় হতে থাকে। আশ্রমের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ে পাঁউশি বৈকুন্ঠ স্মৃতি মিলনী বিদ্যামন্দির থেকে ৮৫ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়। খুব ছোট থেকেই সুভাষের কম্পিউটারের প্রতি ঝোঁক লক্ষ্য করে আশ্রমের প্রাণপুরুষ বলরাম করণ তাকে উচ্চ মাধ্যমিকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে সাতমাইল হাই স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করে দেন। সুভাষ বর্তমানে স্কুলের ছাত্রাবাসে থেকেই পড়ছে।

২০২০ সালে গুরুগ্রামে জাতীয় স্তরে রোবোটিক্স প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পুরো কৃতিত্ব প্রতিথযশা রোবট বিজ্ঞানী মলয় কুন্ডু তার ছেলে রিকি কুন্ডু আর প্রতিযোগিতা সফল আশ্রমের ছেলেদের দিতে চান। বলরাম করণের কথায়, ‘ভারত সরকারের স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচিতে আশ্রমের সুভাষ-সহ অন্যান্য আবাসিকদের রোবোটিক্স প্রযুক্তি নিয়ে প্রাথমিক পাঠ থাকলেও জাতীয়স্তরের কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মত যথেষ্ট ছিল না। ২০১৯ সালে ভারতে করোনা মহামারী শুরুর কিছু আগে পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমে এসেছিলেন আশ্রমের বিভিন্ন সহায়তার কাজে যুক্ত একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আমেরিকা প্রবাসী এক প্রথিতযশা রোবট বিজ্ঞানী মলয় কুন্ডু ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সেই সময় মলয়বাবু আশ্রমের আবাসিক ছেলেমেয়েদের রোবট নিয়ে কিছু কথা বলা ছাড়াও রোবট কিভাবে কাজ করে তাও আশ্রমের আবাসিক অনাথ ছেলেমেয়েদের বিস্তারিত ভাবে দেখান। আশ্রমের আবাসিক ছেলেমেয়েদের উৎসাহ দেখে আমেরিকা ফিরে যাওয়ার আগে আশ্রমে কিছু মডিউল দিয়ে যান রোবট বিজ্ঞানী মলয় কুন্ডু।

আমেরিকা থেকে আশ্রমের ছেলেমেয়েদের রোবোটিক্স নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে এলেন বিজ্ঞানী মলয় কুন্ডুর ছেলে দশম শ্রেণির পড়ুয়া রিকি কুন্ডু। রিকি দশম শ্রেণির পড়ুয়া হলেও রোবোটিক্স নিয়ে আমেরিকার এমআইটি থেকে বিশেষ প্রশিক্ষিত। আমেরিকা থেকে হোয়াটস অ্যাপে ভিডিও কলের মাধ্যমে টানা একবছর ধরে রোবোটিক্স নিয়ে বিশদ বোঝানোর পর গুরুগ্রামে জাতীয় স্তরের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পরিবেশ বান্ধব রোবট গাড়ি তৈরি করে সাফল্য অর্জন করে অন্ত্যোদয় রোবট মাষ্টার দল। রোবট মাষ্টার দলের অন্যতম সদস্য সুভাষ বিশ্বকর্মা সাফল্য অর্জনের জন্য যাবতীয় কৃতিত্ব আমেরিকার রিকি কুন্ডুকে উৎসর্গ করে জানিয়েছে, “রোবট নিয়ে সিনেমা দেখা ছাড়া কোন সম্যক ধারণা ছিলনা আমাদের। আমেরিকা থেকে রিকিদাদা-ই ভিডিও কলের মাধ্যমে রোবট নিয়ে আমাদের বিস্তারিত বুঝিয়ে আমাদের রোবট তৈরির স্বপ্ন সফল করতে সাহায্য করেছে।”

আগামীদিনে সুভাষ রোবোটিক্স নিয়ে অনেকদূর এগোবে বলে সাতমাইল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক স্থিতধী দাশও আশাবাদী। স্থিতধীবাবুর কথায়, “স্কুলের পাঠ্য বিষয়েও ভালো হলেও খুব উচ্চ মানের ভালো বলা যাবেনা। তবে কম্পিউটার বিষয়ে সুভাষ খুব ভালো শুধু নয়, তুখোড় বলা যায় নিশ্চয়।”

ইতিমধ্যেই রোবোটিক্স নিয়ে সুভাষের আগ্রহ দেখে বিজ্ঞানী মলয় কুন্ডু ও রিকি কুন্ডু সুভাষকে দফায় দফায় প্রায় লাখ ছয়েক টাকার ল্যাপটপ, নানা ধরনের সেন্সর, সার্কিট পাঠিয়েছেন পাঁউশি আশ্রমে। তা দিয়েই নানান রোবট বানাচ্ছে সুভাষ ও আশ্রমের ক্লাস সেভেনের মুধুরিমা মাজি, সুপর্ণা দাস ও ক্লাস টেন এর ছাত্র সিদ্ধান্ত দাস। ইতিমধ্যেই সুভাষ তৈরি করেছে নানা ধরনের রোবট গাড়ি। যা তার কথা শুনে এগোয়-পেছোয়। সুভাষের কথায়, “রোবট তৈরির সময় মধুরিমা, সুপর্ণা আর সিদ্ধান্ত ওরাই আমাকে রোবট তৈরির সহায়ক হিসেবে কোন সময়ে কোন সেন্সর লাগবে তা এগিয়ে সহায়তা করা ছাড়াও ওরা রোবট গাড়িও বানাতে পারে।”