ঋত্বিকের সঙ্গে সামনাসামনি পরিচয় হবার আগে আমি তাঁকে প্রথম চিনি নিমাই ঘোষের ছবি ‘ছিন্নমূল’-এর অভিনেতা হিসাবে। তার আগে আমি ঋত্বিককে চোখে দেখিনি কখনও। নিমাইবাবু ছিলেন আমাদের ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির একেবারে প্রথমদিকের সভ্যদের মধ্যে একজন। তিনি যখন ‘ছিন্নমূল’ ছবি করছেন, মাঝে মাঝে আমার কাছে আসতেন এবং ছবি সম্বন্ধে নানারকম গল্প করতেন। সেই ফাঁকে ঋত্বিকের কথাও মাঝে মাঝে উঠেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ওঁকে একটা অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছি। ছেলেটির মধ্যে চলচ্চিত্র সম্বন্ধে প্রচুর উৎসাহ রয়েছে।’
তার পরে বেশ কিছুকাল আমি ঋত্বিকের সঙ্গে সামনাসামনি পরিচিত হইনি। ফিল্ম সোসাইটিরই একটা মিটিং-এ সে আসে এবং তখনই তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। ফিল্ম সোসাইটির বৈঠকে সে যে ঘনঘন আসত তা নয়। কাজেই তখনও তাঁকে ভালো করে চেনবার সুযোগ হয়নি। আমার ধারণা সে সময়টা ঋত্বিক বোধহয় নাটক এবং মঞ্চ সম্পর্কেই আরও বেশি উৎসাহিত ছিল।
আরও কিছুকাল পরে, বেশ কিছুদিন পরে অরোরা কোম্পানির আপিসে ঋত্বিকের সঙ্গে আমার সত্যি করে পরিচয় হল। সে বোধহয়, যতদূর মনে পড়ে, সেসময়ে বোম্বেতে বিমল রায়ের সঙ্গে কাজ করছে, বিমল রায়ের ছবির চিত্রনাট্য লিখছে। তার কিছু আগে ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে, ঋত্বিক সে ছবি দেখেছে এবং দেখে তার খুবই বেশি রকম ভালো লেগেছিল। সে কথা সে প্রাণ খুলে আমার কাছে বলে। কিন্তু আমার কাছে যে-জিনিসটি সব চাইতে ভালো লেগেছিল সেটা সে যেভাবে ছবিটাকে বিশ্লেষণ করেছিল-তার কয়েকটা দৃশ্য — যেটা থেকে আমার মনে হয়েছিল, ঋত্বিক যদি ছবি করে তাহলে সে খুব ভালোই ছবি করবে। তারও পরে যখন ‘অপরাজিত’ ছবির সম্পাদনার কাজ হচ্ছে বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে তখন শুনলাম একটি ছবির প্রিন্ট সেখানে রয়েছে। সে ছবি হল ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি ‘নাগরিক’। তৎক্ষণাৎ আমরা সেই ছবি দেখি। খুবই অসুবিধার মধ্যে তোলা হয়েছিল ছবিটা, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। তার বাইরের পালিশ একদমই নেই বলতে গেলে, কিন্তু তাও তার মধ্যে কতকগুলো এমন গুণের পরিচয় আমি পেয়েছিলাম যে তাতে এই নবীন পরিচালক সম্বন্ধে একটা প্রচণ্ড শ্রদ্ধা জাগে আমার মনে।
তার কিছুকাল পরে ‘অযান্ত্রিক’-এর আবির্ভাব। ‘নাগরিক’ ছবি বাজারে দেখানো হয়নি। ‘অযান্ত্রিক’ ছবির প্রথম শোতে আমি উপস্থিত ছিলাম। এবং সে ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম একজন সত্যিকারের শিল্পী যদি সত্যিকারের কাজের সুযোগ পায়, তাহলে সে একধাপে কতদূর এগিয়ে যেতে পারে। ‘অযান্ত্রিক’ ছবি ব্যাবসায়িকভাবে ভালো চলেনি। তার কারণটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট ছিল। ঋত্বিক বিষয়বস্তু নির্বাচনে একটা অসম সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। ঠিক সেই জাতীয় ছবি তাঁর আগে বাংলার চলচ্চিত্র জগতে কেউ করেনি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে নীরস ছবি-নায়ক বলতে একজন গাড়ির ড্রাইভার এবং নায়িকা বোধহয় সেই গাড়িটাকে বলা চলে। সেখানে সাহসের পরিচয় বলতে একটা ছিল যে, সেই গাড়িটার মধ্যে একটা মনুষ্যত্ব আরোপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের anthropomorphism, সেটা যে সব জায়গায় উতরেছিল সেটা আমি বলব না; কিন্তু বাংলার চিত্রজগতে কাজ করতে এসে, বাংলার দর্শকদের কথা মনে রেখে একজন শিল্পী যে এটা আদৌ করবার সাহস পেয়েছে সেটাই হচ্ছে আশ্চর্যের কথা। তারপরে ‘অযান্ত্রিক’-এর, আমার কাছে, যে সবচেয়ে লক্ষ করবার মতো জিনিস কতকগুলো ছিল সেগুলো হচ্ছে, বিষয়বস্তু বাদ দিয়েও সে জিনিসটা অনেক ছবিতেই পাওয়া যেতে পারে, এক ধরনের দরদ, মানবিকতা। এগুলো অনেকের ছবিতেই লক্ষ করা যেতে পারে, কিন্তু যে সমস্ত গুণগুলো থাকলে একটা ছবি সত্যিকারের সার্থকতা অর্জন করতে পারে সেই ধরনের চলচ্চিত্রের কতকগুলো বিশেষ গুণ ‘অযান্ত্রিক’-এ প্রায়ই বহু জায়গায় লক্ষ করা যায়। আমি কয়েকটা উদাহরণ দেব। আজকে আপনারা এ ছবি দেখবেন। যাঁরা আগে দেখেছেন, তাঁরা দ্বিতীয়বার দেখবেন নিশ্চয়ই, এবং তাবা এগুলো লক্ষ করতে পারেন। এগুলো হচ্ছে বিশেষ করে কতকগুলো শট, যেখানে ঘটনা হয়তো কিছুই ঘটছে না, উপাদান সামান্যই। কিন্তু একটা বিশেষ context-এ এসে সেই শট এমন একটা কাব্যের পর্যায়ে উঠে গেছে, এমন একটা শক্তিশালী চেহারা নিয়েছে যেটা একমাত্র অত্যন্ত শক্তিশালী পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব। আপনারা দেখবেন গাড়িটাকে নিয়ে কত কী করা হয়েছে। গাড়িটা কিছু না, একটা লেকের ধারে গাড়িটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সন্ধেবেলায়। তার দৃষ্টিকোণ, তার composition এমন আশ্চর্য, সেটা যেন একেবারে স্পষ্ট কথা বলছে। তারপর আর একটা দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে গাড়ির শুধু বনেট। বনেটের ওপর সেই ক্যাপটা রয়েছে। ঢাকনাটা খুলে বিমল তাতে জল ঢেলে ঢাকনিটায় তিনটে প্যাঁচ দিয়ে বন্ধ করে হাত দিয়ে, রুক্ষ হাত দিয়ে তিনটে চাপড় মারল ভালো করে বন্ধ করার জন্য। আর কিছুই না। পেছনে আকাশ, বনেটের সামনেটুকু আর বিমলের হাত। এ একটা আশ্চর্য জিনিস। তারপর এক পাগলের ব্যবহার আছে ‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে। দুটো জায়গায় দেখা যাবে পাগলকে, দুটো বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাবে পাগল রাস্তার ধারে বসে রয়েছে। বিমলের গাড়ি তার সামনে দিয়ে চলে গেল। একবার ধুলো উড়িয়ে গেল, তারপর অনেক পরে ছবিতে দেখা গেল সে জল ছিটিয়ে গেল, কেন-না বর্ষা গেছে! কিংবা হয়তো প্রথমবার জল ছিটিয়ে গেছে, দ্বিতীয়বার ধুলো উড়িয়ে গেল। কিন্তু দৃষ্টিকোণ একই, সবই এক। শুধু এই দু-জায়গায় দু-বার বিভিন্নভাবে এসে যেন একই গানের সুর দু-রকমভাবে শুনতে পেলাম আমরা। এরকম আশ্চর্য জিনিস ‘অযান্ত্রিক’-এ বহু বহু জায়গায় রয়েছে।
‘অযান্ত্রিক’-এর পর ঋত্বিক মাত্র ছ-খানা ছবি করার সুযোগ পেয়েছিল। তার মধ্যে আমার পক্ষে দেখা সম্ভব হয়েছে মাত্র তিনখানা। ‘কোমল গান্ধার’ যখন দেখানো হয় তখন আমি কলকাতায় ছিলাম না। তারপর সে ছবি আর এমনই ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে দেখানো হয়নি। ‘তিতাস’- বাংলাদেশে তোলা ‘তিতাস’ ছবি এবং ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি-তক্কো-গপ্পো’ যখন দেখানো হয়েছে privately তখন আমার শুটিং-এর কাজ চলছে। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়নি। যাই হোক ‘সুবর্ণরেখা’ ছবি মনে আছে। ঋত্বিক আমাকে নিজে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার পাশে বসিয়ে দেখিয়েছিল।
এই ‘অযান্ত্রিক’ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ১৭-১৮ বছরে ঋত্বিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় হবার সুযোগ কখনও হয়নি-যাকে বলে বেশ বসে আলাপ করা, আড্ডা মারা বা চলচ্চিত্রের নানান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা। সেই সুযোগ প্রায় আসেনি বললেই চলে। সত্যি বলতে কী ঋত্বিককে শেষ কবে সুস্থ দেখেছি সেটা চেষ্টা করে মনে করা কঠিন। তার কাজ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি; কিন্তু যাঁরা তার সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁদের মুখে শুনেছি যে সে কাজ করার সমযও, অনেক সময়ই অসুস্থ থাকত। কিন্তু আমার কাছে যেটা সবচেযে আশ্চর্য লেগেছে যে তার কোনো ছবি দেখে কখনও মনে হয়নি সেই অসুস্থতা একটুকুও, এতটুকুও সেই ছবিব মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। তার বিষয়বস্তু যেরকম বলিষ্ঠ তার বলার কায়দার মধ্যেও সেরকম জোর ছিল। এটা একমাত্র সম্ভব হয় তখনই যখন একজন শিল্পীর মধ্যে তাঁর বিশেষ শিল্পের আদবকায়দাগুলো একেবারে মজ্জাগত হয়ে থাকে। ঋত্বিকের মধ্যে সেটা ছিল। এবং সেই বিশেষ গুণটুকু না থাকলে আমার মনে হয় না মহৎ শিল্পী হওয়া যায়। ঋত্বিককে তাই খুব কাছাকাছি না-জেনেও, তার ছবি যখনই দেখেছি তখনই মনে হয়েছে একে আমি খুব ভালো করে চিনি এবং এ আমার খুব কাছের লোক।
আর একটা কথা বলে আমি শেষ করব–একটা বিশেষ গুণ ঋত্বিকের ছবির। আমরা যারা প্রায় গত চল্লিশ বছর ধরে ছবি দেখেছি, তাদের মধ্যে তো প্রায় ত্রিশটা বছর কেটেছে হলিউডের ছবি দেখে, কেন-না কলকাতায় তার বাইরে কিছু দেখবার সুযোগ ছিল না সে সময়টা। উনিশশো ত্রিশ বা পঁচিশ থেকে শুরু করে প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বা ষাট অবধি আমরা হলিউডের বাইরে খুব বেশি ছবি দেখতে পারিনি। আমাদের সকলের মধ্যেই তাই কিছু কিছু হলিউডের প্রভাব ঢুকে পড়েছে। কিন্তু ঋত্বিক এক রহস্যময় কারণে সম্পূর্ণ সে প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল; তার মধ্যে হলিউডের কোনো ছাপ নেই। এটা যে কী করে হয়েছে, সেটা এখনও আমার কাছে রহস্য রয়ে গেছে। যদি প্রভাবের কথা বলতে হয়, আমার মনে হয় ঋত্বিকের ছবিতে কিছুটা-কিছু কিছু সোভিয়েট ছবির প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু সে প্রভাবটা-প্রভাব মানে সেখানে অনুকরণ নয়; কারণ ঋত্বিকের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার মৌলিকতা এবং সেটা সে শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছিল। এই সোভিয়েট ছবির প্রভাব এবং সংলাপে, বিষয়বস্তুতে, ছবির পরিসমাপ্তিতে নাটকের প্রভাব তার মধ্যে ছিল। এবং এই দুটো জিনিস দাঁড়িয়েছিল যে-ভিত্তির ওপর সেটা একেবারে বাংলার মাটিতে বসানো। ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল-আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তার সবচেয়ে বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তার সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
সংগৃহীত