শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:৫৮
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ঋত্বিক ঘটক : বাংলা সিনেমার এক খ্যাপা শিল্পস্রষ্টা

পেজফোর, বিশেষ প্রতিনিধি / ৪৫২ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

ভারতে বৈদিক যুগে যজ্ঞে চারজন ঋত্বিক বা পুরোহিতের প্রয়োজন হতো। আর তিন ধরনের অগ্নিরও প্রয়োজন হতো। বাংলা সিনেমাকে গত শতাব্দির পাঁচ দশক থেকে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়ার কঠোর যজ্ঞে তিনজন পুরোহিত তিন ধরনের অগ্নি প্রজ্জলন করে রেখেছিলেন। স্বয়ং নামে ঋত্বিক নিয়ে এ তিনজন ঋত্বিক সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন। আরও একটি দৈবঘটনা এই যে, এ তিন পুরোহিতের একজন ঢাকার জিন্দাবাজারের ঋষিকেশ দাশ লেনে জন্ম নেয়া পাবনার বাঙ্গাল, আরেকজন ফরিদপুরের বাঙ্গাল আর সত্যজিৎ রায়ের জন্ম কলকাতায় হলেও পিতামহ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির বাঙ্গাল। তিনজনের জন্ম ১৯২১ থেকে ১৯২৫ এর মধ্যে। তিন বাঙ্গালের দেখা হলো কলকাতাতে। আর একজন ঋত্বিকের কথা না বললে নয়- তিনি কাবুলিওয়ালা, অতিথির মতো ছবির স্রষ্টা তপন সিংহ। তাঁরও জন্ম ওই সময়কালের মধ্যে। ঋত্বিকের মহাপ্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ঋত্বিক কুমার ঘটক জন্মেছিলেন ঢাকার জিন্দাবাজারের ঋষিকেশ দাস লেনের ঝুলনবাড়িতে। বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁরা মূলের পাবনার লোক। নগরবাড়ি ঘাটের অদূরে ভারেঙ্গা গ্রাম তাঁদের দেশের বাড়ি। কিন্তু বাবার কর্মসূত্রে ঋত্বিকের জন্ম ঢাকায়। পিতামাতার কনিষ্ঠতম ৯ম সন্তান। যমজ বোন প্রতীতির সাথে জন্ম নিয়েছেন। ঘরের নাম ভবা। ৮ম শতকের পণ্ডিত ভট্টনারায়ণ তাঁদের আদি পুরুষ। ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষও পণ্ডিত ভট্টনারায়ণ। শাণ্ডিল্য গোত্রীয় এই ব্রাহ্মণ কান্যকুব্জ থেকে আদিশূর আনীত পঞ্চ ব্রাহ্মণের অন্যতম। বাবার বদলির চাকরি সূত্রে স্কুলজীবন শুরু ময়মনসিংহে। বাবা কর্মজীবন শেষে রাজশাহী গিয়ে বাড়ি করে বাস করতে লাগলেন। ঋত্বিকের শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে রাজশাহীতে। বাড়ি থেকে কয়েকবার পালিয়েছেন। কানপুরে টেক্সটাইল বিভাগে কিছুদিন চাকরিও করেছেন। সর্বশেষ কানপুর থেকে বাড়ির লোকজন ধরে নিয়ে আসেন। মাঝে বছর দুয়েক নষ্ট হয়েছে। এরপর পড়াশোনায় মন আসে। তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছেন। ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই এ পাস করেন। দেশবিভাগ তথা বাংলাবিভাগে তাঁরা উদ্বাস্তু হয়ে ১৯৪৭ এ পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ কোর্স শেষ করেও নাটকের টানে পরীক্ষায় আর বসেননি।

ঋত্বিকের পারিবারিক আবহ ছিল দারুণ সৃষ্টিশীলতার। বাবা কবিতা, নাটক লিখতেন, গান গাইতেন। মা ইন্দুবালা দেবী পিয়ানো বাজাতেন। জ্যেষ্ঠভ্রাতা মণীষ ঘটক (লেখক, ছদ্মনাম-যুবনাশ্ব) কল্লোল যুগের অন্যতম প্রধান কবি তথা সাহিত্যিক, ইংরেজির অধ্যাপক, সমাজকর্মী। ভারতীয় গণনাট্য সংঘে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ও তেভাগা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মেঝদা সুধীশ ঘটক ছিলেন বিলেতে সিনেমাটোগ্রাফিতে ডিপ্লোমা করা টেলিভিশন এক্সপার্ট। সিনেমায় ক্যামেরাম্যান ও পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। বিমল রায় প্রোডাকশনস এর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। সেসবের সুবাদে স্বনামধন্য তাবড় তাবড় কবি, সাহিত্যিক, সিনেমা পরিচালকের নিয়মিত যাতায়াত এ বাড়িতে ছিল। অন্যান্য ভাই বোনেরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যশস্বী হয়েছিলেন। একসাথে বেড়ে ওঠা বড়দার মেয়ে সমবয়সী মহাশ্বেতা দেবী বিখ্যাত সাহিত্যিক-ঔপন্যাসিক ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী। তাঁর জমজ বোন প্রতীতি দেবীর সাথে বিয়ে হয় ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপনকারী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্র পরলোকগত বিশিষ্ট সাংবাদিক অভিনেতা সঞ্জীব দত্তের। তাঁদের কন্যা রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত এরোমা দত্ত দেশের বিশিষ্ঠ মানবাধিকার ও উন্নয়নকর্মী।

ঋত্বিক তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন শুরু করেছিলেন কবিতা ও গল্প লেখার মাধ্যমে। কিন্তু একসময় তাঁর মনে হলো গণসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও গণমানুষের কাছে পৌঁছাতে নাটক অধিকতর কার্যকর মাধ্যম। ১৯৪৮ সালে লিখলেন তাঁর প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। ১৯৫১ সালে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘে যোগ দেন ও পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতেও যোগ দেন। বেশ কিছু নাটক লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন, অভিনয় করেছেন অনেক নাটকে। ব্রেশট, গোগোল, গোর্কির নাটক অনুবাদ করেছেন। নাটকে মজে গিয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেন না। নাটক করতে করতে মনে হলো সিনেমার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বক্তব্য পৌঁছে দেয়া অনেক সহজ। পরবর্তীতে অবশ্য সিনেমা নিয়েও তাঁর মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছিল। সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন যদি তিনি আরও দশ বছর বাঁচেন এবং তার মধ্যে সিনেমার চাইতেও কোনো শক্তিশালী মাধ্যম জনগণের কাছে যেতে তৈরি হয়, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে তিনি নতুন মাধ্যমটি বেছে নেবেন। যা হোক সিনেমায় পদার্পণের ক্ষেত্র তো তৈরি হয়েই ছিল। মেঝদা সুধীশ ঘটক খ্যাতিমান সিনেমার ক্যামেরাম্যান ও পরিচালকও। ইতোমধ্যে সত্যজিৎ রায় ও চিদানন্দ দাশগুপ্ত কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি গঠন করেছেন। কলকাতাসহ চারটি শহরে আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জগদ্বিখ্যাত সিনেমাগুলো দেখানো হলো। ১৯৫১ সালে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল ছবিতে সহকারী পরিচালক ও অভিনেতাও ছিলেন। একক পরিচালনায় দেশ বিভাগ তথা বাংলা বিভাগ ও ফলশ্রুতিতে পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু সমস্যার পটভূমিকায় ১৯৫২ সালে নির্মাণ করেন ‘নাগরিক’। সম্ভবত সেটিই বাংলায় প্রথম আর্ট ফিল্ম। অতীব দুঃখের বিষয় তাঁর জীবৎকালে ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৭৭ সালে ছবিটি মুক্তি পায় যখন ছবিটির টেকনিকাল দিকগুলো প্রায় সব নষ্ট হয়ে যায়। ঋত্বিক মাঝে কিছু সময়ের জন্য বোম্বে যান ও দুই বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক বিমল রায় ও ঋষিকেশ মুখার্জির পরিচালনায় ও দিলীপ কুমার অভিনীত মধুমতী ও মুসাফিরের হিন্দী চিত্রনাট্য লেখেন। কিন্তু অর্থ তাঁকে কখনও বাঁধতে পারেনি। স্ত্রী সুরমাকে লেখেন ‘দশটা পাঁচটা গিয়ে বসে থাকতে হবে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু পয়সার চেষ্টা করা। দেখ লক্ষ্মী, এ জীবন আমাদের নয়….। এ সব ছেড়ে দেব। এ হবে না।’ তিনি কলকাতা ফিরে আসেন।

ঋত্বিকের দ্বিতীয় ছবি ক্লাসিক হিসেবে পরিগণিত অযান্ত্রিক ১৯৫৮ সালে। নিজের জাত চিনিয়েছিলেন ঋত্বিক এ ছবিতে। সুবোধ ঘোষের একই নামের ছোট গল্প থেকে নায়িকা একটি লক্কড় ট্যাক্সি জগদ্দল। নায়ক ড্রাইভার বিমল চরিত্রে কালী ব্যানার্জি। ট্যাক্সিটির সাথে বিমলের যে কথাবার্তা মনে হয় যেন সত্যিকার দুজন মানুষের মধ্যে ভাব বিনিময় হচ্ছে, মান, অভিমান, ভালবাসা সব কিছু। ১৯৫৯ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে অযান্ত্রিক প্রদর্শিত হয়। অনেকে মনে করেন ১৯৬২ তে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের অভিযান ও ১৯৭৬ সালে মার্টিন স্করসেস নির্মিত ট্যাক্সি ড্রাইভার সিনেমা দুটিতে বেশ প্রভাব ঋত্বিকের অযান্ত্রিকের। এর পর পরই তাঁর আর একটি ছবি বাড়ি থেকে পালিয়ে। এর পর ১৯৬০, ’৬১, ’৬২ তে তিনটি ছবি মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখা। এ তিনটিকে ট্রিলজি ধরা হয়। এর মধ্যে শক্তিপদ রাজগুরুর গল্প ‘চেনামুখ’ অবলম্বনে মেঘে ঢাকা তারা বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। শিল্পবোদ্ধারা মনে করেন বাংলা সিনেমায় ছবিটির স্থান সত্যজিতের পথের পাঁচালীর পরেই। চলচ্চিত্র বিষয়ক সাময়িকীতে মেঘে ঢাকা তারাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের তালিকায় ২৩১ নম্বরে রাখা হয়েছে। এ ছবির একেবারে শেষের দিকে নায়িকা নীতার (সুপ্রিয়া দেবী) বড়দা শঙ্করের (অনিল চ্যাটার্জি) উদ্দেশ্যে ডায়ালগ ‘দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম। দাদা, আমি বাঁচতে চাই’ — ক্লাসিক ডায়ালগ হয়ে আছে।

ভারত বিভাগ তথা বাংলা বিভাগ এবং এর ফলশ্রুতিতে পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু জীবনের কঠোর বাস্তবতা ঋত্বিকের হৃদয়ে সতত রক্তক্ষরণ করেছে এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম তা নাটকই হোক বা সিনেমা হোক তাতে সুগভীর প্রভাব ফেলেছে। ট্রিলজি মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধার ও সুবর্ণরেখা দেশ বিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে রিফিউজিদের অস্তিত্বের সঙ্কটে হাজারো সমস্যাসঙ্কুল, ও মনোজাগতিক জটিল পরিস্থিতি, অবক্ষয়কে অবলম্বন করে নির্মিত। তিনি এ নির্মাণে অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে নির্লিপ্ত থাকতে পারেননি। কারণ তাঁর নিজের উদ্বাস্তু হওয়ার মনোজাগতিক বেদনা, দুঃখ, রক্তক্ষরণ মিশে গেছে তাঁর সৃষ্টিতে। তবে শিল্পবিচারে ট্রিলজিতে তিনি অপূর্ব মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। মেঘে ঢাকা তারায় তিনি প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেছেন। আবহ সঙ্গীতে রাগ ও রাগাশ্রয়ী খেয়াল ব্যবহার করেছেন। ধ্রুপদী এ ছবিটি তাঁর মৃত্যুর পর আরও অনেক বেশি আদৃত ও আলোচিত হচ্ছে। ছবিটি ব্যবসা সফল হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬১ তে নির্মিত কোমলগান্ধার ও বিশেষত ১৯৬২ তে নির্মিত সুবর্ণরেখা একেবারেই মার খায়। কেন যে বাঙ্গালী ছবি দুটো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তিনি এমনভাবে মুষড়ে পড়েন যে দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে তিতাস একটি নদীর নামের আগে আর কোন পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা করেননি। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। পাতার বিড়ি আগেই খেতেন। নতুন করে প্রচ-ভাবে ধরলেন বাংলা মদ। ১৯৬৫ সালের দিকে স্নান করা ছেড়ে দিলেন। নিজের সমস্ত ব্যবহারে তিনি প্রচণ্ড একগুয়েমিভাবে অচঞ্চল। তাঁর অত্যন্ত ‘লক্ষ্মী’ স্ত্রী সুরমা ঘটক যিনি নিজেও কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, জেল খেটেছিলেন কমুনিস্ট পার্টি করার কারণে, সন্তানদের নিয়ে শিলং চলে গেলেন, বরং তিন সন্তানের কথা চিন্তা করে ঋত্বিককে তাঁর নিজের মতো করে থাকতে দিয়ে গেলেন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উসকোখুশকো চুল, মলিন পাঞ্জাবি পাজামা, ঠোঁটে বিড়ি, হাতে বাংলা মদের বোতল, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা নিয়ে ট্রেডমার্ক ঋত্বিক হয়ে গেলেন। সিজোফ্রেনিয়াতেও আক্রান্ত হন। স্পষ্টভাষী, ঠোঁটকাটা নিজের পরিচয় দিতেন মাতাল বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল বলে। এমন গল্প আছে যে হয়ত রাতে বাড়ি ফিরছেন, মাতাল অবস্থায় পা চলছে না। ট্যাক্সি নিলেন। বাড়ি এসে ভাড়া দিতে গিয়ে বললেন ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে গিয়ে কলিং বেল টিপলে একজন ঢ্যাঙা লোক বেরিয়ে আসবেন। তাকে বলবে ঋত্বিক ঘটক ভাড়া দিতে পারেনি। আপনাকে দিতে বলেছেন। সেই ঢ্যাঙা লোকটি সত্যজিৎ রায়। অনেকবার সত্যজিৎ এভাবে নাকি ঋত্বিকের ট্যাক্সিভাড়া পরিশোধ করেছেন।

কিন্তু অভাব নিয়ে ঋত্বিকের কোনো দুঃখবোধ ছিল না। স্পষ্টভাষী, ঠোঁটকাটা ঋত্বিক একবার বলেছিলেন যে তাঁর বাবা চেয়েছিলেন তিনি ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হন। ঋত্বিক ইনকাম ট্যাক্সে চাকুরি পেয়েও না করে উল্টো কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। তিনি বলেন যে হয়ত তিনিও চাকুরি করলে হতে পারতেন অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেলও। আজ তিনি রাস্তার কুকুর। কিন্তু শিল্পী হিসেবে তাঁর উদ্দেশ্য বাণিজ্য বা অর্থ নয়। শিল্পীর দায়িত্ব আছে সমাজের কাছে, জনগণের কাছে। তাঁর মতে প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। সিনেমাকে তিনি বিনোদনের হাতিয়ার নয়, প্রতিবাদের ভাষা করতে চেয়েছেন। সস্তা জনপ্রিয়তার ধার ধারেননি আদৌ। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী শিল্পী। তাঁর অভীষ্ট সমাজব্যবস্থা হবে শোষণমুক্ত, শ্রেণি বিভাজনহীন, অসাম্প্রদায়িক।

১৯৬৫ সালে স্বল্প সময়ের পুনেতে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। কয়েক মাস উপাধ্যক্ষও ছিলেন সেখানে। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ঋত্বিক ঘটকের গুণমুগ্ধ ছিলেন। পদ্মশ্রীও তাঁর প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে দেয়া। কিন্তু এই স্বল্পকালীন শিক্ষকতায় এতই আনন্দ পেয়েছেন ও গুরুত্ব দিয়েছেন যে তিনি তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের ওপর এই শিক্ষকতাকে স্থান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে অল্প কয়েকটি সিনেমা তিনি নির্মাণ করেছেন, তা যদি দাঁড়িপাল্লার একদিকে তোলা হয় এবং ওই স্বল্পকালীন শিক্ষকতাকে যদি অপর পাল্লায় তোলা হয়, তাহলে শিক্ষকতার পাল্লা ভারী হবে।

১৯৬২ তে সুবর্ণরেখা চূড়ান্ত মার খাওয়ার পর দীর্ঘদিন আর পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি করেননি। এ সময়ে বেশ কয়েকটি ডকুমেন্টারি ও শর্টফিল্ম করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দুর্বার গতি পদ্মা শর্টফিল্মটি করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ করেছেন।

১৯৭৩ সালে দীর্ঘদিন পর নির্মাণ করেন একই নামের অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র। তিনি বলেছেন তিনি ব্যতিরেকে তিতাস হতো না। তাঁর মতো মমত্ব নিয়ে আর কেউ এই কাহিনী তুলে ধরতে আগ্রহী হতেন না। এটি ছিল তাঁর স্বপ্ন। তবে ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্ল বর্মণ যেখানে মরতে বসেছে তিতাস নদী এমন নৈরাশ্য দেখিয়েছেন উপন্যাসে, ঋত্বিক সেখানে আশার আলো দেখিয়েছেন। তাঁর মতে শিল্প মানেই লড়াই, সংগ্রাম। তিনি পুনরুজ্জীবন দেখিয়েছেন। তাই তিতাসের শেষ দৃশ্যে দেখিয়েছেন চরে গজিয়ে ওঠা নোতুন ঘাসের মধ্যে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে একটি শিশু ছুটে আসছে — বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে শেষ করেন ছবি। ছবিটি ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের ভোটে সেরা ১০টি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করে। ৬৩তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্লাসিক বিভাগে প্রদর্শিত হয়।

তাঁর শেষ ছবি আত্মজৈবনিক যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ১৯৭৪ সালের। মাত্র দু-দিনে এছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন নিজে। তাঁর নির্মিত তিনটি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন — সুবর্ণরেখা, তিতাস একটি নদীর নাম ও যুক্তি, তক্কো আর গপ্পে। শেষ ছবিতে তিনি মাতাল বুদ্ধিজীবী নীলকণ্ঠ বাগচি প্রধান চরিত্র যিনি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য বিক্রি হননি। ১৯৭১-৭২ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন কাউকে তুষ্ট না করে। ১৯৭১ সাল কলকাতার দারুণ ক্রান্তিকাল। একদিকে নকশাল আন্দোলনের অভিঘাত, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শরণার্থীর ঢল ও তার অভিঘাত। মৃণাল সেনও কলকাতা ৭১-এ তুলে ধরেছেন সে সময়ের বাস্তবতা। ঋত্বিকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এমন নির্মম ভাবে আত্মবিশ্লেষণ, নিজেকে শবব্যবচ্ছেদ করা সহজ নয় মোটেই। যদিও তাঁর কমিউনিজম সম্পর্কে নিজস্ব চিন্তাধারার থিসিস লেখা ও বিতরণের জন্য পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন (শোনা যায় জ্যোতি বসু তাঁর পক্ষে ছিলেন অবশ্য) আজীবন তিনি মার্ক্সবাদী ছিলেন। দ্বান্দ্বিকতা তিনি এই আত্মজৈবনিক ছবিতে প্রবলভাবে ব্যবহার করেছেন। রূপক ব্যবহার করেছেন অসংখ্য। চরিত্রের নামগুলিও রূপক — নীলকণ্ঠ, দুর্গা, নচিকেতা, বঙ্গবালা প্রভৃতি। নকশালরা যখন দাবি করল যে তিনি ক্ষয়প্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী অকপটে স্বীকার করে বললেন ‘ধরে ফেলেছ?’ এ ছবিতে তিনি প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রধান চরিত্রাভিনেতা। সম্ভবত পৃথিবীতে এর নজির নেই। এ ছবিতেও একটি রবীন্দ্রনাথের গান ছিল এবং সেটি দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন — কেন চেয়ে আছ গো মা। মা সেখানে বঙ্গবালা চরিত্রে শাঁওলি মিত্র। রূপক অর্থে পূর্ববঙ্গ। শাঁওলি মিত্র এখানে বঙ্গবালা চরিত্রে যে ১৯৭১-এ পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে।

তাঁর শেষ ছবি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো নির্মাণের কিছু পরেই সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। নির্জন প্রকোষ্ঠে হাসপাতালে খামখেয়ালী, খ্যাপাটে, স্পষ্টবাদী, উচ্ছৃঙ্খল অথচ অমিত প্রতিভার অধিকারী ঋত্বিক মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। উল্কার মতই সিনেমায় তাঁর স্বল্পক্ষণ অবস্থান। ১৯৫২ থেকে ১৯৬২, তারপর প্রায় ১০ বছর পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি থেকে ছুটি। তারপর আর মাত্র দু-বছর। মাত্র ৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি তাঁর। কিন্তু বিশ্বসিনেমায় তা দিয়ে নিজকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। কোন প্রকার কম্প্রোমাইজ করেন নি। তাঁকে বলা হয়েছিল সুবর্ণরেখা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালে যাবে শুধুমাত্র বেশ্যালয়ে রিফিউজি কলোনির মাতাল ভাইয়ের (বিন্দুমাত্র ধারণার বাইরে যে নিজের বোন সেখানে থাকতে পারে) বোনের ঘরে প্রথম খদ্দের হিসেবে যাবার দৃশ্যটি বাদ দিতে হবে। রাজী হন নি ঋত্বিক। তাঁর মতে শিল্পী সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে সে ছবি করবে। তিনি সিনেমায় ‘জীবন ঘষে আগুন’ বের করতে চেয়েছেন। ‘আমার চরিত্ররা বলে আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায় — এতো মৃত্যু নয়, জীবনেরই জয় ঘোষণা।’ তিনি নায়ক নায়িকার পুতুপুতু করা সিনেমায় বিশ্বাসী নন। তিনি সেখানে বিপ্লবী। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বুঝাব যে, ইট ইজ নট এন ইমাজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। আমি আপনাকে হাতুড়ি মেরে বুঝাব যে, যা দেখছেন তা একটি কল্পিত ঘটনা। কিন্ত এরমধ্যে যেটা বুঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটি বুঝুন। …..যদি আপনি সচেতন হয়ে উঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে উঠেন, আমার প্রচেষ্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।’ ঋত্বিক বলেন যে- চিত্রনির্মাতা দুই ধরনের — এক দল পরিচালক, আরেক দল স্রষ্টা। আমি স্রষ্টার দলে।’ কিন্তু প্রচণ্ড জীবনমুখী, নির্লোভ, পূর্ণ কমিটেড শিল্পী নিজেই জীবনযুদ্ধে অকালে পরাজয় স্বীকার করে চলে গেলেন। নাকি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পে নিজের গপ্প বলে, বিভিন্ন দ্বান্দ্বিকতার তক্কো হাজির করে, নিজের যুক্তি দিয়ে সুশীল লেখক সত্যজিৎ বসুকে (উৎপল দত্ত ভূমিকায়) দেয়া ডায়ালগ ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো’ এর ন্যায় অন্যদের বিষয়গুলো ভাবতে বলে তিনি শিল্পের দাসত্ব থেকে নিজে মুক্তি নিলেন? দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে গেলেন জীবিতদের হাতে? কে জানে।

ঋত্বিক তাঁর সমালোচকদের সমালোচনাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর নির্মিত ছবির সমালোচনায় বলা হয় যে তিনি সর্বদা উচ্চকিত কণ্ঠ, কয়েনসিডেন্সের আত্যন্তিক ব্যবহার, নাটকীয় সংলাপ- মেলোড্রামাটিক প্রয়োগ, নাটকীয় শরীরী ভাষা ইত্যাদি দোষে দুষ্ট। তিনি জবাবে বলেছেন মেলোড্রামা ব্যবহার তাঁর বার্থরাইট, তাঁর সিনেমাটিক ফর্ম। অর্থাৎ তিনি দেশজ উপাদান তাঁর সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন। পশ্চিমা সিনেমার টেকনিক, ভাবধারা তিনি কত ভাল জানতেন, তা তাঁর পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা যারা পরবর্তীতে অতি বিখ্যাত হয়েছিলেন, তাঁরা স্বাক্ষ্য দিয়েছেন। ঋত্বিক তাঁর সৃষ্টিতে পশ্চিমা ভাবধারা অত্যন্ত সচেতনভাবে বর্জন করেছেন।

বিশাল প্রতিভার সামান্য যেটুকু ব্যবহার করে তিনি কালজয়ী সিনেমা নির্মাণ করে গেলেন তার কতটুকু যোগ্য স্বীকৃতি তাঁর বরাতে জুটেছিল? স্বীকৃতি বা সম্মানের তিনি কাঙ্গাল ছিলেন না আদৌ, বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ সে দিকে কখনও করেননি। শিল্পের দাসত্বই করে গেছেন। একটি পদ্মশ্রী, যুক্তি তক্কো আর গপ্পোর জন্য ভারতের ১৯৭৫ শ্রেষ্ঠ কাহিনীর পুরস্কার, বাচশাস পুরস্কার, আর কিছু খুচরো। তাঁর যোগ্য সম্মাননা জোটেনি ভাগ্যে। তার দায়ভাগ ভারতের অবশ্যই, সরকারের ও জনগণেরও। যে পূর্ববাংলা থেকে তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল এবং সে বেদনার ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ তাঁর আজীবন হয়েছে, তাঁর সৃষ্টির মূল সুরের অন্যতম উপাদান, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে দেশে নির্মিত শ্রেষ্ঠ সিনেমাটি তিনি নির্মাণ করেছেন, আমরা বা তাঁকে কি ভাবে মনে রেখেছি? সিনেমা সংক্রান্ত, নাটক সংক্রান্ত বা সাহিত্যবিষয়ক কোন প্রতিষ্ঠানের নাম বা কোন রাস্তার নাম? সম্ভবত না। যাহোক আমার পাঠকদের অনুরোধ করব, যদি ভাল সমাজ সচেতনমূলক, ভাবনা উদ্রেকমূলক ছবি দেখতে চান, আগে না দেখে থাকলে ঋত্বিক ঘটকের সব কটি ছবি দেখুন। তবে একটি কথা অনস্বীকার্য- তাঁর সৃষ্টির স্বাদ পেতে হলে (বিশেষত উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে নির্মিত) দেশবিভাগ ও বাংলাবিভাগের সৃষ্ট উদ্বাস্তু সমস্যা বোঝার মন থাকতে হবে।

সিনেমার সাথে ঋত্বিকের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবির সংখ্যা মাত্র আট। ডকুমেন্টারির সংখ্যা ১০। কিন্তু সিনেমায় তাঁর পরিচয় আরও ব্যাপক। অসমাপ্ত ফিল্ম ও ডকুমেন্টারি বেশ অনেকগুলো। তাঁর বহু চিত্রনাট্য শুটিংই হয়নি। তাঁর পরিচালিত তিনটি চলচ্চিত্র ছাড়াও আরো দুটিতে অভিনয় করেছেন। দুটি হিন্দী ছবির পর দ্বীপের নাম টিয়ারং সহ কয়েকটি বাংলা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন। নিজের পরিচালিত ৮টি ছবির সবকটি চিত্রনাট্য তিনি লিখেছেন। সিনেমার ওপর তাঁর ৫০টির বেশি উচ্চমানের প্রবন্ধ আছে। সত্যজিৎ রায়ের মতে এসব প্রবন্ধ সিনেমার সবদিক আলোকপাত করেছে।

মেঘে ঢাকা তারা থেকে সিনেমায় ঋত্বিক রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন বেশ চিত্তাকর্ষক। বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারি না। আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি আমার সমস্ত অনুভূতি জড়ো করে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে বুঝেছিলেন এবং সেসব লিখেও ফেলেছিলেন। আমি যখন তাঁর লেখা পড়ি তখন মনে হয় যে সব কিছুই বলা হয়ে গেছে এবং নতুন করে আমার আর কিছুই বলার নেই।’ ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’-এ বিখ্যাত গানটি আগে অনেকবার শুনলেও ঋত্বিকের কোমলগান্ধার ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া এ গানটির পিকচারাইজেশন দেখার পর থেকে অন্য রকম অনুভূতি হয়। যখনই শুনি তখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে কোমলগান্ধারের গানটির পিকচারাইজেশন — সুপ্রিয়া দেবী পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছেন আর অনিল চ্যাটার্জি চোখে মুখে দুহাতে আনন্দের দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে গানটির অন্তর্নিহিত মানব জনমের জয়গান গেয়ে হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে গানটি গাইতে গাইতে তাঁকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন। এ গানটির সাথে অনিল চ্যাটার্জির অভিব্যক্তি একই সাথে হাজির হয় আমার মানসপটে। প্রচণ্ড জীবনমুখী এ মহান শিল্পী, যিনি মানুষকে বলেছেন ‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাঁচতে চায়’, তাঁর পক্ষে এমন একটি অনুপম প্রাণবন্দনার রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর সৃষ্টিতে প্রয়োগ দারুণ মানানসই। পাঠক, বাংলা সিনেমাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার অন্যতম এ কিংবদন্তি শিল্পস্রষ্টার মৃত্যুর কাছে অকালে এ করুণ পরাজয়ে আপনার অন্তত একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস তাঁর স্মৃতির প্রাপ্য।

সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা থেকে সংগৃহীত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন