বাংলার গৌরব। জঙ্গলমহলের রাঙামাটির মেয়ের বিশ্বজয়। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালকের শিরোপা ছিনিয়ে নিলেন পুরুলিয়ার মেয়ে অন্নপূর্ণা রায়। ‘সংগস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ ছবির জন্যই তাঁর এই পুরস্কার। তাঁর এই জয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, “আমাদের পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়-এর অসাধারণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার খবরে আমার খুব আনন্দ হয়েছে। আমি তাঁকে, তাঁর বাবা-মাকে, তাঁর সকল বন্ধু-সহযোগীকে অভিনন্দন জানাই। অনুপর্ণা বিশ্বখ্যাত ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তাঁর শাখায় শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান পেয়েছেন, চলচ্চিত্রের জগতে যেটাকে কার্যত পৃথিবী জয় বলা যায়।”
যে ছবিটির জন্য তিনি মনোনীত হলেন, সেটি মুম্বইয়ে বসবাসকারী দুই মহিলার লড়াইয়ের কাহিনি নিয়ে। এই ছবির গল্প আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে ২০২৩ সালে রিলিজ হয়েছিল তাঁর প্রথম ছবি ‘রান টু দ্য রিভার’। আর এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ছবি, যা তাঁকে বিশ্বে সেরা পরিচালকের মুকুট পরিয়ে দিল। আদি বাড়ি জঙ্গলমহলে হলেও বাবা-মা থাকেন কুলটিতে। মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন না পাওয়ার জন্য তাঁর মা তাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মামার কাছে। সেখানেই ইংরেজি সাহিত্য দিয়ে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরা শুরু হয়। বদলে যেতে থাকে তাঁর জীবন। দুটি কর্পোরেট সংস্থার চাকরি পেয়েও ছেড়ে দেন। মন দেন চিত্র পরিচালনায়। সেই কারণেই বোধহয় পুরস্কার পাওয়ার খবরে উচ্ছ্বসিত অনুপর্ণা। তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, “মামা ফের রূপোলি পর্দার জগতে ভারতের জয়জয়কার। ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালকের খেতাব জয়। এক বাঙালি পরিচালক হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করলেন পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়। ‘অরিজন্টি’ বিভাগে তাঁর পরিচালিত ছবি ‘সংগস অফ ফরগটেন ট্রিজ’-এর (Songs Of Forgotten Trees) জন্য তিনি এই পুরস্কার পেলেন।
ছবির বিষয় সকলকে আকৃষ্ট করেছে। মুম্বইয়ে বসবাসকারী দুই মহিলার জীবন সংগ্রামের গল্প বলা এই ছবির জন্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসায় ভাসছেন অনুপর্ণা। ফরাসি পরিচালক জুলিয়া ডুকুরনো নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুপর্ণার হাতে। সাদা শাড়ি পরে যখন তিনি মঞ্চে ওঠেন, পুরস্কার হাতে তাঁর চোখ ছলছল করে ওঠে। আবেগে ভেসে তিনি জানান, এই সম্মান তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়, বরং নিঃশব্দে লড়াই করা সব নারীর প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বলেন, “এই পুরস্কার আমি উৎসর্গ করছি সেই সকল মহিলার জন্য, যারা লড়াই করেন কিন্তু আলো পেতে পারেন না”। অনুপর্ণার এই ছবিতে অভিনয় করেছেন নাজ শেখ ও সুমি বাঘেল। প্রযোজকের দায়িত্বে ছিলেন বিভাংশু রায়, রোমিল মোদি এবং রঞ্জন সিং। অনুরাগ কাশ্যপ ছিলেন এই ছবির প্রেজেন্টার। তিনি কৃতজ্ঞতা জানান তাঁদের সকলকে। পাশাপাশি তাঁর ডিওপি অশীতিপর গাফার দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “আমার শহর, আমার দেশ, আমার সহযোদ্ধাদের এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি।” তবে পুরস্কার মঞ্চে সিনেমার বাইরে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গেও স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন অনুপর্ণা। ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাত নিয়ে তিনি বলেন, “প্রত্যেক শিশুর শান্তি ও স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। প্যালেস্তাইনও এর ব্যতিক্রম নয়। হয়তো এই বক্তব্যে আমার দেশের কেউ কেউ বিরক্ত হবেন, তবুও আমি সত্য বলতেই বাধ্য।” তারপর থেকে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার প্রত্যন্ত শহর কুলটিতে রায় দম্পতির মোবাইলে অভিনন্দনমূলক ফোন এবং বার্তায় ভরে উঠেছে। প্রাথমিকভাবে অনুপর্ণা রায় এর বাবা ও মা যথাক্রমে ব্রহ্মানন্দ রায় এবং মনীষা তাদের মেয়ের চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশকে প্রথমের দিকে মেনে না নিলেও আজ তারা বিশ্বের সবচেয়ে গর্বিত বাবা-মা।অনুপর্ণার বাবা বলেন , “প্রথমে, আমরা তাকে চলচ্চিত্র লাইনে কাজ করার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমার মনে হয় বাবা-মা হিসেবে, এটা স্বাভাবিক ছিল। আমরা চলচ্চিত্র নির্মাণের পেশা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমরা তার ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন এবং তার বেতনের সব অর্থ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা তাকে এই বলে ঠাট্টা করেছিলাম যে, তুমি কি সত্যজিৎ রায় হবে? সে বলত যে, সে রায় হতে পারবে না, কিন্তু সে চলচ্চিত্রে কাজ করা বন্ধ করবে না। সে শুরু থেকেই অবিচল এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ছিল। এখন, আমরা দেখতে পাচ্ছি আমরা ভুল বুঝে ছিলাম। সে নিজেকে প্রমাণ করেছে বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে।” অনুপর্ণার বাবা-মা আরও বলেন যে,” অনুপর্ণাকে জীবনে বেশ কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সে মুম্বাইতে আরো দুই মেয়ের সঙ্গে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকত। আমি তাকে কিছু টাকাও পাঠাতাম, যা সে তার ছবিতে ব্যবহার করত।আমরা তার জন্য এবং সে কী করছে তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, কারণ আমরা কখনই চলচ্চিত্র বুঝতে পারিনি, কিন্তু এটা তার আবেগ ছিল, এবং আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের মেয়ে কোথায় পৌঁছে গেছে। পুরুলিয়ার একটি গ্রাম থেকে বেরিয়ে ইতালিতে পুরস্কার জেতার জন্য পৌঁছেছে।”
অনুপর্ণার শিক্ষাজীবন শুরুটা ছিল অদ্ভুত। পুরুলিয়ার নিতোরিয়া থানার নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। অনুপর্ণা রায় স্থানীয় রানিপুর কোলিয়ারি স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং নাপাড়া হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি কুলটি কলেজ থেকে ইংরেজিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া এবং লেখালেখিতে তার খুব আগ্রহ ছিল। তারপর তিনি দিল্লিতে গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করতে যান। এরপর হঠাৎ তিনি মুম্বাই চলে যান, যেখানে তিনি আইটি সেলস সহ বেশ কয়েকটি চাকরি করেন। অনুপর্ণা বলেন, “আমি এমন একটি গ্রাম থেকে এসেছি যেখানে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বইয়ের পরিবর্তে রেশন দেওয়া হয়। আমার বন্ধু ঝুমার ১৩ বছর বয়সে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের আওতায় বিয়ে হয়েছিল, তারপর সে নিখোঁজ হয়ে যায়। তার নীরবতা আমার সঙ্গেই থেকে যায়।
রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস, অনুপর্ণাকে অভিনন্দন বার্তায় বলেছেন যে, তিনি তার জন্মস্থান পুরুলিয়া এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন।