শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:৫৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত

প্রবুদ্ধ পালিত / ১৭২ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

১৯৪০ খৃষ্টাব্দের ১লা মার্চ বাঁকুড়ার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ওই দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পদার্পনে বাঁকুড়া জেলার মাটি ধন্য হয়েছে। “বাঁকুড়া প্রসূতি ভবন”-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও “জেলা কৃষিশিল্প প্রদর্শনী”-র দারোদ্ঘাটন উপলক্ষে বাঁকুড়ার “নারী ও শিশুমঙ্গল” সমিতির নেতৃ শ্রীমতী ঊষা হালদারের আহ্বানে, কবির বাঁকুড়ায় শুভাগমণ হয়। তিন দিন জেলা শাসকের বাংলো “হিল হাউস”-এ অবস্থান করে তিনি এখানের বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন। কবির বাঁকুড়া আগমণের প্রধান উদ্যোক্তা ও ভ্রমণ সঙ্গী হয়েছিলেন বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিক বাঁকুড়ার ভূমিপুত্র রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। এই রামানন্দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল এক দারুন মধুর সম্পর্ক। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একাধারে বন্ধু একাধারে প্রিয় ভক্ত এবং অনুজ। রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন- ‘আত্মার আত্মীয়’।

রবীন্দ্রনাথ তখন অসুস্থ। সেই সময় শিলাইদহে ১৩৪৬ সালের ৯, ১০, ১১ই চৈত্র তারিখে অনুষ্ঠিত “নিখিল বঙ্গ পল্লীসাহিত্য সম্মেলনে” আমন্ত্রিত হয়েও সেখানে উপস্থিত থাকার অক্ষমতা জানিয়ে কবি লিখছেন — “আমার যৌবনের ও পৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস সাধনার তীর্থস্থান ছিল, পদ্মা-প্রবাহ চুম্বিত শিলাইদহের পল্লীতে। সেখানে যাত্রাপথ আজ আর সহজগম্য নয়। কিন্তু সেই পল্লীর স্নিগ্ধ আমন্ত্রণ সরস হয়ে আছে আজও আমার নিভৃত স্মৃতিলোকে। সেই আমন্ত্রণের প্রত্যুত্তর অশ্রুতগম্য করুণ ধ্বনিতে আজও আমার মনে গুঞ্জরিত হয়ে উঠছে, সে কথা এই উপলক্ষে পল্লীবাসীদের আমি জানিয়ে রাখলাম”। (প্রবাসী : বৈশাখ ১৩৪৭, পৃ-১১৪ )।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহ গ্রামে গেলেন না, অথচ কয়েক মাস পরই শারিরীক অসুস্থতা উপেক্ষা করে রাঢ় বাংলার এক ক্ষয়িষ্ণুতম অবহেলিত জেলা বাঁকুড়ায় এসে এখানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলিতে অংশ গ্রহণ করলেন। আসলে নারীজাতির কল্যাণের নিমিত্ত রবীন্দ্রনাথের চিত্ত চিরজীবন ব্যাকুল ছিল। তাই জীবন সায়াহ্নে শারিরীক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে তিনি প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এসেছিলেন।

প্রথমে আমাদের মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ বাঁকুড়ায় এসেছিলেন পৃথিবী যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তান্ডব লীলায় উত্তাল। মানবিকতার অন্তর্ধানে মানুষের ওপর মানুষ বিশ্বাস হারাচ্ছে। তবু বিপন্ন মানুষ ছুটে যেতে চাইছে মানুষের কাছে শেষ আশ্রয়ের জন্য। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে, — কবির কথায় “সুন্দর যখন অবমানিত কদর্য কঠোরের অশুভ স্পর্শে” তখন অর্থাৎ ২১শে জানুয়ারী ১৯৪০ সালে কবি সানাইয়ের বিপ্লব কবিতায় লিখলেন — “বেজে উঠে ডঙ্কা,শঙ্কা শিহরায়/হে নির্দয়া, কি সঙ্কেত বিচ্ছুরিল স্থলিত কঙ্কনে।”

১লা মার্চ কবি বোলপুর হতে বাঁকুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। খানা জংশন পর্যন্ত রেল পথে আসেন। কবির সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুত্রবধু শ্রীমতি প্রতিমা ঠাকুর এবং ড. অমিয় চক্রবর্তী, শ্রী শুধাংশু রায় চৌধুরী ও অনিল কুমার চন্দ। খানা জংশন থেকে মোটরে কবির যাত্রা শুরু হয় বাঁকুড়ার দিকে। দামোদর ঘাটে কবির গাড়ী এসে পৌঁছলে নৌকায় করে মোটর গাড়ীটি পার করানো হয়। কবি বালির ওপর দিয়ে কিছুটা হেঁটে নদী পার হন। সময় তখন বেলা প্রায় পৌনে বারোটা। রোদের প্রচন্ড তাপ। কবির দামোদরের শুষ্ক অবস্থা দেখে ক্ষোভের সাথে বলেন — “নদীটা এতো বৃহৎ অথচ সেই তুলনায় জলের পরিমাণ অতি সামান্য। নব্বুই ভাগ বালি আর দশ ভাগ জল। এ প্রকৃতির পরিহাস না অভিশাপ।” মেঝিয়া থেকে কবির গাড়ী সোজা বাঁকুড়া অভিমুখে রওনা হয়। পথে কিছুক্ষণের জন্য গঙ্গাজলঘাটির “অমরকাননে” কবির গাড়ী থামে। কিন্তু তাঁর শরীরের কথা ভেবে তাঁকে গাড়ী থেকে নামানো হয়না। অমর কাননের শিক্ষক ছাত্র এবং গ্রামবাসীরা গাড়ীর ভিতরেই মাল্য ভূষিত করে তাঁকে বরণ করেন।

বেলা ১টা ২৫ মিনিটে কবির গাড়ী বাঁকুড়া শহরের গন্ধেশ্বরী নদীর (সতীঘাটে) ঘাটে এসে পৌঁছয়। কবির আগমণে সারা শহরে তখন এক অভূতপূর্ব আলোড়ন ও উদ্দীপণার সৃষ্টি হয়। জনগণের উল্লাস, পুষ্প বৃষ্টি ও অভ্যর্থনার মাঝে কবি প্রবেশ করেন “হিল হাউসে”। কবির জন্য নির্দিষ্ট বাংলোর পূর্বদিকের শয়ন কক্ষ বারান্দা ও অভ্যর্থনা কক্ষটি সুন্দর আলপণা দিয়ে অলংকৃত করা হয়েছিল। জেলাশাসকের বাংলোর পূর্বদিকের এই কক্ষে কবি তিনদিন অবস্থান করেছিলেন। ওই দিনই বিকেল চারটায় বাঁকুড়ার “নারী ও শিশুমঙ্গল” সমিতির সভ্যগণ “হিল হাউস” প্রাঙ্গনে কবির অভ্যর্থনার আয়োজন করেন। কবি অভ্যর্থনা ও অভিনন্দনের উত্তরে একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ দেন। ভাষণে নারীজাতির প্রতি তাঁর দরদ ও সহানুভূতি ফুটে উঠে। ওই সভায় তিনি “যদি ভরিয়া লইব কুম্ভ” কবিতাটি আবৃত্তি করেন।

২রা মার্চ (১৯৪০) কবি এখানের কৃষি ও শিল্প প্রদর্শনীর দারোদ্ঘাটন করেন। “চন্ডীদাস চিত্রমন্দির” সিনেমা হল প্রাঙ্গনে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয়। নব নির্মিত “চন্ডীদাস চিত্রমন্দির” প্রেক্ষাগৃহে কবির অভ্যর্থনার আয়োজন করা হয়। সকাল সাতটার মধ্যেই অভ্যর্থনা হলটি বহু জনসমাগমে মুখরিত হয়ে উঠে। কবি আটটা পঞ্চাশ মিনিটে অভ্যর্থনা মঞ্চে উপস্থিত হন। অতুলপ্রসাদ সেনের “রবীন্দ্র বন্দনা” গীতির পর সভার কাজ শুরু হয়। এ সময় সমবেত সকলে দাঁড়িয়ে কবিকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের অভ্যর্থনা সমিতি’-র সভাপতি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় বাঁকুড়ার জনগণের পক্ষ থেকে মানপত্র পাঠ করে রবীন্দ্রনাথের হাতে দেন। “বাঁকুড়া সাহিত্য পরিষদের” পক্ষ থেকে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মানপত্র পাঠ করেন — “অদ্য বাঁকুড়ার সুপ্রভাত, রবীন্দ্রনাথের উদয়ে দশদিক সুপ্রসন্ন, অন্ধবহ সুখস্পর্শ আম্রমুকুলিত বৃক্ষশাখা গুঞ্জিত। আপনার চিত্তের প্রসার স্মরণ করিয়া জগৎ মুগ্ধ, আপনার ‘রবীন্দ্র’ নাম সার্থক। বেদে যিনি রবি প্রখর নিদাঘে সোম নিহিত পীযূষ বর্ষন দ্বারা শুষ্ক ও তৃষিত ধরাতল সরস ও স্নিগ্ধ করেন। আপনি পূর্ণ ইন্দুর সুধা-ভান্ড ঢালিয়া দিয়াছেন। যাঁহার কন্ঠে দেবী সরস্বতী নিত্য বিলাসিতা যাঁহার কবিত্বময় গদ্য ও পদ্য রচনা পর্বত প্রমাণ, যাঁহার কিঙ্করী বাঙ্গালা ভাষা, তাঁহাকে নমস্কার, তাঁহাকে নমস্কার, তাঁহাকে নমস্কার”। এর পরে কয়েক জন কবিকে তার দিয়ে বাঁধা পাতাবাহার পাতা ও ফুল দিয়ে তৈরী মালা যাকে ইংরাজীতে রীথ (wreath) বলে এমন মালা দিলে তিনি কৌতুক করে হাসি মুখে বলে উঠেন — “এটি বিদেশ থেকে আমদানী একটি প্রথা। এতো বরণ-মালা নয় এই রীথ মৃতকে সন্মান দেখানোর জন্য দেওয়া হয়”। এক জনের মানপত্র পাঠ শেষ হলে উপস্থিত সকলে হাততালি দিচ্ছিলেন। এ সম্বন্ধেও কবি বলেন — “কারো বক্তৃতা করার পর বা মাঝে তাঁকে উৎসাহিত করার জন্য হাততালি দেওয়া আমাদের রেওয়াজ নয়। এটিও বিদেশ থেকে নিয়েছি। হাততালি দিয়ে চিরকাল আমরা দুয়ো দিয়েছি। আমি শান্তিনিকেতনে এসব ক্ষেত্রে হাততালি দেওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছি ….।

এর পর নটা কুড়ি মিনিট থেকে দশটা পর্যন্ত কবি জনমন্ডলীর উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ভাষণ দেন। জনগণের উদ্দেশ্যে তাঁর দীর্ঘ ভাষণে বিভিন্ন বক্তব্যের মাঝে তাঁর গ্রাম বাংলার প্রতি চিরন্তন আকর্ষণের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন — “কলকাতা থেকে নির্বাসন নিয়ে এসেছি শান্তিনিকেতনে। চারিদিকে তার পল্লীর আভরনী। কিন্তু সে তার একটা বিশেষ দৃশ্য। পুকুর নদী খাল বিলের যে বাংলাদেশ এ সে নয়। এর একটা রুক্ষতা আছে, সেই শুষ্ক আবরণের মধ্যে আছে একটা মাধুর্যরস; সেখানকার মানুষ যারা সাঁওতাল, সত্যপরতায় তারা ঋজু এবং সরলতায় তারা মধুর”। বিকেলে কবি “হিলহাউসে” ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক, মুক্তবন্দী ও শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে মিলিত হন। তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং লোকশিক্ষা সম্বন্ধে সারগর্ভ বক্তৃতা করেন। লোকশিক্ষা সম্পর্কে কবি বলেন — “যাত্রাগান, বাউল সঙ্গীত, কথকতা যাতে লোপ না পেয়ে বৃদ্ধিপায় সেদিকে সকলকে মনযোগী হতে হবে। সাধারণ লোক এগুলির মাধ্যমেই সুশিক্ষা লাভ করে সভ্য নাগরিক হয়। সিনেমা থিয়েটার নগর সভ্যতার দান — আমাদের পল্লীর লোকেদের আনন্দ বর্দ্ধনে ও মানসিক উৎকর্ষসাধনে যাত্রা, কথকতা ও বাউলের দরকার আজও আছে”।

৩রা মার্চ ছিল “বাঁকুড়া শিশুমঙ্গল সমিতির” উদ্যোগে “প্রসূতি ভবনের” ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন। কবির বাঁকুড়া আগমণের এটি একটি বিশেষ উপলক্ষ। ওই দিন সকাল ৮টায় কবি মটর গাড়ীতে করে উপস্থিত হন সেখানে। কবিকে এই বয়সে অধিক পরিশ্রম হতে অব্যাহতি দেবার জন্য তাঁকে মটর গাড়ী হতে না নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কবি সকলের এই অনুরোধ এড়িয়ে জেদের সাথে গাড়ী থেকে নেমে বলেন —

“এখানে যে কয়টি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি এটিই হচ্ছে সবচেয়ে আনন্দজনক অনুষ্ঠান। আমি যদি গাড়ীতে বসে এই অনুষ্ঠানের কাজ করি তবে সেটা মাতৃজাতির প্রতি উপেক্ষাই প্রকাশ পাবে। শারীরিক ক্লান্তিতো এই বয়সে থাকবেই — কিন্তু বিবেকের কাছে আমি অপরাধী হতে চাই না।” এর পর তিনি উপনিষদের মন্ত্র উচ্চারণ করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাজ শুরু করেন। ওই দিনেই জেলার ছাত্র সমাজ “চন্ডিদাস চিত্রমন্দির”-এ কবির অভ্যর্থনার আয়োজন করেছিলেন। কবি প্রসূতি ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের কাজ শেষ করে বেলা ৯টায় সভায় উপস্থিত হন।

বাঁকুড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবিকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই বাঁকুড়ার জনগণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন — “এইতো একটা জায়গায় এলুম বাঁকুড়ায়। প্রাদেশিক শহর বটে, কিন্তু পল্লীগ্রামের চেহারা রয়েছে এর মধ্যে। সাবেক দিন যদি থাকতো এরই আঙ্গিনায় আঙ্গিনায় ঘুরে বেড়াতে পারতুম। এদেশের এক নতুন দৃশ্য, শুষ্ক নদী বর্ষায় ভরে উঠে অন্য সময় থাকে শুধু বালিতে ভরা। রাস্তার দুই ধার ছায়াময় বন পেরিয়ে এলুম ভিতর দিয়ে, দেখতে পাইনি তেমন বিশেষ কিছুই। কিন্তু এমনতর দেখা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় তো আর নেই। কেবলই চেষ্টা কি করে দৃষ্টিকে ছিনিয়ে নিতে পারে উপলক্ষ থেকে। যেন উপলক্ষটা কিছুই নয় শুধু লক্ষে পৌঁছে দেবার উপায়। কিন্তু এই উপলক্ষই তো আসল জিনিষ। এরই জন্য তো লক্ষ আনন্দে পূর্ণ হয়”।

বক্তৃতার মাঝে তিনি কবি চন্ডীদাস প্রসঙ্গে বলেন — “জীবনের পরপারবর্তী একজন কবির প্রতি এই প্রদেশের কতো বড় সম্মান ভালবাসার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে আছে এখানকার আকাশে। চন্ডীদাসের গান উৎসমুখে ছিল যে ভাষায় কালের প্রবাহে সে-ভাষায় বাংলার পরিবর্তমান বাণীকে গ্রহণ করে এসেছি। এতদিন তাকে তার ঐতিহাসিক সীমায় পায়নি। এখন ইতিহাসের প্রহরী তার তর্জনী তুলেছে। তার ফলে তিন চন্ডীদাস নয়। দুই চন্ডীদাসের উদ্ভব হয়েছে — ঐতিহাসিক তর্কক্ষেত্রর বিশেষ চন্ডীদাস এক জন, আর একজন সর্বজনের চন্ডীদাস সর্বকালের বাংলা ভাষায় তার গান আজ ধ্বনিত হচ্ছে। এই চন্ডীদাসের সঙ্গেই আমার প্রথম পরিচয় এবং সম্পূর্ণ পরিচয়। সেই চন্ডীদাস মৃত্যুর আগে সমাজে কত নিন্দা পেয়েছেন। কত অপমান সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে, কবি জনোচিত আত্মশক্তি ছিল তাঁর। যে সাধনাকে গ্রহণ করেছিলেন তাতে লোক নিন্দা পরিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে তাঁর উপর থেকে। সে নিন্দা তাঁর জীবনকে মহত্ব দিয়েছে, পরে সেই জীবন আপন সম্মান নিয়ে সুবিস্তীর্ণ হয়েছে বাংলার মধ্যে। মহাকালের হাতে সত্যকার সম্মান লাভ করেছেন তিনি মৃত্যুর পরে। এখন তো কেউ বাধা দিতে পারে না তাঁকে। যদি অদৃষ্টে থাকে চন্ডীদাসের সম্নান আমার ঘটবে — তখন জানবো না আমি থাকবো না আমি। …তোমাদের, অভিনন্দনকে আজ গ্রহণ করি, আপাতত এ জমা থাক গচ্ছিত সম্পত্তির মতো। কালের বড়ো অভিনন্দন সভায় এর যাচাই হবে। তখন তোমাদের এই বাঁকুড়াতেই চন্ডীদাসের পাশে কি আসন পাব — এই প্রশ্ন মনে নিয়ে বিদায় গ্রহণ করি”। ১৮ই ফাল্গুন ১৩৪৬।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তখন চন্ডীদাস সমস্যায় উত্তাল বাংলার “প্রবাসী” গোষ্ঠীর লেখক। চন্ডীদাসের দেশ কাল নিয়ে প্রবাসীর লেখক গোষ্ঠীর মধ্যে (১৩৪২) বিতর্কের ঘণঘটা। নীলরতন মুখোপাধ্যায় প্রমূখ কয়েকজন পন্ডিত সে সময় চন্ডীদাসের জন্মস্থান বীরভূম নানুর গ্রামে বলে দাবী করেছিলেন। ইতিপূর্বে প্রবাসীতে প্রকাশিত হেমেন্দ্রনাথ পালিতের নিজস্ব আবিস্কৃত পুঁথির ভিত্তিতে লেখা “অধ্যাপক চন্ডীদাস” (প্রবাসী মাঘ, ১৩৩৮) প্রবন্ধটি বিদ্বৎ মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। উক্ত প্রবন্ধে তিনি চন্ডীদাসকে বাঁকুড়াবাসী বলে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীকালে যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির গবেষণার মাধ্যমে তাঁর এই সিদ্ধান্ত সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি “সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায়” প্রকাশিত তাঁর “চন্ডীদাস” প্রবন্ধের একটি কপি তাঁকে পাঠিয়ে ছিলেন নিজ হাতে লিখে — “হেমেন্দ্র তোমার সংগৃহীত পুঁথি দেখতে পেয়ে এই প্রবন্ধ লিখায় সাহায্য হয়েছিল ১৮ পৃষ্ঠায় দেখ” এই মন্তব্যে শোভিত করে। রবীন্দ্রনাথ বাঁকুড়ায় এসে চন্ডীদাস গবেষণায় সিলমোহর দিয়ে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। এই কথা বলে — “তোমাদের এই বাঁকুড়াতেই চন্ডীদাসের পাশে কি আসন পাব — এই প্রশ্ন মনে নিয়ে বিদায় গ্রহণ করি”। ৩রা মার্চ রাত্রি ১১-২ মিনিটে বেঙ্গল-নাগপুর রেল যোগে কবি বাঁকুড়া থেকে বিদায় নেন।

রবীন্দ্রনাথ যেখানে যেখানে পদার্পণ করেছেন সেখানেই তাঁর স্মৃতি রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাঁকুড়ায় তাঁর স্মৃতি রক্ষার তেমন কোন ব্যবস্থা আজও হল না। কেবল, বাঁকুড়ার জেলাশাসকের বাংলোয় একটি কক্ষে কবির ব্যবহৃত চেয়ার ও বাঁকুড়া সদর হাসপাতালের বারান্দায়, “প্রসূতি ভবন”-এর প্রস্তর ফলকটি আজও রবীন্দ্রনাথের বাঁকুড়া ভ্রমণের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। অথচ বরাবরেই রবীন্দ্রনাথের এ জেলার প্রতি একটা দৃষ্টি ছিল”। একসময় (১৯১৬ সালে) বাঁকুড়ার দুর্ভিক্ষ পীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের সাহায্যার্থে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় অনুষ্ঠিত ফাল্গুনী নাটকে ‘অন্ধ বাউলের’ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এবং নাটকের সমুদয় অর্থ বাঁকুড়ার ত্রাণে ব্যয় করা হয়েছিল ।

তথ্যসূত্র :

১) শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবাসী বৈশাখ, ১৩৪৭।

২) “কবির উত্তর — বাঁকুড়ার জনসভায় অভিনন্দনের…উত্তরে কথিত”, প্রবাসী।

৩) ছবি : লেখকের সংগৃহীত।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন