ইউনানি দাওয়াইয়ের তীব্র গন্ধে বাতাস ভারি।প্রায় অন্ধকার ঘরে টিমটিমে আলোটি যেন শয্যায় শায়িত মৃতপ্রায় প্রাণের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। বৃদ্ধ হাকিম রোগীর নাড়ি দেখছেন। তার লোলচর্ম মুখে সময়ের দাগে মুছে গেছে অনুভূতির রঙ।
মাগরিবের আজান শুরু হল। হিন্দুস্তানের মোঘল বাদশা, শাহেনশাহ বাবর পশ্চিম দিকে মুখ করে নতজানু হয়ে নমাজ আদা করলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে যে মানুষটিকে কখনো ভয় ছুঁতে পারে নি, আজ তাঁর চোখে এক গভীর অসহায়তা। তিনি তাঁর প্রিয়তম পুত্র নাসিরের শয্যার পাশে বসলেন। নিঃশব্দে স্পর্শ করলেন তার কপাল। তপ্ত জ্বরের উত্তাপে ছেলেটির শরীর জ্বলছে — তার প্রতিটি নিশ্বাস যেন মৃত্যুর সঙ্গে সংগ্রাম করে চলেছে।

বাবর চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। চারদিকের টিমটিমে আলো যেন ঝাপসা হয়ে আসে চোখের জলে। হঠাৎ তিনি উঠে দাঁড়ান, দু’হাত আকাশের দিকে তোলেন। তাঁর কণ্ঠ ভেঙে যায়, তবু সেই ভাঙা কণ্ঠেই উচ্চারিত হয় এক অমর প্রার্থনা—
“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত—
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।
আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
জীর্ণ ক’রে ওকে কোথায় নেবে ?
ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”
(বাবরের প্রার্থনা, শঙ্খ ঘোষ)

প্রার্থনা শেষে তিনি ধীরে ধীরে নাসিরের শয্যার চারপাশে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন, যেন পুত্রের রোগ নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছেন। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। কেবল প্রদীপের মৃদু দপদপে আলোয় দেখা যায় — এক সম্রাট নয়, এক পিতা, যিনি নিজের জীবন সন্তানের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
রাত পেরিয়ে ভোর আসে। নাসিরুদ্দিন হুমায়ূনের জ্বরের উত্তাপ ধীরে ধীরে কমে যায়। সম্রাট বাবর দিন কয়েক পরেই শয্যাশায়ী হন — কিন্তু পুত্র বেঁচে ওঠে। ইতিহাস সাক্ষী হয়ে থাকে সেই অলৌকিক বিনিময়ের — এক পিতার প্রাণে এক পুত্রের নবজন্ম।

দিল্লির পুরানা কেল্লার অ্যাম্ফি থিয়েটারে বসে ইতিহাসের এমনি এক গল্প শোনাচ্ছিলেন আমাদের কথক ঠাকুরাণী। হেমন্তের সকালে রাজধানীর বাতাসে সেদিন দূষণের মাত্রা বিপদ সীমা পার করেছে। যদিও কেল্লার পরিসরে নির্ভয়ে ঘুরছে ময়ূর। গাছের আগায় বসে শ্যেন দৃষ্টিতে শিকার খুঁজছে চিল। শিশির ভেজা মাটি থেকে পোকা খুঁটে খাচ্ছে ময়ূরী। টিয়া পাখির দল নির্ভয়ে গল্প জুড়েছে হুমায়ূনের প্রিয় লাইব্রেরি শের মন্ডলের অলিন্দে।
পুরানা কেল্লার হেরিটেজ ওয়াকে সেদিন আমাদের দলে পুনে আর নাসিকের দুজন আর্কিটেকচারের ছাত্র, দুই বান্ধবী, বাবা-মেয়ে, সকন্যা মা, দুজন উকিল, “আমি একটু একটু বাংলা বলতে পারি” বলা স্প্যানিশ ভাষার শিক্ষিকা আরোজা। ইনি দুবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। কোলকাতায় ঘুরে এসেছেন।এখন দিল্লিতে স্প্যানিশ শেখান। এছাড়াও আমি এবং আরো কয়েকজন।

পুরানা কেল্লার ভগ্নপ্রাচীরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাদের দাস্তান গো (গল্প বলিয়ে) লেহের জায়দি বললেন, দিল্লিতে কোনো গর্বিত রাজমহল আজ আর সময়ের সাক্ষী দিতে বেঁচে নেই। যা আছে শুধু কেল্লার প্রাচীর। এ যেন দিল্লির এক অভিশাপ। আমার রবীন্দ্রনাথ মনে পড়ল,
“কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে
সুদীর্ঘ অতীতে
জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে।
এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল,
এসেছে মোগল;
বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল,উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।”

প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখান থেকে খুঁজে পেয়েছেন খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মানুষের বসবাসের নিদর্শন। তবে কি এখানেই ছিল বিশ্বকর্মা নির্মিত পান্ডবদের স্বপ্ননগরী রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ! ময়দানবের তৈরি দ্রৌপদীর সাধের মায়াপ্রাসাদ! স্ফটিকের তৈরি নকল জলাশয়ে মিশে ছিল দ্রৌপদীর অহংকার আর দুর্যোধনের ঈর্ষা! কোন ভগ্নস্তুপের ওপরে গড়ে উঠেছিল মোঘলদের নতুন রাজধানী!
সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর লাডলা বেটা নাসির উদ্দিন হুমায়ূন বাদশাহের তখতে বসে এখানেই নতুন এক শহরের পত্তন করলেন। যমুনা তীরে, দিল্লির উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে কেল্লার প্রাচীর ঘিরে তৈরি হল হুমায়ূনের ‘দীন পনাহ্’ বা ‘বিশ্বাসের আশ্রয়’।

বাবরের সৌন্দর্যপ্রিয়তা, কাব্যপ্রীতি, জ্ঞানতৃষ্ণা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন পুত্র হুমায়ূন। যুদ্ধযাত্রাতেও তাঁর সঙ্গে থাকত উটের পিঠে রাখা বইয়ের বোঝা। হুমায়ুনের বেগম, আকবরের আম্মীজান হামিদা বানু ছিলেন পারস্যের শিয়া মুসলিম পরিবারের। তিনি তুলসী দাসের দোহা রামায়ণ পড়তেন ফার্সি অনুবাদে।
আশ্চর্যজনক ভাবে হুমায়ূনের প্রতিদ্বন্দ্বী শেরশাহ্ও ছিলেন প্রবল বিদ্যানুরাগী, কবি। তবে হুমায়ুনের মত তাঁর কপালে পিতৃস্নেহ জোটে নি। জায়গিরদার পিতা, সৎ মায়ের সংস্রব ছেড়ে ভাগ্যান্বেষণে তিনি বিহার থেকে এসে বাবরের সামরিক বাহিনীতে যোগ দিলেন। আফগান যুবক ফরিদ খান তখনো বাঘ মেরে শের শাহ্ উপাধি পান নি। একবার বাদশার সঙ্গে দাওয়াতে বসে অন্যদের মত জি হুজুর, জো হুজুর বলে তরুণ ফরিদ সময় নষ্ট করলেন না। একপেট খিদে নিয়ে নিজের খঞ্জর দিয়েই তন্দুরী গোস্ত কেটেকুটে খেতে শুরু করে দিলেন। বাদশা ফরিদের এই গোস্তাকি মাফ করে দিলেও তাঁর জহুরির চোখ তাকে নিরীক্ষণ করেছিল। মোঘলদের হয়ে যুদ্ধ করার সময়ই হয়তো সাসারামের এই জায়গিরদারের ছেলে দিল্লির সিংহাসনে বসার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

এর পরের ইতিহাস সবার জানা। উচ্চাভিলাসী তরুণ শেরশাহ শক্তি সঞ্চয় করে হুমায়ূনকে চৌসা ও কনৌজের যুদ্ধে হারিয়ে দিল্লি কব্জা করলেন। নির্বাসিত হুমায়ূনের সাধের দীন পনাহতে প্রতিষ্ঠা করলেন সূরী বংশের নতুন রাজধানী। নাম হল তার শেরগঢ়। কেল্লার ভিতরে নতুন সম্রাট তৈরি করালেন ইন্দোইসলামিক স্থাপত্য শৈলীতে কিলা-ই-কুনা মসজিদ। পাঁচ বছরের রাজত্বকালের পর আবার পাশা উল্টোল। শের শাহ মারা গেলেন বুন্দেলখন্ডের কালিঞ্জর দুর্গে বারুদ বিস্ফোরণে। পুরানা কেল্লায় পুরনো লোক অর্থাৎ হুমায়ূন আবার ফিরে এলেন। তবে মাত্র দু-মাস ছিল এ আনন্দ যাপন। ইতিহাস জানায় তাঁর সাধের অষ্টকোণা লাইব্রেরি ‘শের মন্ডলে’র সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট লেগেই মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু। পুরানা কেল্লার ইতিহাসের অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি। এরপর চিরকালের জন্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কেল্লার উত্তর দিকের দ্বার। বিজয় অভিযান শেষে আর কোনো সম্রাট উত্তরের ঐ তালাকী দরওয়াজা দিয়ে সসম্মানে দুর্গে ফিরে আসেন নি ।

এখন পুরানা কেল্লার পাশ দিয়ে সময়ের রথে বেঁধে ছুটে চলে দুরন্ত শহর।
সূর্য ডুবে গেলে ছায়া লম্বা হয়,
হুমায়ুনের দীনপনাহ্, শের শাহের শেরগঢ় আঁধারের হিজাব পরে।
এক মুহূর্ত, শুধু এক টলমলে মুহূর্ত।
ইতিহাস থমকে গেছিল সেদিন।
রাজমুকুট খসে পড়েছিল মাটিতে।
সেই লাইব্রেরির দেয়াল জুড়ে আজও
একটা নরম ছায়া ফিসফিস করে বলে,
“ধ্বসে পড়া রাজত্বের ধ্বংসস্রোতেও জ্ঞান বয়ে চলে নিরবধি! তার বিনাশ নেই।”

ইতিহাসের পথে পথে। খুব সুন্দর লেখা।
অনবদ্য , জানতাম না ফরিদের গোস্ত খাওয়ার ঘটনাটি, তোমার লেখাটি ভারী নিখুঁত আর সুন্দর গো
অনেক কিছু জানলাম। অনেকটাই জানা ছিলনা। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
কি সুন্দর । খুব ভালো লাগলো রে