ছট পুজো কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত উত্তর ভারতের অন্যতম প্রাচীন, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের ব্রত উৎসব। ছট পূজা মূলত সংসারের শ্রীবৃদ্ধি এবং মঙ্গল কামনায় সূর্যদেব এবং ছঠি মাইয়ার (দেবী ষষ্ঠী) আরাধনা করা হয়। উৎসবটি মূলত বিহার, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশের হলেও বর্তমানে আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
এই বছর ছট পুজো ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ থেকে শুরু হবে এবং ২৮ অক্টোবর, ২০২৫-এ শেষ হবে।
২৫ অক্টোবর প্রথম দিন স্নান (নাহায়-খায়), দ্বিতীয় দিন খরনা, তৃতীয় দিন সন্ধ্যা অর্ঘ্য অর্থাৎ জলে দাঁড়িয়ে উপাসনা করার পর অস্তমিত সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া এবং চতুর্থ দিন (২৮ অক্টোবর) ঊষা অর্ঘ্যের মধ্যে দিয়ে পালিত হবে সূর্য উপাসনার এই মহোৎসব।এই উৎসব আমাদের শেখায় — জীবন যতই কঠিন হোক, কৃতজ্ঞতা ও সংযমই হল আসল পূজা।

ছট পুজোর বিশেষ আকর্ষণ হল এর ভোগ বা প্রসাদ, যা সম্পূর্ণ নিরামিষ এবং ঘরে তৈরি বিশুদ্ধ । ভোগ তৈরি করা হয় মাটি বা পিতলের পাত্রে মাটির নতুন উনুনে আম কাঠে। এই ভোগ তৈরিতে কোনও রকম রসুন-পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয় না। এটি শরীর ও মনকে পবিত্র রাখার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ভোগ তৈরির সময় ব্রতীরা স্নান করে নতুন পোশাক পরেন। ভোগ তৈরি করার সময় বাড়িতে সুরেলা ছট গীত গাওয়া হয় — ‘কাঁহে দেলু দূর ভবন, উষা মে লেলু আরঘ।’ বিশ্বাস করা হয়, যদি ভোগ বিশুদ্ধ মনে ও হাতে তৈরি হয়, সূর্যদেব ও ছটি মাই তাতে বিশেষ কৃপা বর্ষণ করেন। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও ছট পূজার উপবাস পালন করে থাকেন।
অত্যন্ত যত্ন এবং নিষ্ঠার সাথে তৈরি এই প্রসাদগুলি কেবল নৈবেদ্যই নয় বরং পরিবার এবং সম্প্রদায়কে একত্রিত করে উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছট উৎসবের প্রসাদ মানেই ছোট-বড় সকলের প্রিয় ঠেকুয়া। তবে শুধু ঠেকুয়াই নয়, এই শুভ উপলক্ষে প্রস্তুত করা হয় কিছু সাবেকি রান্নাও। চার দিনের পুজোয় প্রত্যেক দিনে আলাদা করে খাবার বানানো হয়।তারই এক ঝলক এখানে দেওয়া হল :

নাহায় খায় (স্নান ও খাওয়া)
পুজোর প্রথম দিনে ভক্তদের পবিত্র নদীতে স্নান করতে হয় এবং নিজেদের জন্য উপযুক্ত খাবার রান্না করতে হয়। এই দিনে নুন ছাড়া চানা ডাল, লাউ ও ছোলা শাকের সাথে ভাত খাওয়া হয়। মাটির পাত্রে ঘি দিয়ে লাউয়ের সবজি বানানো হয়। এটি বানানোর সময়ে শুধুমাত্র গঙ্গাজল ব্যবহার করা হয়। চানা ডাল তৈরি করার জন্য প্রথমে ঘিয়ের মধ্যে গোটা জিরে, শুকনো লঙ্কা, ধনে গুঁড়ো ফোড়ন দিয়ে তাতে আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা ডাল দিয়ে বানানো হয়।
ব্রতীর খাওয়া এঁটো খাবারই প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে পরিবারের বাকি সদস্যরা। ছট পুজোর সময় আটার তৈরি অনেক রকমের খাবার বানানো হয়। খাবার বানানোর জন্য ব্যবহৃত গম ঘরে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়। শুকোনোর সময় লক্ষ্য করা হয় বিশুদ্ধ গমের ওপর যেন ধুলো ময়লা বা পাখির মলমূত্র না পড়ে।

খারনা : দ্বিতীয় দিনে ব্রতিকে পুরো দিন ধরে নির্জলা থাকতে হয় এবং সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পর উপবাস ভাঙতে পারবেন। উপবাসে থাকাকালীন তাকে বাড়ির সকল সদস্যের জন্য খাবার তৈরি করতে হয়। এই দিন তিনি তাসমাই (ক্ষীর যেটি দুধ চিনি আর চাল দিয়ে বানানো) ও রুটি তৈরি করে। সন্ধ্যার সময় তৈরি রান্না কুলদেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে কলাপাতায় পরিবেশিত করা হয়। এটি তার রাতের আহার এবং ব্রতের নিয়ম অনুযায়ী তারা আহারের অংশই পরিবারে সদস্যরা প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে।
সন্ধ্যা অর্ঘ্য : তৃতীয় দিনটি বাড়িতে প্রসাদ তৈরি করে কাটানো হয় এবং তারপর সন্ধ্যায় ব্রতী পুরো পরিবারের সঙ্গে নদীর তীরে যায়, যেখানে তারা অস্তগামী সূর্যের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গ করে। চালের গুঁড়ো কিম্বা আটার সঙ্গে গুড়, ঘি এবং মৌরি মিশিয়ে এক বিশেষ লাড্ডু বানানো হয়, যাকে বলে কাসার। সন্ধ্যা অর্ঘ্য হিসাবে এটি নিবেদন করা হয়। মহিলারা সাধারণত নৈবেদ্য উৎসর্গ করার সময় হলুদ রঙের শাড়ি পরেন। লোকসঙ্গীতের মূর্ছনায় সন্ধ্যা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।

উষা অর্ঘ্য : শেষ দিনে সমস্ত ভক্তরা সূর্যোদয়ের আগে নদীর তীরে যান উদীয়মান সূর্যকে অর্ঘ্য দিতে। এই উৎসব শেষ হয় যখন ব্রতীরা তাদের ৩৬ ঘন্টার উপবাস (যাকে পরাণ বলা হয়) ভেঙে ফেলে এবং আত্মীয়স্বজনরা তাদের বাড়িতে প্রসাদের ভাগ নিতে আসে। এদিন চাল এবং গুড় দিয়ে বানানো হয় রাসিয়া। এই সুস্বাদু পায়েসটি গরম পুরির সঙ্গে ভোরবেলায় সূর্যদেবকে নিবেদন করা হয়।
ছট পুজোর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রতীকী প্রসাদ হল ঠেকুয়া। এই মিষ্টি, মুচমুচে খাবারটি গমের আটা, গুড় এবং ঘি দিয়ে তৈরি করা হয় এবং প্রায়শই স্বাদ বাড়ানোর জন্য এলাচ এবং নারকেল দেওয়া হয়। প্রতিটি ঠেকুয়া সূর্যদেব ও ছটি মাইয়াকে ধন্যবাদ জানানোর একেকটি রূপ।
ছট পুজোর ডালাতে থাকে হলুদ গাছ, আম্রপল্লব, বিভিন্ন ফল, ঠেকুয়া ও খাস্তা টিকরি। ছট পুজোর প্রসাদি ফলের অন্যতম হলো কলা, আখ, লেবু, নারকেল, পেঁপে, এবং ডাব। এই ফলগুলি প্রসাদ হিসেবে ছটী মাইয়াকে উৎসর্গ করা হয় এবং পুজো শেষে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

নারকেল : এটি ছট পুজোর ঝুড়ির একটি অপরিহার্য উপাদান, যা সাধারণত ‘ওম’ এবং ‘স্বস্তিকা’ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
আখ : আখ ছট পুজোর একটি অপরিহার্য অঙ্গ। ছট পুজোর সময় এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আখ মিষ্টি এবং জীবনীশক্তির প্রতীক, এটি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। তাই এই পুজোয় এই ফলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
কমলালেবু : ছট পুজোয় কমলালেবু বা বাতাবিলেবু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সতেজ স্বাদ এবং ভিটামিন সি এর প্রাচুর্য এটিকে বিশেষ করে তোলে। পুজোয় লেবু নিবেদন শুধুমাত্র স্বাস্থ্য উপকারী নয়, এটি ইতিবাচক শক্তির প্রতীকও।
ডাব : এটিও পূজার একটি পবিত্র উপকরণ।
পেঁপে : ছট পুজোয় পেঁপে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল।

ছট পূজার সময় খাবার
আপেলও ছট পূজায় ব্যবহার করা হয়, এই ফলটি বিশেষভাবে তার স্বাদ ও স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য পরিচিত, যার মধ্যে রয়েছে পূজায় এটি পূজার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং ভাগ্য আকর্ষণে সাহায্য করে।
কলা : সমৃদ্ধি ও সুখের প্রতীক হিসেবে ছট পুজোয় কলা নিবেদন করা শুভ। পুজোয় কলা প্রদানের পাশাপাশি এটিকে প্রসাদ হিসেবেও বিতরণ করা হয়। এর সতেজতা এবং মিষ্টতা উৎসবটিকে বিশেষ করে তোলে।
পানিফল : হাইড্রেটিং, কম ক্যালরিযুক্ত এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ, হজমের সাহায্যকারী ফল যেটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সাহায্য করে। এটি ছট পুজোর প্রসাদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সুপারি : সুপারি ছাড়া যে কোনও পূজা অসম্পূর্ণ। সুপারি মা লক্ষ্মীর প্রিয় ফল। বিশ্বাস করা হয় সুপারি করে ঘরে প্রবেশ করেন মা লক্ষ্মী।
একটা সময় এই পুজোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম,তাই নতুন করে পড়ে ভালো লাগলো।
লেখা খুবই সুন্দর হয়েছে। কিছু ছাত্র এই পূজার আয়োজন করে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূজা বলে মনে হয়।
নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়।
কিন্ত ডিজে গান গেয়ে কি উপকার হয়, জানতে ইচ্ছে হয়।
শব্দের তাণ্ডবে সমস্ত পূজার গরিমা বারে কি?