এবার আলুর ফলন পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় আলুর ধ্বসা বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত না হওয়ায় ফলন ভালো হওয়ার অন্যতম কারণ বলে চাষিদের অভিমত। কিন্তু চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দাম নিয়ে। সরকার না ভাবলে চাষিরা দেনার দায়ে ডুববে। এদিকে চাষিদের কথা ভেবে আলুর কালোবাজারি রুখতে এখন থেকেই তৎপর সরকার। পাশাপাশি ছোটো ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করল সরকার। আগামী দিনে মানুষ যাতে ন্যায্য মূল্যে আলু কিনতে পারে, সেদিকেও নজর দিচ্ছে সরকার। তাছাড়া কৃষকদের যাতে আর্থিক ক্ষতি না হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, গত বছরের মতো এবারও রাজ্যের হিমঘরগুলিতে ছোটো ও প্রান্তিক চাষিরা তাঁদের উৎপাদিত আলু যাতে হিমঘরের ৩০ শতাংশে রাখতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গত বছর ১৪৬ লক্ষ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছিল রাজ্যে।
আলুর দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় একাধিক কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছিল রাজ্যের তরফে। এবার আর অকারণে আলুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দিতে চাইছে না রাজ্য। তাই এখন থেকেই এনিয়ে তৎপর হচ্ছে রাজ্য সরকার। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি বৈঠক হয়েছে নবান্নে। এ বছরও আলুর ফলন ভালো হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ফড়েদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে ছোটো ও প্রান্তিক চাষিরা যাতে সরাসরি তাঁদের উৎপাদিত ফসল হিমঘরে রাখতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করছে রাজ্য। এবছরও একজন কৃষক সর্বাধিক ৩৫ কুইন্টাল বা ৭০ বস্তা আলু রাখতে পারবেন হিমঘরে। সম্পূর্ণ বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকছে জেলাশাসকদের উপর। এদিকে খানাকুলে আলুর ন্যায্যমূল্যের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে বিজেপির বিক্ষোভ প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায়। চাষিদের সরকারের কাছে একটাই দাবি ন্যায্য মূল্যে আলু কিনতে হবে।

তৃণমূলের হুগলি জেলা পরিষদের সদস্য সাহানা সুলতানা বলেন, এ রাজ্যের উন্নয়ন হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে সারের দাম বাড়িয়ে চলেছে,তাতে চাষিরা লোকসানে পড়েছেন। আমাদের সরকার চাষিদের কথা ভেবে বেশ কিছু প্রকল্পচালু করেছে। যা চাষিদের কাছে বাঁচার রসদ জুগিয়েছে। ছোটো ও প্রান্তিক চাষিদের আলু হিমঘরে রাখতে যাতে সমস্যা না হয়, তার জন্য ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে রাজ্য সরকার। হিমঘরগুলিতে ৩০ শতাংশ জায়গা ছোটো ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিজ্ঞপ্তিও জারি হয়েছে। এই সংরক্ষিত অংশে আলু রাখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবে প্রশাসন। জেলাশাসকের হাতে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিডিও, পঞ্চায়েত অফিসের মাধ্যমে তা রূপায়িত হবে। কিষান ক্রেডিট কার্ড, কৃষকবন্ধু প্রকল্প ও সরকারি শস্য বিমা প্রকল্পের কাগজ দেখিয়ে সংরক্ষিত জায়গায় আলু রাখতে পারবেন ছোটো চাষিরা। হিমঘর মালিক ও আলু ব্যবসায়ী সংগঠনের সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যে যে ৫০০-র বেশি হিমঘর আছে, সেখানে চেপেচুপে প্রায় ৮০ লক্ষ টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। গত বছর ৭৩ লক্ষ টন আলু সংরক্ষিত হয়েছিল হিমঘরে। এবার এখনও পর্যন্ত যা পরিস্থিতি, তাতে এর থেকেও বেশি আলু মজুত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন চাষিরা নতুন আলু বিক্রি করে প্রতি কেজিতে ৪-৫ টাকা দাম পাচ্ছেন। এই দাম লাভজনক নয় বলে ব্যবসায়ী মহলও মনে করছে।
১ মার্চ থেকে হিমঘর খোলার পর সেই আলুর দাম কত হয়, সেদিকে নজর রয়েছে সব মহলের। চাষিদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারা কতটা সস্তায় আলু পাচ্ছেন, সেদিকে নজর রাখছে সরকার। প্রচুর ফলন হওয়ার জন্য এবার সরকার ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করে কিছু আলু কিনলে ভালো হয় বলে মনে করছেন চাষিরা। কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্যে ভোট। তাই এবার চাষিরা ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছে। তাছাড়া সরকারের হাতে কিছু পরিমাণে আলু থাকলে তা আগামী দিনে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজ্যে এবার আলুর ফলন এক কোটি টনের অনেকটা বেশি হতে পারে বলে সরকারি তরফে মনে করা হচ্ছে। নতুন আলুর একটা বড় অংশ সরাসরি বাজারে চলে আসে। জানুয়ারি থেকে তা শুরু হয়েছে। আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত মাঠ থেকে ওঠা নতুন আলু বাজারে আসবে। সাধারণত মে মাস থেকে হিমঘরের আলু বের হয়। প্রতি মাসে রাজ্যের ও প্রতিবেশী রাজ্যগুলির চাহিদা মেটাতে ৫-৬ লক্ষ টন মতো আলু প্রয়োজন হয় বলে জানিয়েছেন প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির নেতা লালু মুখোপাধ্যায়। এপ্রিল পর্যন্ত এভাবে অন্তত ২০-২৫ লক্ষ টন আলু চলে যাবে। যে পরিমাণ আলু অবশিষ্ট থাকবে, তা হিমঘরে রাখার জন্যই ‘প্রতিযোগিতা’ হবে। ব্যবসায়ীরা যাতে চাষির কাছ থেকে সস্তায় আলু কিনে তা হিমঘরে মজুত রেখে একচেটিয়া কারবার না চালাতে পারেন, তারা ভালো জন্যই এই ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ বলে জানা গেছে।