শুরু হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের প্রায় তিন শতকের বেশি প্রাচীন পঁচেট গড়ের ঐতিহাসিক রাস উৎসব। এই রাস উৎসবকে ঘিরে উৎসবে মেতে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর এলাকার মানুষজন। পঁচেটগড় রাজবাড়িও এখন রাস উৎসবের রঙে রঙিন। রাজবাড়ির কুলদেবতা কিশোররায় জিউ ও অন্যান্য বিগ্রহের শোভাযাত্রা দেখতে ও মেলায় প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।

ইতিহাসের চুপকথা জানান দেয়, পঁচেট গড়ের জমিদার পরিবারের পূর্ব পুরুষ কালামুরারি দাস মহাপাত্র ওড়িশার পুরী জেলার রথীগ্রাম থেকে পটাশপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। কালামুরারী দাস মহাপাত্র ছিলেন আকবর বাদশাহের রাজ কর্মচারী এবং ওড়িশার রাজা মুকুন্দদেবের সহযোগী। গৌড়ের রাজা সুলেমান কারনানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের পর বাদশাহের কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে তিনি পটাশপুর পরগনায় ভূমি পান ও সেখানেই বসতি ও জমিদারি স্থাপন করেন। পরে বাংলার নবাবের কাছ থেকে চৌধুরী পদবী প্রাপ্ত হন। ১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় মারাঠা যুদ্ধের শেষে পটাশপুর পরগনা মারাঠাদের হাত থেকে কোম্পানির অধীনে এলে পঁচেটগড়ের রেনুকা দেবী চৌধুরাণীকে ইংরেজ সরকার পঁচেট গড় জমিদারি প্রদান করেন। রেনুকা দেবী ও তাঁর স্বামী ব্রজকিশোর চৌধুরীর কোন সন্তান না থাকায় গোপেন্দ্র নন্দনকে তাঁরা দত্তক নেন। পরবর্তীকালে তিনিই পঁচেটগড় রাজবাড়ি ও পঞ্চেশ্বর মন্দির নির্মাণ করেন।

শ্রীচৈতন্যদেব নীলাচলে গমনের পথে পঁচেটগড় পরগনা অতিক্রম করেন, তখন শৈব ধর্মাম্বলী পঁচেটগড়ের রাজ পরিবার শৈব ধর্ম থেকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেয়। এরপর থেকেই কিশোর রায় জিউকে কুলদেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সময় থেকেই শুরু হয় পঁচেটগড় রাজবাড়ির রাস উৎসব, যা আজও একই ঐতিহ্যে পালিত হয়ে আসছে। রাস উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ প্রতিদিন সন্ধ্যায় কিশোর রায় জিউ ও কুড়িজন বিগ্রহের শোভাযাত্রা। রাজবাড়ি থেকে শুরু করে রাসমঞ্চ পর্যন্ত চলে এই ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা। রাতের দিকে দেবতারা পুনরায় ফিরে আসেন রাজবাড়ির মূল মন্দিরে।

রাস উৎসবকে ঘিরে প্রতিবছরের মত রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় বসেছে বিশাল মেলা। আলোকসজ্জা, সার্কাস, টোরাটোরা, ট্রয় ট্রেন ও নানা প্রসাধন সামগ্রীর দোকান পাট। প্রতিদিন ভোররাত পর্যন্ত চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

রাস উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ‘দধি উৎসব’। দধি উৎসবের দিন ভোররাত থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজবাড়ির কুলদেবতা কিশোর রায় জিউ ও সমস্ত বিগ্রহ রাসমঞ্চে অবস্থান করেন।

রাজ্যের হেরিটেজ কমিশনের হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া পঁচেটগড় রাজবাড়ির ভেতরে হোমস্টে-র সুবিধা থাকায় বিদেশি পর্যটকরাও প্রতিবছর রাস উৎসব দেখতে পঁচেটগড়ে আসেন। রাস উৎসবের দর্শনার্থীদের জন্য রাস উৎসবের সময় রাজবাড়ির সংগ্রহশালাও খুলে দেওয়া হয়।

পঁচেট গড় রাজবাড়ির বর্তমান প্রজন্মের এক সদস্যের কথায় পঁচেটগড়ের রাস উৎসব শুধু ধর্মীয় নয়, এটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতীক। পাঁচশো বছরের বেশি সময় ধরে সেই ঐতিহ্য আর ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পঁচেটগড়ের রাস উৎসবের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে পঁচেটগড় রাজবাড়ির বর্তমান প্রজন্ম।
অপূর্ব লেখা। অনেক না জানা জিনিস জানলাম।
অনেক ধন্যবাদ সুব্রত বাবু।
অতি মনোহর । রাধে রাধে।