“শাকের সঙ্গে কাঁচালঙ্কা,ডালের সঙ্গে ঘি।
মাংসেতে দাও আদা আর মেয়ের সঙ্গে ঝি”
ছোটোবেলায় আমাদের রান্নাঘরে ঝাল ঝোল তরকারির সুগন্ধের সঙ্গে তাল দিত মীরার মায়ের ছড়া।তার একগলা ঘোমটার আড়াল থেকে মৃদুস্বরে শোনা যেত ছড়ায় মোড়া রান্নার উপকরণের গুণাগুণ।
উচ্ছের কচি,
পটলের বীচি
শাকের ছা,
মাছের মা
শাকের মধ্যে পুঁই
মাছের সেরা রুই
কচি পাঁঠা
পাকা মেষ
দইয়ের আগা
ঘোলের শেষ।
গ্রাম্য জীবনে আনন্দের উপকরণ কম। তাই সেকালের সেই শ্যামলবরণ গাঁয়ের মেয়েটি শব্দের ছোট ছোট ঢেউ তুলে রান্নাঘরের চার দেয়ালের একঘেয়েমিকে ভেঙে দিত।
ভাষাবিদ সুকুমার সেন বলেছেন, নারীরা শব্দভাণ্ডার নাকি পুরুষের থেকে আলাদা ছিল। ভাগ্যিস আলাদা ছিল,তাই তো আমরা এমন রান্নাঘরের ছড়া, ‘তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা’, ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’, ‘কথায় কথায় ফোড়ন কাটা’র মত প্রবাদবাক্য পেয়েছি! মাতৃহদয়ের স্নেহধারায় বিকশিত হয়েছে ছেলে ভুলোনো ছড়া। আমার পিসিমার ‘নন্দিনীর মাকে উপহার’ দেওয়া ছেলে ভুলোনো ছড়ার বইয়ে পড়ি দারুণ সুন্দর সব মেয়েলি ছড়া। মা হয়ত তার কোলের বাছাকে এভাবেই প্রথম গুনতে শিখিয়ে ছিল!
চাক্কু লাটা পানের বাটা
চাক্কু দুই তুলে থুই
চাক্কু তিন ঘোড়ার ডিম
চাক্কু চার পগার পার
চাক্কু পাঁচ ধিন তা নাচ
চাক্কু ছয় খুকুর জয়।
চাক্কু সাত কুপোকাত
চাক্কু আট গড়ের মাঠ
চাক্কু নয় বাঘের ভয়
চাক্কু দশ খেজুর রস।
মা ছেলেকে গুনতে শেখাতে শেখাতে অজান্তেই কখন আবার নিজের দুঃখগুলোকেও ছন্দে গেঁথে ফেলত।
সংখ্যার হিসেবের ফাঁকে ফাঁকেই জীবনের অগণিত অভাবের কথাও মৃদুস্বরে উচ্চারিত হত।
ডালিম গাছে পিরভু নাচে
টাক ডুমাডুম বাদ্যি বাজে
আই মা চিনতে পারো?
গোটা দুই অন্ন বাড়ো
অন্নপূর্ণা দুধের সর,
কাল যাব গো পরের ঘর।
পরের বেটা মারল চড়,
কাঁদতে কাঁদতে খুড়োর ঘর।
তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন সব মেয়ের ভাষা তো মহাভারতের সুভদ্রার মত স্নিগ্ধছায়া, শান্তির প্রলেপ দেয় না। কারোর বাক্য দাউদাউ জ্বলা তেলের কড়াইয়ে লঙ্কা ফোড়নের মত। যেমনটি ছিল দ্রৌপদীর ভাষা। তীক্ষ্ণ, দীপ্ত ও দহনময়। এর কারণ দীর্ঘ সময় ধরে মেয়েদের অত্যাচার, অবিচার, অপমান আর বঞ্চনার জীবন।
মেয়েদের ব্রতকথা জুড়ে তাই তো তাদের দুঃখের বারোমাস্যা। সংসারের দারিদ্র্য কষ্ট, অবহেলা,অপেক্ষার প্রতিফলন।
“অশ্বত্থ তলায় বাস করি,
সতীন কেটে আলতা পরি !”
সেই শত দুঃখের মাঝেও আশা,সংসারের মঙ্গলকামনা, সন্তানের কল্যাণ, সুখের প্রার্থনা গেয়েছে মেয়েরা।বসুধারা ব্রতে মেয়েরা প্রার্থনা করেছে,
“গঙ্গা গঙ্গা ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ বাসুকি
তিন কুল ভরে দাও ধনে জনে সুখি”
ব্রতকথার ভাষায় শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এগুলির মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, নারীর অবস্থান, পারিবারিক সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সংস্কারের বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখি।
আমার ঠাকুমা সুন্দর হবার জন্যে নখছুট ব্রত করেছিলেন।
“পাট গাছটির মত চুল হবে
দুধে আলতা বন্ন হবে
ঘেঁচকড়ির গতর হবে
বাঁশির মত নাক হবে
ছোট ছোট পা হবে
চাঁদপানা মুখ হবে।”
আমরা এখন বিজ্ঞাপনের চমকলাগা প্রোডাক্টের ছলনায় ভুলি।সেকালের মেয়েরা সৌন্দর্যের প্রার্থনা করত। একমাস নখ না কাটার পর নাপতিনীর ডাক পড়ত। তারা সিধে-অর্থ পেয়ে খুশি হত। সমাজ-সংসার আবর্তিত হত এই নিয়মেই।
শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে মেয়েলি ব্রতের গান ছিল প্রকৃতির রঙে রঞ্জিত এক অপূর্ব আলেখ্য। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরত-বসন্তের ফুলপাতা, আকাশ-বাতাসের মাধুর্য মিলেমিশে ষড় ঋতুর উৎসব। চৈত্রের অশথপাতার ব্রতে মেয়েদের ছড়ায় প্রকৃতির ছবি; বসন্তের বাতাস লেগে গত শীতের শুকনো পাতা গাছের তলায় ঝরে পড়েছে। নদীর ধারে অশথ, কুঞ্জলতা, চাঁপা সুন্দরী আর শ্যাম পন্ডিতের ঝি — কেউ পাকা পাতার তামাটে লাল, কেউ কাঁচা পাতার সতেজ সোনালী সবুজ।কচি পাতার কোমল শ্যামের সঙ্গে শুকনো পাতার তপ্ত সোনা। কেউবা ঝরা পাতার পান্ডুর রঙে সেজেছে। অশথ পাতা, কুঞ্জলতা, চমকাসুন্দরীর সঙ্গে সেজেগুজে ব্রত করতে বেরিয়েছেন শ্যাম পন্ডিতের মেয়ে! ব্রতের ছড়া কাটতে কাটতে অজান্তেই মেয়েদের মুখে ফুটে উঠেছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্বের আভাস! দৈনন্দিন জীবনের সহজ উচ্চারণেই গোপনে জেগে থাকত অনুভূতির কোমল ছন্দ।
মেয়েদের ব্রতকথা, মায়েদের হেঁশেলের প্রবাদবাক্য, ঘুমপাড়ানি ছড়া এখন ইতিহাস। বদলেছে মেয়েদের ভাষাও। বলাবাহুল্য শিক্ষিতা, কর্মরতাদের ভাষার সঙ্গে পুরুষের ভাষার আর বিশেষ পার্থক্য নেই। তবে একজন লেখিকার ভাষার সঙ্গে মহিলা প্রোমোটারের ভাষার নিশ্চয়ই ফারাক আছে। অথবা করপোরেট সেক্টরে কাজ করা আমার মেয়ের সঙ্গে আমাদের অষ্টমীর। অষ্টমী যখন বলে আম ঠাকুরের পুজোয় অচনা ব্যানার্জির গান বাজছিল, আমি তাকে শুধরে দিই না। তার এই ভুলটুকু আমার কানে বড় মিঠে লাগে। সে কখনো গদগদ হয়ে জানায়, “বৌদি গো, আমি তোমায় খুব ভালোবাসি! নিজের দিদির থেকেও বেশি!” আমার সন্দিগ্ধ মন বলে, এই রে আবার বুঝি মাইনে বাড়াতে বলবে! আমার নীল রঙের শালোয়ার কামিজটা না চেয়ে বসে! তবে একই সঙ্গে নদে জেলার এই মেয়েটির মিষ্টি ভাষার আন্তরিকতাও বড় উপভোগ করি!
এই ধরণের লেখা আরও হলে ভাল হয়।
ধন্যবাদ। অবশ্যই চেষ্টা করব 🙏