পশ্চিমবঙ্গে যত দেবদেবীর মন্দির আছে তার মধ্যে দেবী কালিকার মন্দিরই সবচেয়ে বেশি। ভিন্ন নামে ভিন্ন রূপে তিনি বিভিন্ন শক্তি মন্দিরের অধিষ্ঠিতা। কালি স্বরূপত এক। সাধকের অভীষ্ট অনুসারেই তার বিভিন্ন নাম ও রূপের কথা শাস্ত্রে নির্দিষ্ট রয়েছে। তাই তাঁর পূজার ভিন্ন ভিন্ন নাম হলেও তিনি কিন্তু একই। তন্ত্র শাস্ত্রেও কালীর বিভিন্ন রূপের কথা বলা হয়েছে। মহানির্বাণ তন্ত্রে বলা হয়েছে কালমাতা মহাপ্রভাময়ী অরূপা কালিকার রূপকল্পনা হয় গুনক্রিয়ানুসারে।
আজ বলবো উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার সাপকালী পূজার কথা যেখানে শত শত বছর ধরে অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নিত্য পূজা হয়ে আসছে মহা আড়ম্বরে। সেখানে তিনি জাগ্রতা এবং তার দর্শনে অচিরেই ফলপ্রাপ্ত হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
জলপাইগুড়ি জেলার “ডুয়ার্সের প্রবেশদ্বার” ময়নাগুড়ির ব্যাঙকান্দি গ্রামে সম্পূর্ণ এক রহস্যবৃত্তের আড়ালে রয়েছেন পেটকাটি কালীমূর্তি বা পেটকাটি মাও। ময়নাগুড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে সামান্য কিছু পথ হাঁটলেই পরে এই গ্রাম। জর্দা নদীর পাড় হয়ে এই গ্রামে যেতে হয়। মাটি খনন করার সময় স্থানীয়রাই রহস্যময় এই দেবী মূর্তি পান। কথিত রয়েছে, মাটি খুঁড়তে গিয়ে কোদালের আঘাতের মূর্তির পেট কেটে গিয়েছিল, সেই থেকেই এই নাম।

পেটকাটি কালীমূর্তি বা পেটকাটি মাও
প্রায় সাত ফুটের এই দেবীর মূর্তি পাথরের। পেটকাটি আসলে কালীমূর্তি হলেও তাঁকে ধূমাবতী চণ্ডী কালী হিসেবেই পুজো করা হয়। এই প্রসঙ্গে বীরেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘জলপাইগুড়ির দেবদেবী’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন — ময়নাগুড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে শিব ও শক্তির বিস্ময়কর সমন্বয়ের নানান নিদর্শন। ব্যাঙকান্দি গ্রামে প্রস্তর নির্মিত বৃহৎ চামুন্ডাদেবীর মূর্তি অধুনালুপ্ত প্রাচীন কামরূপের শক্তিসাধনা ও তান্ত্রিক পথের প্রভাবের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে। দেবী বজ্রযানীর সঙ্গে মিল রয়েছে এই মূর্তির। এক সময়ে কামাক্ষ্যা, তিব্বত এমনকী নেপাল থেকে তন্ত্র সাধকদের যাতায়াত ছিল ময়নাগুড়ির এ অঞ্চলে। অনেকের মতে এ দেবী আগে ভদ্রেশ্বরী দেবী রূপে পূজা পেতেন। পরে ভদ্রেশ্বরী চামুন্ডা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।
মূর্তিটির দশটি হাত। দুটি দক্ষিণ ও একটি বামহস্ত ভগ্ন অবস্থায় দেখা যাবে। দেবীর নাসাগ্রভাগ ভগ্ন। প্রস্ফুটিত পদ্মে দেবী উপবিষ্টা। বামদিকের পাঁচটি হাতে রয়েছে— হাতি, ঘণ্টা, ছিন্ন নরমুন্ড এবং একটি নরমূর্তি। অপর হস্ত ভগ্ন। দক্ষিণ দিকের হাতগুলিতে রয়েছে–মৃত ব্যক্তির কঙ্কাল, হাতির মুখ, ছোট্ট বাদ্যযন্ত্র বিশেষ, অন্য দুটি হাত আংশিক ভগ্ন। শিরদাঁড়ার উপরের দিকে বিছে।
দেবী চামুন্ডা ত্রিনয়না, সর্পনির্মিত কর্নাভরন, মুকুটও সর্পশোভিত, গলায় নরমুন্ডমালা, সর্বাঙ্গে সর্প মালায় সজ্জিতা। পদতলে জানু পেতে বসার ভঙ্গিতে একটি নারী মূর্তি। শূন্য উদরে একটি বৃশ্চিক। মূর্তির একদিকে শৃগাল,অন্যদিকে ময়ূর। দেবী প্রত্যহ পুজে পাচ্ছেন। একজন রাজবংশী পূজা করেন। পেটকাটি মা খুবই জাগ্রত। কালী পূজার সময় আলাদা করে মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে ঘটা করে পূজো হয়, মেলা বসে।
এবার বলবো জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে দূরত্ব দুই কিলোমিটার দূরে পান্ডাপাড়ার সাপকালী পুজোর গল্প। জলপাইগুড়ি রেলস্টেশনের ভেতর দিয়ে হলদিবাড়ি রোডে বাসে করে পান্ডাপাড়ার যাওয়া যায়। রাস্তার উপরেই অবস্থিত দেবী মন্দির। প্রায় ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে দেবী এখানে পুজিতা। দেবী সাপকালী এখানে দুটি গোখরা সাপের লেজের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। সাপ দুটি সৃষ্টি ও প্রলয়ের প্রতীক।
এই প্রসঙ্গে ডাক্তার চারুচন্দ্র সান্যাল তার “জলপাইগুড়ি শহরের একশ বছর” শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘একটি মন্দিরের কথা না বললে সব কথা বলা হবে না বলে মনে হয়। মন্দিরটি শহর থেকে একটু দূরে দক্ষিণ দিকে পান্ডাপাড়ায়। কে বা কবে এই মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন সেটা আজও সঠিকভাবে জানা যায়নি। সম্ভবত স্বাধীন বৈকুণ্ঠপুরের আমলে। মন্দিরের কালীমূর্তি দুটো গোখরা সাপের লেজের উপর দাঁড়িয়ে। একটি পুরুষ আরেকটি স্ত্রী সাপ। সোজা ফনা তুলে দাঁড়িয়ে। মূর্তির কটি দেশ পর্যন্ত গহনা সব সাপের। খাচ্ছেন সাপ। জিহবা নেই। মুখবিহব্বর কালো জামের মত গাড় নীল। চক্ষু কোটরাগত। মহাদেব নেই। লোকে বলে ইনি চন্ডী, কেউ বলে ভদ্রকালী। আমার মনে হয় ইনি চন্ডী রুপী মনসা, মহাদেবের সাথে সাক্ষাতের পূর্বে রণরঙ্গিনী ধ্বংসকারিনী মূর্তি।’
দেবীর এই রূপের জনশ্রুতি আছে যে, দ্বাপর যুগে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পান্ডবরা দেবীর এইরূপ মূর্তির পূজা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। আরো আগে ত্রেতা যুগে লঙ্কেশ্বর রাবণ এইরূপ দেবীর মূর্তি পাতালে পূজা করতেন।

ভদ্রেশ্বরী চামুন্ডা
প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে, কোচবিহারের রাজা রূপনারায়ণ ১৬৯৩ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে দ্বিমত আছে। কথিত আছে, বৈকুণ্ঠপুরের রাজা দর্পদেবের রাজত্বকালে ১৭৫৮-৯৩ সালের মধ্যে এই পুজো শুরু হয়। অন্য মতে, ১৬৯৩ সাল নাগাদ কোচবিহারের রাজা রূপনারায়ণ এই পুজোর প্রচলন করেন। তবে বৈকুণ্ঠপুরের রাজা দর্পদেব রায়কতকে দেবী বিগ্রহের প্রতিষ্ঠাতা বলে অধিকাংশই মানেন। তিনি পুরি থেকে পান্ডা নিয়ে এসে এই পূজার প্রচলন করেন। বংশ-পরম্পরায় এই পান্ডারাই দেবীর পূজা করে আসছেন। সেই থেকেই এই পাড়ার নাম পাণ্ডাপাড়া। রাজ পরিবারের সদস্যরা এই পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন।
কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা ছাড়া উত্তর দিনাজপুরের সাপকালীর সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রামের নাম মুস্তাফানগর, থানা কালিয়াগঞ্জ।এখানে দেবী চতুর্ভূজা এবং কালীমূর্তির পাশে একটি ফনা তোলা সাপ থাকে।এই পূজা মূলত গ্রামের মানুষেরা করে থাকেন, যেখানে সাপদেবতাকে স্থানীয়ভাবেও পূজা করা হয়।ষাটের ও সত্তর দশকের কালিয়াগঞ্জে কাঁচা লঙ্কার চাষের পীঠস্থান হিসাবে সুনাম অর্জন করেছিল।
জেলা কোচবিহারের সীমান্ত লাগোয়া মহকুমা দিনহাটা। আর এই দিনহাটা মহকুমার সিঙ্গিমারি ভেটাগুড়ি গ্রামের বর্মন সম্প্রদায় সাপকালী পূজা করেন। দেবী এখানে দ্বিভূজা। এক হাতে খড়গ আর এক হাতে থাকে মুন্ডু। দেবীর একপাশে শিব আর এক পাশে নারদ মুনির মূর্তি। দেবী বিরাট এক সাপের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। সাতকানির এই মূর্তি করেন বর্মন সম্প্রদায়ের কুম্ভকার দেবী পূজায় আগে পাঁঠা পায়রা হাঁস বলি দেওয়া হতো। শিবরাত্রিতে দেবীর বিশেষ পূজা উৎসব হয়। সেসময় গ্রামের জমজমাট হয়ে ওঠে। এখানকার সাপকালী পুরোহিতকে বলা হয় ভোমরিয়া। কালীপূজায় বিশেষ পূজোর ব্যবস্থা করা হয়।
ব্যতিক্রমী এসব পুজো দেখতে গেলে অবশ্যই ঘুরে আসুন উত্তরবঙ্গে। দেবী এখানে বিশেষ রূপে পূজিতা। তবে এদের সকলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় প্রাকৃতিক শক্তি মহাকালীকে, যিনি সৃষ্টি স্থিতি ও মহাকালের প্রতীক।