ব্যাঙ্গালোর শহরের পাঁচতারা বিলাসবহুল হোটেল। এখন সময় সকাল আটটা। শীতের সকালের জড়তা ভাঙতে পুলসাইড রেস্টুরেন্টের এগজিকিউটিভ কর্মচারীরা লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে গুলতানি করছে। ওদের টপিক একটাই। পরবিন্দর সিং। ম্যানেজার।
নীতিন বলল, “আরে দাদা, লোকটার কি ক্ষিদে, ঘুম কিচ্ছু নেই?”
শৌণক ওরফে দাদা বলে, “সারাদিন নিজে দৌড়চ্ছে আর আমাদেরও খাটিয়ে মারছে।”
নীতিন বলে, “দাদা তোমার তো যাওয়ার সময় হল। বাড়ি কবে যাচ্ছ?”
এইসময় লাউঞ্জে আসে পরবিন্দর সিং। ম্যানেজারকে দেখে ওরা চুপ করে যায়।
ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পরবিন্দর এগিয়ে আসে। শৌণককে বলে, “কি দাদা হালচাল সব ঠিক তো?”
হোটেলে শৌণকের পরিচয় দাদা। ও কলকাতার ছেলে, তায় বাঙালী। তাই হোটেলের সবার কাছে ও দাদা বলেই পরিচিত।
“ফাইন স্যার এ্যান্ড স্যার হোয়াট এ্যাবাউট মাই লিভ” বলেই চুপ করে যায় শৌণক।
পরবিন্দর ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বলে, “থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের আর একজনকে দেখছি না যে!”
নীতিন, “এখনো আসেনি”।
পরবিন্দর ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “অলওয়েজ লেট লতিফ। দেখো গাইজ, আমি যেমন আমার রাজস্থানের বাড়ি, সংসার সব ছেড়ে এখানে এসেছি, তোমরাও নিজেদের হোম টাউন ছেড়ে এখানে এসেছো। সো উই আর অন দ্য সেম পেজ ব্রাদার, মে বি আয়্যাম ইওর বস্। এই হোটেলের এই রেস্টুরেন্টটা আমাদের কাজের জায়গা। একে তোমরা মন্দির ভেবে কাজ করো। টাকা কামাও।
গো বিয়ণ্ড এভরিথিং টু সার্ভ দ্য গেস্ট। অতিথি দেব ভব। গেস্ট হ্যাপি থাকলে সবকিছু ঠিক।”
পরবিন্দর চলে যায়। সেদিকে তাকিয়ে শৌণক দাঁত কিড়মিড় করে।
নীতিন সবটা লক্ষ্য করে। বলে, “দাদা বছরের শুরুতেই ছুটি নিচ্ছ কেন?”
“দেখ ভাই, এই সময়ই কলকাতায় বইমেলা হয়।” ওর কথায় নীতিন হেসে ফেলে। “তুমি কবে থেকে বুক লাভার্স হলে দাদা?”
“আরে ভাই, বইমেলায় বই ছাড়া আরও অনেক কিছু আছে। আছে বাংলা রক গ্যাজেট মিউজিক স্টল। নতুন গান, নতুন ভয়েসকে ওরা প্রোমোট করে। সাধারণ মানুষের কাছে, মিউজিক জগতের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। আমার প্যাশন এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। আজ ইউটিউবে আমার টু মিলিয়ন ভিউয়ার। সুতরাং আমার ইন্টারেস্টটা বুঝতেই পারছ।”
নীতিন হেসে ওঠে, “তাহলে বলছ, বইমেলায় বই ব্যাকফুটে!”
“আরে ভাই, যে মেলার নামে বই আছে, সেখানে বই কখনোই গৌণ নয়; তবে এই মেলার রং কারো কারো কাছে অন্যরকম। দেখো, মেলায় আসা মানুষজনের রসনা তৃপ্তির জন্য যারা নানানরকম খাবারের স্টল দেয় তারা চায় তাদের খাবারের ব্যবসায় লাভ হোক। মূলকথা বইকে ঘিরেই নানান উৎসব।”
পরবিন্দর তার স্টাফদের সুন্দরভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে নিয়ন্ত্রণ করে।
আজ পরবিন্দরের রেস্টুরেন্টে উপচেপড়া ভিড় ছিল। স্টাফদের প্রচুর পরিশ্রম হয়েছে। পরবিন্দরও আজ সারাদিন খুব চাপে ছিল। ডিউটি আওয়ার্স পেরোনোর কয়েক ঘন্টা পরেও নীতিন, শৌণক বাড়ি যেতে পারেনি। বাড়ি মানে নীতিন, শৌণক আর তন্ময় এই থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের একসাথে ভাড়া করা ফ্ল্যাট।
শৌণক খানিকটা মাথা গরমের ছেলে। সবসময় পকেটে রেজিগনেশন লেটার নিয়ে ঘোরে। আজ সারাদিনের অতিরিক্ত পরিশ্রমে ওর মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে।
এই সময় পরবিন্দর এসে, “দাদা আজ ডবল ডিউটি করনা পড়েগা। থোড়া বহুৎ চাপ হ্যায়। ম্যানেজ কর্ লে না।” বলে চলে যায়।
শৌণক খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর নিজের ডেস্ক ঠিকঠাক ভাবে গুছিয়ে নিয়ে সোজা ম্যানেজার পরবিন্দরের চেম্বারে। ম্যানেজারের টেবিলে নিজের রেজিগনেশন লেটার রেখে বলে, “স্যার, আয়্যাম আনেবেল টু কন্টিনিউ মাই সার্ভিস মোর”। আর একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না পরবিন্দরের রিএ্যাকশন শোনার জন্য। বেরিয়ে সোজা বাড়ি।
বাড়ি ফিরে স্নান খাওয়া সেরে একদম বিছানায়। পরদিন চোখ খোলে বেলা বারোটায়। ভাবে, আহঃ কি শান্তি। আজ আর কাজের চাপ নিতে হবে না। এখন দুটো দিন তো একটু আরাম করি, তারপর সোজ কলকাতা। বাড়ি, বইমেলা কতকিছু! সারাদিন হালকা মেজাজে গান শুনে খাওয়া দাওয়া করে কাটায় শৌণক। নীতিন আর তন্ময় ডিউটিতে গেছে। ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা। ফোন করে শৌণক বলে দিয়েছে আজ ও ডিনার বানিয়ে রাখবে। ওরা ফিরলে সবাই একসাথে খাবে।
রাত্রি দেড়টা। ওরা তিনজন সারাদিনের গল্প আর খাবার নিয়ে বসে হাসিঠাট্টা করছে। এমনসময় কলিংবেলের আওয়াজ। এত রাতে আবার কে এল? ওরা এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
শৌণক উঠে গিয়ে দরজা খোলে। দরজায় দাঁড়িয়ে পরবিন্দর। শৌণক অবাক।
— “কি দাদা, অন্দর নেহি বোলাওগে?” পরবিন্দর বলে।
শৌণক, “হ্যাঁ স্যার, আসুন আসুন।”
পরবিন্দর ঘরে ঢুকে চেয়ার টেনে বসে। দ্যাখে ওরা কেউ বিছানায়, কেউ মাটিতে বসে খাচ্ছে।
হতচকিত থ্রি মাস্কেটিয়ার্স কি বলবে ভেবে পায় না। পরবিন্দরই নিস্তব্ধতা ভাঙে, “মুঝে খানা নেহি অফার করোগে?”
শৌণক, “সিওর স্যার, আপনি খেলে আমরা খুব খুশি হব।”
একটা প্লেটে রুটি আর চিকেন রেজালা সাজিয়ে পরবিন্দরকে দেয় শৌণক।
পরবিন্দর থালা হাতে নিয়ে শৌণককে পাশে বসায়।
বলে, “ইয়ংম্যান তোমরাই আমার স্ট্রেন্থ। আমরা সবাই মিলে যেভাবে রেভিনিউ দিতে পারবো আমাদের সকলের উন্নতি সেভাবেই হবে। আমি সবসময় তোমাদের হ্যাপি রাখার চেষ্টা করি। মান্থলি টার্গেট এ্যাচিভ হওয়ার পর এভরি মান্থে তোমরা আমার তরফ থেকে হয় পার্টি নয় আউটিং পাও। টার্গেট এ্যাচিভ হওয়ার পর যে রেভিনিউ আসে তার কমিশন থেকে আমার উদ্যোগে হোটেলের তরফ থেকে তোমাদের গিফ্ট দেওয়া হয়। যেটা এতবড়ো হোটেলের অন্যান্য রেস্টুরেন্টের স্টাফরা কখনোই পায় না।
বাড়ি ছেড়ে দূরে এসে তোমরাই আমার পরিবার। চাকরি তুমি ছাড়তেই পারো। বেটার অপারচুনিটি যেদিন পাবে সেদিনই আমি তোমাকে রিলিজ করে দেব। বাট নিজের পরিবার ছেড়ে দূরে এসে শুধুমাত্র মস্তি করতে তুমি পারো না। কাজের জায়গাটাকে নিজের জায়গা মনে করলে দেখবে পরিশ্রমের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাবে। এই নাও তোমার রেজিগনেশন লেটার। এটা ছিঁড়ে ফেলো। আজ সারাদিন রেস্ট করেছো, কাল থেকে আবার ডিউটি শুরু কেমন? ফ্রম টোয়েন্টিথ ইউ মে টেক লিভ ফর এ উইক।”
শৌণকের দিক থেকে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই পরবিন্দর সবাইকে গুডনাইট জানিয়ে বিদায় নেয়।
শৌণক বুঝতে পারে এই কর্মক্ষেত্রে সবার ভালোবাসায় ও এক অচেনা বাঁধনে বাঁধা পড়েছে। হাসি, মজা, রাগ, দুঃখ সবকিছু দিয়ে ভরা এই সংসার।
পরদিন সকালে শৌণক কেতাদুরস্ত হয়ে ডিউটিতে যায়। হোটেলে ঢুকেই পরবিন্দরের মুখোমুখি।
“গুড মর্ণিং স্যার”।
নিজের কাজ করতে করতে মাথা তোলে পরবিন্দর, “ভেরি গুড মর্ণিং দাদা, ওয়েলকাম। উই আর অন দ্য সেম পেজ। মাইণ্ড ইট।” মুখে খুশির হাসি।