গত দু’দশকে ভারতের মাটিতে যতগুলি বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে তাতে ঘটনাস্থল রক্তে ভেসেছে, হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গিয়েছে, মৃতের পরিবারের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, ধ্বংসস্তূপ ঘেঁটে সূত্র খোঁজা হয়েছে, তদন্ত চলেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। গত দশ বছরের মধ্যে যতগুলি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০৬ সালের মুম্বাই ট্রেন বিস্ফোরণ, যাতে দুশোর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তারপর সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার সন্ধ্যায়, নয়াদিল্লির লাল কেল্লার কাছে একটি গাড়ি বিস্ফোরণ। এখন পর্যন্ত অন্তত ন’জনের প্রাণহানি এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের পর রাজধানী-সহ অন্যান্য জায়গাতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ঘটনায় সারা দেশ জুড়ে যথারীতি তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে — দিল্লির এই গাড়ি বিস্ফোরণ কি আত্মঘাতী হামলা, না কি সন্ত্রাসবাদী হামলা? ঠিক কী কারণে বিস্ফোরণ ঘটল তা প্রশাসন ও তদন্তকারী সংস্থাগুলি এখনও জানতে বা জানাতে পারে নি, তবে তারা কোনো সম্ভাবনাই নাকচ করছে না বলে জানিয়েছে।
জানা গিয়েছে বিস্ফোরণে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহৃত হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে। সোমবার যে রাসায়নিক ফরিদাবাদে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। হরিয়ানার ফরিদাবাদ থেকে সোমবার সকালেই দু-জন ডাক্তারকে জেরা করে প্রায় ২৯০০ কেজি অ্যামেনিয়াম নাইট্রেট উদ্ধার করা হয়েছিল। ফলে এই দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে তদন্তকারীদের কেউ কেউ এটি একটি ‘ফিদায়িন’ ধাঁচের আত্মঘাতী হামলাও হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন। তবে ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে এসেছে জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামার একজন চিকিৎসক ড. উমর মোহাম্মদ-এর নাম, যিনি লাল কেল্লার কাছে ওই বিস্ফোরক বোঝাই একটি সাদা রঙের হুন্ডাই আই২০, নম্বর HR 26CE7674। সোমবার বিকেল ৩টা ১৯ মিনিটে গাড়িটি লাল কেল্লার কাছে একটি পার্কিং লটে ঢোকে এবং ৬টা ৩০ মিনিট নাগাদ বেরিয়ে যাওয়ার পর তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগেই পুলওয়ামার বাসিন্দা ড. উমর মোহাম্মদ-এর নামে ওই গাড়িটি কেনা হয়েছিল। যদিও গাড়িটি তার আগে একাধিক মালিকের হাতে হাতবদল হয়, কিন্তু মোটর ভেহিকেল বিভাগে তা নথিভুক্ত করা হয়নি। ড. উমর মোহাম্মদ ছিলেন একটি সন্ত্রাসবাদী চক্রের সদস্য, যাদের দুইজন সদস্যকে সোমবারই দিল্লির কাছে ফরিদাবাদে গ্রেফতার করা হয় এবং সেখান থেকে ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার হয়। অনুমান সহযোগীদের গ্রেফতারের খবর পাওয়া মাত্র উমর মোহাম্মদ আতঙ্কিত হয়ে তিনি একাই আত্মঘাতী হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটলো কীভাবে? দিল্লির পুলিশ কমিশনার বিস্ফোরণের বিবরণ জানিয়ে তদন্ত চলছে, দ্রুত বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলেছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো বক্তব্যে স্পষ্ট হয়নি গাড়িতে বিস্ফোরক না বোমা কী রাখা ছিল? গাড়িটির জ্বালানি ট্যাংক বা সিএনজি ট্যাংকে কী বিস্ফোরণ হয়েছিল যার জন্য আশপাশের গাড়িগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়? স্পষ্ট নয় এটি সন্ত্রাসবাদী হামলা কি না। দিল্লির পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে একাধিক এজেন্সি কাজে নেমেছে। ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির কর্মকর্তা বলেছেন, “ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পরেই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে। মঙ্গলবার উত্তর দিল্লি ডেপুটি পুলিশ কমিশনার বলেছেন, দিল্লি বিস্ফোরণের ঘটনায় সন্ত্রাসদমন আইন– ইউএপিএ, বিস্ফোরক আইন এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে এখনও নমুনা সংগ্রহ করছে।
গাড়িটির আসল মালিক কে, কোথা থেকে গাড়িটি আসছিল আর কোথায়ই বা যাচ্ছিল, কতজন যাত্রী ছিলেন গাড়িতে আর বিস্ফোরণে কতজন মারা গেছেন? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। কেন নেই এখনও? খোঁজ চলছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিস্ফোরণস্থলের কাছাকাছি এলাকাতেই গাড়িটি কয়েক ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করছিল। এও বলা হচ্ছে যে গাড়িটি একটি পার্কিং এরিয়ায় দাঁড়িয়েছিল এবং বিস্ফোরণে কিছু আগেই ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করে। যে জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেটি লাল কেল্লা মেট্রো স্টেশনের একেবারে গায়ে। কিন্তু পুলিশ এসব তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। দিল্লির এই বিস্ফোরণটি পরিকল্পনা করে ঘটানো হয়েছে, নাকি এটি দুর্ঘটনা? যদি পরিকল্পনা করেই ঘটানো হয় তাহলে কোন উদ্দেশে বা লক্ষ্যবস্তু কী ছিল? এই প্রশ্নও উঠছে যে বিস্ফোরণটি পরিকল্পনা করে ঘটানো হয়েছে, নাকি এটি দুর্ঘটনা? যদি পরিকল্পনা হয়ে থাকে, তাহলে লক্ষ্যবস্তু কী বা কে ছিল? সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে কী এই বিস্ফোরণ নাকি অন্য কেউ? এসব প্রশ্ন নিরাপত্তার কারণে স্বাভাবিক ভাবেই উঠছে কিন্তু প্রশ্নের জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।