একাকীত্ব এমন একটা অনুভূতি যা মানুষ জীবনে একবার বা অনেকবার বা নিয়মিতভাবে অনুভব করে থাকে। মুস্কিল হচ্ছে এই যে ‘একাকীত্ব’ শব্দটা যখন মানুষ প্রবলভাবে ভাবতে শুরু করে অর্থাৎ ‘আমি এই বিরাট পৃথিবীতে একা, ভয়ংকরভাবে একা’ এই বোধটা যখন মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ে তখন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে পারে।
প্রত্যেক মানুষের মানসিক গঠন এবং স্বাস্থ্য ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কেউ একা থাকতেই পছন্দ করেন। বেশি ভীড়, আড্ডা, কথা তাঁর অপছন্দের, এটা হতেই পারে। আবার এটাও সত্য যে, কোনো মানুষ নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে পড়লে একা বোধ করেন। এখানে কমফোর্ট জোন তাঁর সঙ্গী এটাই ধরে নিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ল। ভোরের উজ্জয়িনী রেল স্টেশন। শীতকাল। ভোর বলতে আলো ফোটা ভোর নয়, কুয়াশা মোড়া আধো অন্ধকার ভোর। মায়ী নর্মদাকে পরিক্রমা করেন এখানে বহু সাধু সন্ত সন্ন্যাসী। আবার উজ্জয়িনীতে আছেন মহাকালেশ্বর স্বয়ং। এইখানে দর্শন সেরে প্রায় প্রত্যেকেই চলে যান ওঁকারেশ্বরে। এই শীতের শেষরাতে একটি ট্রেন পৌঁছে দেবে ইন্দোর হয়ে ওঁকারেশ্বরে। তাই কাঁপতে কাঁপতে ফাঁকা স্টেশনে এসে উপস্থিত হয়েছিলাম। লম্বা প্ল্যাটফর্মের এদিক ওদিক গুটিকয়েক লোকজন। দুটি চায়ের স্টল খোলা। যথারীতি শীতের ভোরে মানুষ সেই চায়ের স্টলের কাছেই ভীড় জমাচ্ছে।
বেশকিছু সাধুসন্তের দল ছোট ছোট ভাগে এখানে ওখানে সিট দখল করে বসেছেন। হিন্দিতে ওনাদের মধ্যে গল্প গুজব হাসি ঠাট্টা সবই চলছে। ঘন ঘন চা পান চলছে যে কটি যাত্রী রয়েছে সকলের। চোখ পড়ল একজনের উপর। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, সুঠাম চেহারার একজন সাধু একা চলেছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছে ছোট্ট একটি গেরুয়া কাপড়ের ঝোলা আর একটি লাঠি। তিনি কিন্তু অন্য কোনও সাধুর সঙ্গে একটিও বাক্যালাপ করেন নি। যদিও অন্যান্য সাধুরা তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন বা হয়ত কথা বলতেও আগ্রহী। কিন্তু ওই একাকী সন্ন্যাসীর কারো দিকে চোখ নেই। নিজের মধ্যেই বুঁদ হয়ে আছেন। মাঝেমাঝে এসে চা খাচ্ছেন আর তারপর একটু দূরে সরে গিয়ে নিজের ছোট্ট মিউজিক সিস্টেমটি চালিয়ে ভজনের সঙ্গে অপূর্ব নেচে চলেছেন।
চা খেতে খেতে ওনাকেই দেখছিলাম। সাধু সম্বন্ধে অসীম কৌতূহল ছোট থেকে। কারণ ওঁরা একা থাকেন, একা সাধন করেন, একা আনন্দে থাকেন। ঠিক ‘আমার আমি’র বিপরীত মেরুতে অবস্থান। বৃষ্টির মধ্যে লাভা লোলেগাঁও এর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কটেজে থেকে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি একাকীত্ব বা নির্জনতা কারে কয়। প্রবল বৃষ্টি, খাদের ধারে ছোট্ট কটেজ। কারেন্ট থাকছে না অধিকাংশ সময়। টিভি নেই। মোবাইলে নেটওয়ার্ক ছিল না। সন্ধ্যার পর বন্ধ ঘরে মনে হচ্ছিল যেন কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে গেছি। এখনই ম্যামথ বা টেরাডেক্টিল কিছু একটা বেরিয়ে আসবে। অন্য কটেজে তেমন লোকজন ছিল না ওই সময়। শিলিগুড়িতে নেমে এসে সেই প্রথম ভীড় দেখে খুব খুশি হয়েছিলাম।
সাধু প্রসঙ্গে ফেরা যাক। জটাজুটধারী ছয় ফুট গৌরাঙ্গ সন্ন্যাসীকে নিজের মনে নাচতে দেখে ভারি ভালো লাগছিল। পাশে হেলায় পড়ে থাকা গেরুয়া ঝুলিতে উঁকি দিলাম। গর্হিত কাজ নিঃসন্দেহে। কিন্তু ওই কৌতূহল। তাছাড়া ঝোলার মুখ খোলাই পড়ে ছিল। দেখতে বাধা নেই। দেখলাম আর এক প্রস্থ গেরুয়া আলখাল্লা আর বোধহয় একটা গামছা। আর কিচ্ছু নেই। নেই মানে নেই। এই চরম শীতে ওঁর গায়ে একটা রবীন্দ্রনাথের মতো আলখাল্লা আর গেরুয়া ধুতি। মাথায় বিশাল জটা। পায়ে জুতো নেই। কিন্তু মিউজিক সিস্টেমটি কাছ ছাড়া করছেন না। ট্রেন আসার আগে পরম মমতায় ওটিকে ঝোলায় পুরলেন তিনি। তারপর এগিয়ে গেলেন। বুঝলাম ওই মিউজিক সিস্টেমটি ওঁর একাকীত্বের দোসর। চরম শীত পরম গ্রীষ্মে খালি পায়ে থাকলেও ওই দামী মিউজিক সিস্টেমটিকে তিনি ত্যাগ করতে পারবেন না কোনোমতেই।
একাকীত্ব মানে দুঃখ বা শোক বা নির্জনতা কোনোটাই ঠিক নয়। দুঃখ বা শোক অস্থায়ী বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে হতে পারে। কিন্তু একাকীত্ব সাধারণতঃ দীর্ঘমেয়াদী এবং তীব্র হয়ে থাকে। সেটি কোনো বেদনাদায়ক অতীত অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতি হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। যিনি বা যাঁরা একাকীত্বে ভোগেন তাঁরা প্রথমে নিজেদের পরিত্যক্ত ভাবতে শুরু করেন এবং নিজে থেকে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। এঁরা গোটা সমাজকে নিজের বিরুদ্ধে ভাবেন। মনে করেন সমাজে কারোর কাছে তাঁর কোনো মূল্য নেই। তাঁরা এই ভাবনার ফলে নিজেদের আরও একা করে ফেলেন।
এই একাকীত্ব কারোর সারাজীবন ভালোভাবে কাটানোর পর বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের শারীরিক অক্ষমতার কথা ভেবে শুরু হতে পারে। আবার শৈশবে কোনো নিকট আত্মীয় দ্বারা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার ফলে কম বয়সের ছেলে মেয়েরও হতে পারে। এছাড়া প্রিয়জনের মৃত্যুর আঘাত সহ্য করতে না পেরে অনেকে বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেকে একটা গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেন। আবার মানসিক ভাবে সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরেও অনেকে একা হয়ে পড়েন। এটাও দেখা গেছে এই একাকীত্বের শিকার প্রধানত মহিলারা হন। পুরুষরা হন না তা নয়, তবে মহিলাদের তুলনায় কিছু কম।
প্রথম বিশ্বের উন্নত দেশগুলি যথা আমেরিকা, জাপান ও য়ুরোপের কয়েকটি দেশে একাকীত্বের প্রকোপ অনেকদিন ধরেই বেশ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই শতকে পৌঁছে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশেও সমাজের একটি অংশের মধ্যে একাকীত্বের প্রকোপ ক্রমবর্ধমান। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমেরিকার প্রায় ৩৫% মানুষ একাকীত্বে ভুগছেন। আশ্চর্য ব্যাপার এটাই যে এর মধ্যে ৬০% তরুণ তরুণীও রয়েছেন। বিশেষ করে কোভিড মহামারীর পর থেকে নানান সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে একাকীত্ব ৪৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৩ সালের ডিসেম্বরে মারা যান জয়েস ক্যারল ভিনসেন্ট নামের আটত্রিশ বছরের এক ব্রিটিশ মহিলা। তাঁর মরদেহ আবিষ্কৃত হয় ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে উত্তর লন্ডনের এক ফ্ল্যাটে, যেখানে এই দুবছর ধরে টিভি চলছিল। ওঁর নিকটাত্মীয় বা বন্ধু সেরকম কেউ ছিল না যাঁরা ওঁর খোঁজে আসবেন। শীতের দেশ এবং দরজা জানালা বন্ধ থাকায় কোনও গন্ধও কেউ পায় নি। ভাড়া বা বিল সব স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট হয়ে যাওয়ার কারণে এগুলোতেও বাধা পড়ে নি। তাই একটা মানুষ কিভাবে আছেন বা নেই, সেই খোঁজও কেউ রাখে নি। এই ঘটনা আমাদের সমাজের একটা চরম নিষ্ঠুর অথচ বাস্তব দিক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মানুষ এখন কতটা অসহায় একাকীত্বের কাছে।
হেদভিগা গোলিক একজন ক্রোয়েশিয়ান মহিলা যিনি ১৯৬৬ তে মারা যান। ২০০৮ সালে এই ৪২ বছরের এই মহিলার কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়। ৪২ বছরের মহিলার কঙ্কালও ৪২ বছর পর আবিষ্কৃত হয়।
আমাদের ভারতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী পরভীন ববি দীর্ঘদিন ধরেই একাকীত্বে ভুগছিলেন। নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে ফেলেছিলেন অথবা সমাজ তাঁকে একা করে দিয়েছিল। তিনিও ৫১ বছর বয়সে বদ্ধ ফ্ল্যাটে মারা যান। ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পেপার আর দুধের প্যাকেট জমতে থাকায় তিনদিনের মধ্যে তাঁর দেহ আবিষ্কৃত হয়। এত জনপ্রিয় হয়েও তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ।
এই একাকীত্ব এখন প্রতিটি উন্নত দেশের সাধারণ একটা ঘটনা। মানুষ যত গ্যাজেট ফ্রিক হবে, চিন্তাশক্তি যত কমবে, একাগ্রতা যত ক্ষীণ হবে, এই একাকীত্ব মহামারীর রূপ ধারণ করবে। আগে ছিল একান্নবর্তী পরিবার, আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া, নানান পালা পার্বণে বাড়িতে অনুষ্ঠান, বৈঠকখানায় জমিয়ে আড্ডা। সব ছেড়ে দিলেও রকের আড্ডা ছিল একটি পাড়ার প্রাণভোমরা। এখন এগুলির একটিও আর নেই। ফ্ল্যাট কালচারে বাগানে সময় কাটানোর প্রাপ্তিটুকুও নিঃশেষিত। এক চিলতে বারান্দায় টুং টাং সৌখিন গাছ আর যন্ত্র নির্ভর জীবন অনায়াসে একাকীত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে অতি সহজে। আমাদের পরের প্রজন্ম বই নামক বস্তু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অথচ এই বই হতে পারে একমাত্র সঙ্গী, মানসিক দিক থেকে মানুষকে সুস্থ রাখতে।
সাম্প্রতিক মুম্বই শহরের ঘারকুল সোসাইটির একটি ঘটনা। পানভেল স্থিত এনজিও SEAL (Social and Evangelical Association for Love) অনুপ কুমার নায়ারকে বন্ধ ফ্ল্যাটের ভিতর থেকে উদ্ধার করে। ওই সোসাইটির মানুষ খেয়াল করেছিলেন যে অনুপ নায়ার তিন বছর ধরে ফ্ল্যাটের বাইরে বের হন নি। উনি পূর্বে কম্পিউটার প্রোগ্রামার ছিলেন। কিন্তু বাবা মায়ের একই বছরে মৃত্যুর পর তিনি অবসাদে ভুগতে থাকেন। ওঁর দাদাও বছর কুড়ি আগে সুইসাইড করেছিলেন। বাবা মুম্বই টাটা হসপিটালে এবং মা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের টেলিকম বিভাগে কর্মরত ছিলেন। অবিবাহিত এই ভদ্রলোক বন্ধু, প্রতিবেশী, অফিস সব কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে নেন। ফুড ডেলিভারি অ্যাপের সাহায্যে খাবার নিতেন। প্রতিবেশীরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও তিনি তা প্রত্যাখান করতেন। মাঝে মধ্যে বাড়ির আবর্জনা ফেলতেন। শেষ তিনমাস আবর্জনাও বের করতেন না দেখে প্রতিবেশীরা SEAL কে খবর দেন। দরজা খুলিয়ে দেখা যায় যে অনুপের পায়ে ইনফেকশন হয়েছে আর গোটা ফ্ল্যাট আবর্জনাময়। তবু একটু আশার দিক যে প্রতিবেশীরা তাঁকে খেয়াল করেছিলেন।
একা থাকতে হয়ত কেউ খুব পছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু নিজেকে একেবারে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে তার প্রতিফল খুব একটা সুখের হয় না। আর আজকাল নিজের রান্নাটুকুও অনেকে করতে চান না। নানা রকম অ্যাপ এসে গিয়েছে। তাতেই অর্ডার। রান্না করলে মানুষের মন শরীর দুইই ভালো থাকে, কর্মক্ষমও থাকে। আর এখন একই বাড়িতে মানুষ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বাস করেন মোবাইলে চোখ রেখে। কারোর সঙ্গে কথা বলা বা নিদেন পক্ষে দেখা হলে একটু হাসি উপহার দিতেও মানুষ ভুলে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ এই ঘটনাগুলোর বাড়বাড়ন্ত। মা, বাবা কারোর চিরকাল থাকে না। সুতরাং তাঁদের মৃত্যুতে কষ্ট হলেও অবসাদে চলে যাবার কারণ নেই। মন খারাপের সময় অন্য কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে।
একাকীত্ব কাটিয়ে ওঠার কিছু উপায় :
১) নিজের পছন্দমত যে কোনো সৃজনশীল কাজে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা। সে রান্না হতে পারে, সেলাই হতে পারে, বই পড়া, আঁকা, আবৃত্তি, গান বা ঘরদোর সাজিয়ে রাখা হতে পারে। মাটি নেই, তাই বর্তমানে বাগান বিলাসিতার নামান্তর। তবু যাঁদের নিজের বাড়িতে থাকা, তাঁরা তাঁদের বাগানে অনেকটা কোয়ালিটি সময় কাটাতে পারেন। বৃদ্ধ মানুষ আধ্যাত্মিক কোন অনুষ্ঠানে যেতে পারেন। যেতে না পারলেও মোবাইলে এখন আধ্যাত্মিক অনেক বক্তব্য শোনা যায়, যাতে নিজে ভালো থাকার পথ খুঁজে নেওয়া যায়।
২) নিজের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যাঁরা একাকীত্বে ভোগেন, তাঁরা সমাজের অন্য মানুষ বা গৃহপালিত জন্তুদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল। বিশেষ করে কেউ কষ্ট পাচ্ছে দেখলে তাদের প্রতি এঁদের সহানুভূতি থাকে। সামাজিক দক্ষতাও অন্যান্য মানুষের মতোই। কিন্তু তাঁরা সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে বা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। এই মানিয়ে নেওয়ার কৌশল তাঁদের শিখতে হবে নিজেকে ভালো রাখার জন্য।
৩) কথা বলা শুরু করতে হবে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কিভাবে কথোপকথন শুরু করতে হয় সেটি আয়ত্তে আনা প্রয়োজন। যে কোন একটি সহজ টপিক নিয়ে অপরিচিতের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন খেলাধূলা, আবহাওয়া, দেশের পরিস্থিতি ইত্যাদি।
৪) নিজের একাকীত্বের কথা প্রকাশ করতে হবে। একা থাকতে ভালো লাগা আর তীব্র একাকীত্বের শিকার হওয়া কিন্তু এক জিনিস নয়। পরিবারের কেউ থাকলে তার কাছে খানিকটা সময় কাটান। পরিবারের কেউ না থাকলে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কিছু না হলে রাস্তায় বেরিয়ে চায়ের দোকানে বসে লোকের কথা শোনা, কাছাকাছি নদী বা জলাশয় থাকলে সেখানে গিয়ে বসলে ভালো লাগবে।
৫) লোকের ভালো দিকটি দেখা উচিত। যাঁরা নিজেদের একা করে নেন, তাঁরা মানুষের থেকে আঘাত পেয়েই সেটি করে থাকেন। তাই কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। কেউ আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল মানেই সেই মানুষটা খুব খারাপ সেটা ভেবে নিজেকে একা না করাই মঙ্গল। বরং ভাবা যাক সেই মানুষটির কি ভালো গুণ রয়েছে। তাতে অন্তত নিজেকে ভালো রাখা যাবে।
৬) কেন একাকীত্ব আসছে সেই কারণ নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে। কেন সমাজের কারোর সঙ্গে মিশতে ইচ্ছা করে না সেই কারণ খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষের জীবন আলাদা, তাই সকলের সঙ্গে আপনার মতের মিল হবে এটা না ভাবাই মঙ্গল।
৭) তবে একা থাকা মানুষ অনেক সময়ই চট করে মিশতে পারবেন এমনটা নয়। তাই ধীরে ধীরে অপেক্ষার দ্বারা নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তি মানেই ভীতিপ্রদ নয় এটাও নিজেকে বোঝাতে হবে। আগে কারো কাছে প্রত্যাখান পেলে, পরেও সকলে প্রত্যাখান করবে এই চিন্তা দূর করতে হবে। কোনও একটি সংগঠনে যোগ দিলে এগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়। সমাজসেবামূলক কোনও সংগঠন বা গান বা আবৃত্তি শেখার কোনো সংগঠন। সেখানে নিজের মনের মিল অনেকের মধ্যে খুঁজে পাবেন। কারণ আপনি ও সে একই সংগঠনে নিজের ভালোলাগা খুঁজে পেয়েছেন।
সবকিছুর উপরে নিজের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। একা থাকতে ভালো লাগে বলে কারোর সঙ্গে কথা বলব না, এটা একেবারেই চলবে না। এই লেখা শুরু করেছিলাম এক সাধুকে দিয়ে। যিনি একা নর্মদা পরিক্রমা করছেন খালি পায়ে, কিন্তু সঙ্গে একটি ছোট মিউজিক সিস্টেম রেখেছেন। ওটিই তাঁর সঙ্গী। তাছাড়া সন্ন্যাসী যাঁরা হন, তাঁদের নিজের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা থাকে বলেই তাঁরা একাকীত্বকে ভয় পান না। সর্বোপরি তাঁরা মনে করেন তাঁদের সঙ্গে ঈশ্বর আছেন। তাই সন্ন্যাসী মাত্রই একা নন, আবার একা আছেন বলেই তিনি সন্ন্যাসী নন। আর আপনি যখন সন্ন্যাসী হতে পারেন নি বা পারবেন না তবে সমাজে থেকে সামাজিক হতে ক্ষতি কি? মানুষের সঙ্গে মিশে, কোনো সেবামূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে ভালো থাকার নামই জীবন। বদ্ধ ফ্ল্যাটে দমবন্ধ হয়ে মরার জন্য তো মনুষ্য জন্ম নয়। তাই একা হয়ে নিজেকে শাস্তি না দিয়ে ভালোভাবে বাঁচার চেষ্টা করা যাক হাতে হাত রেখে।