আজও ইন্ডাস্ট্রিতে কান পাতলে শোনা যায় প্রয়াত কিংবদন্তি দুই বলি-গায়ক মহম্মদ রফি এবং কিশোর কুমারের মধ্যে নাকি বরাবরেরই ঠান্ডা যুদ্ধ চলত। ‘আরাধনা’ ছবির পরেই মহম্মদ রফির থেকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা রীতিমতো কলার তুলে ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়েছিলেন কিশোরকুমার। তবে এক সাক্ষাৎকারে এই রটনা ফুৎকারে উড়িয়ে দেন রফি-পুত্র শাহিদ আর কিশোর পুত্র অমিত কুমার। দুজনের মধ্যে যথেষ্ট সখ্যতার সম্পর্ক ছিল বলে জানায় দুই পরিবার। কিশোরের সঙ্গে ডুয়েট গাওয়ার সুযোগ এলে ভীষণ খুশি হতেন রফি।
এই জুটি একসাথে ৩০টিরও বেশি গান গেয়েছিলেন। মজার বিষয় হল কিশোর কুমার তার অভিনীত তিনটি ছবিতে রফির কণ্ঠে লিপ-সিঙ্ক করতে পেরেছিলেন — ‘রাগিনী’, ‘শররাত’ এবং ‘বাঘি শেহজাদা’। অন্যদিকে, রফি কিশোর কুমারের হোম প্রযোজনা কমেডি ঘরানার মুভি’ বধতি কা নাম দধি’-তে রফির সুরে একটি গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন ।
রফি কিশোর কুমারের জন্য একবার বা দুবার নয়, বহুবার প্লেব্যাক করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে কারণ জানা যায় আবার কিছু ক্ষেত্রে অজানা। ভাগমভাগ (১৯৫৬) চলচ্চিত্রে রফি কিশোর কুমারের জন্য দুটি গান গেয়েছিলেন, “হামে কোই গম হ্যায়” এবং “চালে হো কাহান”। “পয়সা হি পয়সা” (১৯৫৬) ছবির গানটি এই দিক থেকে বিশেষ। কিশোর কুমার এই ছবিতে দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এবং তাই গানটিতে উভয় কিংবদন্তির কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়েছিলো।
রাগিণী (১৯৫৮) ছবির “মন মোরা বাওরা” গানটি কিশোর কুমারের উপর চিত্রায়িত হয়েছিল কিন্তু গেয়েছিলেন মোহাম্মদ রফি। এটি একটি আধা-ধ্রুপদী গান ছিল এবং সঙ্গীত পরিচালক ওপি নায়ার মনে করেছিলেন যে কেবল রফিই পারবেন তাঁর রেওয়াজি কন্ঠে ত্রুটিহীন করে গাইতে।
১৯৫৯ সালে “শরারাত” ছবিতে কিশোরের জন্য রফি দুটি গান গেয়েছিলেন। “আজব হ্যায় দাস্তান তেরি অ্যা জিন্দেগি” গানের জন্য ধ্রুপদী পটভূমি এবং উচ্চস্বরের প্রয়োজন ছিল। একই কারণে কিশোর মূল অভিনেতা হিসেবে থাকলেও “তু মেরা কপিরাইট, ম্যায় তেরা কপিরাইট” গেয়েছিলেন রফি।

১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রোড়পতি ছবির “ও মেরি ময়না” গানটিতে কিশোর এবং রফি উভয়েই কিশোরের জন্য একই গানে প্লেব্যাক করেছিলেন।
একবার মুখোমুখি প্রতিযোগিতায় আসেন মহম্মদ রফি-কিশোর কুমার৷ কিন্তু সেটা তাঁদের অজান্তেই৷ কারণ নেপথ্যে ছিলেন আরডি বর্মন৷ ১৯৬৯ সালের ছবি ‘প্যায়ার কা মৌসম’ ছবির গান ‘তুম বিন জায়ু কাহা’ গানটি রফি ও কিশোর কুমার দুজনের কন্ঠেই রেকর্ড হয় ৷ রফির স্বর ব্যবহার হয় শশী কাপুরের জন্য, কিশোর কুমারের স্বর ব্যবহার করা হয় ভারত ভূষণের জন্য ৷
কিশোর কুমারের অনুরোধে তার মুভি ‘চলতি কা নাম জিন্দেগি’ তে যে রফি পারিশ্রমিক নেন মাত্র এক টাকা। কিশোর বহু চেষ্টা করেও তার সে সময়ে সম্মান দক্ষিণা ১০০০০ টাকা নেওয়াতে পারেননি।
রফি সাহেবের মৃত্যুর পর তার পায়ের কাছে বসে হাউকাউ করে কেঁদেছিলেন কিশোর কুমার। তাঁর অসম্ভব শ্রদ্ধার মানুষটি যে চলে গেলেন। কিশোর কুমার কে ভেঙে পড়তে এর আগে কেউ কোনদিন দেখেননি।
একবার এক অনুষ্ঠানে কিশোরকুমারকে সামনে পেয়ে তার ভক্তরা অটোগ্রাফ চাইলেন। অটোগ্রাফ না দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রফিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘সংগীত তো উধার হ্যায়’।
দুই শিল্পী তাদের অনন্য ঈশ্বর-প্রদত্ত অসাধারণ কণ্ঠ দিয়ে স্মরণীয় গান গেয়েছেন এবং সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশ ও বিশ্বের মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। সেই সময় তাঁরা হিন্দি চলচ্চিত্র সঙ্গীতের দুটি স্তম্ভ হয়ে ওঠেন।

অর্থের ব্যাপারে উদাসীন রফি কখনো গানের মূল্য টাকায় ধার্য করেনি। রেকর্ডিং এর সময় বারবার রিহার্সাল দিতেন। স্মৃতিশক্তিও ছিল তার সাংঘাতিক। অন্যদের মতো ক্যাসেট বাড়ি নিয়ে যেতেন না, বারবার শুনতেও হতো না অথচ নিখুঁত রেকর্ডিং করতেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘উপরওয়ালা হ্যায় না’।
জীবনে কোনদিন কোন অন্যায় কাজ করেননি, কটুক্তি থেকে দশহাত দূরে থাকতেন, হাসি মুখ ছাড়া জোরে কোনদিন কথা বলতেন না। এতোটুকু ম্লান হয়নি তার মুখের হাসি কোনদিন। একবার এইচএমভি ঠিক করে মহম্মদ রফির স্যাড সং-এর কালেকশন রিলিজ করবে। সেই কারণে ঠিক করা হয়, রফির একটি দুঃখের ফেস ব্যবহার করতে হবে ৷ কিন্তু লাইব্রেরী-সহ একাধিক জায়গায় খোঁজার পরেও রফির স্যাড ফেস কোথাও মেলে না ৷ অবশেষে, রফির দুঃখের গানের কালেকশনের মুক্তি দেওয়া হয় হাসিমুখের ছবি দিয়েই৷ এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও মুখে ছিল হাসির ঝলক।
অসম্ভব মানবদরদী ছিলেন এই মানুষটি। কতগুলো গল্প বলি —
একবার গরমকালে রেকর্ডিং করে বাড়ি ফিরছেন গাড়ি করে। দেখলেন একটি লোক এক পা তুলে দাঁড়াচ্ছে আবার কিছুক্ষণ পর সেটি নাবিয়ে অন্য পা তুলছেন। গরমে গলছে রাস্তার পিচ আর লোকটির খালি পা। গাড়ি থেকে নেবে তিনি নিজের জুতো জোড়া খুলে দিয়ে দিলেন মানুষটিকে। কল্পতরু হয়ে দান ধ্যান করে গেছেন গোপনে। তাঁর মৃত্যুর পর জানা গেছে তার দানের বহু ঘটনা।
মর্নিং ওয়াকে এক বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে একজন লোক তার কাছে এসে হাত পাতলো সাহায্যের জন্য। রফি পকেটে হাত ঢুকিয়ে যা পেলেন তাই না গুনে দিয়ে দিলেন। বন্ধুটি অবাক হয়ে বললেন, ‘যে কোন লোককে কি না গুনেই টাকা দেন!’ রফির জবাব ছিল, ‘যখন খুদা আমাকে বিনা গুনতিতে দিয়েছেন, তখন আমি তার জরুরতমন্দ বান্দাকে কেন গুনে দেবো?’

তিনি নতুন সঙ্গীত পরিচালকদের গান গাওয়ার জন্য সামান্য পারিশ্রমিক নিতেন, এমনকি অনেক সময় রফি সঙ্গীত পরিচালকদের কাছ থেকে এক পয়সাও না নিয়ে গান গেয়েছেন। এর একটি উদাহরণ হল “আপ কে দিওয়ানে” ছবিটি, যেখানে অভিনেতা রাকেশ রোশন প্রযোজক-পরিচালক হিসেবে তার জীবন শুরু করেছিলেন। রফি ছবির শিরোনামের গানটি গেয়েছিলেন কিন্তু কোনও টাকা নেননি কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে গানটি তার খুব পছন্দ হয়েছে।
অভিনেতা জয় মুখার্জির প্রোডাকশনের ‘হামসায়া’ ছবিটি বক্স অফিসের মার খাওয়ার ফলে তিনি প্রচুর লোকসানের মধ্যে পড়লেন। ছবি ফ্লপ হল কিন্তু হিট দেওয়া রফির ‘দিল কি আওয়াজ শুন’। রফি সাহেবের কথাটা কানে যেতেই তিনি এসে জয় মুখার্জির পকেটে গুঁজে দিলেন তার দক্ষিনার টাকা। জয় মুখার্জী নিতে অস্বীকার করায় তিনি পিঠ চাপড়ে হেসে বলে ছিলেন, ‘দিল কি আওয়াজ শুন’।
লক্ষীকান্ত পেয়ারেলালের প্রথম ছবি ‘পরশমণি’তে হিট গান ছিল ‘ও যব ইয়াদ আয়ে’, সুরটি রফির খুব পছন্দ হয়। তার জন্য তিনি টাকা নেননি। দোস্তি ছবির ‘চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে’ গানটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অনেক পীড়াপীড়িতে নিলেন এক টাকা। এই গানটির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেছিলেন। রফি এবং লক্ষ্মীকান্ত জুটি এক সঙ্গে ৩৬৯টি গানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারমধ্যে ১৮৬টি গানই ছিল রফির এককের। লক্ষীকান্ত পেয়ারেলালের জীবনে তিনি ছিলেন পিতৃসম। শুধু তিনি নন, সব সুরকারদের কাছেই তিনি ছিলেন ফরিস্তা।
আন্তর্জাতিক গানের সফরে বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছিলেন ক্যান্সারে চিকিৎসার যন্ত্র, যা তিনি দান করেছেন হাসপাতালে। তার জন্মই যেন হয়েছিল দান করার জন্য। মানুষটি ভালোবাসতেন ঘুড়ি ওড়াতে, মাছ ধরতে, ব্যাডমিন্টন খেলতে। কোন নেশা করতেন না। যতটুকু সময় পেতেন কাটাতেন পরিবারের সঙ্গে।
চল্লিশের দশকে রফি হামিদের চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু ভারত ভাগের পর অভিবাসন আইনের দরুন তিনি স্ত্রীকে ভারতে নিয়ে আসতে পারেন নি, ফলে স্ত্রী পাকিস্তানের লাহোরেই থেকে যান। প্রথম সংসারে রফির এক পুত্র সন্তান রয়েছে। পরবর্তীতে বোম্বেতে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি বিলকিস নামের এক রমণীর সাথে দ্বিতীয় বারের মত বিয়ে করেন। পরে এই দম্পতির সংসারে তিন পুত্র এবং তিন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।
বাংলা ভাষাতেও তিনি অনেক আধুনিক গান গেয়েছেন। ‘পাখিটার বুকে যেন তির মেরো না’, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’, ‘গুলমোহরের ফুল ঝরে যায়’, ‘ওই দূর দিগন্ত পাড়ে।’…ভাঙা বাংলা উচ্চারণে, মিষ্টি কন্ঠের জাদুতে আজও বাঙালি মুগ্ধ তাঁর গানে।

১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই তিনি মারা যান। মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে রফি জীবনের শেষ গান রেকর্ড করেন৷ গান রেকর্ড শেষ করে তিনি বাড়ি যান, তারপরেই তিনি অসুস্থ বোধ করেন৷ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে৷ রাত ১০:২৫ মিনিটে ৫৫ বছর বয়সে ভয়াবহ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন ভারতীয় সঙ্গীত জগতের অন্যতম এক মহীরুহ মহম্মদ রফি৷ তাঁর শেষকৃত্য ছিল মুম্বাই শহরের সবচেয়ে বড় শবযাত্রাগুলির মধ্যে একটি।
তার গৌরবময় ক্যারিয়ারে রফি কমপক্ষে ছয়বার সেরা প্লেব্যাক গায়কের ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার জিতেছিলেন। ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছিল।
গায়কের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ৩১ জুলাই ২০১০ তারিখে মুম্বাইয়ে মহাম্মদ রফি একাডেমি চালু করা হয়েছিল ভারতীয় ধ্রুপদী এবং সমসাময়িক সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ।
চার দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রফি ৭০০০-এরও বেশি গান গেয়েছেন এবং তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ১০০০-এরও বেশি হিন্দি ছবির সাউন্ডট্র্যাককে সমৃদ্ধ করেছে। তার গান কখনো ভোরের পেলব মাধুরী, কখনো মধ্যাহ্নের দীপ্তি, কখনো গোধূলির বিষন্নতা, কখনো বা না পাওয়ার আকুলতা, কখনো সে গান নিশীথের স্বপ্নশায়ক। ‘সূর্য ডোবার পালা’ এলেও আজও সংগীত প্রিয় মানুষের অন্তরে ধ্বনিত হয় শাশ্বত গায়কের সেই বিখ্যাত গান, ‘ইয়াদ না যায়ে বিতে দিনো কি’।