‘খোয়া খোয়া চাঁদ’, ‘কৌন হ্যায় জো সপনো মে আয়া’, ‘তারিফ কারু কেয়া’ …. এমন অজস্র সব বিখ্যাত গান প্রাণ পেয়েছে যাঁর কন্ঠে সেই কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী মহম্মদ রফির আজ ৩১শে জুলাই ২০২৫, ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। দেশাত্মক বোধক গান থেকে শুরু করে আইটেম নাচের গান, বিরহ থেকে চূড়ান্ত রোমান্টিক গান, সুফি কাওয়ালী থেকে ভজন ভক্তিমূলক সংগীতের সব ঘরানায় অবাধ বিচরণ ছিল রফির মধুডালা বহুমুখী কন্ঠের। তার কন্ঠের রেঞ্জ ছিল সাংঘাতিক। প্রয়াণের এত বছর পরেও রফির জনপ্রিয়তা অমলিন। ১৯৪০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত, প্রায় প্রতিটি গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং সুরকার তাঁর সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আজও তাঁর সুরের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে বহু শ্রোতা–অনুরাগী, বদল হয়নি ভারতীয় সঙ্গীত শাহেনশার মুকুটটির উত্তরাধিকার। আজকের এই বিশেষ দিনে বলবো তাঁর সঙ্গীত সফরের কাহিনী।
তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার বর্তমান মাজিথার কাছে অবস্থিত কোটলা সুলতান সিংয়ের অধিবাসী হাজী আলী মোহাম্মদের ষষ্ঠ সন্তান হিসাবে ২৪ ডিসেম্বর, ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন রফি। রফির ডাক নাম ছিল ফিকো (আদর করে ডাকা হতো)। শৈশব থেকেই ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ফিকো স্বপ্ন দেখতেন তিনিও আকাশে উড়বেন অনেক উঁচুতে। একদিন তার নিজ গ্রামে এক ফকিরের ভজন মন দিয়ে শোনেন আর তাঁর অনুকরণ করে নির্ভুলভাবে মিষ্টি আওয়াজ নিয়ে গান গাওয়া শুরু করেন। ফকির স্তম্ভিত হয়ে শোনে ওইটুকু বাচ্চার গানের গলা প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘তোমার কন্ঠ একদিন পৃথিবী শাসন করবে.’

জীবিকার সন্ধানে তার বাবা হাজী আলী মোহাম্মদ ১৯২০ সালে পাকিস্তান দেশে লাহোরে চলে যান এবং ভাট্টি গেটের নূর মহল্লায় একটি সেলুন খোলেন বড় ছেলে দীনকে সঙ্গে নিয়ে। বাবার আয় বাড়ায় পুরো পরিবার চলে আসে লাহোরে। তাই চতুর্থ শ্রেণীর পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি ফিকোর। বাবা একটি ধাবা চালান আর দীন খুলেছে সেলুন। সেখানে ফিকোর কাজ চুলাদাড়ি কাটার। চুলদাড়ি কাটার সময় ফিকো আপন মনে গান গায় আর খদ্দেরা ফিকোর গান শুনে খুব খুশি হয় ।এই বয়সে তালিম না নিয়ে এমন মধুর গলা ভাবা যায় না!
একদিন সেলুনে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন লাহোরের অল ইন্ডিয়া রেডিওর প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ জীবনলাল মাট্টু। গান শুনে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। সটাং সেলুনে ঢুকে সোজা প্রশ্ন করলেন, ‘রেডিওতে গান গাইবে’, ফিকোর দৃঢ় জবাব ছিল ‘হ্যাঁ’। উনিশ বছর বয়সে অডিশন দিলেন রফি।প্রথম জনসাধারণের সামনে রেডিওতে তিনি কেএল সায়গলের সাথে লাহোরে গান গাইলেন।
বড় দাদা দীন ও প্রিয় বন্ধু হামিদ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিলেন কিছুতেই নষ্ট হতে দেবেন না ফিকোর প্রতিভা। শুরু হলো লাহোরের বিখ্যাত শিল্পী ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান, ছোট গোলাম আলী খান, আব্দুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবন লাল মাট্টু এবং ফিরোজ নিজামীর কাছ থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা।
সুরকার শ্যামসুন্দর পাঞ্জাবি ছবি ‘গুল বালোচ’ এ মহাম্মদ রফিকে দিয়ে গাওয়ালেন। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে মহম্মদ রফি প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন এই সিনেমায়। জিনাত বেগমের সাথে “সোনিয়ে নি, হেরিয়ে নি” গানটি দ্বৈত সঙ্গীত হিসেবে রেকর্ড করেন তিনি।সবাই অবাক হয়ে গেলো তার কণ্ঠের সুক্ষ মডিউলেশন শুনে।

রফির গানের পরিধি বিস্তৃত করার জন্য হামিদ তাকে নিয়ে চলে এলেন বোম্বে। অনেক কষ্টে ভেন্ডি বাজারে ১০০ বছরে পুরনো এক ‘চওল’-এ ৫ টাকায় ঘর ভাড়া করে চলল গান গাওয়ার সুযোগ খোঁজা। অনেক চেষ্টার পর এক জলসায় রফির পাঁচ মিনিটের জন্য গান গাওয়ার সুযোগ এলো। সেখানে গাইবেন বিখ্যাত গায়ক কুন্দনলাল সায়গল ককোন ফ্লিমের গান নয়, দরবারি কানাড়ায় এমন মখমলি কন্ঠে ত্রুটিহীন খেয়াল, দর্শক আগে কখনো শোনেননি। উদ্যোক্তারা খোঁজ নিয়ে জানলেন, ঘন্টার পর ঘন্টা সাধনা করেন গায়ক মেরিন ড্রাইভের বিচে বসে।
এমনই একদিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে তার গান শুনে চমতকৃত হলেন সেখানে নামজাদা গায়িকা অভিনেত্রী সুরাইয়া। খোঁজ নিয়ে জানলেন, ঘরের পাতলা দেওয়ালে যাতে কারোর অসুবিধা না হয়, তার জন্যই তিনি এখানে বসে রেওয়াজ করেন।
১৯৪৪ সালে বোম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে যে কোন ধরনের গানের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কম্পোজিশনে যথার্থ তালিমপ্রাপ্ত গায়কের প্রয়োজন হয় পারে। হামিদের অক্লান্ত চেষ্টায় নওশাদ আলী ‘পহেলে আপ’ ছবিতে রফির গান গাওয়ার সুযোগ করে দিলেন শ্যামসুন্দর ও আলাউদ্দিনের সঙ্গে। গানটি ছিলো ‘হিন্দুস্তান কি হাম হ্যায়’। এটি ছিলো তাঁর হিন্দি ভাষার প্রথম গান রেকর্ড।পরবর্তীকালে এই জুটি সৃষ্টি করেছিলেন সংগীত প্রেমীদের জন্য শাশ্বত গানের সম্ভার।
রেকর্ডিংয়ের পর সাবাশি হিসেবে দশ টাকা দিয়েছিলেন নওশাদ। তাতেই স্বর্গীয় আনন্দ পেয়ে ছিলেন রফিসাহেব। হঠাৎ করে নওশাদের চোখে পড়ল রফির পা দিয়ে রক্ত ঝরছে। আসলে রেকর্ডিং এ আসবে বলে নতুন জুতো কিনে দিয়েছিল হামিদ, প্রচন্ড টাইট হওয়ায় রক্ত বেরিয়ে এসেছিল। অথচ কি হাসি মুখে সহ্য করে নিয়েছিল রফি। সেদিন নওশাদ বুঝেছিলেন, ছেলেটির আত্মবিশ্বাস ও হাসিমুখে কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা অসীম। কত যে কষ্ট সহ্য করেছিলেন রফি, তার ইয়াত্তা নেই। সময় মত স্টুডিওতে যাতে পৌঁছতে পারেন তার জন্য কত রাত কাটিয়েছেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। একটা ঘটনা বলি।
একবার নওশাদের তত্বাবধানে একটি কোরাস রেকর্ডিং ছিলো। রেকর্ডিং হয়ে যাওয়ার পর নওশাদ দেখলেন সব শিল্পী চলে গেল রফি মুখ নিচু করে বাইরে বসে আছে। নওশাদ খোঁজ নিয়ে জানলেন যে স্টুডিওতে আসার জন্য তার কাছে এক টাকা ছিল, বাড়ি ফেরত যাওয়ার পয়সা তার কাছে নেই। নওশাদ তাঁকে এক টাকা দিলেন। কিন্তু রফি সেটা খরচা না করে হেঁটে ফিরলেন।
এর কয়েক বছর রফির জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। যখন তিনি রফি থেকে মহাম্মদ রফি সাহেবে পরিণত হয়েছেন, তখন তিনি এই এক টাকাটাকে সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। অতীতকে কখনো ভোলেননি, অসম্মানও করেনি রফি। তার মৃত্যুর পর নওশাদ বলেছিলেন, ‘এমন মানুষ রোজ জন্মান না, তিনি ছিলেন ‘আধুনিক যুগে তানসেন’।মানুষ রূপে এই দেবদূতের আসন চিরকালই খালি থাকবে।’
নওশাদ আলী ছিলেন রফির কর্মজীবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। নওশাদের পরিচালনায় রফি অনেক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। ১৯৪৬ সালে দ্বৈত সঙ্গীতরূপে ‘আনমল ঘড়ি’তে “তেরা খিলাউনা তোতা বলাক” গানটি রেকর্ড করেন। মহম্মদ রফি’র পূর্বে নওশাদের প্রিয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী তালাত মাহমুদ। একদিন রেকর্ডিং চলাকালে তালাত মাহমুদকে ধুমপানরত অবস্থায় দেখতে পান নওশাদ। এতে তিনি তার প্রতি ভীষণভাবে রেগে যান। ফলে ‘বৈজু বাওরা’ ছবির সকল গানই মহাম্মদ রফিকে দিয়ে গাওয়ান। নওশাদের সাহচর্য্যে রফি নিজেকে হিন্দী সিনেমার ভুবনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও কিংবদন্তি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।বৈজু বাওরার গান হিসেবে — ‘ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে’ এবং ‘মন তারপাত হরি দর্শন কো আজ রফি’-র কণ্ঠকে অবিসংবাদিত তারকা খ্যাতি এনে দেয়। নওশাদের দিক-নির্দেশনায় সর্বমোট ১৪৯টি সঙ্গীত পরিবেশন করেন রফি। তন্মধ্যে তার সলো বা একক সঙ্গীত ছিল ৮১টি।

মৃত্যুর ঠিক একদিন আগে নওশাদের জন্য গান রেকর্ড করেছিলেন মহম্মদ রফি৷ ছবির নাম ছিল ‘হাব্বা খাতুন’৷ গানের লিরিক্স ছিল, “জিস রাত কা খাওয়াব আয়ে, ও রাত আয়ি…”৷ গানের রেকর্ড শেষ হওয়ার পরেই স্টুডিয়ো থেকে বেরিয়ে রফি কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেন নওশাদকে৷ তিনি বলেন, “অনেকদিন পর এক দারুণ গান গাইলাম৷ আজ অনেক শান্তি পেলাম৷ এখন মন করছে এবার আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারি৷” তার পরের দিনই মৃত্যু হয় রফির৷ এমনটা হবে, ভাবতে পারেননি নওশাদ৷ এমনকী, এই গানের জন্য তৈরি চেকও নেননি রফি৷
মহাম্মদ রফি ভারতের অন্যতম বহুমুখী এবং দক্ষ গায়ক ছিলেন। ১৯৪০-৫০ সালের মধ্যে কেরোসিনের বিজ্ঞাপন দিতে হত কারণ জ্বালানি কাঠ কেরোসিনের চেয়ে সস্তা ছিল। এই কারণে বার্মাশেল কোম্পানি মহাম্মদ রফিকে বিজ্ঞাপনের গান গাওয়ার জন্য ভাড়া করেছিল যাতে বিক্রি বাড়ানো যায়। সেই বিজ্ঞাপনটি কেবল রেডিওতে প্রচারিত হত কারণ তখন রেডিওই ছিল বিজ্ঞাপনের একমাত্র প্রধান মাধ্যম। সেই সময় বার্মাশেল কোম্পানির কেরোসিনের নাম ছিল “ঘাসলেট”।
১৯৫০-এর দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত এই বিজ্ঞাপনটি যখন কেবল রেডিওর মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা সম্ভব ছিল, তখন রফি সাহেব বিজ্ঞাপনটিতে একই প্রাণশক্তি, আবেগ এবং প্রাণ এনেছিলেন যা তিনি তার প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান, যেমন “অ্যায় ওয়াতন অ্যায় ওয়াতন” এবং “ইয়ে দেশ হ্যায় বীর জওয়ান কা”, গর্বের সাথে ঘোষণা করেছিলেন যে ভারতের প্রতিটি গ্রামে এবং প্রতিটি শহরে বার্মা শেল ব্যবহৃত হয়। “মিত্তি কা তেল” গানটি অবশ্যই সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলো।