শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:১৩
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কৃষ্ণনগর শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার : অমৃতাভ দে

অমৃতাভ দে / ১৩০৬ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৭ জুলাই, ২০২৫

“আজ সমূহ সংশয়ের আঁধির মধ্যে রয়েছে স্বদেশ। এগোবার পথের কোনো স্থির নিশানা নেই কোথাও। এ আঁধি থেকে ত্রাণ কোন পথে কেউ নিশ্চিত জানে না। ভাবনার সংকটের এই খিন্ন সময়ে কখনও কখনও বিজয়লালের মতো চারিত্র-মূর্তির স্মৃতি মনে গভীর প্রশ্ন আনে।”

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সত্যজিৎ চৌধুরী কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন কবির জন্মশতবর্ষে (১৯৯৭) প্রকাশিত একটি রচনায়। খুব ছোটোবেলা থেকেই কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের কথা শুনেছি। আমাদের গ্রামে অর্থাৎ নদিয়া জেলার বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে তাঁর জীবনের অনেকটা সময় প্রায় ২৮ বছর কেটেছে জলঙ্গী নদীতীরে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত লোকসেবা শিবিরে। বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে গ্রন্থাগার, বেসিক ট্রেনিং কলেজ, নার্সারি স্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, গদাধরের মন্দির প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, প্রবর্তন করেন সর্বধর্ম সমন্বয়ভাবনার উৎসব গদাধরের মেলা। তাঁর সঙ্গে অন্তরঙ্গতার সম্পর্ক ছিল এমন কিছু মানুষের কাছ থেকে জানতে পেরেছি — তাঁর কবিত্ব, তাঁর বাগ্মিতা, তাঁর বিপুল পড়াশুনো, পাণ্ডিত্য, দৃপ্ত হাঁটাচলা, তাঁর অসম্ভব সুন্দর হস্তলিপি, তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা, তাঁর প্রাণোচ্ছলতা পরিহাসপ্রিয়তা, তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা ও অকৃত্রিম গুণগ্রাহিতা নিয়ে তিনি ছিলেন বড়োই আকর্ষণীয় এক ব্যক্তিত্ব।

স্বাধীনতার ৭৬ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের ১২৫ বছরও পেরিয়ে এলাম আমরা। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার ৮০ বছর অতিক্রম করল। একটু পিছনের দিকে ফিরে তাকালে কী দেখব? ১৯৪০ সালে স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবতার জয়গান করে বিজয়লাল শুরু করেন ‘চারণ আন্দোলন’ — রচনা করেন চারণগীতি। গ্রামে গ্রামান্তরে সেই গান অনেককে নিয়ে গাইতে শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য দেশকে প্রস্তুত করা।মনে পড়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় সেই গান —

“চাই স্বাধীনতা, সাম্য চাই,

 গাহ দিকে দিকে চারণদল।

 পীড়িত দলিত, বন্দী নর,

 সবলে দু’হাতে ভাঙ্ শিকল।”

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার রাজপথে শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্টের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হন বিজয়লাল এবং অচৈতন্য অবস্থায় আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। পরে কৃষ্ণনগর প্রত্যাবর্তন করেন এবং কৃষ্ণনগর জেলে বিনাবিচারে বন্দী হন। কারামুক্তির পর কৃষ্ণনগর নগেন্দ্রনগরে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার এবং একটি হরিজনপল্লীতে নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একজন মানুষের কথা যিনি কৃষ্ণনগর শহরের সবার কাছে পরিচিত ছিলেন ‘মাস্টারমশাই’ নামে, তিনি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী। নিরক্ষর হরিজনপল্লীর অবৈতনিক শিক্ষকের কাজ পেয়েছিলেন বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। মাস্টারমশাই লিখছেন —

“কবি ইস্কুলের জমিকেনা আর ঘর তৈরীর টাকা সংগ্রহ করলেন এক অভিনব উপায়ে। দু’আনা দামের টিকিট করে ভারতের আদর্শ ও সাধনা বিষয়ে পরপর চারটি বক্তৃতার ব্যবস্থা করে কয়েকশ’ টাকা তুলেছিলেন।”

১৩৫১ সালের বৈশাখ মাসে অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য দিনে নগেন্দ্রনগরে ডাক্তার ভোলানাথ বিশ্বাসের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারে জন্ম হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের একটি প্রতিকৃতির সামনে বসে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যাঁদের নিয়ে গড়া হয়েছিল পাঠাগারের প্রথম পরিচালন সমিতি। সভাপতি ছিলেন অতীন্দ্রনাথ হালদার। আর এই প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকে প্রায় দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যাঁর নাম বারবার উচ্চারিত হয় সেই ‘মাস্টারমশাই’, দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী প্রথম পরিচালন সমিতির সম্পাদক ও হিসেব রক্ষক ছিলেন।

এই পাঠাগার যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় কলকাতার এক দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকের কাজ নিয়েছিলেন। বাড়ি আসতেন সপ্তাহের শেষে শনিবার এবং রবিবার, ছুটির দিনে নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকতেন। পাঠাগার প্রতিষ্ঠার ৬ মাস পরে হরিজনপল্লীতে একটি বিদ্যালয়ের সূচনা হয়, ৮-১০ জন কিশোর ছাত্রকে নিয়ে। রাস্তার ধারে দাওয়ায় প্রথম স্কুল শুরু হয়। ১৯৪৫ সালে হোল্লির গঙ্গারাম দাসের জমিতে একটি আটচালা বিদ্যালয় গৃহ তৈরি হয়। প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক সুধীর চক্রবর্তী পাঠাগারের ৭৫ বছর পূর্তিতে লিখছেন, — “অচিরে গড়ে উঠল হরিজন পল্লি। একটা ছোটো ঘরে নৈশ বিদ্যালয় পত্তন করে বিজয়লাল শিক্ষার আলো জ্বেলে দিলেন। লণ্ঠন জ্বেলে পল্লির ছেলেমেয়েদের পড়ানো, গল্প বলা, নীতিশিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতন করা, গান করা, সব তাতেই অগ্রণী ও একক মাস্টারমশাই। বিপুল প্রসারিত তাঁর কাজের জগৎ। পাঠাগার, চরকাকেন্দ্র, হরিজন বিদ্যালয় চালানো। বিজয়লাল তাঁর প্রভাব খাটিয়ে গড়ে দিলেন স্কুল ঘর (ক্রমে তা পাকা হয় ), পুরসভাকে ধরে আদায় হল টিউবওয়েল, পথ ও নর্দমা। মাদক বর্জনের অভিযান শুরু হল। শ্রী রামকৃষ্ণ পাঠাগার ও হরিজন বিদ্যালয় সেই থেকে আজ পর্যন্ত একাঙ্গ হয়ে বয়ে চলে পঁচাত্তর বছর। বিজয়লাল ও মাস্টারমশাই প্রয়াত হয়েছেন।” ৮০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তাঁকেও পেলাম না আমরা অর্থাৎ ৮০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের আগেই সুধীর চক্রবর্তীও প্রয়াত হয়েছেন।

বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় লিখছেন — “নগেন্দ্রনগরের ভাড়াটে জীবনে যে বাসায় থাকি তারই একটি ঘরে রামকৃষ্ণ পাঠাগারের জন্ম। দু-একটি আলমারীতে কতগুলি ভালো ভালো পুঁথি। শক্তি, শম্ভু, কালু, প্রফুল্ল এবং আরও কেউ কেউ আসতো পড়তে। আমি সংসারী। সংসারের খরচ আছে। ছেলেমেয়ে এসেছে সংসারে। সুতরাং কলিকাতায় সাংবাদিকের কাজ নিতে হলো। ‘লোকসেবক’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদকের ভূমিকায় অবতরণ করা গেল। শনিবার কৃষ্ণনগরে আসি। রবিবারটা কোথা দিয়ে আনন্দের মধ্যে কেটে যায়। রবিবার সকালে দেবপ্রসাদবাবু দলবল নিয়ে আসেন। শ্রীরামকৃষ্ণের ছবির সামনে আমরা গান করি সোৎসাহে। তারপর সবাই মিলে শহরের উপকণ্ঠে বেড়াতে যাই। নীল নির্মল আকাশের নিঃসীম থেকে ঝ’রে পড়ছে শীতের আতপ্ত রোদ্দুর। নদীতীরের সর্ষের ক্ষেতগুলির চেহারায় চোখ জুড়িয়ে যায়। হলুদ ছোপানো আলোয়ান গায়ে দিয়ে প্রান্তরলক্ষ্মী কী আরামে নদী-তীরে পা ছড়িয়ে বসে আছে। দুপুরে চামার পল্লীর ছেলেদের এক এক জনকে মধ্যাহ্ন-ভোজনের নিমন্ত্রণ করতাম। গৃহিণী দুইটি আসন পাশাপাশি পেতে দিতেন। কাঁসার দুখানা থালায় সাজিয়ে দিতেন অন্নব্যঞ্জন। খাওয়া হয়ে গেলে নিজের শাঁখাপরা দুটি সুডোল হাতে পরিষ্কার করতেন উচ্ছিষ্ট। কী মানুষই এসেছিলেন জীবনের পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পথে জীবনসঙ্গিনীর ভূমিকা নিয়ে। কতদিন দেবপ্রসাদবাবুর এবং আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন চামার পল্লীতে সাফাইয়ের কাজে। নিজের হাতে পল্লীর আঙিনায় আঙিনায় লাগিয়েছেন তুলসীর গাছ।

হরিজন পল্লীর এই বিদ্যালয়টির কথা পাঠাগারের সঙ্গে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয়। শুরুর সময়েই বিপ্লবী হেমন্ত কুমার সরকার একটি ছোট আলমারি আর বই কেনার জন্য কিছু টাকা দেন। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় কিছু বই দেন। কিছু বই কেনা হয়। চালু হয়ে যায় লাইব্রেরি। গোলবাড়ির বারান্দায় বসে বই দেওয়া-নেওয়া করতে থাকেন শক্তিপদ দত্ত, পাঠাগারের প্রথম গ্রন্থাগারিক। পাঠাগার শুধু বই আদান-প্রদানের মধ্যেই আটকে থাকেনি। শুরু থেকেই পাঠাগারের ছেলেমেয়েরা জড়িয়ে গিয়েছিল খেলাধুলার সঙ্গে। পাঠাগারের ছেলেমেয়েরা অনেকেই সরু সুন্দর সুতো কাটতে শিখে গিয়েছিল। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় স্কুলের ছেলেদের সামনেই চরকাকেন্দ্র স্থাপনের কথা বলেছিলেন।

আগেই বলেছি কৃষ্ণনগরের নগেন্দ্রনগর পল্লিতে সমাজ-সংস্কৃতি মনস্ক কয়েকজন ব্যক্তির সহায়তায় চারণকবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের মুখ্য উদ্যোগে ১৩৫১ (১৯৪৪) সালে শুভ অক্ষয় তৃতীয়ায় যাত্রা শুরু করে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার।অচিরে পরিবর্ধিত কার্যক্রমে নগেন্দ্রনগর সন্নিহিত অনুন্নত, অশিক্ষিত ও অসহায় চর্মকারবৃত্তির হরিজনদের স্বনির্ভর জীবন-জীবিকার লক্ষ্যে স্থাপিত হয় শ্রীরামকৃষ্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়–সর্বাঙ্গীণ দায়িত্ব নেন মাস্টারমশাই, দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী। বর্তমানে পল্লিবাসী উচ্চতর পঠনপাঠনের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। হরিজন পল্লিটি আজ ৮০ বছর পর আর পাঁচটা পল্লির মতোই স্বাভাবিক ও স্বয়ম্ভর এবং এই পল্লির সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারের যোগাযোগও অটুট। গ্রন্থাগার হিসাবে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার আজ এই জেলার অন্যতম ঐতিহ্যশালী গ্রন্থাগার–এর পুস্তক সংখ্যা প্রায় ৮০০০ এবং একই সঙ্গে এটি দুষ্প্রাপ্য পত্র-পত্রিকায় সমৃদ্ধ। পাঠাগারের সাংস্কৃতিক দল শহরে সুপ্রতিষ্ঠিত, ক্রীড়া বিভাগটি নদীয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার ‘এ’ পর্যায়ের ক্লাব। শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার পরিচালিত জেলা ক্রীড়া সংস্থার অনুমোদিত ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ৩৮ বছর অতিক্রান্ত। অ্যাথলেটিকস দলের অনেকেই জেলা, রাজ্য দলের অন্তর্ভুক্ত — সম্প্রতি পাঠাগারের রেজওয়ানা মল্লিক হেনা দেশের হয়ে তাসখন্দে এশিয়ান যুব অ্যাথলেটিকস মিটে ৪০০ মিটার দৌড়ে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে।

সম্প্রতি ২০২৩ সালে এই প্রতিষ্ঠান পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠার ৮০তম বর্ষে। কার্যনির্বাহক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুসারে ২৯-৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ তিনদিনব্যাপী নানারকম উৎসব ও সমাবেশে, প্রাক্তন ও বর্তমানের পুনর্মিলনে এবং নবাগতদের অংশগ্রহণে খেলাধূলা ও গানে মুখরিত হয়ে উঠছিল আমাদের প্রিয় শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারের পরিপার্শ্ব। ২৮শে ডিসেম্বর সকাল ৮ টায় পাঠাগারভবনে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ও হয় পদযাত্রা। যাত্রা শেষ দেবপ্রসাদ পল্লিতে এবং সেখানে হয় সময়োচিত অনুষ্ঠান। সন্ধে ৫ টায় ছিল পাঠাগারভবনে কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ২৯ ডিসেম্বর সন্ধে ৫টায় পাঠাগারভবনে তিনটি স্বল্প সময়ের অন্তরঙ্গ থিয়েটার ছিল। অংশগ্রহণে ছিল কৃষ্ণনগরের থিয়াস, সিঞ্চন ও কলস্বর নাট্যদল। ৩০ ডিসেম্বর বিকেলে রবীন্দ্রভবনে হয় সম্মাননাজ্ঞাপন, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও রবীন্দ্রগীতিনাটক ‘বাল্মীকি প্রতিভা’।

৩১ ডিসেম্বর সকালে ছিল নগেন্দ্রনগর ইউনাইটেড রেড স্টারস ক্লাব মাঠে প্রাক্তনদের প্রীতি ক্রিকেট খেলা। পাঠাগারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা বাচিকশিল্পী আকাশ লিখছে, — “পাঠাগারের ৮০ বছর…দেশ স্বাধীন হল…দেশভাগ হল…দাঙ্গা হল…পাঠাগারের ৮০ বছর…গান্ধী হত্যা…খাদ্য-আন্দোলন…পাঠাগারের ৮০ বছর…একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ…নকশাল আন্দোলন…পাঠাগারের ৮০ বছর…কবি বিজয়লাল কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন হরিজন পল্লীর দিকে। …তাঁর সঙ্গ নিলেন মাস্টারমশায়…সুধীরবাবু তখন তরুণ অধ্যাপক…পাঠাগারের ৮০ বছর…আমি যখন মা’র সঙ্গে পাঠাগারে গেলাম তখন আমার বয়স চার…আবৃত্তি প্রতিযোগিতা…প্রথম হলাম…পুরস্কার আনতে গিয়ে দেখি নাটক হচ্ছে…মা বলল চুপ করে শোন, এ হল “তাসের দেশ”…পাঠাগারের ৮০ বছর…রাজপুত্র আর সওদাগরপুত্র দেশ থেকে দেশান্তরে চলে গেল তারপর…আর একবার প্রতিযোগিতায় পাঠাগারে গিয়ে,জারুলগাছটার নীচে দাঁড়িয়ে বাবা বলেছিলে জানিস, এই এখান থেকে একদিন নদী দেখা যেত…আমাদের খোড়েনদী…রুপোর মত বালি চিকটিক করতো রোদ্দুরে আর জ্যোৎস্নায়…পাঠাগারের ৮০ বছর…”

সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানও ১৯৯৩ সালের ২৪ থেকে ২৭ ডিসেম্বর খুব ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। সুবর্ণজয়ন্তী স্মারক গ্রন্থ সুবর্ণেসাযপান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক সত্যজিৎ চৌধুরী। আয়োজন করা একটি প্রদর্শনীর। প্রদর্শনীতে সাজানো ছিল ৫০ বছরের বিভিন্ন সামগ্রী স্মৃতিসারক। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বেরিয়েছিল শহরের পথে। হয়েছিল প্রাক্তনদের ক্রিকেট ম্যাচ।

শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার প্রতিষ্ঠার ৭৫তম বর্ষ উদযাপন এবং একই সঙ্গে পাঠাগারের রূপকার মাস্টারমশাই দেবপ্রসাদ চক্রবর্তীর জন্মশতবর্ষ পালনে ব্রতী ছিল এই প্রতিষ্ঠান।এই উপলক্ষে ২৮ থেকে ৩০ শে ডিসেম্বর ২০১৮ তিন দিনব্যাপী নানারকম উৎসব, সমাবেশ, প্রাক্তন ও বর্তমান পুনর্মিলন এবং নবাগতদের অংশগ্রহণে খেলাধুলা সংগীতানুষ্ঠান, বক্তৃতা এবং নাট্যাভিনয়ে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল প্রিয় এই প্রতিষ্ঠান ও পরিপার্শ্ব। অনুষ্ঠান শুরুর দিনে প্রকাশ পেয়েছিল একটি স্মরণিকা। বহু তথ্য সমৃদ্ধ এই স্মরণিকা সম্পাদনা করেছেন রামকৃষ্ণ দে। বিশিষ্ট লেখকদের লেখায় উঠে এসেছে পাঠাগারের ইতিহাস আর অবশ্যই মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে পাঠাগারের সম্পর্কের কথা। আগামী প্রজন্মের কাছে এই স্মরণিকাটি বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেবে।

২০২৩ সালে পাঠাগারের ৮০ বছর পূর্তি হলো। দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী, দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে এই পাঠাগার। পাঠাগারের বর্তমান সম্পাদক শ্রী চন্দন সরকার লিখছেন —

 

“শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার শুধুমাত্র একটি গ্রন্থাগার নয়, একটি গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সকলে প্রথমে জড়ো হয় গ্রন্থাগারে। তাঁদেরই অনেকে সাংস্কৃতিক জগতে পরিচিত নাম, জেলা ও রাজ্য পর্যায়ের খেলোয়াড়, দেশে বিদেশে কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত কিংবা হরিজনপল্লির সেবামূলক কাজে নিয়োজিত। কিন্তু গোড়ার গড়াটা হয় এই গ্রন্থাগার থেকেই।

শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার এই জেলার অন্যতম বেসরকারি গ্রন্থাগার। বর্তমান পুস্তক সংখ্যা ৭৯০৩ সঙ্গে পত্র-পত্রিকা ও ইংরাজি বই। মঙ্গলবার বাদে সপ্তাহে ছয়দিন বিকেল ৪.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ পর্যন্ত গ্রন্থাগার খোলা থাকে। সদস্য সংখ্যা একেবারে হতাশাজনক নয় তবে সর্বত্র বই পড়ার যে অনীহা তা এই গ্রন্থাগারকেও স্পর্শ করেছে। সব রকম সরকারি সাহায্য বন্ধ — চলছে পাঠাগার — পরিবারের শুভার্থীদের আনুকূল্যে। বিভিন্ন সমস্যা থাকবেই কিন্তু তার মধ্যেই আজ যে গ্রন্থাগারের বয়স ৮০, তা শতবর্ষে পৌঁছাবে এই আশা রাখি — দৃঢ়তার সঙ্গে।”


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “কৃষ্ণনগর শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার : অমৃতাভ দে”

  1. Ranjit Kumar Das says:

    Very nice. A legacy of education, cultural activities, sports, untouchability and the mission of upliftment of the downtrodden to be continued.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন