বেশ অনেক রাতে মনোজের ভিডিও মেসেজটা এসেছিল। তারপর থেকে কবিতা আর নিজের মধ্যে নেই। দেওয়ালে মাথা ঠুকে কেঁদেছে। গলগল করে ঘেমেছে। হাউ হাউ করে বাচ্ছাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। ভোররাতে সে স্বপ্ন দেখল, অন্ধকার গুহার মধ্যে সে পথ ভুলে আটকে পড়েছে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে দিশাহারা। সামনের পথ অনিশ্চিত।
ঘুম ভাঙতেই আগুপিছু না ভেবে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে, মেয়ের হাত ধরে কবিতা গঙ্গার ঘাটের দিকে দৌড়ল। মা সেই কাকভোরে উঠে দুয়ারে জলের ছড়া দেয়। ঠিক পিছু ডাকল, ‘কাঁহা যাতা রে কবিতা!’
কবিতা উত্তর দেয়নি। ঘাটে গিয়ে দেখে ঐ সকালে পুলিশ, লোকজনের ভিড়ে ভিড়াক্কার গোটা চত্বর। একটা লাশ নাকি আটকে আছে ঘাটের কিনারে। কবিতার বুকটা কেমন জানি কেঁপে উঠল!
ঠিক তক্ষুনি গুড্ডি মায়ের গলা জড়িয়ে বলে, “হমর কা ভুখ লাগলবা মাঈ। ঘর চল না”। বোউয়া কি জানি কি ভেবে কবিতার গলা জড়িয়ে গালে একটা চুমু খেলো। কবিতার আর মরা হল না। রামসীতা মন্দিরে পন্ডিতজী ঘন্টি বাজিয়ে ঠাকুরকে শয়ান থেকে তুললেন।
কবিতা ধীর পায়ে বাড়ি ফিরে আসতেই মা আবার চেঁচাল, “কোথায় যাস ছেলেপুলে নিয়ে সকাল সকাল! সমানে ফোন বেজেই চলেছে তোর!”
কবিতার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। ধপ করে উঠোনের মাঝখানে বসে পড়তেই মায়ের সন্দেহ হল, “কা ভইল তোহার!”
শান্তশিষ্ট কবিতা যে কোনোদিন মায়ের মুখের ওপর কোনো কথা বলেনি, সে হঠাৎ বাড়ি মাথায় করে চেঁচিয়ে উঠল, “— থোড়া চুপ রহী মাঈ। আমার জীবনটা তো তছনছ করেই দিলে তোমরা! এখন শান্তিতে মরতেও দেবে না!”
— কাহে মরী তু! কি হোলো তোর আবার নতুন করে! বাচ্ছাদের কথা কি তুই একটুও ভাববি না! মায়ের কথাও না!
মাঈয়ের কাছে কি করে উচ্চারণ করে এমন কথা কবিতা! কি করে জানায় সে মনোজের নোংরা কুকীর্তি! মুখে হাত ঢেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে,
— হম না বোল সকী মাঈ, হম না বোল সকী!
মা ভাবে, সবটাই ভাগ্য। কই অন্য মেয়েদের সঙ্গে তো এমনটা হয় নি।
বিয়ের আগে বেশ কেটেই যাচ্ছিল মা-মেয়ের জীবন। গরীব হলেও খাওয়া পরার অভাব ছিল না তাদের। ভোর ভোর মায়ের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি কাজ করে একটু বেলায় কলেজ যেত কবিতা। বস্তির দু-তিনটে ঘরের ভাড়া, গ্রামে ফসল বেচার টাকা পাঠাত ভাইয়া। বিকেলে বকুলতলার আন্টির কাছে সপ্তাহে তিনদিন কবিতা টিউশ্যনে যেত। আন্টি পয়সা নিত না, বলত, ‘তোর মাথা আছে কবিতা। ভালো করে পড়াশোনা কর।’
পড়াশোনার সঙ্গে কলেজে পড়তে পড়তে প্রেমও এসেছিল কবিতার জীবনে। বাঙালি ছেলে বাদল পড়াশোনার পাট চুকিয়ে হার্ডওয়্যারের একটা ছোটোখাটো ব্যবসা করে। স্বপ্নের ইঁট গেঁথে বাবামাকে সে আরো একটু ভালো রাখতে চায়। সে স্বপ্নে কবিতাও কখন ঢুকে পড়েছিল! লজ্জায়, সঙ্কোচে তাদের ভালোবাসা ধীরে ধীরে ডানা মেলছিল তখন।
ওদিকে বাড়িতে অবশ্য কবিতার শত বাধা সত্ত্বেও বিয়ের দেখাশোনা চলছে। পাত্রপক্ষের চাহিদাও কিছু কম নয়। নগদ টাকা, মোটর সাইকেল, বাসনকোসন, ফার্নিচার সব চাই তাদের। কবিতার দিদি-জীজাজীরা, ভাইয়া বললো, ‘আমরা সবাই মিলে যোগাড়যন্তর করব মাঈ। ফিকির মত করী। মেয়েকে আর ঘরে বসিয়ে রেখো না। বিয়েটা দিয়ে দাও।
একমাত্র আপত্তি করেছিল বকুলতলার আন্টি, ‘মেয়েকে তোমাদের ইউ পির গ্রামে বিয়ে দিও না কবিতার মা। লেখাপড়া শেখা মেয়ে ওখানে মানিয়ে নিতে পারবে না’।
আন্টি জানত বাদলের কথা। মাঈকে ঘুরিয়ে বলল, — ‘দিন যাক না। তারপরে দেখেশুনে কোনো বাঙালি ছেলের সঙ্গেই বিয়ে দিও। ততদিনে কবিতাও ছোটোখাটো কাজ খুঁজে নেবে খ’ন।
— না গো বৌদি। বাঙালি ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে আমাদের সমাজ ছিছি করবে। গাঁয়ে আমরা একঘরে হয়ে যাব। এ রিস্তাও আমি হাতছাড়া করতে পারব না। জমিজমা, গায়ভৈঁষওলা পরিবার। ছেলে দিল্লিতে নোকরি করে। কবিতার খাওয়া পরার অভাব হবে না।
— বিয়ের পর কবিতাকে সঙ্গে করে জামাই দিল্লিতে নিয়ে যাবে তো!
— সে কথা এক্ষুনি কি করে বলি বলো!
— যা ভালো বোঝ করো কবিতার মা! দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আন্টি বলেছিল।
বাদলের প্রেমকে চোখের জলে বিদায় দিয়ে কবিতা একমাথা মেটে সিঁদুর, মাথায় ঘোমটা দিয়ে লখনপুর গ্রামে মনোজের ঘর করতে এল। সঙ্গে ট্রাঙ্কভরা শাড়ি, বাসনকোসন, মায়ের শেষ জমানো পুঁজি দিয়ে কেনা মনোজের মোটর সাইকেল।
সুহাগরাতেই মনোজের পাশবিক শারীরিক অত্যাচারে কবিতার মনের ভালোবাসার বাষ্পটুকু উধাও। বিয়ের পরের মাস থেকেই কবিতা বুঝল তার শরীরে প্রাণের স্পন্দন। সঙ্গে হাড়ভাঙা খাটুনি। গায়ভৈঁষকে চারা দেওয়া, খেতের মুনিষদের জন্যে নাস্তা বানানো। মনোজ দিল্লি থেকে মাঝেমাঝে ছুটিতে এসে শোবার ঘরের বন্ধ দরজার আড়ালে পৌরুষ দেখিয়ে ফিরে যায়। স্বামী হিসেবে তার ঐটুকুই কর্তব্য। বাড়িতে এসেই সে আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকে কবিতার লুকিয়ে কেনা কন্ট্রাসেপটিভ পিল। হাতে পেলেই কবিতার ওপর চোটপাট।
গুড্ডি জন্মানোর পর শরীর ভাঙছিল কবিতার। নির্দয়া শাশুড়ির অত্যাচার আর সহ্য হচ্ছিল না। বিধবা মায়ের কাছে আবার কোন ভরসায় সে ফিরে যাবে! দাঁতে দাঁত চেপে তাই সবটাই সহ্য করত। বড় জা লীলা একমাত্র সহায় সেখানে। কিন্তু তারও মুখ ফুটে বলার কিছু অধিকার নেই। গুড্ডি হবার দেড় বছরের মাথায় আবার যখন কবিতা সন্তানসম্ভবা, তখন কি জানি কি ভেবে মনোজ বলল, ‘যা, একবার মাঈকে ঘুরে আয়। তবে কোনোরকম চালাকি করলে কিন্তু ফল ভালো হবে না বলে দিলাম।’
কবিতা কোলে গুড্ডি, পেটে বাচ্ছা নিয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের গলা জড়িয়ে কেঁদে বলল, ‘আর আমাকে লখনপুরে পাঠাস না মা। আমি মরে যাব সেখানে।’
দিদিরা, ভাইয়া পরামর্শ করল, তবে কবিতার পেটের বাচ্ছাটাও আর রাখার দরকার নেই। ডিভোর্স চাওয়া হোক। সঙ্গে খোরপোষ।
ডাক্তারবাবু বললেন, “বড় দেরী করে ফেলেছ মা। এখন আর গর্ভপাত সম্ভব নয়।”
ছেলে হবার খবর পৌঁছেছিল লখনপুরে। ডিভোর্সের কাগজও। লীলা খবর দিল সে কাগজ নাকি মনোজ ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে। আজকাল ফোনে মনোজ কবিতাকে সমানে গালিগালাজ করে। কখনো কখনো অচেনা নম্বর থেকে। কবিতা আর তার ফোন তোলে না। শয়তানটাকে ব্লক করে দেবার কথা একবার ভাবছিল কবিতা।
এরমধ্যেই কালরাতে মনোজের পাঠানো ঐ ভয়ানক ভিডিও। কবিতার ওপর মনোজের যৌন নির্যাতনের একের পর এক অশ্লীল ছবি! হারামজাদা কবে, কখন তুলেছে এমন ছবি কবিতা ঘুণাক্ষরেও তা টের পায় নি!
কবিতা জানে, এতক্ষণে দিদিদের, ভাইয়ার কাছে পৌঁছে গেছে কবিতার এ অপমান। তাই এত ফোনের পর ফোন। তাকে বাঁচানোর চেয়ে বাড়ির লোক এখন পরিবারের সম্মান বাঁচাতে ব্যস্ত হবে। বেশ কিছুদিন চলবে ফিসফাস, এ কেচ্ছার কথা চালাচালি। বলা যায় না, ঠোঁটকাটা তরুদিদি হয়তো বলেই বসবে, শিক্ষিত মেয়ে হয়ে কিছুই কি বুঝতে পারলি না! কেমন আহাম্মক রে তুই!
কি করবে এখন কবিতা! কোথায় যাবে, কাকে জানাবে তার এমন লজ্জা আর অপমানের কথা! একমাত্র আশার আলো বোধহয় বকুলতলার আন্টি। লজ্জার মাথা খেয়ে কবিতা ফোন নিয়ে মরীয়া হয়ে দৌড়চ্ছে এখন বকুলতলার আন্টির কাছে। মাথার মধ্যে জটার মত জড়িয়ে যাচ্ছে অজস্র চিন্তা, ‘আন্টি কি একটু পাশে দাঁড়াবে না আমার! সাহায্য করবে না আমায়! না জানি আমার মত প্রতিদিন কত কত কবিতার এমন সর্বনাশ হয়েই চলেছে! আমি ছাড়বো না তো শূয়োরের বাচ্ছা ঐ মনোজকে। এর শেষ দেখেই ছাড়ব! আর কি খারাপ হবে আমার! আর কত নিচে নামতে পারে মনোজ, দেখি এবার! ‘