বোটানির অধ্যাপক সাধ করে ছেলের নাম রেখেছিল অরণ্য। গাছ-পাগল ছেলেটা ধীরে ধীরে নিজের নামের মতোই সার্থক হয়ে উঠছে। বাড়ির সামনের বুড়ো বটগাছটার সঙ্গে তার খুব ভাব। তার গায়ে পরম আদরে হাত বুলিয়ে তার সঙ্গে কি কথা বলে কে জানে! অরণ্যের মা নয়না এসব মোটেই ভালো চোখে দ্যাখে না। স্বামীর প্রতি অনুযোগের তির ছোঁড়ে,
— তুমি আর গাছপালার গল্প বলে ছেলেটার মাথা খেয়ো না তো! তুতানটা দিন দিন কেমন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।
— কিসের আবার অন্যরকম!
— ওর চালচলন সবটাই তো অন্যরকম। বন্ধুবান্ধব নেই। খেলাধুলো করেনা। গাছেরা নাকি ওর বন্ধু। দেখলে না এবছর পুজো প্যান্ডেলের জন্য সামনে পার্কের রাধাচূড়া গাছটা কাটা হয়েছিল বলে ওর কি মন খারাপ! ব্যালকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত। ওর বয়সী কোনো বাচ্ছা ওর’ম করে, বলো!
— তারপর যখন গাছে নতুন পাতা এল, তখন কম খুশি হয়েছিল তোমার ছেলে! গাছপালা ওর প্রাণ। মানছি, এ ভালোবাসা আমার কাছ থেকেই পেয়েছে। তুতান এখনো ছোটো, তাই কল্পনাপ্রবণ। কিন্তু জেনে রেখো ও অনেকের থেকে ভালো। অন্য বাচ্ছাদের মত সারাক্ষণ মোবাইল ঘাঁটলে বুঝতে!
নয়নার গাছপালার ভালোবাসায় আবেগের বাড়াবাড়ি নেই। ব্যালকনিতে দু-একটা ঝোলানো লতাগাছ আর ঘরের ভেতর সাজানো কয়েকটি ইন্ডোর প্ল্যান্টই তার সবুজ সংসার। ওইটুকুই যথেষ্ট; বেশি গাছ মানেই নাকি বিশৃঙ্খলা। আসবাবপত্র যেমন জায়গা বুঝে বসে থাকে, গাছগুলোরও তেমনই শৃঙ্খলা মানতে হয়। নয়না তার ঘরের জিনিসপত্রের মতই গাছের পাতার ধুলো ঝাড়ে, জল স্প্রে করে।
ছেলে তুতান লক্ষ্য করেছে যে গাছগুলো মায়ের যত্ন, স্পর্শ বেশি পায় তারা বেশি চনমনে। মা এসব কথা বুঝতে চায় না। সবুজ জগত আবিষ্কারের আনন্দে মশগুল থাকে শুধু বাবা আর ছেলে।
চশমা পরা, গালে হাত দেওয়া, আরো একজন মানুষ অরণ্যের সামনে খুলে দিয়েছেন এ জগতের আরো অনেক দরজা। স্যর জগদীশ চন্দ্রের বই পড়েই সে জেনেছে গাছেরাও আমাদের মত দুঃখকষ্ট পায়। জীবনধারণ করার জন্যে এদের সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয়। অভাবে পড়লে এরাও চুরি ডাকাতি করে। গাছেরাও বন্ধু পাতায়। একে অন্যকে সাহায্য করে।
এসব কথা পড়েই তো অরণ্য গাছপালাকে বন্ধু ভাবে। তাদের সঙ্গে কথা বলে! স্কুলের তপোব্রত, কিয়ান, শ্রেয়সের সঙ্গে তার মিশতেই ইচ্ছে করে না। ওরা শুধু শুধু গাছে ঢিল ছোঁড়ে। একবার অরণ্য শুধু বলেছিল, ওরকম করে গাছে ঢিল ছুঁড়িস না। ওদের ব্যথা লাগে। একটা খুব খারাপ গালাগাল দিয়ে অরণ্যকে ওরা বলেছিল, ফালতু বকিস না তো! খুব বড় জ্ঞানদাতা হয়েছিস!
ক্লাস সিক্সের বিজ্ঞান বইয়ে যা গাছপালার কথা লেখা আছে, তার থেকে অনেক বেশি অরণ্য জেনেছে তার বাবার কাছে।
অরণ্যের বাবাই তো তাকে বলেছিলেন,
— জানিস তুতান, ক্রিসমাসের সময় অস্ট্রেলিয়ার একটি গাছে প্রচুর কমলা-হলুদ উজ্জ্বল ফুল ফোটে। এরা হল অর্ধ-পরজীবী গাছ। এরা অন্য গাছের শিকড় থেকে জল আর পুষ্টি চুরি করে কেমন ক্রিসমাস ট্রী নামে বিখ্যাত হয়ে গেছে!
— গাছের এমন চুরি ডাকাতির কথা আমি জগদীশ চন্দ্রের লেখায় পড়েছি বাবা।
বাবার সঙ্গে তার জঙ্গলে বেড়ানো যেন এক আনন্দ অভিযান। আকাশ ছুঁতে চাওয়া লম্বা গাছগুলোকে দেখে অরণ্যের মনে হয় এরা কি তাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় বিষাণের মত! মাথা উঁচু করে সবসময় এগিয়ে যেতে চায় অথচ বট অশ্বত্থের উঁচুতে ওঠার কোনো দায়ই নেই। তাদের ছড়িয়ে যাওয়া ডালপালায় পশুপাখিদের আশ্রয়। এই গাছের নিচে মুনি-ঋষিদের তপস্যা। মানুষের পুজো নিয়ে এরা কয়েকশো বছর বেঁচে থাকে!
পরজীবী, পতঙ্গভূক গাছ নিয়ে অরণ্যের কৌতুহলের শেষ নেই। সত্যজিৎ রায়ের সেপ্টৌপাসের ক্ষিদে পড়ে সে চমকে উঠেছিল। প্রকৃতির এই সবুজ জগতকে আরো বেশি করে দেখতে, জানতে অরণ্যের আমাজনের জঙ্গল, অস্ট্রেলিয়ার রেনফরেস্টে যেতে ইচ্ছে করে।
এবছর পুজোয় অরণ্যের বাবা ঠিক করেছে ফুলেশ্বরে গঙ্গা পারের একটি বাংলোয় ক’টা দিন কাটিয়ে আসবে। এই বাংলো নাকি জগদীশ চন্দ্র বসুর বড় পছন্দের ছিল। তিনি প্রায় সেখানে এসে থাকতেন। সে কথা শুনে অরণ্য আরো লাফাচ্ছে।
মা ওখানে যাবে না। আবাসনের পুজোয় মা এবার চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের ডিরেকশন দিচ্ছে। ট্রলিতে দুজনের জামাকাপড় রাখতে রাখতে মা গজগজ করে, ‘ছেলেটাকে আরো অসামাজিক করে তুলছ তুমি। পুজোর সময় কোথায় সবার সঙ্গে তুতান মেলামেশা করবে, খেলাধুলো করবে! তা না ছেলেকে সবার থেকে আলাদা করে দিচ্ছ!’
ফুলেশ্বরে পৌঁছে অরণ্য তো আনন্দে আত্মহারা। গঙ্গা এখানে কত চওড়া। এপার ওপার দেখা যায় না। বাবার সঙ্গে সে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। গাছপালা নিয়ে বাবা কত কথা বলে। গাছ চেনায়। বাজারে যায়। একটা দুটো পুজো প্যান্ডেলেও ঘুরে এসেছে।
বাংলোয় জগদীশ চন্দ্রের হাসিমুখের মস্ত বড় একটা ছবি আছে। এখানকার নির্জন, গাছপালা ঘেরা পরিবেশে উনি নাকি গাছেদের ফিজিওলজি নিয়ে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। অরণ্য চুপ করে বসে সেসব কথা ভাবে। ওঁর সঙ্গে একটিবার দেখা হলে কি ভালোই না হত! বাংলোর লাগোয়া একটি পুকুরঘাটের সিঁড়ির দুধারে দুটি প্রকান্ড বকুলগাছ নাকি আচার্য্য নিজে হাতে পুঁতে ছিলেন। সারারাত সুগন্ধ ছড়িয়ে সকালে বকুল ফুল গাছের তলায় পড়ে থাকে। অরণ্য সে ফুল কুড়িয়ে এনে বাটিতে রাখে। অরণ্যের কেমন যেন শিহরণ জাগে।
কিন্তু বকুলতলার সামনেটা এত নোংরা কেন? লোকে পিকনিক করে কবে চলে গেছে! এখনো এখানে ওখানে কাগজের প্লেট, প্লাসটিকের প্যাকেট ছড়ানো। দুটো গাছের মাঝখানে একটা ক্যাটকেটে কমলা রঙের কাপড় দড়ি দিয়ে কে টাঙিয়েছে! যে পাথরের ফলকে জগদীশ চন্দ্রের নাম লেখা আছে সেখানেও ধুলোনোংরার পরত।
রাতে অরণ্যের স্বপ্নে জগদীশ চন্দ্র এলেন। তবে তাঁর মুখে হাসি নেই। মনখারাপি সকালে অরণ্য বাবাকে সব কথা খুলে বলতেই তিনি বললেন, “চল আমরা দুজনে মিলে সবটা পরিষ্কার করে ফেলি। পারবি না!”
অরণ্য একটা বড় করে ঘাড় নেড়ে বাবার সঙ্গে কাজে লেগে পড়ল। একঘন্টার পরিশ্রমেই বকুলতলাটা ঝকঝকে পরিষ্কার। কমলা রঙের বিচ্ছিরি ছেঁড়া কাপড়টা ফেলে দিয়ে বাপ-বেটা বীরদর্পে বাংলোর দেয়ালে লাগানো জগদীশ চন্দ্রের ছবির সামনে দাঁড়ালো।
ছবিতে ওঁনার হাসিটা আজ একটু বেশি চওড়া লাগছে না! বাবারও কি তাই মনে হচ্ছে! বাবা অরণ্যের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল!