দুয়ারসিনি, কংসাবতী, কুমারীরা পৌষের জাড়ে সারারাত কেঁপেছে। মকর পরবে গাঁয়ের মেয়েবৌরা ভোর ভোর সেইসব নদীজলে গা ডোবাল। তাদের দেহতাপে খানিক গা সেঁকে নিল মানভূমের শীতের শীর্ণকায়ারা। নদীর বালুচর উত্তরায়ণের সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে। মকর স্নান সেরে ভোরের শিশির পায়ে দ’লে চলে উৎসবমুখর নরনারী। পরনে তাদের নতুন রঙিন পোশাক, কপালে দেবতার থানের চন্দন টিপ।
সাসুন্ডি গাঁয়ের লক্ষীমণির হাতের তুলিতে ঘরের দেওয়ালে রঙিন লতাপাতা। বিট্যি দীপালির ভিতি আঁকনে, পিঠা বানাবারে ম্যন নাই। আইবুড় ঝিঁয়াট্যো দাওয়ায় বইস্যে মুবাইল ঘুরাচ্ছে। নাচার লক্ষীমণি শঙ্কিত হয় পরবের পিঠা, ভিতি আঁকন কি তার সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে তার ঘরে!

আধুনিক হয়ে ওঠার এই বিপন্নতা শাল-শেগুন-পলাশের জঙ্গলে, অযোধ্যা পাহাড়ের কঠিন গ্রানাইট পাথরের বুকেও বাজে। উন্নয়নের জোয়ারে নির্বিচারে ধ্বংস হয় প্রকৃতি। সরল, মেহনতী আদিবাসী মানুষের জীবন বিকিয়ে যায় শস্তার শহুরে মোহে।
তবু বছর ঘুরে পয়লা মাঘে সোহরাই বা ফসল কাটার উৎসবে মুখর পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল। শহরে কাজ করতে যাওয়া ঘরের ছেলে পিঠে ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফেরে। বছরকার দিনে বাড়িতে ভালোমন্দ রাঁধাবাড়া হয়। সকাল সকাল স্নান করে কাতারে কাতারে মানুষ ঐ উঁচু মাঠা পাহাড়ে মাঠাবুরুর থানে মাথা ঠেকাতে যায়। মেয়েদের পরনে রঙিন শাড়ি, পায়ে আলতা, মাথায় চওড়া সিঁদুর। উৎসবের দিনে বালিকাদের লিপস্টিক লাগানোয় ছাড়। অপটু হাতে ঠোঁটের লালি ছড়িয়েছে চিবুকে, গালে, দাঁতের ফাঁকে

মাঠাবুরুর আশীর্বাদ পেতে ধামসা-মাদল বাজিয়ে দলে দলে ঝাড়খন্ডীরা আসছে। মানত রেখে দন্ডী খাটছে ভক্তের দল। ছাগবলি হচ্ছে। বাজনার দাপটে চাপা পড়ে ছাগশিশুর আর্তনাদ। মাঠাপাহাড়ের নিচে জমজমাট মেলা। গেলা গ্রামের শঙ্কর গড়াই চাউমিন আর রোলের দোকান দিয়েছে। তার সতেরো বছরের ছেলে মাণিক সামলাচ্ছে আইসক্রিম আর মিনারেল ওয়াটারের স্টল। পাহাড় চূড়ায় মাঠাবুড়ুকে দর্শন করে পরিশ্রান্ত, ঘামেভেজা মানুষগুলোর জল চাই। বোতল বোতল জল খুব বিকোচ্ছে। সাজাগোজা মেয়েরা দলবেঁধে আইসক্রিম খেতে খেতে হাসিতে উদ্বেল। মাণিকের হিসেবে তাই আজ বড় গরমিল হচ্ছে। আজ কি সব মেয়েরাই সুন্দর! ছেলের রকমসকম দেখে শঙ্কর ধমকায় ছেলেকে, ‘হিসাবটা মিলায়ে লিবি’। উৎসবে উদারহস্ত বাবা মায়েরা ছেলেপুলেকে বলছে ‘রুল খাবি না চাউচাউ! যা ম্যন চায়, লে ক্যানে’।
মেলা বসেছে সীতাকুণ্ডের মাঠে। লহড়িয়া শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। ‘হুই উঁচা উঁচা টুসু চৌঢল বানাই়ছে গ্যো!’ অবাক শিশু বাপের কাঁধে চড়ে টুসুর ঝকমকে, ফুলগাঁথা চূড়া দেখে। মাটিতে উবু হয়ে বসে শালপাতায় ঝাল ঝাল গরম খিচুড়ি খায় । কচি জিভ তা সইতে পারে না। তবু সে গরাস মুখে তোলে আর নাল ঝোলের সঙ্গে বেরিয়ে আসে ঊস্ ঊস্ শব্দ ।

রেরেং টাঁড়ের বুঢ়া জয়দেব সোরেন আজ মকর মেলায় হাঁড়িয়া টেনে টং। মাথায় তার লাল ফেট্টী। হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার নাচের বিরাম নেই। ধামসা, মাদল, ঢোলক তালে তালে বাজলেও তার পা পড়ছে বেতালে।
চটুল ইশারা করে ছুঁড়িদের দিকে তাকিয়ে সে গাইছে,
‘আইল রে সজনী মোর,
হাটের পথে সাঁঝে,
চুড়ি খনক খনক বাজে,
জিয়ান লাগে লাজে।
ও ঢোল বাজে টাং টাং,
মাদল বাজে,বাজে ঘুমুর,
চোখে কাজল, ঠোঁটে হাসি,
নাচে অ্যরা ঝুমুর ঝুমুর।’
বুড়ার মনে বড় ডর। পরের জাড়ে বাঁচবে না মরবে তার কোনো ঠিক লাই।ফূর্তি করতে দোষ কুথায়!

কম্পিটিশনের তাগিদে দূর দূর থেকে মেলায় পৌঁছেছে পনেরো কুড়ি ফুট লম্বা চৌঢল। চকচকে রাংতায় সাজানো টুসুর চৌঢলের সঙ্গে বাজছে ক্যাসিও আর ধামসা মাদল। নাচতে নাচতে ঐ আসছে মেয়ে মরদের দল। জিতলে টাকা পাবে বট্যেক ।
ভুচুন্ডি গ্রামের শোভারাণী এসব দেখছে আর ভাবছে, ‘কোথায় গেল আমাদের সহজ সরল টুসুপরব। আনন্দের সেই সোনালী বিকেল! মাটির দাওয়ায় গর্ত করে ধানের তুষ ভরা হত! তুষই হয়ে উঠত টুসুদেবী। পৌষ মাসের পয়লা থেকে মাটির সরাতে, প্রদীপের আলোয়, গাঁদাফুলের হলুদ বন্নে সেজে উঠত আমাদের টুসুরাণী। সইয়ের দল দাওয়ায় বসে গাইতাম,’
“চল টুসু চল খেইলতে যাব কুলিমুড়ার বটতলা
ঘুড়ার সময় দিখাঞ দিব পলাশপাতায় জল তুলা।
কলাতলায় ধান মেলেছি পায়রা গুম গুন করে গো,
পায়রা লয় মা, পাখি লয় মা, টুসু খেলা করে গো”

পৌষের নরম রোদে টুসুর সঙ্গে ফুলসই পাতিয়ে,তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে, হেসে-কেঁদে-ঝগড়া করতে করতে লীলাখেলা চট করে কবে ফুরিয়ে যেত! সংক্রান্তির ভাসান পর্বে মেয়েলি হাতে টুসুরাণীর জন্যে গড়া হত পাটকাঠির চৌঢল। তাতে লালনীল ঘুড়ির কাগজের ঝালর। চৌঢলের মাথায় ওড়ে পতপতে লাল নিশান। বিদায় বেলায় এই টুসু রাণীকে জলে ভাসাতে ভাসাতে সবার মনে বিষাদ, চোখে জল। যে মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়েছে ভিনগাঁয়ে সে কেঁদে আকুল। সামনে বছর সংসারের বেড়াজালে তার টুসু হয়তো গাইবে দুখের বারোমাস্যা।
ও টুসু মাই, ভাসে গেলি জলে,
চোখের জল পড়ে ঢ’লে ঢ’লে।
পুষ মাসের জাড়ে,
তু এলি মোদের ঘরে
আবার কবে আসবি রে মা,
মন যে কেমন করে!
মোদের মন যে কেমন করে…..
যথারীতি ভালো হয়েছে। ক্ষণিকের সুখপাঠ্য।এনার সব লেখাই বেশ রেশমি বটুয়া থেকে সামান্য উপহার আকর্ষণীয়ভাবে দান করার মতো—-ব্যক্ত তথ্য কখনও মাথা ভার করে না।লিখতে থাকুন,পড়তে থাকি। ভালোবেসে তথ্যসমৃদ্ধ হ ই।
নমস্কার।
ভালোবাসা বর্ণালী। এমন পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখালেখিতে উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়।