শনিবার | ৫ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | সকাল ৭:৫৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওড়িশার হীরক ত্রিভুজ : ললিতগিরি, উদয়গিরি ও রত্নগিরি (দ্বিতীয় পর্ব) : জমিল সৈয়দ হুমায়ুন-এক স্মৃতি-এক আলাপ : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী সনজীদা যার সন্তান : শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার ওড়িশার হীরক ত্রিভুজ : ললিতগিরি, উদয়গিরি ও রত্নগিরি (প্রথম পর্ব) : জমিল সৈয়দ অবসর ঠেকাতেই মোদী হেডগেওয়ার ভবনে নতজানু : তপন মল্লিক চৌধুরী লিটল ম্যাগাজিনের আসরে শশাঙ্কশেখর অধিকারী : দিলীপ মজুমদার রাঁধুনীর বিস্ময় উন্মোচন — উপকারীতার জগৎ-সহ বাঙালির সম্পূর্ণ মশলা : রিঙ্কি সামন্ত রামনবমীর দোল : অসিত দাস মহারাষ্ট্রে নববর্ষের সূচনা ‘গুড়ি পড়বা’ : রিঙ্কি সামন্ত আরামবাগে ঘরের মেয়ে দুর্গাকে আরাধনার মধ্য দিয়ে দিঘীর মেলায় সম্প্রীতির মেলবন্ধন : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ‘বিজ্ঞান অন্বেষক’ পত্রিকার ২২তম বর্ষ উদযাপন : ড. দীপাঞ্জন দে হিন্দিতে টালা মানে ‘অর্ধেক’, কলকাতার টালা ছিল আধাশহর : অসিত দাস আত্মশুদ্ধির একটি বিশেষ দিন চৈত্র অমাবস্যা : রিঙ্কি সামন্ত চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয় : ড. দীপাঞ্জন দে রায়গঞ্জে অনুষ্ঠিত হল জৈব কৃষি বিপণন হাট অশোকবৃক্ষ, কালিদাসের কুমারসম্ভব থেকে অমর মিত্রর ধ্রুবপুত্র : অসিত দাস কৌতুকে হাসতে না পারলে কামড় তো লাগবেই : তপন মল্লিক চৌধুরী জাতিসংঘ মহাসচিবের সফর ও রোহিঙ্গা সংকটে অগ্রগতি : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন এথেন্সের অ্যাগনোডাইস — ইতিহাসের প্রথম মহিলা চিকিৎসক : রিঙ্কি সামন্ত সন্‌জীদা খাতুন — আমার শিক্ষক : ড. মিল্টন বিশ্বাস হিমঘরগুলিতে রেকর্ড পরিমাণ আলু মজুত, সস্তা হতে পারে বাজার দর : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় শিশুশিক্ষা : তারাপদ রায় জঙ্গলমহল জৈন ধর্মের এক লুপ্তভুমি : সসীমকুমার বাড়ৈ ওড়িশা-আসাম-ত্রিপুরার অশোকাষ্টমীর সঙ্গে দোলের সম্পর্ক : অসিত দাস পাপমোচনী একাদশী ব্রতমাহাত্ম্য : রিঙ্কি সামন্ত ভগত সিংহের জেল নোটবুকের গল্প : কল্পনা পান্ডে নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘অমৃতসরী জায়কা’ মহিলা সংশোধনাগারগুলিতে অন্তঃসত্ত্বা একের পর এক কয়েদি, এক বছরে ১৯৬ শিশুর জন্ম : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ‘শোলে’র পঞ্চাশ বছর : সন্দীপন বিশ্বাস বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাস পালটাতে চায় : তপন মল্লিক চৌধুরী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ অন্নপূর্ণা পূজা ও বাসন্তী পূজার আন্তরিক শুভেচ্ছা শুভনন্দন।  ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

হুমায়ুন-এক স্মৃতি-এক আলাপ : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ২৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫

দিল্লীতে নামতেই একটা হিমেল হাওয়া কাঁপিয়ে দিল। সময়টা মার্চের প্রথম সপ্তাহ। আকাশ ঝকঝকে নীল। যে বায়ুদূষণে দিল্লীর আকাশ সবসময় ধূসর হয়ে থাকে সেই ধূসরতা গায়েব। বরং হাওড়ার রাস্তায় ধূসরতা মেখেই দিল্লী আসা। একটা অটো বুক করে চললাম গন্তব্যের দিকে। দিল্লীর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিয়ে অনেক অভিযোগ আগে ফেস করেছি। না, এবারে দিল্লী আমাকে বরণ করবে বলেই তার মনোহরা রূপ দেখাচ্ছে, এটাই অটোতে বসে গায়ে শাল জড়িয়ে মনে হল। অটো বা ক্যাব চালকের যে ব্যবহার পূর্বে প্রত্যক্ষ করেছি আজ তার বিন্দুমাত্র আভাস নেই। মনে মনে নিজেকে বললাম, “কি হল? সব কি কোনো জাদুমন্ত্রে পাল্টে গেল!” অটোচালক দিব্য গল্প করতে করতে তীব্র গতিতে অটো চালাচ্ছে। সাহস এল মনে, নিজস্ব হিন্দিতে বাতচিত শুরু হল। “রাস্তায় যেতে যেতে হুমায়ুন টুম্ব পড়বে ভাইসাব?”

“হাঁ জি।”

“লে যাওগে?”

“বহৎ টাইম লাগেগা।” দেখলাম গলায় তার মোলায়েম ভাব রয়েছে। একটু বিরক্ত হচ্ছে না। আলাদা টাকা পয়সার কথাও বলছে না। হল কি দিল্লীর! রাস্তায় দুধারে বড় বড় গাছ সবুজে সবুজ। রাস্তায় কোনও গাড্ডা নেই। মসৃণ, ঝকঝকে। হুমায়ুন স্মৃতিসৌধের গেটে সে থামল বিনাবাক্যব্যয়ে। শুধু হেসে বলল, “জলদি আনা।” বুঝলাম মুঘলদের সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার কেউ আটকাতে পারবে না।

দেখা হওয়াটা দৈবাৎ ছিল। আলওয়ার শহরে বাবরের স্ত্রী, যিনি হুমায়ুনের সৎমা, বাবরের উপপত্নী দিলদার আগাচা বেগম এক ভোজসভার আয়োজন করেন। শিয়া পরিবারের শেখ আলী আকবরের কন্যা ১৪ বছরের কিশোরী হামিদা বানু এই ভোজসভায় আমন্ত্রিত। আলী আকবর ছিলেন সম্রাট বাবরের কনিষ্ঠ পুত্র হিন্দল মির্জার শিক্ষক। শের শাহ সুরির সঙ্গে যুদ্ধে হেরে হুমায়ুন তখন আলওয়ারে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। দুজনের মুখোমুখি দেখা এই ভোজসভায়। হুমায়ুনের মন হামিদা বানু কেড়ে নেন। হুমায়ুন বিয়ের প্রস্তাব তুলতে প্রথমেই না বলে দেন হামিদা বানু। একই সঙ্গে হিন্দলও প্রবল আপত্তি তোলেন।

প্রেমের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কখনো কি পাওয়া যায়? তবে এটা বোঝা যায় যে হিন্দলের প্রাসাদে হামিদার অবারিত আনাগোনা ছিল। হিন্দলের বোন গুলবদন বেগম আর হামিদা ছিলেন ঘনিষ্ঠ সখী। দিলদার বেগমের কাছের জন ছিলেন হামিদা। একই সঙ্গে হিন্দল ও হামিদার হুমায়ুনের বিবাহ প্রস্তাব নাকচ করা নিয়ে তাই একটা প্রেমের গল্প তৈরি করে নেওয়া যেতেই পারে। এমন কি গুলবদন ‘হুমায়ুননামা’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে দিলদার বেগমের প্রাসাদে, হিন্দলের প্রাসাদে প্রায়ই হামিদার উপস্থিতি উজ্জ্বল হয়ে থাকত।

হুমায়ুনের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তাবও হামিদা নাকচ করে দেন। শোনা যায় ৪০ দিন পর দিলদার বেগমের প্ররোচনায় হামিদা হুমায়ুনকে বিবাহ করতে রাজি হন। হামিদা লিখেছেন, “আমি এমন একজনকে বিবাহ করব যার কন্ঠদেশ পর্যন্ত আমার হাত পৌঁছতে পারে, এমন কাউকে নয় যাকে আমি স্পর্শ করতে পারি না।” এই কথাতেই বোঝা যায় হামিদা বানু কতটা তেজস্বী মহিলা ছিলেন।

শের শাহ সুরির মৃত্যু ঘটে ১৫৪৫ সালে। তাঁর উত্তরসূরী ইসলাম শাহও ১৫৫৪ সালে মারা যান। সুরি সাম্রাজ্যের অন্ত ঘটলে হুমায়ুন যখন ভারতে ফিরে আসেন, হামিদা বানু কিন্তু কাবুলে থেকে যান। হুমায়ুন ১৫৫৫ সালে দিল্লি পুনরুদ্ধার করতে পারলেও ফিরে আসার বছর খানেক পরেই পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫৫৬ সালে এই আকস্মিক দুর্ঘটনার সময় হুমায়ুনের বয়স ছিল মাত্র ৪৭। আর তাঁর উত্তরাধিকারী আকবর তখন ১৩। রাজত্ব চালাতেন সম্রাট কিন্তু অভ্যন্তরে অনেক কিছুতেই হামিদা হস্তক্ষেপ করতেন।

হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ বা সমাধিসৌধ অথবা হুমায়ুন টুম্ব যাই বলি না কেন, মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের প্রসঙ্গ এলেই তাঁর পত্নী হামিদা বানু আসবেনই। ১৫৬২ সালে হুমায়ুন পত্নী হামিদা বানু বেগম এই অসাধারণ সমাধিটি তৈরির পরিকল্পনা করেন। এটির নকশা করেন পারসিক স্থপতি মির্জা গিয়াস। হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ হচ্ছে প্রথম উদ্যান — সমাধিক্ষেত্র।

দিল্লীর নিজামউদ্দিন পূর্ব অঞ্চলে হুমায়ুন ১৫৫৩ সালে যে দিনা-পানাহ বা পুরানা কিল্লা নির্মাণ করেছিলেন, তারই সন্নিকটে এই সমাধিসৌধ স্থাপিত হয়। লাল বেলেপাথরে তৈরি এত বড় মাপের সৌধ ভারতে এটিই প্রথম স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে ঘোষণা করে।

সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যু হয় ১৫৫৬ সালের ২০শে জানুয়ারি। ভরা শীতে। নিজের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে। তাঁর দেহ প্রথমে দিল্লীতে রাজপ্রাসাদেই সমাহিত করা হয়। তারপর খঞ্জর বেগ দেহ নিয়ে যান পাঞ্জাবের সিরহিন্দে। হুমায়ুন পুত্র তথা তদানীন্তন মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৭১ সালে হুমায়ুনের সমাধিসৌধের কাজ সমাপ্ত হওয়ার মুখে এটি পরিদর্শন করেন।

হুমায়ুনের বিধবা পত্নী হামিদা বানুর নির্দেশে ১৫৬৫ সালে হুমায়ুনের মৃত্যুর নয় বছর পরে এই সমাধিসৌধের কাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৫৭২ সালে। সৌধটি শেষ করতে সেই যুগে খরচ হয়েছিল ১৫ লক্ষ টাকা। অসামান্য স্থপতি মির্জা গিয়াসকে উত্তর পশ্চিম আফগানিস্তানের হেরাত থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ইতিপূর্বে তিনি হেরাত, বুখারাতে এবং ভারতের অন্যান্য স্থানে অনেকগুলি ভবন নির্মাণ করেছিলেন। তবে নির্মাণ কার্য শেষ হবার আগেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর পুত্র সৈয়দ ইবন মুহাম্মদ ইবন মিরাক গিয়াসুদ্দিন পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন।

সুফি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার সমাধিস্থল নিজামউদ্দিন দরগার নিকটেই হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ। হুমায়ুনের মূল সমাধিসৌধটি ছাড়াও পশ্চিমের প্রধান দরজা থেকে যে পথ সমাধি পর্যন্ত গেছে তার দু পাশে অনেক ছোট ছোট স্মারক রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম ইসা খান নিয়াজির সমাধি সৌধ। এই সমাধি হুমায়ুনের সৌধ তৈরিরও ২০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। এটি সুরি শাসক শের শাহের রাজসভার আফগান অভিজাত পুরুষ ইসা নিয়াজির। নিয়াজি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ইসা খান নিজেই এটি তৈরি করে রেখেছিলেন। এছাড়া পাশেই একটি মসজিদও তৈরি করিয়েছিলেন (১৫৪৭ সাল)। অষ্টভুজাকৃতি এই সমাধিসৌধের অনন্য জালির কারুকার্য মুগ্ধ করে।

কাবুলে ‘বাগ-ই-বাবর’ নামে পরিচিত মুঘল সম্রাট বাবরের যে সমাধিসৌধটি রয়েছে সেটি নেহাতই সাদামাটা। উদ্যান সহ এমন রাজকীয় সমাধিসৌধ হুমায়ুনেরই প্রথম। সেভাবে দেখলে দেখা যাবে যে হুমায়ুনের সৌধের সঙ্গে তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুর লঙের সমাধি গুর-ই-আমীরের আদল আসে। আবার আগ্রার বিখ্যাত তাজমহল এর উত্তরসূরী।

হুমায়ুনের সমাধি চত্বরে হুমায়ুনের সমাধি ছাড়াও রয়েছে তাঁর পত্নী হামিদা বানুর সমাধি। এছাড়াও এখানে শাহজাহানের পুত্র দারাশিকো, জাহান্দার শাহ, রফি উল-দৌলত ও দ্বিতীয় আলমগীরের সমাধিও রয়েছে।

“হে খোদা, যদি জীবনের বদলে জীবন দেওয়া যায়, তাহলে আমি বাবর, আমার পুত্র হুমায়ুনের জীবনের বদলে নিজের জীবনদান করতে প্রস্তুত।” অসুস্থ সন্তানের পালঙ্ক তিনবার ঘুরে এক পিতার আকুতি ঈশ্বর বোধহয় শুনেছিলেন। তাই পুত্র সুস্থ হয়ে ওঠার সঙ্গে পিতা আস্তে আস্তে অসুস্থ হতে থাকেন। পিতা ভারত সম্রাট হোন বা পথের কাঙাল, সন্তানের জন্য সমস্ত পিতার একই প্রার্থনা – সন্তান যেন সুস্থ থাকে, দুধেভাতে থাকে।

বাবরের প্রার্থনা তখনকার মত সফল হলেও হুমায়ুনের আয়ুরেখা দীর্ঘ ছিল না। গোটা জীবন কেটেছে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে। ইব্রাহিম লোদীর সঙ্গে লড়াই করে ফিরতে বাবর তাঁকে ফিরুজা জায়গীর উপহার দিলেন। পানিপথের যুদ্ধের পর বাবর তাঁকে পাঠান আগ্রা দখল করতে। গোয়ালিয়রের রাজা একটি বড় হীরা হুমায়ুনকে দিয়েছিলেন। হুমায়ুন সেটি পিতার হাতে তুলে দেন কিন্তু বাবর আবার সেই হীরা হুমায়ুনকেই উপহার দেন। সুতরাং পিতৃস্নেহ থেকে হুমায়ুন বঞ্চিত হননি বোঝা যায়। কিন্তু ভাগ্যের সহায়তা হুমায়ুন পাননি অনেক সময়।

ইতিহাসবিদ এস এম বার্কে তাঁর বই ‘আকবর দ্য গ্রেটেস্ট মুঘল’-এ লিখেছেন “ঘোড়া ছোটানো বা তীরন্দাজ হিসেবে হুমায়ুন পারদর্শী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধজয়কে আরও মজবুত করার ব্যাপারে তার ইচ্ছাশক্তির অভাব ছিল। নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিভারও খামতি ছিল তার মধ্যে। এই জন্যই খুব কাছের মানুষরাও হুমায়ুনকে ছেড়ে দূরে সরে গেছেন নানা সময়ে, অথচ সেই সময়গুলোতেই হুমায়ুনের তাদের খুব প্রয়োজন ছিল। আবার সামনে কোনও বাধা এলে ভয় না পেয়ে তা অতিক্রম করার ক্ষমতাও ছিল হুমায়ুনের।” অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে এই ঐতিহাসিক চরিত্রে। বাবর রোজনামচা লিখতেন। হুমায়ুনও পড়াশোনার মধ্যে অনেকটা সময় কাটাতেন। বাবরের উপপত্নী দিলদার বেগমের কন্যা গুলবদন বেগম লিখেছেন হুমায়ুনের মৃত্যু সম্বন্ধে, “সেদিন খুব ঠান্ডা ছিল, জোরে হাওয়াও বইছিল। লাল পাথরের তৈরি নিজের লাইব্রেরি ঘরে হজ থেকে ফেরা কয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা ছিল সেদিন। জুম্মার দিন ছাদের লাইব্রেরি থেকে তিনি জনসাধারণকে দর্শন দিতেন। হঠাৎই মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ আসে। সেটা শুনেই ধার্মিক হুমায়ুন সাজদা করার জন্য একটু ঝুঁকতে গিয়েছিলেন, আর তখনই তার পোশাকে পা জড়িয়ে যায়।… গড়িয়ে পড়েন অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে। মাথায় গভীর আঘাত। ডান কান থেকে গড়িয়ে আসছে রক্ত। ”

শীতের আরাম আর সোনালী রোদ্দুর মেখে উঁচু সিঁড়ি দিয়ে উঠে চারপাশ দেখছিলাম। পাশেই একটি কালো রঙের অপূর্ব মসজিদ। আজানের সুর কি ভেসে এল? আমি কি ঝুঁকব হুমায়ুনের মত? উঁচু সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় আমার পোশাকে যাতে পা না আটকায়, তার জন্য বিশেষ সতর্কতা নিলাম কি? এখানে যতবার আসি কেন মন খারাপ হয়? মনে হয় যিনি লাইব্রেরি ভালবাসতেন, তাঁকে কেন বারবার যুদ্ধ করতে হয়? কেন প্রমাণ করতে হয় তিনি বীর! লাইব্রেরি নিয়ে কি একটা জীবন কাটে না? কি জানি? আমি শুধু প্রার্থনা করি কবির সঙ্গে গলা মিলিয়ে…

“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম

আজ বসন্তের শূন্য হাত —

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

**

কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন

কোথায় কুরে খায় গোপন ক্ষয়!

চোখের কোণে এই সমূহ পরাভব

বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা!

**

জাগাও শহরের প্রান্তে প্রান্তরে

ধূসর শূন্যের আজান গান,

পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

**

না কি এ শরীরের পাপের বীজানুতে

কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের

আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে

মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?

না কি এ প্রাসাদের আলোর ঝলসানি

পুড়িয়ে দেয় সব হৃদয় হাড়

এবং শরীরের ভিতরে বাসা গড়ে

লক্ষ নির্বোধ পতঙ্গের?

**

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার

জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?

ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”

জলদি ফেরা যায় না স্মৃতি থেকে। অনেকটা সময় কাটিয়ে অটোতে ফিরে অটোচালকের হাসিমুখ দেখলাম। অটোতে আমার দুখানি ব্যাগ অটুট রয়েছে। অবিশ্বাসের স্থান নেই। না, গন্তব্যে পৌঁছে সে কোনো বাড়তি টাকা দাবী করেনি। আমিই নিজে থেকে দিয়েছি আর মনে মনে বলেছি, —

“ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ১৪৩১ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন