নিঃশেষে নিভেছে তারাদল, মেঘ এসে আবরিছে মেঘ,
স্পন্দিত ধ্বনিত অন্ধকার, গরজিছে ঘূর্ণ বায়ুবেগ।
লক্ষ লক্ষ উন্মাদ প্রাণ, বহির্গত বন্দিশালা হ’তে,
মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি’ ফুৎ কারে উড়ায়ে চলে পথে।
সমুদ্র সংগ্রামে দিল হানা, উঠে ঢেউ গিরিচূড়া জিনি’
নভস্থলে পরশিতে চায়। ঘোররূপা হাসিছে দামিনী,
প্রকাশিছে দিকে দিকে তার মৃত্যুর কালিমা মাখা গায়।
লক্ষ লক্ষ ছায়ার শরীর। দুঃখরাশি জগতে ছড়ায়,
নাচে তারা উন্মাদ তান্ডবে, মৃত্যুরূপা মা আমার আয়।
করালী! করাল তোর নাম, মৃত্যু তোর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে
তোর ভীম চরণ-নিক্ষেপ প্রতিপদে ব্রহ্মাণ্ড বিনাশে।
কালী, তুই প্রলয়রূপিণী, আয় মা গো আয় মোর পাশে।
সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মৃত্যুরে যে বাঁধে বাহুপাশে,
কাল-নৃত্য করে উপভোগ, মাতৃরূপা তারি কাছে আসে।
(স্বামী বিবেকানন্দ)
বারোমাসে তেরো পার্বণ নিয়ে বছর কাটে হিন্দুদের। অজস্র দেবদেবীর মধ্যে কিছু দেবদেবী হিন্দু ধর্মে পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছেন। আবার কিছু দেবী হয়ে উঠেছেন ঘরের মেয়ে, আদরের দুলালী। যেমন আমাদের মা দুগ্গা, যাঁর আর এক নাম উমা। তিনি বাঙালি মেয়ের মতন শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের ঘরে আসেন আদর খেতে, একটু সংসারের কাজ থেকে মুক্তি পেতে। তারপর তাঁকে চোখের জলে বিদায় দিতে হয়। দুদিন যেতে না যেতেই আসেন কোজাগরী লক্ষ্মী। তিনিও প্রত্যেক হিন্দু ঘরের কন্যা। তিনি সমৃদ্ধি বয়ে আনেন, তাই তাঁর আলাদা কদর। গোটা বছর আমরা লক্ষ্মীকে নানান উপাচারে, আদরে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করি।
লক্ষ্মীপুজোর পরে বেশ কটা দিন ফাঁকা ফাঁকা। তারপরেই আসেন আর এক আদরিণী কন্যা শ্যামা। তাঁরই অপর নাম কালী। সমস্ত হিন্দু দেবীর মধ্যে তাঁরই রূপ উগ্র এবং ভয়ংকরী। তবু তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছেন অনায়াসে। শ্মশানের যিনি একমাত্র দেবী, আমরা তাঁকেই বলি ঘরের মেয়ে। মৃত্যু যাঁর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে তাঁকে নিয়েই বাংলায় সবথেকে বেশি গান রচিত হয়েছে এবং সেখানে কোথাও ভয় পাবার কোনও কথা নেই, শুধু আছে সমর্পণ। রামপ্রসাদ থেকে ভবাপাগলা, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য থেকে কাজী নজরুল সকলেই মাকে আরাধনা করেছেন গানে গানে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবও বলেছেন সাধনা গানের মাধ্যমেও করা যায়।
কয়েকজন ইংরেজ এক হলে একটি ক্লাব গড়ে ওঠে, কয়েকজন স্কচ এক হলে একটি ব্যাঙ্ক, কয়েকজন জাপানি এক হলে একটি গুপ্ত সমাজ আর কয়েকজন বাঙালি এক হলে দুর্গা পুজো আর একটি কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা হবেই হবে।
বাংলার অলিতেগলিতে রাজপথে অজস্র কালী মন্দির। যার কোনোটা সুবিখ্যাত আবার কোনোটা শুধুই অঞ্চলের মানুষের কালীবাড়ি। বাংলার মত ভারতেও অনেক কালীমন্দির রয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে যে মরুতীর্থ হিংলাজ মাতা ছাড়াও আরও এক অনন্য কালীমন্দির এখনও বর্তমান সেটার কথা আমরা হয়ত সকলে খুব একটা অবগত নই। যেখানে মৌলবাদীদের দম্ভে ভেঙে পড়েছে অজস্র মাতৃমন্দির সেখানে ১৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে একটি কালীমন্দির মহিমান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং যেটির সামনে পাকিস্তানের অধিবাসীরাও মাথা নত করেন সেই মন্দিরটিই হল পাকিস্তানের বালুচিস্তানের কালাত অঞ্চলে কালাটেশ্বরী কালী মন্দির। যেখানে মৌলবাদীরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান মন্দির গির্জা ভেঙ্গে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে, সেখানে এই মন্দির স্পর্শ করার স্পর্ধা এখনও দেখাতে পারেনি তারা।
পাকিস্তানের কয়েকটি টিকে থাকা হিন্দু মন্দিরের মধ্যে একটি হল মরুমাতা হিংলাজ। এটি ৫১টি সতীপীঠের মধ্যে একটি। তবে এই কালাটেশ্বরী মন্দিরটি কিছুটা গোপনেই ছিল। জানা যায় যে মন্দিরটি ৭৪ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু বণিকদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মন্দিরের ফলকে উর্দুভাষায় এই প্রতিষ্ঠাকাল জ্বলজ্বল করছে। পাকিস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের মতে ভোজমল ভাটিয়া নামে এক ব্যক্তি ষোড়শ শতাব্দীতে মনোরা শহরে এসে এই কাঠের মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন থেকেই দেবী কালিকার পূজা নিয়মিতভাবে হয়ে আসছে। সিন্ধু ও বালুচিস্তান পাকিস্তানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। করাচি এবং কোয়েটা এই দুই প্রদেশের রাজধানী। এখানে অনেক প্রভাবশালী হিন্দুর বসবাস। এই দুটি প্রদেশেই বিভিন্ন হিন্দু ও শিখদের মন্দির ও উপাসনালয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি হল কালাট কালী মন্দির।
এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন যে সমস্ত হিন্দু বণিকরা, তাঁদের ব্যবসা বিস্তৃত ছিল পারস্য অবধি। কথিত আছে স্থানীয় বালুচদের কিংবদন্তি নায়ক সেওয়া কালাত শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। তারই নামানুসারে এটির নাম হয় কালাত-ই-সেওয়া (সেওয়া = দুর্গ)। এই কালী মন্দির ওই দুর্গের পাদদেশে অবস্থিত এবং এটি উত্তর ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। ঐতিহাসিকদের মতে সেই সময়ে এশিয়ার এই অংশে অনেক হিন্দু দেবদেবীর মন্দির ছিল। পরবর্তীকালে বিদেশী হানাদার এইসব মন্দিরের অধিকাংশই ধ্বংস করে ফেলে। প্রচুর সংখ্যক মন্দির দখল করে সেগুলি জোরপূর্বক বাসগৃহে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে এই কালাটেশ্বরী মন্দির অক্ষত রয়ে গেছে।
পাকিস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের মতে এই কালীমন্দির প্রাক-ইসলামিক যুগে নির্মিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই মন্দিরের কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। মন্দিরের অন্দরে দেবী কালিকার মূর্তিকে বিশেষভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাকিস্তানের অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে সিন্ধু প্রদেশের মানুষ এই মন্দির দর্শনে আসেন। গত ১৫০০ বছর ধরে পাকিস্তানের এই কালী মন্দির উগ্রপন্থীরা স্পর্শ করতে পারেনি।
আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি স্থানীয় রাজ্য কালাত, যেটি বালুচিস্তানের অন্তর্গত। এই আদি রাজ্যটি ১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভাগের পর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বালুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। কিছু তথ্য থেকে এরূপ জানা যায় যে কালাতবাসীরা পাকিস্তানের নয়, ভারতের অংশ হতে চেয়েছিলেন। বালুচিস্তান সবসময়ই ব্রিটিশ বিরোধী ছিল। ওখানকার স্থানীয় নবাবরা খুব প্রভাবশালী ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা পাকিস্তানের শাসন মেনে নিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলস্বরূপ ১৯৪৭-এর পর থেকে বালুচিস্তান বারবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। রক্তাক্ত হয়েছে মাটি। তাঁরা নাকি জহরলাল নেহেরুকে চিঠি লিখেছিলেন ভারতে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। কিন্তু ভৌগোলিক কারণ ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তাঁদের অনুরোধ রাখা সম্ভব হয়নি।
এই কালাত নবাবরা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে এই কালীমন্দিরটিকে রক্ষা করতেন। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁরা পাকিস্তান সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই কালী মন্দির ইতিহাসে প্রাচীনতম স্মৃতিস্তম্ভ রূপে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে পাকিস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এই মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে। কালাত প্রদেশের মানোরা শহরে এই মন্দির অবস্থিত।
জানা যায় যে উগ্রপন্থীরা এই মন্দির ধ্বংসের অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই সফল হতে পারেনি। ২০১০ সালে মৌলবাদীরা এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ও দুই ভৃত্যকে অপহরণ করে। কিন্তু কয়েকদিন পর তাঁদের জীবিত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা অনেকের মনেই প্রভাব বিস্তার করে। স্থানীয় মুসলমানরাও এই মন্দির বুক দিয়ে আগলে রাখেন। বর্তমানে এখানে মাত্র দুই শতাংশ হিন্দু বসবাস করেন।
মায়ের মূর্তি ভয়ংকরী। মূর্তিটি প্রায় ২০ ফুট উঁচু। যতদূর জানা যায় যে এটি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ কালী মূর্তি। ভক্তদের অতি ভক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মূর্তিটি বুলেটপ্রুফ কাচ দিয়ে ঘেরা। মূর্তিটি অন্য দেবীর মূর্তির মতো নয়। এখানে দেবী দুর্গার মত মা কালীরও দশ হাত। দশ হাতে তিনি গদা, তরবারি, ঢাল, ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, ধনুক, শঙ্খ, খঞ্জর এবং মানুষের মাথা ধারণ করে আছেন। মা এখানে যুদ্ধের পোশাক পরিহিতা। গাত্রবর্ণ নীল। সবথেকে যেটি ভয়প্রদ সেটি হল নরমুণ্ডমালা এখানে আসল। পুরুষের খুলি দিয়ে মুন্ডমালা দেবী ধারণ করে আছেন। ঐতিহাসিকদের দাবী যে এই ধরনের রণচন্ডী মূর্তি পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কারণ এমন একটি বিতর্কিত স্থানে যে মায়ের অবস্থান, সেখানে মায়ের এমন ভয়াল মূর্তিই তো স্বাভাবিক।
মন্দিরটির সঙ্গে বিভিন্ন কিংবদন্তি জড়িয়ে রয়েছে। এরকম একটি কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, দেবী কালীর ঐশ্বরিক শক্তি মন্দির ধ্বংসের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল। যারা এই মন্দিরের ক্ষতি সাধন করতে চেয়েছিল তারা মায়ের ভয়াল মূর্তি দেখে ভীত হয়েছিল। ‘মৃত্যুর কালিমা মাখা গায়’ মা কালাটেশ্বরী তাই স্বমহিমায় বিরাজিতা।