গত ৯ জুলাই ছিলো প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক এবং প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা গুরু দত্তের জন্মশতবার্ষিকি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক স্বভাব স্বতন্ত্র স্রষ্টা। গুরু দত্ত নামটা শুনে বাঙালি মনে হলেও তিনি কিন্তু বাঙালি ছিলেন না।যদিও তার কৈশোরবেলা কেটেছিল কলকাতার ভবানীপুরে। তাই তিনি বাংলা বেশ পরিষ্কার বলতে পারতেন, বাংলা সংস্কৃতিও পছন্দ করতেন। ক্ষনজন্ম এই প্রতিভার জীবন দীপ নিভে আসে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে নেশা, নৈরাশ্য আর নারীসঙ্গে। আজকের স্মৃতিচারণায় তারই কিছু ঝলক।
দক্ষিণ ভারতে সারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৯২৫ সালের ৯ জুলাই তার জন্ম। বাবা স্কুলের হেডমাস্টার, মা গৃহবধূ হলেও কবিতা ও ছোট গল্প ভালো লিখতেন। গুরুদত্তের আসল নাম ছিল বসন্তকুমার শিবশঙ্কর পাদুকোন। ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনার কবলে পড়ার জন্য, বাড়ির লোকেরা মনে করতেন তার নামটি হয়তো অশুভ। তাই নতুন নামকরণ করা হয় গুরুদত্ত অর্থাৎ গুরু প্রদত্ত।
পাঁচভাই বোনের সংসারে প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকত।ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের ভয়ংকর ঝগড়ার সাক্ষী হয়ে বড় হয়েছেন গুরু। বন্ধু বলতে ছিল ‘বকুট মামা’ (বালকৃষ্ণ বেনেগল), তিনি সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। তার মুখে সিনেমার গল্প শুনে সিনেমার প্রতি অনুরাগ জন্মায় ছোট্ট গুরুর। ছোট বয়স থেকেই খুব একটা পড়াশোনায় মন ছিল না গুরুর। মাধ্যমিক পাস করার পরে বাবার আর্থিক দুর্বলতার জন্য মাত্র ৪০ টাকা বেতনে টেলিফোন অপারেটরের চাকরি নেন। তাতেও মন টিকলো না, কলকাতা ছেড়ে দিয়ে তিনি আলমোড়ায় উদয়শঙ্কর ডান্স একাডেমিতে ভর্তি হন নাচের তালিম নিতে।

কিন্তু সেখান থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কেননা গুরু স্কুলের মধ্যেই জড়িয়ে পড়েছিলেন প্রেমের সম্পর্কে। তারপর পুনার প্রভাত ফিল্মস্ ।এখানেও দলের অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেম এবং সেই নিয়ে থানা পুলিশ কান্ড। প্রভাত ফিল্মস এর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না গুরুর। মাঝে বিশ্রাম বেডেকারের একটি মারাঠি ছবিতে ছোট একটি রোল করলেন গুরু। এরপরে প্রভাত ফিল্মের সঙ্গে তিন বছরে কন্টাক্ট শেষ হতে তার পাকাপাকি ছুটি হয়ে গেল।
এখানে কাজ করার সময় তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় দেবানন্দের। প্রভাত ফিল্মস তে থাকার সময় মাঝেমাঝে যখন তারা আড্ডা দিতেন, তখন কথা হতো নিজেদের ছবি নিয়ে। এখানেই দেব এবং গুরু একে অপরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দেব যেদিন নিজের ছবি প্রযোজনার সুযোগ পাবেন, তার পরিচালনায় দায়িত্ব দেবেন গুরুকে। আর গুরু পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, নায়কের রোল দেবেন দেবকে।
ততদিনের গুরুর পরিবার চলে গেছেন মুম্বাইতে। এক বন্ধুর সুপারিশে বাবুরাও পাইয়ের অফিসে একটা চাকরি পেলেও তাতে মন টিকলো না। প্রায় দশ মাস কর্মহীন অবস্থায় টুকটাক কাজ, নাচ গানের অনুষ্ঠানে দিনমজুরি করে দিন কাটতে লাগলো।

হঠাৎই একদিন বন্ধু মনপ্রীত বললো, বসে না থেকে তুই তো লেখালেখি করতে পারিস! তবে সেটাই শুরু করে দে।’ গুরু বললেন, ‘আমি সিনেমার গল্প লিখি! কিন্তু তা দিয়ে কি আর রোজগার হবে?’
বন্ধু মমনপ্রীত তাকে নিয়ে গেল খুশবন্ত সিং-এর কাছে। খুশবন্ত সিং তখন টাইমস গ্রুপের উইকলি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তার সঙ্গে কিছু কথা হলো। শোনা গেল নতুন লেখকদের গল্প পিছু ১৫ টাকা পুরনো লেখকদের ২০ টাকা দিতেন। পরের মাস থেকেই পর পর প্রকাশিত হতে লাগলো গুরুর লেখা, খুশবন্ত সিং তাকে দিয়ে কয়েকবার অন্য লেখাও লিখিয়ে নিয়েছিলেন।
লেখালেখির পাশাপাশি স্টুডিও পড়ায় নিয়মিত ঘুরে বেড়াতেন গুরু, পয়সা রোজগার হোক না হোক অন্যের কাজ দেখে শিক্ষিত হতে ক্ষতি নেই সেই ভাবেই অমিয় চক্রবর্তী, জ্ঞান মুখার্জি ইত্যাদি নির্দেশকের কাজ দেখতে শুরু করেন। জ্ঞান মুখার্জিকে গুরু তার গুরুজী হিসেবে মানতেন। গুরু মাঝেমধ্যে স্টুডিওয় কাজ করতেন দৈনিক পারিশ্রমের বিনিময়ে।
একদিন বাড়ি ফিরে গুরু বন্ধু দেব আনন্দের চিঠি পেলেন। দেবানন্দ নিজের ছবি বানাতে চাইছিলেন, কিন্তু একা ভরসা পারছিলেন না। সঙ্গে নিতে চাইলেন গুরুকে।
চেতন আনন্দ-দেব আনন্দের নিজেদের সংস্থা ‘নবকেতন ফিল্মস’-এর দ্বিতীয় ছবি “বাজি” (১৯৫১ সালে) প্রথম পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে গুরু দত্তের। দুই বন্ধু একে অপরের প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন। ছ’বছর পর গুরুদত্ত লিমিটেড ব্যানারে ‘সিআইডি’ ছবিতে নায়ক হিসেবে থাকলেন দেবানন্দ।

বাজি ছিল দেশে নির্মিত প্রথম ক্রাইম থ্রিলার। ছবির থিম ছিলো পরিস্থিতির চাপে একজন মানুষ কিভাবে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। এটি “বোম্বে নয়ার” নামে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছিল। আওয়ারা ছবির পর ১৯৫১ সালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্র ছিল এটি। গুরু দত্তের পরিচালিত বাজি, জাল এবং বাজ এই তিনটি ছবি তৈরি হয়েছিল ‘নয়ার’ ছবির চিত্রশৈলী অনুসরণ করে।
ছবিটির সুরকার ছিলেন শচীন দেব বর্মন। সুপারহিট হয় এই ছবির গানগুলি। গানের রিহার্সাল হতো শচীন দেবের বাড়িতে। এখানেই গীতার সঙ্গে গুরুদত্তর প্রথম আলাপ। গীতা দত্ত (রায়) ছিলেন ফরিদপুরে জমিদার বংশের মেয়ে। দেশভাগ আর ভাগ্য বিপর্যয় কলকাতা, তারপর বোম্বেতে এসে পৌঁছে দেয়। খুব ছোট বয়স থেকেই গীতা প্লেব্যাকে প্রচুর নাম করেন। এই সিনেমায় গান গাওয়ার আগে গীতা দেড়শ প্লে ব্যাক করে ফেলেছিলেন। শচীন দেব বর্মন তাকে তার ছোট মেয়ে ভাবতেন। সিনেমায় ছয়টি শোলো গেয়েছেন গীতা দত্ত। কিশোর কুমার দেব আনন্দের কন্ঠে একটি গান গেয়েছিলেন, শামসাদ বেগমের কন্ঠ একটি গান ছিল।
গানের রেকর্ডিং এর শেষ দিনে সাউন্ড প্রুফ ঘরে গীতা দত্ত গাইলেন, ‘তদবীর সে বিগড়ি হুয়ি তকদীর বানা লে’, গান শেষ হতেই হাততালি দিয়ে গুরুদত্তের বোন ললিতা বললেন, ‘শুনলে দাদা, আহা কি সুন্দর গান, মন ভরে গেল’।
‘হ্যাঁ খুব ভালো হয়েছে’, বলে রেকর্ডিং রুম থেকে বাইরে চলে গেলেন গুরু। রেকর্ডিং এর রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর গীতা দেখলেন গুরু দত্ত ঘরে নেই। ললিতা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘দারুন হয়েছে’।

গীতা প্রশ্ন করলেন, তোমার দাদা কোথায়?
কোন উত্তর না দিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে একটি চিঠি বার করে ললিতা গীতার হাতে দিয়ে বললেন, ‘দাদা দিয়েছে। পরে বাড়ি গিয়ে পড়ে একটা উত্তর দিও’।
এদিক-ওদিক চোখ মেলে গীতা দেখলেন ঘরে কেউ নেই। তার খুব ইচ্ছা হল চিঠিটা রাখবেন বুকের মধ্যে। কিন্তু লজ্জায় তা করতে পারলেন না। হাত ব্যাগে চিঠিটা চালান করে তিনি বললেন, ঠিক আছে।
গুরুর পৌরুষে আকৃষ্ট হয়ে গীতা ভেসে গেলেন প্রেমের জোয়ারে। শুরু হয় গীতা গুরুর প্রেম কাহিনী। গুরু তখন নবাগত অবগত থাকলেও গীতা ততদিনে ছিলেন সুপারস্টার নায়িকা। গীতা দত্তের গানের জন্যই গুরুর ছবি রিলিজ হওয়ার আগে হিট হয়ে যেত। গুরুর কাছে গীতা ছিলেন ট্রাম কার্ড।
যদিও দুই পরিবার চায়নি বিয়েটা হোক। গুরু দত্তের পরিবার ছিল ব্রাহ্মণ, তাই অসবর্ণ বিয়েতে কোন মতামত ছিল না অন্যদিকে গীতার পরিবারের কাছে গীতা ছিলেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস, তাকে হারাতে চাইনি পরিবার। কিন্তু পীরিতি কাঁঠালের আঠা, একবার লাগলে আর ছাড়তে চায় না। ১৯৫৩ সালে সকলের বাধা অতিক্রম করে চার হাত এক হল।

বিয়ের সেলিব্রেশন ছিল দেখার মত। বাঙালি মতেই বিয়ে হয়েছিল। গীতার পরণে ছিলো লাল বেনারসি আর গুরু পরে ছিলেন সাদা ধুতি পাঞ্জাবি, মাথায় টোপর। গীতাকে সাজিয়েছিলেন গীতা বালি, যিনি পরে সামনের শাম্মী কাপুরকে বিয়ে করেন। বিয়ের আসরে মেতে ছিলেন সব হেভিওয়েটরা। স্ত্রী-আচার সামলে ছিলেন কিশোর কুমারের স্ত্রী রুমা গুহ ঠাকুরতা। বহুদিন চর্চায় ছিল বলিউডের এই গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন।
সিনেমায় আবিষ্ট গুরুদত্ত অতিরিক্ত সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। তিনি সিনেমা জগতে এক ধরনের কিন্তু বাস্তবে বিবিধ অন্তর দ্বন্দ্বের জটিল সমাবেশ ছিল তাঁর চরিত্রে। নিজের ছবিতে নারী স্বাধীনতা, রোজগারে নারীদের গল্প বলতেন কিন্তু ঘরে ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। বিয়ের পরই গীতা দত্তের বাইরে গান গাওয়া বন্ধ করে দেন গুরু, শুধুমাত্র গুরুর ছবিতেই গীতা গাইবেন এমন শর্ত আরোপ করেন। বিয়ের আগের গুরু আর বিয়ের পরের গুরুর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ ছিল।
জুয়ারী, স্মাগলার ও অ্যাডভেঞ্চারের গল্প ছেড়ে গুরুদত্তের প্রথম কমেডি হিট ছবি হলো আরপার।
ছবিটির গান ছিল খুবই জনপ্রিয়। ফিল্ম কম্প্যানিয়নের “সর্বকালের সেরা বলিউড অ্যালবাম” এর তালিকায় চলচ্চিত্রটির অ্যালবামটি ৩৪তম স্থানে ছিল। ছবিটি তে গান গেয়েছিলেন গীতা দত্ত। ‘বাবুজি ধীরে চালনা’ গানটি আজও প্রচুর জনপ্রিয়। (ক্রমশ)
অনবদ্য লেখনী।