শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৪৪
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

গোর্খে-সামান্দেন-ভারেং ট্রেক : পাহাড়-অরণ্য-নদীর কলতান : অমৃতাভ দে

অমৃতাভ দে / ৮২১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৩০ জুন, ২০২৫

বেরিয়ে পড়লাম আবার পাহাড়ের টানে। তিনদিনের ট্রেক। পাহাড়-নদী-ঝর্ণা-অরণ্যের পথ। সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের অপার সৌন্দর্য জড়িয়ে ধরবে আমাদের। সবুজ গালিচায় ডুবে যাব আমরা। পাহাড়ি ঝর্ণার শব্দ নতুন ভাষা দেবে আমাদের। অরণ্যের শীতলতা আমাদের শান্ত হতে শেখাবে।নদীর বহমানতা দূর করবে আমাদের নাগরিক ক্লান্তি। এ পথের পরতে পরতে বিস্ময়। লক্ষ লক্ষ ছবির কোলাজ পথের দু’ধারে টাঙানো, শরতের মেঘ, আকাশ, সবুজ বনানী, রঙিন নুড়ি,কাঁকড়,পাথর পাহাড়ি ঝোরার মাদকতা আমাদের মাতাল করে তুলবে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছাড়লো ট্রেন বিকেল পাঁচটায়। ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে গেল ট্রেন। রাত তিনটে নাগাদ আমরা রওনা হলাম। রোহিনি হয়ে কার্শিয়াং। কার্শিয়াং হয়ে ঘুম, লেপচাজগত, তারপর মানেভঞ্জন। সেখান থেকে পৌঁছে যাব সেপি, শ্রীখোলার ঠিক একটু আগে ছবির মত সাজানো একটি গ্রাম। রাতের কার্শিয়াংকে পেলাম খুব কাছ থেকে। রাতের পাহাড় যেন একেবারে অন্যরকম। চা বাগানের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। লেপচাজগতে এসে যখন থামল তখন ভোরের আলো ফুটেছে। লেপচাজগতকে আগে এভাবে পাইনি। লেপচাজগত মানেই যেন মেঘ-কুয়াশায় মোড়া একটি পাহাড়ি সুন্দরী কন্যা। সবুজ পাহাড়শ্রেণির পিছন দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তখন তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ। লেপচাজগত থেকে এত সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবো ভাবতেই পারিনি। লেপচাজগত আসলে মেঘ কুয়াশার জগত।পাইনবনের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া পথে যেন লুকিয়ে থাকে অজানা রহস্য। আজ মনে হল তার মেজাজ সে যেন কিছু সময়ের জন্য পাল্টেছে, মানেভঞ্জন থেকে ধোত্রে যাবার পথে পর্বতশ্রেণিকে আরো কাছ থেকে পেলাম। সকালের রোদ্দুর তখন পর্বতশিখরে, শরীরে রঙিন আবীর ছড়িয়েছে। চলি একে সঙ্গে নিয়ে। কথা বলি কতদিনের চেনা ওর সাথে। ধোত্রেতে সান্দাকফু ট্রেকিং-এর সময় রাত কাটিয়েছি। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ধোত্রে গ্রামটি বেশ সাজানো গোছানো।

নির্জনতা এখানে ছন্দে ছন্দে পা ফেলে। বেশ কিছুটা সময় কাটল। ধোত্রতে পাইনবনের নিবিড় অরণ্যের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে হেটে বেড়ানোর অনুভূতি আলাদা। ধোত্রের সৌন্দর্য সকলকে আকৃষ্ট করে। ধোত্রে থেকে চললাম আমাদের গন্তব্য শ্রী খোলা। বৃষ্টি এলো পাহাড়ের কোলে। আমাদের খুব সহজেই পাহাড় এসে আপনাকে আলিঙ্গন করবে। কোন এক দূর অরণ্যের ভিতর থেকে সে যেন কথা কইতে এসেছে আমাদের সঙ্গে। অনেকগুলি পাহাড় একসঙ্গে মিশেছে। পরস্পরের কানে কানে কথা বলছে তারাও। সবুজ পাহাড়ের মাথায় সাদা মেঘ। ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে জানালায় একটু চোখ রাখা। কবিতার পঙক্তি জন্ম নিল মনে।

পৌঁছে গেলাম পাহাড়ঘেরা নদীর তীরে যেই

দীর্ঘ পথের ক্লান্তি কোথায়? কষ্ট কিছু নেই।

বর্ষা যেন এই পাহাড়ের সঙ্গী হবে আজ

বলেই ফেলি উল্লাসে তাই,কী অপরূপ সাজ!

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ছোট্ট একটি ট্রেকে বলা ভালো প্র্যাকটিসে। সেপি থেকে শ্রীখোলা হয়ে একটি পথ গেছে গুরদুম হয়ে সান্দাকফুর দিকে। অন্য পথ গেছে রাম্মাম হয়ে সামালদেন ভ্যালি ছুঁয়ে গোর্খের দিকে, গোর্খে আসেন সকলে ফালুট ট্রেক থেকে ফেরার সময়। আমরা পরের দিন মূল ট্রেক শুরু করব গোর্খের পথে। ঠিক করলাম যাব টিম্বুরে পর্যন্ত। শ্রীখোলা ব্রিজ পেরিয়ে খাড়াই পথে টিম্বুরে। জঙ্গলের পথে অনেকটা উঠে গেলাম এই পথে।এর আগে আসিনি তাই অ্যাভেঞ্চার ভালই হল। কয়েকদিন ধরে ভালই বৃষ্টি হয়েছে পাহাড়ে। স্বাভাবিকভাবেই পিচ্ছিল পথ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ কিন্তু অনুভূতি বেশ আলাদা। নানান পতঙ্গের ডাক, আলোআঁধারিকে অন্য মাত্র দিচ্ছে। শ্রীখোলা নদীর রূপ মুগ্ধ করবে এই গ্রামের পথে যেতে যেতে। নামলাম অন্য পথে।এই রাস্তায় অজস্র ফুল চোখে পড়বে। পথের পাশেই ধাপে ধাপে চাষ হচ্ছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু কিছু বাড়ি সবুজের মাঝে, যেন এক ঝুলন সাজানো।সন্ধে নামছে পাহাড়ে। বৃষ্টি নেই পথে। এ পথ যেন কত চেনা আমাদের। প্রকৃতির নির্জনতায় কবিতারা আসে গুটি গুটি পায়ে।

সেপির পাশেই শ্রী খোলা গ্রাম নির্জন এক দেশ

বৃষ্টিভেজা ব্যালকনিতে সন্ধ্যা নামে বেশ

ক্যাম্পফায়ারে মাতল সবাই বৃষ্টি যে ঝিরঝির

গল্প শোনে রাতের আকাশ একলা নদীর তীর

ইন্দ্রজিৎ বাজায় মাউথ অর্গান, স্নেহাশীষদা গাইতে শুরু করে পুরনো দিনের কত না গান। পাহাড়ের কোলে আমরা রোমন্থন করি ফেলে-আসা দিনের কথা। রাত্রি নামে। নদীর স্রোত ঘুমপাড়ায় আমাদের। কাঁচের জানালায় কুয়াশারা আসে। বলে, ডেকে দেবো ভোরবেলা। টিপটিপ বৃষ্টি, পাখির ডাক, নদীর স্রোতের নুপুর নিক্বণ। পরদিন সকালে আমাদের ট্রেক শুরু হবে, হেঁটে যাব গোর্খের পথে।

সেপি থেকে রাম্মামের দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। বেশিরভাগ পথই খাড়াই। কষ্ট হবে কিন্তু প্রকৃতি ক্লান্তিকে দূরে সরিয়ে দেবে। চোখের সামনে একটি একটি করে নতুন নতুন ক্যানভাস তুলে ধরবে প্রকৃতি। দুপুর হল। পৌঁছাতেই গরম গরম চা, তারপর দুপুরের খাবার। পাহাড়ের হোমস্টের খাবারের প্রতি আমাদের সকলেরই একটা আলাদা লোভ থেকে যায়। তার সঙ্গে উপরি পাওনা ওদের ব্যবহার। রান্নাঘরটি নিজেই যেন একটা গল্পের দৃশ্য! কি পরিপাটি! রাম্মামকে পিছনে ফেলে এবার প্রায় ছ কিমি হাটা। বিকেল বিকেল পৌঁছাতে হবে সামান্দান ভ্যালি। ভ্যালিতে পৌঁছানোর আগেই নদী অতিক্রম করতে হবে। নদী পেরোলেই অনেকটা উঁচুতে উঠতে হবে। তারপর কিছুটা নেমে ভ্যালি। সবুজের সমারহ। সত্যিই মনে হলো কোনো স্বপ্নের দেশে পৌঁছে গেছি। মনে হবে স্বপ্নের সুইজারল্যান্ড স্বাগত জানালো আমাদের। আসলে এই সামান্দেনভ্যালিকে বলা হয় পশ্চিমবঙ্গের সুইজারল্যান্ড। যদিও এই কথাটা শুনতে কারো কারো খারাপ লাগতে পারে কিন্তু আমাদের এই ঘরের পাশেই পৃথিবীর অন্যতম সৌন্দর্যময় একটি দেশ যেন আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।শরীরকে সবাই এলিয়ে দিল সবুজ ঘাসে, সামান্দানভ্যালির সৌন্দর্যের কথা আমি ভাষায় বলতে পারব না। অল্প কিছু হোমস্টে আছে, সেখানে সবুজ ঘাসে ছুটে বেড়াচ্ছে ঘোড়ার দল, ফুটবল খেলছে স্থানীয় কিশোরের দল, ধাপে ধাপে সাজানো উপত্যকায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ছুটে গেলাম অনেকটা উপরে। পাইনের বন এক পাশে, ভুট্টার ক্ষেত অন্য পাশে। চারিদিকে পাহাড় শ্রেণি কোলের ভিতরে আগলে রেখেছে যেন তার কন্যাকে। কিছুটা পথ নেমে আবার আমরা উঠতে থাকি, তারপর আবার নামা। এবার আমাদের সামনে এলো রাম্মাম নদী। পাথরের ভিতর দিয়ে চলেছে সে, পাশেই আমাদের হোমস্টে। কাঠের পুল পেরিয়ে এলাম হোমস্টের দিকে। অসামান্য নৈসর্গিক চিত্রপট চোখের সামনে। রাম্মাম একটু এগিয়ে মিশেছে গোর্খে নদীর সঙ্গে। সকালে গোর্খে নদীকে পেরিয়ে আমরা চলে যাব ভারেং। ভারেং সিকিম রাজ্যের অন্তর্গত। গোর্খে গ্রাম আপনাকে তার সমস্ত মোহনীয় রূপ নিয়ে আলিঙ্গন করবে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু হোমস্টে। গোর্খে আসলে ট্রেকারদের প্রিয় জায়গা। সান্দাকফু-ফালুট ট্রেকিং-এ ফালুট থেকে নেমে আসার সময় এই পথে ফেরেন। সকলে গোর্খেতে এসে একরাত্রি থাকেন। গোর্খের সন্ধেটা আমাদের কাছে বহুদিন মনে রাখার মত রঙিন হয়ে থাকলো। বৃষ্টি নামলো মুষলধারে। সান্ধ্য-আড্ডায় রবীন্দ্রনাথ এলেন গানের ডালি নিয়ে। একের পর এক রবীন্দ্রগানে মাতলাম আমরা। ইন্দ্রর মাউথ অর্গান আর স্নেহাশিসদার কন্ঠের যুগলবন্দিতে পাহাড়ি নির্জনতা সুরে সুরে মাতাল হল। ভোর বেলায় গোর্খে যেন রূপোলী কন্যা। ঘুরে বেড়ানো গ্রামের পথে। দুটি নদী বয়ে চলেছে গ্রামের দুপাশ দিয়ে, মিশেছে আমাদের হোমস্টের কাছেই। দুই নদীর সঙ্গে গল্প করে কাটলো অনেকটা সময়। নিস্তব্ধতা এই গ্রামের অলংকার। বৃষ্টি হয়েছে রাতে। পাহাড় যেন এইমাত্র স্নান সেরে সবুজ শাড়ি পড়ে আমাকে সুপ্রভাত জানালো। ঘুম ভাঙেনি কারো। শুধু জেগেছে প্রকৃতি। দুটি নদীর প্রেমালাপ শুনতে শুনতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম অজানা কোনো দেশে, সেই দেশে — যে দেশে ভোরের বেলা পাখিরা গান শোনায় পাহাড়কে, অরণ্য রূপকথার গল্প বলে কীটপতঙ্গদের, নদী তার বয়ে চলে চলার গল্প শোনায় মেঘকে। আমিও আমার সমস্ত ভালোবাসাটুকু এই গ্রামের পথে রেখে গেলাম।

সকালের ভিজে মেঘ নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায় শহরের মেয়ে

নদীতে নেমেছে দেখো

সারারাত জেগেছিল বুঝি!

বৃষ্টি হয়েছে টিপটিপ

কবিতা লিখেছে. ..গান করেছে গুনগুন

এই সকালে নদীর কানে কানে কি বলছে ও

খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার।

অনেক দিনের চেনা মনে হয় ওকে…

ওকে বলো, আমি আগের মতোই আছি।

গোর্খে থেকে আমরা রওনা দিলাম ভারেং-এর দিকে। হোমস্টে থেকে একটু উপরের দিকে উঠে আবার নামতে হবে নদীর কাছে। নদী পেরোনোর আগেই চেকপোস্ট, সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক এলাকাতেই আমরা আছি। এটা অবশ্য আমাদের পশ্চিমবঙ্গ। এখানে ফি জমা করতে হয়। যেহেতু আমরা ফরেস্ট এলাকাতেই আছি তাই বিশেষ চার্জ লাগবে। এখান থেকে অনেক কিছু জানা গেল। এই অরণ্যে পশু-পাখি-গাছপালা সম্পর্কে বিশদে লেখা রয়েছে চেকপোষ্টের অফিসের দেওয়ালের বিভিন্ন ছবিতে। পক্ষীপ্রেমীদের কাছে এটি ভূস্বর্গ। নদীর নাম গোর্খে। ছোট্ট কাঠের সেতু পেরোতে পেরোতে নদীর কথা কানে এলো।ওর ভিতরে এত সুর! নূপুর পায়ে নৃত্যরতা পাহাড়ি মেয়ে বলল তুমিও না হয় আমাকে নিয়ে একটা গান শোনাও। নদী মানেই তো সেই চেনা ক্যানভাস, নদী মানেই তো ভালোবাসা বারোমাস। নদী নিয়ে কবিতার কথা মনে আসছে। তখন বন্ধু ইন্দ্র গান ধরল। গানের কথা আর চারপাশের প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার তখন।

নদীর কাছে দাঁড়িয়ে মেয়ে

নানান কথা বলে

কেমন আছো গোর্খে নদী

ছন্দে সুরে তালে

গ্রামের রাখাল বাউলফকির

তোমায় ছুঁয়ে থাকে

মনমাঝিরা পাল তুলে দেয়

আজও তোমার ডাকে।

পাশে নিয়ে নতুন রাজ্য, অরণ্যপথে হেঁটে চলেছি আমরা।এক পাশে ফেলে আসা পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি গ্রাম গোর্খে তখনও যে তাকিয়ে আমাদের দিকে। বন্ধুত্বের উষ্ণতা যে মাখিয়ে এসেছি ওর গায়ে লাল রঙের আবেশে।ভারেং-এর পথ বড় সুন্দর! নৈসর্গিক দৃশ্যের বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। নদীটি পেরোনোর পরে ভয়ঙ্কর সুন্দর রাস্তার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। ধ্বস নেমেছে পথে।এক পাশে খাড়া ঢাল, মিশেছে নদীতে। সাবধানে পথ পেরোলাম। কয়েক কিলোমিটার বনভূমির ভেতর দিয়ে চলবার পর পিচ রাস্তা পাওয়া গেল।জানা গেল ভারেং-এর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই সড়ক পথ। যদিও আমরা আবার নেমে যাব নিচের দিকে সবুজ অরণ্যের পথে। পাহাড়ি ঝর্ণাকে সঙ্গী করে সবুজের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলা। কোনো এক ঝর্ণার পাশেই মা ভবানীদেবীর স্থান — গাছের গায়ে ঝোলানো বোর্ডের লেখা থেকে জানতে পারলাম। রঙিন নিশান উড়ছে। প্রণাম করে এগিয়ে চললাম। আকাশে নীল মেঘের ভেলা আর পায়ের তলায় সবুজ ঘাস বিছানো। পথ চোখে পড়ল কত না গাছগাছালি, চোখের সামনে রঙিন ক্যানভাস। তুলিতে এঁকেছে কেউ। বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন পাহাড়ী প্রকৃতিকে ভালোবেসে, “যখন তাহাকে দেখি বিস্ময়-বিস্ফারিত নয়নে দেখি তখন তাহারা ঈষৎ হাস্যে ভ্রুকুটি করিয়া বলে আমাকে ককী দেখো? আমার স্রষ্টাকে স্মরণ করো। ঠিক কথা। চিত্র দেখিয়া চিত্রকরের নৈপুণ্য বুঝা যায়।”

ধাপে ধাপে চাষ হচ্ছে গ্রামে, মেঘরোদ্দুরের খেলা চলছে পাহাড় জুড়ে, ভারেং-এ পৌঁছাতেই মেঘ-কুয়াশায় ডুবে গেলাম সবাই। চোখের সামনে বেগম রোকেয়ার বর্ণনা ফুটে উঠলো — “বায়ু এবং মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখিতে চমৎকার। এই মেঘ এদিকে আছে,ওদিক হইতে বাতাস আসিল — মেঘখণ্ডকে তাড়াইয়া লইয়া চলিল। প্রতিদিন অস্তমান রবি, বায়ু এবং মেঘ লইয়া মনোহর সৌন্দর্যের রাজ্য রচনা করে। …ইহাদের তামাশা দেখিতেই আমার সময় অতিবাহিত হয়, আত্মহারা হইয়া থাকি, আমি কোনো কাজ করিতে পারি না। “আমিও আত্মহারা হই। প্রকৃতি ভুলিয়ে দেয় আমার সমস্ত দুঃখ-কষ্ট। ভারেঙ-এ হোমস্টের রান্নাঘর চোখ-জুড়ানো। পাহাড়ি কন্যার হাতে স্পর্শে তা যেন সুসজ্জিত। আন্তরিক আপ্যায়ণে আমরা মুগ্ধ। তামার পাত্র সাজানো টেবিলে। সুস্বাদু রান্না। পরিচ্ছন্ন ডাইনিং-এর জানলায় তখন সবুজ পাহাড় ছবির মতোই এসে দাঁড়িয়েছে। কিছু পরেই মেঘ কুয়াশার চাদরে ঢাকলো আমাদের গ্রাম আর এই সময় গ্রামের পথে হারিয়ে যেতে কার না ইচ্ছে করে, চলি আঁকাবাঁকা পথ ধরে। লিখে ফেলি পথের কাব্য।

এ পথে তুমি রেখে যেও না শহুরে বিষাদ

এ পথের কাছে তুমি চেয়ে নাও সুনীলের প্রেম

কিংবা শক্তির মাতাল রাত্রি

কোনো একদিন এ পথেই হেঁটে গেছে উদাসী কবির দল

পাহাড়ি মেয়ের হাসি নদীর মতোই পদাবলী লিখে দেয়

ভালোবাসা নিকষিত হেম…

ভারেং-এ বৃষ্টি এলো ঝমঝমিয়ে। মেঘভাঙা বৃষ্টি যেন। পাহাড়িগ্রামে বৃষ্টি মনে ভয় ধরায়। ভারেং থেকে সকালে আমরা ফিরব জলপাইগুড়ি। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা হল, গানে-কবিতায়-কথায়। পাহাড়ি জনপদ মুখরিত হল। বৃষ্টি চলল সারারাত। ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠে পড়া। যেতে হবে জোরথাং পর্যন্ত। রাস্তা বেশ খারাপ। রঙ্গিতকে পাশে নিয়ে চললাম আমরা। পশ্চিম সিকিমের সাজানো-গোছানো এক-একটি গ্রামের দিকে তাকালেই চোখ জুড়িয়ে যায়। যদিও পথে পথে ধ্বস। তিস্তার রূপ দেখে ভয়ই লাগছিল। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ধেয়ে আসছে না তো? আমাদের ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হলো। সকালবেলা জানতে পারলাম যে আশঙ্কা করেছিলাম, সেই আশঙ্কা সত্যি হয়ে গেল…

অমৃতাভ দে, কথার ঘর, শিবতলা লেন, ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া, ৭৪১১০৩


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “গোর্খে-সামান্দেন-ভারেং ট্রেক : পাহাড়-অরণ্য-নদীর কলতান : অমৃতাভ দে”

  1. বন‍্যাধারা রায় says:

    অসাধারণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথালিপি। সঙ্গে পাহাড় নদী মেঘ সবুজের কোলাজ। মাঝে মাঝে কবিতার হিরক খচিত কারুকাজ। এ যেন এক রং মিলান্তির মেলে দেওয়া নকসিকাঁথা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন