বহড়ু এক সময়ে ‘বড়ুক্ষেত্র’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। ১৬৮৬-র কৃষ্ণরাম দাসের রায়মঙ্গলে বডুক্ষেত্রের উল্লেখ রয়েছে। ‘সঘনে দামামা ধ্বনি শুনি রায় গুণমণি বড়ুক্ষেত্র বাহিল আনন্দে’। তারপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ সময়। বহড়ুর সেই পুরনো রমরমা আজ অনেকটাই নিষ্প্রভ। একদিকে জয়নগর মজিলপুর আর অন্যদিকে বারুইপুর সোনারপুর মাঝে থাকা বহড়ু আজ শুধুই জয়নগর এক নম্বর ব্লকের একটি গ্রাম। তবুও আদিগঙ্গার মজাখাতের পশ্চিমের গ্রাম বহড়ুকে মানুষ মোয়ার জন্য মনে রেখেছে। অথচ মাত্র দেড়শো দুশো বছর আগে ধনে জনে জমজমাট ছিল এই গ্রামীণ জনপদ। একদিকে নন্দকুমার বসু জয়পুর থেকে গোলাপি পাথর আর শিল্পী এনে মন্দির তৈরি করে তাঁর দেওয়াল ফ্রেসকো দিয়ে মুড়ে দিচ্ছেন আর অন্যদিকে দ্বারকানাথ ভঞ্জ তাঁর বাস্তুভিটায় তিন মহলা বাড়ি আর দুর্গা দালান তৈরি করছেন। কিছুদিন পরেই অষ্টধাতুর দুর্গা প্রতিষ্ঠা করে দেবীর নিত্যপূজার আয়োজন করবেন। আজকের ভেঙে পড়া ঠাকুরদালান আর বার বা চুরি হয়ে যাওয়া স্বপ্নাদিষ্ট অষ্টধাতুর দেবী মুর্তির গল্প শুনতে শুনতে সবটাই কেমন যেন একটা স্বপ্নের মতন মন হচ্ছিল। বিভিন্ন লেখালেখির দৌলতে শ্যমসুন্দর মন্দির আর তার বিবর্ণ ফ্রেসকো কিছুটা পাদপ্রদীপের তলায় থাকলেও ভঞ্জ পরিবারের কথা কেই মনে রাখেনি। রাধারমন মিত্র মশাই জানিয়েছেন “ভঞ্জ বংশ বহড়ু গ্রামের দ্বিতীয় বিখ্যাত বংশ।

এরা দক্ষিণ রাড়ী ও বঙ্গজ কায়স্থদের বাহাত্তর ঘরে (৭২ ঘরের) মৌলিক কায়স্থ”। এই পরিবারের এক সদস্য ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের সহপাঠী। দ্বারকানাথের ছোট ভাই হরনাথ ভঞ্জের সহযোগিতায়, ১৮৫৬ সালে বহুড়, গ্রামে “সাউথ সুবারবন বহড়ু স্কুল” চালু হয়। পরে ঐ স্কুলের নাম পালটে রাখা হয় “বহড়ু, হাই স্কুল”। জানা যায় যে, এই স্কুলের প্রাক্তনীদের মধ্যে রয়েছেন ডা. নীলরতন সরকার ও কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখরা। এই পরিবারের আরেকটি উদ্দোগ “জয়নগর ইনষ্টিটিউশন”। ১৮৭৮ সালে জয়নগরের আনন্দমোহন ঘোষ এবং মজিলপুরের রামগোপাল দত্তের সক্রিয় সহযোগিতায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পারিবারিক নথি থেকে জানা যায় এই বংশের পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর ভঞ্জ খুলনা জেলার সাতক্ষীরাতে থাকতেন। ভাগ্য অন্বেষণের সুত্রে তাঁর প্রপৌত্র অনন্তরাম আদি ভিটে ছেড়ে চব্বিশ পরগণার মূলদিয়া গ্রামে চলে আসেন। পরে বংশের প্রানপুরুষ দ্বারকানাথের প্রপিতামহ শ্যামসুন্দর ভঞ্জ চব্বিশ পরগণার বহড়ু গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। সেও প্রায় তিন’শ বছর আগের কথা।
তখন থেকেই ঐ গ্রামে ভঞ্জ পরিবারের স্থায়ী বসবাসের সূচনা। অল্প বয়সে বাবার মৃত্যুর পর উদ্দোগী পুরুষ দ্বারকানাথ বিভিন্ন মানুষের আশ্রয়ে থেকে লেখাপড়া শিখেছেন। অর্জন করেছেন বিশ্বাস যোগ্যতা আর তারপর ধাপে ধাপে উন্নতি করে সাহেব হৌসের মুৎসুদ্ধি আর বিভিন্ন পরিবারের সরকার নিয়োজিত এক্সিকিউটর। সেখানেই থেমে থাকেননি দ্বারকানাথ। সাহেবদের সাথে পাল্লা দিয়ে জাহাজ থেকে মাল খালাস আর বোঝাই করার জন্যে অনেকগুলো কার্গো বোট কিনে স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এ ছাড়াও দ্বারকানাথ দড়ি তৈরীর মেসিন আর জুটমিলের জন্য “‘হাইড্রলিক প্রেস’ও চালু করেন অধুনা বিশ্রুত বাঙালি উদদোগপতি। এরপর দ্বারকানাথের লক্ষীলাভ আর থেমে থাকেনি।কোলকাতা আর অন্যান্য বিভিন্ন যায়গায় ভূ-সম্পত্তি কিনে তিনি তখন জমিদার শ্রেণীভুক্ত। দ্বারকানাথের আর এক কীতি “বাল্মীকি প্রেস”। সটিক বাল্মীকি রামায়ণের সংস্কৃত ও বাংলায় অনুবাদ করে সেই বই প্রকাশকে কেন্দ্র করে ঐ প্রেস স্থাপিত হয়েছিল। দ্বারকানাথের ইচ্ছা ও আর্থিক সহায়তায় “আদি ব্রাহ্ম সমাজের” আচার্য ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশেষ স্নেহভাজন সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক পণ্ডিত হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য রামায়ণ অনুবাদের কাজ করেছিলেন।

রামায়ণটি সেকালে বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল। বিশ্বখ্যাত ভাষাবিদ হরিনাথ দের বাবা ভূতনাথ দের বাল্য ও যৌবনের কিছু অংশ বহুড় গ্রামে, পরে কলকাতায় ভঞ্জদের বাড়িতেই কাটে। এবার ফিরে আসি ঠাকুরদালান আর অষ্টধাতুর দুর্গা মূর্তির প্রসঙ্গে। শোনা যায় বিজয়ার রাতে দ্বারকানাথ স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি কিশোরী মেয়ে তাঁকে বলছে “আমি তো যেতে চাই না, তবু কেন আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে আসিস্”। পরের দিনই দ্বারকানাথ মনস্থির করে ফেললেন। আর বিসর্জন নয়, অষ্টধাতুর দুর্গা প্রতিমা তিনি প্রতিষ্ঠা করবেন নিজের বাড়িতে। নতুনবাজারের কাংসশিল্পী বক্রেশ্বর প্রামাণিকের ওপর প্রতিমা নির্মাণের ভার পড়ে। তাঁকেও নাকি দেবী স্বপ্নে দর্শন দিয়েছিলেন। গ্রাম বৃদ্ধদের মুখে শোনা শিল্পী স্বপ্নে দেখা অবিকল রূপটি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দর সেই প্রতিমায়। সাগর চট্টোপাধ্যায় মশাই তাঁর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার পুরাকীর্তি বইতে জানিয়েছেন “বহড়ুর ভঞ্জ পরিবারের ঠাকুরদালানে ১২৮৪ সাল অর্থাৎ ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তিটি একটি উল্লেখযোগ্য পুরাবস্তু”। সেই হিসাবে ১৫০ বছর পুর্ন হতে আর মাত্র দুবছর বাকি। তখন সার্বজনীন দুর্গাপুজার চলন হয় নি। এইসব ঘরোয়া পূজাই ছিল সমাজের সব মানুষের উপাসনার কেন্দ্র, আনন্দের উৎস।

পুজার ক’দিন ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে গ্রামবাসীদের আনাগোনায় ঠাকুরদালান, চাঁদনী মুখরিত থাকত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্য্যন্ত। আটপৌরে সাজে যে প্রতিমার দর্শন রোজ মেলে, জরিমোড়া ভেলভেটের পোষাক আর মূল্যবান অলংকারে ঢাকা পূজোর সাজে সেই বিগ্রহ দর্শনে সকলের আগ্রহ থাকতো অপরিসীম। মহা সমারোহে পূজা চলতো। পূজার ক’দিন নতুন ধুতি, শাড়ী, খই, মুড়কী, সন্দেশ ইত্যাদি বিতরণ করা হোত স্থানীয় গ্রামবাসীদের মধ্যে। পরিবারের সদস্যরা জানালেন ২০০৬ সালে এই পুরাকীর্তিটি মুর্তিচোরেদের নজরে পরে। চুরি হয়। চোরেরা কিছু অংশ কেটে মুর্তিটি পুকুরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। তারপর ২০১৯ সালে এটি আবার চুরির চেষ্টা হয়। এবার পুলিশি তৎপরতায় মুর্তি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ততদিনে মুর্তিটি চোরের টুকরো করা ফেলেছে। যাই হোক পরিবারের সদস্যরা আবার নতুন করে মুর্তি নির্মাণ করতে দিয়েছেন। সম্ভবত বাসন্তী পুজোর আগেই এ কাজ সম্পন্ন হবে বলে শিল্পী আশা দিয়েছেন। সে কারনে এ বছর পটেই মায়ের পুজো হবে। জানালেন পরিবারের সদস্যরা। ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঘেরা এই স্টেশনের চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যাদের ট্রেন আর রেল স্টেশনের প্রতি মোহ বা আকর্ষণ আছে, এই স্টেশন হতে পারে তাঁদের একদিনের গন্তব্য সাথে স্থানীয় ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা।
Atyanta pramanik lekha ebag antarik bhabnar prakash. Lekhak ke sadhubad janay. Yyan briddhi holo .
লেখাটি বেশ তথ্য সমৃদ্ধ। কয়েকটি বানান ভুল আছে।
চমৎকার লেখা। বাংলার গ্রামের ইতিহাস এখানে ধরা থাকলো। এগুলো তো হারিয়ে যেতে বসেছে।
একবার জয়নগর বেড়াতে গিয়েছিলাম। আদিগঙ্গার মরা খাত প্রসঙ্গে মনে পড়ল । পরপর লাইন দিয়ে পুকুর। মাঝে পথ এদিক থেকে অন্যদিকে যাবার। দেখেই বোঝা যায় পুকুরগুলো একসময় নদী ছিল। যাদের বাড়ি গিয়েছিলাম তারা বলেছিলেন এলাকার মানুষ ওই পুকুরের জলকে তারা গঙ্গাজল মনে করে ব্যবহার করে। চোখ বুঝে ভাবছিলাম ঐখান দিয়ে চৈতন্যদেব পুরী গিয়েছিলেন।
আপনারা ভাল কাজ করছেন।