মালবের রাজপথ ধরে চলেছে বিচিত্র এক শোভাযাত্রা। একদম সামনে বাজনদারের দল। মাথায় সাদা ফেটা পরা, মোটা গোঁফওলা দুজন লম্বা চওড়া মানুষ তুতারী শিঙ্গায় আওয়াজ তুলছে। ধুতি, ঘেরওলা আঙরাখা পরা চারজনের শক্তপোক্ত দুই হাতে ঝনঝন শব্দে বেজে উঠছে ঝাঁজ। কারোর হাতের লাঠিতে ঢোল-তাশায় বোল উঠছে তিটক-তিটক, তিটক-কিটক।
বাজনদারের পরে ঘোড়সওয়ারীরা। তাদের হাতের লাঠিতে ধরা নিশান হাওয়ায় উড়ছে পতপত। সে পতাকায় আঁকা হোলকরের পরিবারের রাজচিহ্ন। ঘোড়সওয়ারীদের কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে লম্বা তলোয়ার। কারোর হাতে ভল্লা।
শোভাযাত্রার একদম মাঝখানে একটি কাঠের শিবিকা। জাঁকজমকহীন অত্যন্ত সাধারণ। তাতে সাদা রেশমের আবরণ টানা। শিবিকার দুপাশে দুজন সশস্ত্র রক্ষী।

শিবিকার পিছনে হাতিরা চলেছে দুলকি চালে। তাদের পিঠে লটবহর। শোভাযাত্রার একদম শেষে আরো লোকলস্কর, ঘোড়ার পাল।
ইন্দ্রেশ্বর বা ইন্দৌরের মানুষ শোভাযাত্রা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে বটে, তবে তাদের চোখের জল মানছে না। মন ভারাক্রান্ত। মালবের রাজমাতা, হোলকর রাজবংশের রাজবধূ রাজপ্রাসাদের আরাম বিলাসের জীবন ছেড়ে চলেছেন মাহেশ্বর। পুণ্যসলিলা নর্মদার তীরে একটি ছোটো দুর্গ তৈরি করা হয়েছে। রাজকীয় ঠাঁটবাঁট বিসর্জন দিয়ে সেখান থেকেই প্রজাদের ভালোমন্দের কথা শুনবেন রাজমাতা অহল্যাবাঈ। প্রাচীন নগরী মহিষমতী বা মাহেশ্বর হবে মালবের নতুন রাজধানী।
জনপদ ছেড়ে গ্রামের পথে এখন শেষবর্ষার ছায়া। পায়ে মোটা মোটা পাঁয়জোর, ঘাঘরা পরা ভীলনিরা মকাইয়ের খেতে ব্যস্ত ফসল কাটতে। মালভূমির লাল মাটিতে ফুটেছে কার্পাসের সাদা, গোলাপি, হাল্কা হলুদ ফুল।
শিবিকার ভেতর থেকে রাণী ইশারায় বাজনদারদের থামতে বললেন। গ্রামের মানুষকে বিব্রত করার কোনো প্রয়োজন নেই। তবুও সরল আদিবাসী মানুষগুলো কৌতুহলে দেখছে এই অদ্ভুত শোভাযাত্রা। ভাবছে, এরা কারা?
রখেলা গাঁয়ের টলটলে জল পুকুরের পাশে একটি ছোটো শিবমন্দির। এখন মন্দিরের পাশেই শিবির ফেলা হবে। সন্ধে হয়ে আসছে। এরপরেই ঘন জঙ্গল। আজ আর যাত্রা করা উচিত হবে না।

রাণী মন্দির দর্শন করতে চাইলেন। তাঁর মনে পড়ছে বাপের বাড়ির গ্রাম চন্ডীর কথা।
চন্ডীগ্রামের পাটিলের আটবছরের ফুটফুটে কন্যা আট বছরের অহল্যা সেদিন বিষ্ণুমন্দিরে অভঙ্গ গাইছিল। মন্দিরের পাশ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলেন মালবের একজন বিখ্যাত সেনাপতি মল্হার রাও হোলকর। তিনি বালিকার রূপেগুণে মুগ্ধ হয়ে ছেলে খান্ডেরাওয়ের জন্যে চন্ডীগ্রামের পাটিলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। চন্ডীগ্রামের অহল্যা হোলকর পরিবারে বধূ হয়ে এল। মল্হার রাও মালবে প্রতিষ্ঠা করলেন হোলকর রাজবংশ। ইন্দ্রেশ্বর বা ইন্দৌর হল তার রাজধানী।
গ্রামের সহজ সরল মেয়ে অহল্যা রাজবধূ হয়ে শ্বশুর মল্হার রাওয়ের উদ্যোগে লেখাপড়া শিখলেন। ঘোড়সওয়ারী, তলোয়ার খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। কে জানত, এমন শিক্ষা অচিরেই তার কাজে লাগবে! স্বামী আর একমাত্র সন্তানের অকাল মৃত্যুর পর শ্বশুরের অনুরোধে রাজবধূকেই সামলাতে হবে রাজ্যপাট!
জীবন কোথা থেকে যে কোথায় নিয়ে যায়! ঘন জঙ্গলের পথে শিবিকার মধ্যে রাণী অহল্যা বারে বারে উদাস হয়ে যাচ্ছেন।
গাছের পাতায় জমে থাকা শেষ বৃষ্টির ফোঁটা সূর্যের আলোয় হীরেরকুঁচির মত ঝলমল করছে। ছোট ছোট ঝরনা ও পাহাড়ি নালাগুলি এখনো জলধারায় সজীব, যদিও স্রোতের তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে। বর্ষাশেষে মালব মালভূমি সবুজ, সজীব ও সতেজ। বৃষ্টি কমে এলেও প্রকৃতির রূপে যেন কোনো শিল্পীর শেষ তুলির টান—স্নিগ্ধ ও মোহময়। সেগুনের থোকা থোকা ফুলে জঙ্গলপাহাড়ের পথে পথে আনন্দ। বন্য জন্তু জানোয়ার আর দস্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে বাজনদারের দল আবার সক্রিয় হয়ে উঠল।

রাজমাতার সামনে এখন পাহাড়প্রমাণ কাজ। নিত্যনতুন পরিকল্পনা। নর্মদা পার করেই ভারতের দাক্ষিণাত্য অঞ্চল। দক্ষিণের রাজাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতেও রাজধানী পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। বাতাসে বারুদের গন্ধের সঙ্গে এদেশে ঢুকে পড়েছে ইংরেজ। আগামীর কথা কে বলতে পারে!
প্রজাকল্যাণ ধর্মনিষ্ঠা রাজমাতার একমাত্র উদ্দেশ্য। জঙ্গলের দস্যু দমন করতে হবে তাঁকে। মালবের বয়ন শিল্পীরা চরম দারিদ্র্যে দিন কাটান। তাঁদের দুর্দশা দূর করতে মাহেশ্বরে একটি নতুন বয়নশিল্পের প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। সুরাতের বয়ন শিল্পীদের তিনি মাহেশ্বরে আহ্বান করেছেন। সে নতুন বস্ত্রের নাম তিনি দেবেন মাহেশ্বরী। তার নক্সায় বোনা হবে নর্মদার স্রোত লহরী। মাহেশ্বর শুধু রাজনৈতিক নয় মালবের সাংস্কৃতিক রাজধানী যেন হয়ে উঠতে পারে!

এসব ভাবতে ভাবতেই পাহাড়ের ঢালে কুয়াশা নেমে এল। সংশয়ে রাণী দেবাদিদেবকে স্মরণ করতে লাগলেন। জীবনে এত বাধাবিপত্তি পার করেও তিনিই যে তাঁর একমাত্র সহায়! সেই কোন আদিকাল থেকে মাহিষমতী নগরীকে রক্ষা করে চলেছেন যে স্বয়ং ভগবান মহেশ্বর!
***
মধ্যপ্রদেশের মাহেশ্বর মানেই আমার কাছে টুকরো ঘটনা দিয়ে গাঁথা, স্মৃতিগন্ধ মাখা একটি মালা। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এলাম এখানে দশ বছরের ব্যবধানে। যদিও পরিবর্তনের স্রোত ছুঁয়ে গেছে মাহেশ্বরকেও। এখন সেখানকার অলিগলিতে মাহেশ্বরী শাড়ির কারখানা আর দোকান। আসল নকল শাড়ি চেনার উপায় নেই। দেবী অহল্যাবাঈ প্রতিষ্ঠিত কারখানাটিতে এখনো স্থানীয় মহিলারাই কাজ করে চলেছেন সরকারি উদ্যোগে।
প্রাসাদটিতে পর্যটকরা যত্রতত্র আবর্জনা ফেলছে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সেরকম উদ্যোগ নেই।
রাজবাড়ি সংলগ্ন যে হোটেলটিতে আমার ঠাঁই হয়েছিল, সেটি ছোটো হলেও পুরনো দিনের গন্ধমাখা, অন্যরকম সুন্দর। কাঠের হাতল দেওয়া পাথরের খাড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে শোবার ঘর। ঘরের কুলুঙ্গিতে সাজানো রয়েছে ফুলদানি, বই। দেওয়ালে টাঙানো সেপিয়া রঙের ছবিতে পুরনো কালের কিছু মানুষজন। গা ছমছম করা শোবার ঘরের মধ্যে দিয়েই ছাদে যাবার সিঁড়ি। সকাল সকাল ছাদে উঠে দেখি দুর্গের প্রাচীরের মধ্যে সুরক্ষিত ছিলাম। ভূত ছাড়া আর ভয় পাবার কিছু ছিল না!
এই শ্রাবণে নর্মদার তীরে পুণ্যার্থীদের ভীড় বেড়েছে। সকালে স্নান সেরে বাঁক কাঁধে শিবভক্তরা প্রস্তুতি নিচ্ছে লম্বা পথ পাড়ি দেবার। মন্দির চত্বরে মহেশ্বর ছাড়াও আছেন রাজরাজেশ্বর আর আলোনা মহাদেব। আলোনা মহাদেব কেন প্রশ্ন করতে পুরোহিত উত্তর দিলেন যাঁরা বিনা নুনে উপবাস করেন, তাঁদের জন্যে শিবঠাকুরের এমন নাম!!

রাজপ্রাসাদ ছাড়িয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নর্মদা বইছে একদম অন্য খাতে। ছোটো বড় পাথরের অভিঘাতে বর্ষার নদী সেখানে বহু বিভাজিত, চঞ্চল। তার পোশাকি নাম সহস্রধারা। নতুন রূপে এই নর্মদাকে দেখে মনে হল,
বর্ষা এসে আবার নর্মদার কানে কানে ফিসফিস করে।
ঘাটের সিঁড়ি ভিজিয়ে দিয়ে বলে,
আমি এসে গেছি গো!
দুর্গের শুকনো পাথরগুলো স্নান সারে এই সুযোগে।
ঘাটের বুড়ো বটগাছটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়।
উদাসীন নর্মদা বয়ে যায় সহস্রধারায়, না লেখা কবিতার ছন্দে।
অসম্পূর্ণ ,অনিবার্য স্বপ্নের মত
বৃষ্টির ফোঁটারা তার বুকে বিলীন হয়ে যায়…
খুব সুন্দর বর্ণনা
অপূর্ব
প্রাণিত হলাম দিদি🙏
আন্তরিক কৃতজ্ঞতা 🙏