বিগত কিছুদিন ধরেই ভারত ও আমেরিকা- এই দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে জল্পনা চলছিল। তখন থেকেই জানা যাচ্ছিল, আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক বা ট্যারিফ ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে। তখন থেকেই আশঙ্কা ছিল ভারত-আমেরিকা নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের বাজারকে আমেরিকার কাছে উন্মুক্ত করে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে, সেই আশঙ্কাকে মোদী ও তাঁর সরকার পুরোদস্তুর বাস্তবে রূপ দিল। আসলে ট্রাম্পের চোখ রাঙানীকে উপেক্ষা করার কোনো সাহসই মোদী সরকারের নেই তাই দেশের স্বার্থকে বিশেষ করে কৃষকদের অবস্থা নির্দয়ভাবে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারত-আমেরিকা নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে নির্লজ্জের মতো মাথা নুইয়েছে। প্রথমেই বলা দরকার যে ভারত আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকার কাছ থেকে ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য কিনবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনবে কিনা তা যৌথ বিবৃতির কোথাও নিশ্চিত করে উল্লেখ করা নেই। তবে ট্রাম্প বলেছেন, ভারত ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে’ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে কি না, তা আমেরিকা নজরে রাখবে। তার ভিত্তিতেই ঠিক হবে ভারতের উপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ফের চাপানো হবে কি হবে না।
নতুন চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকার ভারত আমেরিকার প্রায় সব ধরনের শিল্পপণ্য এবং বেশ কিছু কৃষি ও খাদ্যপণ্যের উপর সাধারণ শুল্ক কমাবে এমনটাই বলা হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকা কেবল ভারতের ৫৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের উপর ‘পারস্পরিক শুল্ক’ কমাবে। প্রশ্ন, এ ধরণের চুক্তিকে কী সমান-সমান বিনিময়’ বা লেনদেন বলা যায়? বিশেষঙ্গরা বলছেন, এই চুক্তি পুরোপুরি আমেরিকার পক্ষে লাভজনক এবং চুক্তি হলেও এখানে অসমতা খুবই স্পষ্ট’। অথচ দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলছেন, আমেরিকার আরোপ করা ১৮ শতাংশ শুল্ক তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এতে ভারতের বস্ত্র, চামড়া ও রত্নপাথরের মতো ক্ষেত্রগুলি লাভবান হবে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছর ভারত আমেরিকার ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কিনবে, যার মধ্যে জ্বালানি, বিমান, প্রযুক্তিপণ্য, কোকিং কোল ইত্যাদি। বিশেষঙ্গদের প্রশ্ন, এটি কী আদৌ সম্ভব? এর জন্য আমেরিকা থেকে ভারতের বার্ষিক আমদানি প্রতি বছর দ্বিগুণের বেশি হতে হবে। তাছাড়া এটি বেসরকারি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে, এর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাছাড়া এ ধরনের চুক্তি হলে ‘ভারতের আমদানি বিল বেড়ে যাবে উল্টোদিকে আমেরিকা তাদের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমিয়ে দিতে পারে’।
এবার কৃষকদের কথায় আসা যাক। এই চুক্তিরপর ভারতের কৃষক ইউনিয়নগুলি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, আমেরিকার কৃষি পণ্যের উপর শুল্ক কমালে দেশীয় উৎপাদকরা বিপদে পড়বেন। সংযুক্ত কিসান মোর্চার বক্তব্য, ড্রাইড ডিস্টিলার্স গ্রেইন, সয়াবিন তেল, লাল জোয়ার, বাদাম ও ফলের মতো পণ্য অবাধে আমদানির সুযোগ দিলে কৃষকদের আয় কমে যাবে। দেশের প্রায় সব কৃষক সংগঠনগুলি ভুট্টা, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য ও বাদামের দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে। এমনিতেই আমেরিকায় বিপুল সরকারি ভরতুকিতে কৃষি কর্পোরেট চলে। বাজার অবাধ হয়ে গেলে ভারতের কৃষিক্ষেত্র তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারবে না। ফলে ভারতের কৃষিক্ষেত্র নিদারুণ সঙ্কটে পড়বে। এমনিতেই দেশে কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্রের সমস্ত উপকরণের দাম ইতিমশ্যে অনেক বেড়ে গিয়েছে। তার উপর সারের ভরতুকি কমানোর ফলে দাম আগের থেকে অনেকি বেড়েছে। একদিকে কৃষকদের ফসল ফলানোর খরচ বেড়েছে কিন্তু ফসলের দাম পাচ্ছে না তারা। কৃষকরা ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মুল্য ঠিক করার দাবি জানালেও কেন্দ্র তা কানে তুলছে না। কৃষি লাভজনক না হয়ে অলাভজনক হওয়ায় দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩.১ শতাংশে। ফলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফপর যে কৃষি সঙ্কট আরও গভীর হবে তা বলাই বাহুল্য।
এক কথায় কেন্দ্রীয় সরকার তথাকথিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে’ আমেরিকাকে যেভাবে ছাড় দিয়েছে তাকে ভারতের অর্থনীতি, কৃষি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্কে বিক্রি করা হয়েছে বলা যায়। প্রথমত, মোদী সরকার আমেরিকার থেকে রপ্তানি করা ফল, তুলো, বাদাম, সয়াবিন তেল এবং অন্যান্য কিছু খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর কোনো শুল্ক না বসাতেই রাজি হয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ আপেল, তুলো, সয়াবিন প্রভৃতি চাষিদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং অন্যান্য রাজ্যের আপেল চাষিরা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলির সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির কারণে ইতিমধ্যেই। এবার নতুন চুক্তি তাদের জীবিকাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিল। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় একইভাবে বিপর্যয়ের মুখে তুলো চাষিরাও। আসলে ভারত-আমেরিকা নতুন বানিজ্য চুক্তিক ট্রাম্পের কাছে মোদী তথা বিজেপি সরকারের লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ কারণ, তারা আমেরিকা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।