‘মুট’ মূলত কৃষক পরিবারের একটা অনুষ্ঠান। একটা ঐতিহ্য। একটা রীতি। একটা আবেগ। একেবারে মাটির কাছাকাছি উৎসব। গ্রাম বাংলার লোক উৎসবের মধ্যে এর একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাধারণত একজন চাষির হাতের মুঠোয় আড়াই গোছা ধান ধরে। মাঠ থেকে ওই পরিমাণ ধান কেটে আনার প্রক্রিয়াটি মুঠ সংক্রান্তি বা মুঠ উৎসব হিসাবে পরিচিত।
“নবীন ধান্যে হবে নবান্ন”। নবান্নের প্রস্তুতি কার্তিক পেরোলে। খনার বচন আছে, “বেদের কথা না হয় আন, তুলা বিনা না পাকে ধান।” ‘বেদ’ বা জ্ঞানের কথা হল, শালিধান পাকবে তবে নবান্ন। আর ‘তুলা’ বা কার্তিক মাস না গেলে ধান পাকে না। তাই নবান্নের আনুষ্ঠানিকতার সূত্রপাত কার্তিক পেরিয়ে অঘ্রাণের পয়লা তারিখে৷
‘মুট’ শব্দের অর্থ মুষ্টি বা মুঠা বা মুঠো। সাধারণভাবে এক মুঠো ধানগাছকে বোঝানো হয়। এই ধানগাছ দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক। নতূন ধান্য নব লক্ষ্মী। আড়াই মুট বা মুঠো ধানগাছ সযত্নে ভক্তিভরে ঘরে নিয়ে আসা হয়। একসময়ে ধুতি–উত্তরীয় গায়ে দিয়ে শাঁখ বাজাতে বাজাতে মাঠ থেকে ‘মুঠ’ আনার রীতি প্রচলিত ছিল। এখন দিব্যি প্যান্ট–শার্ট পরে সাইকেল কিংবা মোটরবাইকে ‘মুঠ’ আনার চল হয়েছে।

কার্তিকের সংক্রান্তিতে কাকভোরে শুদ্ধ বস্ত্রে মাঠে যাওয়া হয়। ধান গাছের গোড়ায় গঙ্গাজল দিয়ে দেবী লক্ষ্মীর পা ধুয়ে দেওয়া হয়। তারপর মিষ্টান্ন (সাধারণত বাতাস বা সন্দেশ) দিয়ে দেবীর মুখ মিষ্টি করা হয়। তারপর নতুন কাস্তে দিয়ে (অনেকে পুরোনো কাস্তে খামারবাড়িতে পুড়িয়ে নিয়ে আনেন) আড়াই মুট বা মুঠো ধানগাছ সযত্নে কাটা হয়। তারপর নতুন কাপড় বা চেলিতে জড়িয়ে মাথায় করে নিয়ে আসা হয়। দেবী লক্ষ্মী তীব্র বাদ্যযন্ত্র অপছন্দ করেন। তাই শুধুমাত্র শঙ্খ বাজানো হয়। একদিকে সূর্যোদয় অন্যদিকে দেবী লক্ষ্মীর আগমণ। সারা মাঠ শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত। এ দৃশ্য সত্যিই মনমুগ্ধকর। ময়মনসিংহগীতিকার কথা মনে হচ্ছে —
“পাঞ্চগাছি বাতার ডুগুল
হাতেতে লইয়া।
ধানের গাড়ি মাঠ থেকে ঘরমুখো
মাঠের মাঝে যায় বিনোদ
বারোমাস্যা গাহিয়া।।”
মুট আনার পর বাড়ির লোকেরা ওই ব্যক্তির পা ধুয়ে দেন। এবং প্রণাম করেন। ঈশান কোণে মুটটিকে রেখে পূজা-অর্চনা করা হয়। সামান্য নৈবেদ্যতেই সন্তুষ্ট হন দেবী। এরপর ওই আড়াই মুট বা মুঠো ধানগাছ সযত্নে তুলে রাখা হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে গোছার ধান ঝড়িয়ে লক্ষ্মীপুজোয় নিবেদন করার রীতি আছে। ধান ঝড়িয়ে নেওয়ার পরে খড়গুলি কয়েকটা ভাগ করা হয়। তৈরি করা হয় গোবরের ডাব। সেই ডাবগুলি পাঁচটি খড় দিয়ে আড়াই প্যাঁচে মুড়ে ধানের গোলা এবং প্রতিটি ঘরের সামনে রেখে মা লক্ষ্মীকে বরণ করা হয়। খড় মোড়া গোবরের ডাবগুলিকে লৌকিক শব্দে ‘চাউড়ি-বাউড়ি’ বলা হয়ে থাকে। পরের দিন ভোরে এই খড় মোড়া গোবরের ডাবগুলিকে পুকুরের জলে বিসর্জন দেওয়া হয়ে থাকে।
‘মুট’ আসলে জমির উপর কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার রীতি। ঐতিহ্য। শ্রাবণের শুরুতে বৃষ্টিপাত শুরু হতেই কৃষকেরা সঠিক সময়ে বীজ বপন করেন। নিয়মিত পরিচর্যায় ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে ধান। তাই জমির প্রথম ধান সেই কাটবে। এটাই তার অধিকার। মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম জেলার বেশ কিছু অঞ্চলে এই পূজা দেখা যায়। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে এই পূজার প্রসঙ্গ রয়েছে —“কার্তিক সংক্রান্তির দিনে কল্যাণ করিয়া আড়াই মুঠা কাটিয়া লক্ষীপূজা হইয়া গিয়াছে…”

লোকসংস্কৃতি গবেষক আদিত্য মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘মুঠ সংক্রান্তি আসলে একটি কৃষি উৎসব। মুঠ সংক্রান্তির ধান দিয়েই পৌষমাসে লক্ষ্মীপুজো, নবান্নের ধানের গুণমান যাচাই করা হয়ে থাকে। তার জন্য সেরা জমি থেকে মুঠ আনা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি।’
ধান তো শুধু আমাদের আহার নয়, ধান আমাদের লোকায়তিক সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি। গোলায় ধান ভরে উঠলেই গলায় গান আসে! অর্থনীতির পুরোটাই তখন ধানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। সে আমন ধান, সেটাই শালিধন্য। আষাঢ়ে শুরু, আর কার্তিকে শেষ। এরপর ধানকাটা সারা হলে মাঠ বিষণ্ণ বিধবা।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায়, যন্ত্রচালিত মানুষের ব্যস্ততায়, এই পূজার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আর পাঁচটা ঐতিহ্যের মত আর একটা ঐতিহ্য। আর একটা লোক উৎসব।
শৌনক ঠাকুর (সহশিক্ষক), দক্ষিণখন্ড, সালার, মুর্শিদাবাদ