ধনঞ্জয় সাহা’র জন্ম ১৯৫৭ সালে আর তাঁর ছড়া রচনা- প্রতিভার স্ফূরণ দেখা যায়; কুমিল্লা জেলার মোহনপুর প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়।
তাই লেখালেখি’র সময় কম নয়। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ভারত ও আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর চৌদ্দটি ছড়া কবিতার বই; তবে অধিকাংশ শিশুদের জন্য এবং ছড়ার বই। এর মধ্যে দুটো বই আবার ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন ধনঞ্জয় সাহা।
ধনঞ্জয় সাহা’র ছড়া’র বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে তা’ হলো বিষয় ভিত্তিক যাতে আপেক্ষিক ভাবে আবোল-তাবোল কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকে যুক্তি, তথ্য আর আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। তাঁর ছড়ায় নৈতিকতা গঠন,অন্যায়ের প্রতিবাদ দেশজ সংস্কৃতি, স্বাধীনতা, শিক্ষামূলক নানা বিষয়, সর্বোপরি মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র নান্দনিক ও কাব্য বহিঃপ্রকাশ এবং তা’ প্রাঞ্জল ভাষায় যা আমাদের মুগ্ধ করে ।
এ বছর ধনঞ্জয় সাহা’র একটা বই বেরিয়েছে অমর একুশের বইমেলা উপলক্ষে : সেটাও বিষয় ভিত্তিক। বইয়ের নামেই তা’ বোঝা যায় — সোনামণিদের ছড়া ‘দাঁতের যত্ন ও স্বাস্থ্য’। তাঁর প্রায় প্রত্যেকটা বই বিশেষ করে শিশুদের জন্য রচিত ব’লে ‘সোনামণিদের ছড়া’ শিরোনামে করেছেন সিরিজ প্রকাশনা। একজন দায়িত্বশীল লেখকের এ যেন শিশুদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা। এই বইয়ের ‘ভুলের মাশুল’ ছড়া’র প্রথমাংশ যেমন —
‘সব না মেনে ভুল করেছি
কেমনে এখন বাঁচি
হাত ধুইনি মাস্ক পরিনি
হচ্ছে কাশি-হাঁচি।’
এখানে লক্ষণীয় বিষয় ভাষা’র সারল্য, সহজ প্রকাশ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলক বক্তব্য হৃদয়গ্রাহী ক’রে তোলে পাঠকের কাছে।

টাবু ধনঞ্জয় সাহা’র তৈরি বিশেষ চরিত্র। টাবু তাঁর আরেকটা বইয়েরও নাম। এ বই প্রকাশ পেয়েছে ২০২৪ এর অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে। যা তাঁর ছড়া’র ভুবনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। জ্ঞানী, দার্শনিক নীতিবাদী চরিত্র হাতির মাধ্যমে শিশুদের সমকালীন সমাজ দর্শন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমাদের মন-মানসিকতা টাবু ও তার বন্ধুদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের নান্দনিক ভাবে প্রকাশ পেয়েছে টাবু বইয়ের মাধ্যমে। টাবু ছাড়াও রিমকি, ঝুমকি, চুমকি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন ধনঞ্জয় সাহা; এনেছেন বিষয়-বৈচিত্র। শিশুদের মাথায় বিক্ষিপ্ত ভাবনা কিলবিল করে। যার পরম্পরা বা সেতুবন্ধন রক্ষা হয় না। কিন্তু শিশুমন এ জাতীয় ভাবনা থেকেও অপার আনন্দের বিনোদন উপভোগ করে থাকে। তাই এদিক থেকে ধনঞ্জয় সাহা বেশ সচেতন লেখক মনে করি। তাঁর টাবু বইয়ের ‘টাবুর শাস্তি’ ছড়া’র প্রথমাংশে প্রত্যক্ষ করি —
‘টাবু রাগে বাবুর বাগে
দলে কলাগাছ
জেলের ছেলে দিঘির জলে
কলে ধরে মাছ।’
এ ছাড়াও ‘টাবুর ভাবনা’ ছড়া’র শেষাংশে বিক্ষিপ্ত ভাবনার পরিচয় মেলে। যেমন —
‘চিন্তা অনেক মনের ভেতর
ঝরছে মাথার ঘাম
ঝুমকি হেসে দিল এনে
চারটি পাকা আম।’
ধনঞ্জয় সাহা শিশুমন জয় করার পাশাপাশি সব বয়সী মানুষের মনকে মুগ্ধ করারও হয়েছেন বিশেষ প্রয়াসী। সামগ্রিক ভাবে তাঁর রচনাবলী পাঠ করলে আমার তো তাই মনে হয়। তাঁর অঙ্ক নামক ছড়া’র বইয়ে শুভরাত্রি শিরোনামের তাহলে পাঠ ক’রে দেখতেই পারি —
‘তুমি আমার দিনের সূর্য
রাতের কোমল চাঁদ
তুমি আমার বুকের সাহস
মাথার উপর ছাদ।
তুমি আমার বাঁচার তাগিদ
নীরব তারার ঋণ
তোমার হাসির দীপ্ত ঝলক
আমার প্রাণের বীণ।’
স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেক বইয়ের শেষ ছড়া হিসেবে শুভরাত্রি শিরোনামে নির্ধারিত করেছেন; যা ধনঞ্জয় সাহা’র
রচনাবলী’র বর্তমান বৈশিষ্ট্য বলে ধরে নেওয়া যায়। সোনামণিদের ছড়া ‘জীবজন্তু’ বইয়ের শেষ ছড়া ‘শুভরাত্রি’।
গুড নাইট শব্দাবলীও দেখতে পাই ছড়া’র শেষে। যেন বাংলা শব্দাবলীর সাথে সাথে তার ইংলিশ অর্থটাও পাঠকের সাথে পরিচিত করে তোলা। জীবজন্তু বই পাঠ করলে ছড়া’র মাধ্যমে ৩০টিরও বেশী জীবজন্তু’র পরিচয়, আদল ও চরিত্র জানা যাবে। তাহলে ‘শেয়ালের ভয়’ ছড়াটি পাঠ ক’রে নেওয়া যাক।
‘বোয়াল মাছের পেটে শেয়াল
আজব কথা নয়
এখন বুঝি নামতে জলে
কেন করে ভয়!’
প্রাচীন কাল থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘ননসেন্স রাইম’ প্রচলিত আছে। সেদিক বিবেচনা ক’রে বলা হয় ছড়া’র প্রধান দাবী – ধ্বনিময়তা ও সুরঝঙ্কার; অর্থময়তা নয়। কিন্তু প্রাচীন কালে ছড়া সাহিত্যের মর্যাদা না পেলেও, বর্তমান সময়ে ছড়া সাহিত্য তার প্রাপ্য সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তার অন্যতম কারণ অর্থময়তাও বটে। অর্থময়তা ও বিষয় ভিত্তিক ছড়া’র বিষয়টি সেজন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। আলোচ্য বইগুলোই প্রচ্ছদ শিল্পী কাজ ও অলঙ্করণে সৃষ্টি নন্দন, হৃদয়গ্রাহী,রঙ ব্যবহারে পরিমিতি বোধ আমার ভালো লেগেছে সেজন্য তাঁদের প্রতিও এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন। তাঁরা হলেন কলকাতার সুদীপ চক্রবর্তী, বাংলাদেশের মোঃ মহিউদ্দিন চৌধুরী (মোহন) ও আলমগীর জুয়েল।

আঠারো শতকে মোজাম্মেল হক রচিত ‘পদ্য শিক্ষা’ গ্রন্থটিকে কেউ কেউ ছড়া’র প্রথম সঙ্কলন মনে করেন। ঊনিশ শতকের কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তকে বলা হয়। আর ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে যোগীন্দ্র নাথ সরকার লৌকিক ছড়াকে প্রথম গ্রন্থভুক্ত করেন এবং তার নাম দেন ‘খুকুমণির ছড়া’। এই গ্রন্থটি’র ভূমিকায় সর্বপ্রথম ছড়াকে সাহিত্যের অন্যতম শাখা হিসেবে স্বীকৃতি দেন রামেন্দ্র ত্রিবেদী। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থে সুকুমার রায়ের ছড়া সঙ্কলিত ক’রে ছড়া’র গ্রহণযোগ্যতাকে সবল ক’রে তোলেন। যদিও জানি যে, বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাগীতি’র প্রথমপদটি
ছড়া’র মূলছন্দ স্বরবৃত্তে লেখা এবং এটি ছন্দ-মিলে রচিত। এই পদটি বাংলা সাহিত্যের আদি ছড়া বললেও ভুল হবে না।
ছড়া সাহিত্যের হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় সমকালীন প্রেক্ষাপটে পাচ্ছি বিশিষ্ট ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে ধনঞ্জয় সাহাকে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী লাভের পর ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং রাইগার্স ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারে থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। নিউইয়র্কের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিন-এ সাবেক রিসার্চ প্রফেসর ড. ধনঞ্জয় সাহা। প্রবাসে থেকেও সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন, দেশ বিদেশের পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশ পাচ্ছে বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষা’র প্রতি, দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা যা আমাদেরকেও অনুপ্রাণিত করে বৈকি!
কবি নজমুল হেলাল, ঢাকা, বাংলাদেশ, bishwazogworldplus59@gmail.com