যুগ যুগ ধরে চলে আসছে শ্রীক্ষেত্রে দোল উৎসব। কয়েকটি দিন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়েও যেন চলে দোল আর হোলির হুকুমদারি।পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথি (ফাগু দশমী) থেকে দোলপূর্ণিমা পর্যন্ত ৫ দিন (মতান্তরে ৬ দিন) অত্যন্ত ধুমধামের সাথে পালিত হয়। দোলোৎসবে শ্রীজগন্নাথ দেবের প্রতিনিধি হিসেবে ‘মদনমোহন’ বা ‘দোলগোবিন্দ’
দেবতাকে রত্ন সিংহাসন থেকে দোলাবেদীতে এনে রঙ (আবির) ও ফুল দিয়ে বিশেষ ভোগ অর্পণ করে পুজা করা হয়।দোলের এই উৎসব জগন্নাথ দেবের মানবীয় রূপের প্রকাশ ঘটায় যা ভক্তদের কাছে প্রীতি ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসে।
দোল পূর্ণিমার দিন ভোর ৩টায় ওড়িশার পুরীর শ্রীমন্দিরের দরজা খোলা হয়।শ্রী জগন্নাথ মন্দির প্রশাসন কর্তৃক ধর্মীয় সময়সূচী অনুসারে সমস্ত উৎসব পালিত হয়। বছরে পাঁচবার জগন্নাথদেবের রাজবেশ হয়। এর মধ্যে দোল পূর্ণিমা অন্যতম। বাকি চারটি উৎসব হলো — রথযাত্রা, বিজয়া দশমী, কার্তিক পূর্ণিমা ও পৌষ পূর্ণিমা।
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, জগন্নাথ মন্দিরেও দৈত্য হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকার উপর ভগবান বিষ্ণুর বিজয় উদযাপন করা হয়।ওড়িশার উপকূলীয় জেলাগুলোতে জনপ্রিয় দোল উৎসবের বা দোল পূর্ণিমার প্রাক্কালে পালিত হয় ‘মেন্ধাপোদি’ (Mendhapodi) বা মেন্ধা কুদিয়া পোদি।
এটি হোলিকা দহনের (Holika Dahan) একটি বিশেষ ওড়িয়া রূপ।জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণে হোলিকা দহনের এই অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
কিছু জায়গায় খড়ের কুঁড়েঘর পোড়ানোকে “মেন্ধাপোদি” বলা হয়। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, ‘মেষা’ নামে এক রাক্ষস স্বর্গ ও পৃথিবীতে আতঙ্ক সৃষ্টি করছিল। দেবতাদের পাশাপাশি মানুষও ভগবান কৃষ্ণের কাছে তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে প্রার্থনা করেছিলেন। ভক্তদের রক্ষা করতে কৃষ্ণ সেই রাক্ষসকে হত্যা করে পুড়িয়ে ছাই করে দেন। এই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য দোলের আগের দিন একটি কুঁড়েঘর পোড়ানো হয় যা রাক্ষসের আবাসস্থলকে প্রতিনিধিত্ব করে।
দোল পূর্ণিমার দিন জগন্নাথ দেবকে দোলগোবিন্দ বা রাধাকৃষ্ণের রূপে পূজা করা হয়। এই দিনে ভোরের মঙ্গলারতির পর থেকে বিশেষ আচার অনুষ্ঠান শুরু হয় যেখানে জগন্নাথবলরাম ও সুভদ্রা দেবীকে দোল বেদীতে (Dolabedi) নিয়ে গিয়ে দোল উৎসব ও সুনা বেশ (Suna Besa) বা রাজরাজেশ্বর বেশে সাজানো হয় এবং ভক্তরা আবির দিয়ে পূজা করেন।
রাজবেশে সোনার মালা, মুকুট, কুন্ডল সহ প্রচুর স্বর্ণালংকার প্রয়োজন হয় তিন বিগ্রহের জন্য। তখন বড় মন্দিরের বড় স্বর্ণ ভান্ডারটি থেকে জগন্নাথ বলভদ্র ও সুভদ্রার জন্য বাঁশের ঝুড়িতে নানা অলংকার গর্ভগৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় তিন বিগ্রহের অলংকার শৃঙ্গার।দেবতারা সোনার গয়না (শ্রীপাদশ্রীহস্তচক্র) পরিধান করেন সাথে লাল রেশমি পোশাক, চন্দনফাগু এবং লাল ফুল।
মূল বিগ্রহের পরিবর্তে উৎসবের জন্য শ্রীমন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে জগন্নাথ দেবের প্রতিনিধি ‘দোল গোবিন্দ’ বিগ্রহকে পালকিতে নিয়ে যাওয়া হয়। দোলগোবিন্দর বিগ্রহর সাথে শ্রীদেবী এবং ভূদেবীকে নেওয়া হয়।
ভগবান দোল গোবিন্দ, শ্রীদেবী এবং ভূদেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সুসজ্জিত পালকিতে করে বড়দান্ডায় জগন্নাথ বল্লভ মঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্তবগান এবং শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে দোল পর্ব নীতি সম্পন্ন হয়।
মহাপ্রভুর ঐশ্বরিক আচার-অনুষ্ঠান এবং নীতিকান্তি (ধর্মীয় আচার) প্রত্যক্ষ করার জন্য ভক্তরা শ্রীমন্দির, বড়দান্ডা এবং জগন্নাথ বল্লভ মঠ প্রাঙ্গণে ভিড় জমান। ভক্ত এবং ভগবান প্রতীকীভাবে আবীর ও গুলালের বৃষ্টিতে একত্রিত হওয়ায় বাতাস উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। রঙের উৎসব এবং সংশ্লিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান দোল পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে।
চাঁচেরি বেষা: প্রতি বছর ফাল্গুন শুক্লা দশমী থেকে চতুর্দশী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে দেবতাদের চাঁচেরি বেষা দিয়ে সজ্জিত করা হয়। এই বেষা শুরু হয় দুপুরে। দেবতাদের শরীরে প্রথম চন্দন প্রলেপ দেওয়া হয়। বৈরানী ও মাধবালী ইত্যাদি বিশেষ মানের কাপড় দেবতাদের নিবেদন করা হয়। দেবতাদের স্থানীয়ভাবে কুণ্ডল নামে পরিচিত চারটি কানের দুল এবং দুটি তদগী দিয়ে সজ্জিত করা হয়। এছাড়াও ভগবানকে গুড়চিনি ও নতুন শস্য দিয়ে তৈরি ‘চাচেরি ভোগ’ নিবেদন করা হয়।
প্রাচীনকালে জগন্নাথ মন্দিরের অগ্নিকোণে (দক্ষিণ-পূর্ব কোণে) অবস্থিত একটি মণ্ডপে দোল উৎসব পালিত হত। মণ্ডপটিকে দোল মণ্ডপ বলা হয় এবং রাস্তাটিকে দোল মণ্ডপ সাহি বলা হয়। একবার এক উৎসবে, দুর্ঘটনাক্রমে দোল ভেঙে যাওয়ার কারণে ভগবান জগন্নাথের শ্রীভূজা (হাত) ভেঙে যায়। সেই ঘটনার পর, ভগবান জগন্নাথের প্রতিনিধি দেবতা (‘দোল গোবিন্দ’) দোল উৎসবে যোগ দেন। বেশ কয়েক বছর ধরে মণ্ডপটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেলে, শ্রী বীরকেশরী দেব মেঘনাদ প্রাচীরের বাইরে একটি নতুন মণ্ডপ নির্মাণ করেন, মণ্ডপটি সাধারণত দোল বেদী নামে পরিচিত। বর্তমানে দোল পূর্ণিমা দোল বেদীতে পালিত হয়।
ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমা তিথি ওড়িশার উপকূলীয় জেলাগুলিতে খুবই জনপ্রিয়। গ্রাম্য দেবতাদের, বিশেষ করে ভগবান কৃষ্ণের মূর্তি, একটি সুসজ্জিত বীমানায় (পালকি) চড়ে সকল বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। মূর্তি বহনকারী এবং তার অনুসরণকারীরা একে অপরকে বিড়া (শুকনো রঙ) দিয়ে মাখিয়ে দেয়।
এই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন গ্রামের ঢোলবাদক, বাঁশীবাদক এবং ‘সংকীর্তন মণ্ডলী’। শোভাযাত্রাটি প্রতিটি বাড়ির সামনে থামে এবং দেবতাকে ‘ভোগ’ উৎসর্গ করা হয়। চার দিন ধরে দেবতার প্রতিদিনের প্রদক্ষিণকে “চাঁচেরি” বলা হয়। পূর্ণিমার শেষ দিনে এই উৎসব শেষ হয় দোল উৎসবের মাধ্যমে। শোভাযাত্রা শেষে ডালিধরা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বারোয়ারি পুজোর ডালি (ফল ও পূজার সামগ্রী) নিবেদন করা হয়।এই পূজা গ্রামের সকল মানুষকে একত্রিত করে এবং পাড়ার মণ্ডপে (খোলা) সবাই মিলে আনন্দ ও উৎসব পালন করে।
এই শুভ দিনে নতুন ওড়িয়া পঞ্জিকা (calendar) পূজার্চনা করে দোলবেদিতে রাখা হয়। আগামী বছরের ওড়িয়া ‘পাঞ্জি’(পঞ্জিকা) পাঠ করে শোনানো হয় মহাপ্রভুকে যাতে তাঁর আশীর্বাদে নতুন বছর সকলের শুভ মঙ্গলময় হয়ে ওঠে। মঠের কেউ নয়, বাইরের কোন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ব্যক্তিকেই পঞ্জিকা পাঠের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দোল পূর্ণিমায় ভগবান জগন্নাথ দেবকে প্রধানত বিশেষ চাচেরি ভোগ বা দোলাযাত্রা ভোগ নিবেদন করা হয়। এই সময়ে দোলগোবিন্দ রূপে প্রভু অন্নভোগের পাশাপাশি ঘন দুধ, মাখন, নারকেল নাড়ু বিভিন্ন মিষ্টি, খইনারকেলের জলসুগন্ধি ভাত ও পাকা কলাসহ বিভিন্ন ব্যঞ্জন ভোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই ভোগ দোলাবেদীতে দেওয়া হয়।
দোলা ভোগের মধ্যে রয়েছে ‘একপাগী উখুদা’ ‘চুদা ভাজা’ ‘চুদা পুয়া’ ‘উখুদা মুয়ান’ ‘নদিয়া পাটি’ ‘চুদা ঘাস’ ‘খাজা’ ‘সাকারা’ ‘ভাজা ছানা’ ‘গজা মুগা (অঙ্কুরিত মুগ), মৌসুমি ফল যেমন কলা, পাঁপড়া ইত্যাদি। জলে গুড়ের দ্রবণ, চেন্না (পনির), সঙ্গে ‘নলি অভিরা’ (শুকনো লাল রঙ), “আলাতি কাঠি” (নারিকেলের কাঠির চারপাশে তুলো দিয়ে মোড়ানো), দেশি ঘি, ধূপকাঠি, কর্পূর এবং চন্দন দেওয়া হয়।
উৎসবের শেষে দেবতাদের বিশেষ অভিষেক (স্নান) করানো হয় এবং নতুন বস্ত্র পরিধান করানো হয়।
রাতে বিশেষ ভোগ নিবেদন ও আরতির মাধ্যমে দোলযাত্রার মূল আচারের সমাপ্তি ঘটে।
২০২৬ সালে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলযাত্রা ৩ মার্চ মঙ্গলবার পালিত হবে। এই উপলক্ষে ২ মার্চ সন্ধ্যায় ‘হোলিকা দহন’ অনুষ্ঠিত হলো। দোলযাত্রার দিন (৩ মার্চ) ভগবান জগন্নাথবলভদ্র এবং সুভদ্রার বিশেষ পূজা রাধাকৃষ্ণের রঙের উৎসব এবং বিগ্রহের স্নানযাত্রা মন্দির প্রাঙ্গণে মহা সমারোহে সম্পন্ন হবে।
দোল পূর্ণিমা তিথি : ২ মার্চ সোমবার বিকেল ৫:৪২ মিনিটে শুরু হয়ে ৩ মার্চ মঙ্গলবার বিকেল ৪:৫৭ মিনিটে শেষ হবে ।
দোলযাত্রা (মূল উৎসব) : ৩ মার্চ মঙ্গলবার (১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ)।
দ্রষ্টব্য : পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের সময়সূচী মন্দিরের অভ্যন্তরীণ প্রথা অনুযায়ী সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে।
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যখন পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার রঙে মাতোয়ারা, তখনই আবির আর রঙের ছোঁয়ায় ভেদাভেদ ভুলে সকলের হৃদয়ে বেজে ওঠে মিলনের সুর — শুরু হয় রঙের উৎসব ‘দোলযাত্রা’। এটি একটি উৎসব নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। সেই মন নিয়েই ভক্তরা দোলের সময় পুরী পাড়ি দেন। ভক্তি এবং উৎসবের এই মিশ্রণ ভক্তদের মনে পুরীর দোলযাত্রাকে একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতায় বদলে দেয়।
জয় জগন্নাথ
Subho dol purnima
জয় জগন্নাথ 🙏