সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ ইতিহাসকে কতখানি বিকৃত করে — এর উত্তরে এটুকু বলাই যায় যে ইতিহাস বিকৃতির একটি বড় কারণ সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার বা প্রতিষ্ঠা। কোনো একটি ধর্ম বা ধর্মীয় গোষ্ঠী যখন নিজেদের সম্প্রচারে অন্য সবার থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করতে চায় এবং তাদের রাজনৈতিক স্বার্থকেই সবথেকে এগিয়ে রেখে প্রাধান্য দিতে চায়, তখন বুঝতে হবে যে তারা ইতিহাসের ঘটনাগুলিকে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সাজাচ্ছে বা বিকৃত করে উপস্থাপন করছে, যা থেকে নানা সময়েই সাম্প্রদায়িকতা ও সংঘাত জন্ম নেয়। উল্লেখ্য, পারমাণবিক অস্ত্র মানুষের জন্য যতটা বিপজ্জনক বলে ভাবা হয় ইতিহাসও কিন্তু মানুষের জন্য ততটাই বিপজ্জনক হতে পারে যদি তাকে বিকৃত করা হয়। বস্তুত, সাম্প্রদায়িকতা একটি চেতনা, যার প্রসার এবং ভিত্তি আরও দৃঢ় মতাদর্শে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিহাসের ভূমিকাই প্রধান। ঐতিহাসিক বিপিন চন্দ্রের ভাষায়, “ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা বাদ দিলে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের খুবই কম অবশিষ্ট থাকে”। এই বিকৃত ইতিহাস কেবল যে অতীতের ঘটনা বিকৃত করে তাই নয়, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেও বিষাক্ত করে তোলে। গান্ধীও সতর্ক করে বলেছিলেন, শিক্ষার প্রসার হচ্ছে না, সাম্প্রদায়িকতার প্রসার হচ্ছে। যতদিন স্কুল-কলেজগুলিতে বিকৃত ইতিহাস পড়ানো হবে, ততদিন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
ঘোর হিন্দুত্ববাদীরা জানে যে এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল ‘বিদেশি তত্ত্ব’ বা ‘বহিরাগত’র ধারণা তৈরি করা। যে কারণে ২০১৪ সালে কেন্দ্রে এককভাবে গেরুয়ারাজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আরএসএস-এর রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে যে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেই কর্মসূচিতে প্রাধান্য পায় ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘বহিরাগত’ বা ‘অনুপ্রবেশকারি-র তত্ত্ব নির্মাণ করা এবং সেই হিসাবে তাদের চিহ্নিত করা। আরএসএস-এর এই প্রচার বহু আগে থেকে চালু থাকলেও বিজেপি কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করায় রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে সেই প্রচার আরও শক্তিশালী হতে শুরু করে। আসলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারের মূলটি রোপন করেছিলেন ঘোর হিন্দুত্ববাদী নেতা এমএস গোলওয়ালকর তাঁর ‘উই আর আওয়ার ন্যাশনহুড ডিফাইনড’- বইতে। তিনি এখানে স্পষ্টভাষাতেই বলেন, “হিন্দুস্তানের বিদেশি জাতিগুলিকে হিন্দু সংস্কৃতি, হিন্দি ভাষাকে গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম করতে হবে, হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতিকে গৌরবান্বিত করা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা পোষণ করা চলবে না।” কেবল তাই নয়, তিনি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হয় তারা এসব করবে, অন্যথায় এদেশে থাকতে হবে হিন্দু জাতির কাছে পদানত হয়ে।” এই ভাবনায় বিশ্বাসী ও পথচলা আরএসএস বছরের পর বছর ধরে প্রচার করে আসছে যে মুসলিমরা বিদেশী এবং অনুপ্রবেশকারী। আর এই প্রচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই বিজেপি সরকার লোকসভায় সংশোধিত নাগরিক আইন (CAA) পাশ করায়, যা কার্যকর করার মূল উদ্দেশ্যই হল মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর রাজনৈতিক ও সামাজিক আক্রমণ সংঘটিত করা।
সাম্প্রদায়িক মত ও আদর্শে বিশ্বাস এবং পথ চলা থেকে সবসময়েই একপেশে ইতিহাস লেখা হয়। কারণ সেই ইতিহাস একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ঘটনা পরম্পরা সাজানো হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এটা দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ বা ঔপনিবেশিক প্রভাব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ইতিহাসবিদরা বিশেষত ব্রিটিশ ইতিহাস রচয়িতারা ভারতের ইতিহাসকে ‘হিন্দু যুগ’ ও ‘মুসলিম যুগ’ নামে বিভাজিত করেন, যা একটি অত্যন্ত সরল ও একপেশে বিভাজন। এই বিভাজন পরবর্তীতে গভীর সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়। যার পিছনে কাজ করেছে রাজনৈতিক সবার্থ এবং সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিভাজনের রাজনীতিকে মনে রেখেই জেমস মিল ভারতের ইতিহাসের যুগ ভাগে বিভ্রান্তি ঘটান। হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ এবং ব্রিটিশ যুগ- এইভাবে তিনি ভারতের ইতিহাসকে তিনটি পর্বে ভাগ করেন। তিনি এইভাবে যুগ ভাগে সচেতনভাবেই সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ কাজে লাগিয়েছিলেন। হিন্দু যুগ মানে স্বর্ণযুগ আর মুসলিম যুগ হল অন্ধকারের সময়- এটা কেবল মিথ্যা বা ভুল নয়, অত্যন্ত একপেশে ব্যাখ্যা কিন্তু দুঃখের বিষয় বহু ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকও একে সঠিক মনে করতেন। প্রশ্ন, কোনো রাজার ধর্ম দিয়ে কি একটি যুগের নামকরণ করা যায়? প্রাচীন যুগেও বহু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল। রাম-রাবণ, কুরু-পাণ্ডব ইত্যাদি যুদ্ধ হয়েছিল, হিংসা, ষড়যন্ত্র, হত্যা সবই ছিল। আবার সম্রাট অশোকের অহিংসাকে হিন্দু ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ অবদান মনে করা হয়। কিন্তু হিংসা-অসহিষ্ণুতা ছিল বলেই তো পরিবর্তিত সম্রাট অশোক অহিংসা ও সহিষ্ণুতার কথা প্রচার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মধ্যযুগ, সামন্ত যুগও তো ছিল, কিন্তু কারা সেগুলিকে মুসলিম যুগ বলে অভিহিত করেছিল? হিন্দু যুগকে গৌরবান্বিত করতে বলতে হল মধ্যযুগ অন্ধকারাচ্ছন্ন, কেবল তাই নয়, হিন্দু যুগের অবনতির জন্য ইসলাম দায়ী। এই ভ্রান্ত, মিথ্যা ইতিহাস কারা সৃষ্টি করল? এই অলীক ধারনা তৈরি করা হয়েছিল এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তা প্রচার করা। তাহলে ঐতিহাসিক সত্য কি? মুসলমান শাসকরা খাজনা দেওয়ার শর্তেী হিন্দু রাজা-রানা ও ভূস্বামীদের সঙ্গে আপস করে চলত কিন্ত আসল ক্ষমতায় থাকত হিন্দু সামন্তপ্রভুরা। ধর্ম প্রসারের লক্ষ্য যদি জোর করে ধর্মান্তর হত তাহলে তো মুসলমানদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, “শত শত বছরের মুসলিম শাসনের প্রাণকেন্দ্র হলো দিল্লি, সেই দিল্লির চারদিকের রাজ্যগুলিতে মুসলিম সংখ্যা খুবই অল্প। শাসন যত দূরে গেছে মুসলিমের সংখ্যা তত বেড়ে গেছে।” তাহলে হিন্দুত্ববাদীরা যে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ প্রচার করে, তার মূল ভিত্তি ইতিহাসের সুপরিকল্পিত বিকৃতি ছাড়া আর কি হতে পারে। মুসলমানদের ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাদের ঐতিহাসিক অবদানকে অস্বীকার করা, এবং রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মকে জাতির সমার্থক হিসেবে তুলে ধরা — এসব কি বিদ্বেষ বা হিংসার রাজনীতির কৌশল নয়?
ভারতের ইতিহাসই জানায় যে ধর্মান্তরকরণের আসল কারণ ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের গোঁড়ামি, কুসংস্কার, যাগযজ্ঞের আতিশয্য এবং একই সঙ্গে উচ্চশ্রেণির অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিকভাবে বর্ণবৈষম্যের শিকার হওয়া নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। অভিহিত ‘স্বর্ণযুগে’-র উচ্চবর্ণের লোকেরা নিম্নবর্ণের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালাতো। শূদ্রের ছায়া মাড়ালে পাপ হত, শূদ্রের বেদ শোনার অধিকার ছিল না, শুনলে গরম সীসা কানে ঢেলে দেওয়া হত, বেদ পড়লে জিভ কেটে নেওয়া হত। ঠিক সেই সময়েই মধ্য এশিয়া, পারস্য থেকে ভারতে এসেছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশতী, নিজামুদ্দিন আউলিয়া প্রমুখ পীর, দরবেশ, ফকির ও সুফিরা। যাদের উদার, সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক ধর্মমতে আকৃষ্ট হলেন নিম্নবর্ণের হিন্দুরা, সহজ ধর্মান্তরকরণ ঘটল। তারাই তো এ দেশের আদি মুসলমান, ‘লস্কর’, ‘মণ্ডল’, ‘সরকার’, ‘হালদার’, ‘সরদার’ ইত্যাদি হাজার হাজার পদবি দেখে কি মনে হয়না যে এই মুসলিম সম্প্রদায় আসলে ধর্মান্তরিত হিন্দু, নাকি এরা খিলজী, তুঘলক বা মোঘল বংশোদ্ভূত?