উদয়গিরি
ললিতগিরি থেকে বেরিয়ে, সুখুয়াপাড়া-পালই নামে একটি গ্রামে কিছুক্ষণ থামলাম। কারণ রাস্তার ধারে একাধিক জায়গায় শিল্পীরা নিবিষ্টমনে পাথর খোদাই করে নানারকম মূর্তি বানিয়ে চলেছেন। এক শিল্পী বিশালাকার পাথর খোদাই করে ফুটিয়ে তুলেছেন বুদ্ধদেবের মূর্তি। পাশেই শায়িত বুদ্ধের একটি মূর্তি রাখা আছে। একজনকে দেখলাম, ৫-৬ ফুট উঁচু পাথরখণ্ড খোদাই শুরু করেছেন, সেটাতে তখনও কোনও অবয়ব ফুটে ওঠেনি।
এঁদের পূর্বপুরুষেরাই কি ওড়িশার বৌদ্ধবিহারগুলিতে মূর্তি তৈরি করেছিলেন?
ভাবি, যাঁরা হাসান-হ্যালেবিডু-সোমনাথপুরার মন্দির বানিয়েছিলেন, যাঁরা লালকেল্লা-তাজমহল-ফতেপুরসিক্রি বানিয়েছিলেন, কোথায় গেলেন তাঁদের বংশধরেরা?
ললিতগিরি থেকে বেরিয়ে আমাদের এবারের গন্তব্য ডায়ামণ্ড ট্রায়াঙ্গেলের দ্বিতীয় স্থান উদয়গিরি। ললিতগিরির উত্তরদিকে ৯ কিলোমিটার দূরত্বে উদয়গিরি। কটক শহর থেকে ৫৬ কিলোমিটার। ওড়িশার জাজপুর জেলার মধ্যে এই উদয়গিরি — জাজপুর-কেওনঝড় স্টেশন থেকে ৩৫ কিলোমিটার। (এর সঙ্গে ভুবনেশ্বরের উপকণ্ঠে উদয়গিরি-খণ্ডগিরি গুহা গুলিয়ে ফেলবেন না কিন্তু!!!)
বুদ্ধদেব কখনও কলিঙ্গে পদার্পণ করেননি। বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ সালে, অবশ্য অনেক পণ্ডিত বলেন খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে। ফলে মৃত্যুর সাল নিয়েও দ্বিমত আছে। কেউ বলেন খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩, কেউ বলছেন খ্রিস্টপূর্ব ৪০০, কিন্তু তিনি ৮০ বছর বয়সে মারা যান এই তথ্য সর্বস্বীকৃত।
মগধের সম্রাট অশোকের সঙ্গে ভগবান বুদ্ধের সাক্ষাৎ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা ছিলো না, কারণ অশোক খ্রিস্টপূর্ব ৩০৪ সালে জন্ম গ্রহণ করেন ও মারা যান খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ সালে।
মগধের সিংহাসনে বসার আট-নয় বছর পরে অশোক আসেন কলিঙ্গ জয় করতে। যখন অশোক কলিঙ্গ জয় করেন, তখন ১,৫০,০০০ জনকে বন্দী করা হয়, ১০০,০০০ জনকে হত্যা করা হয় এবং এর বহুগুণ বেশি মানুষ যুদ্ধে মারা যায়। ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলে, ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সমগ্র কলিঙ্গ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই যুদ্ধে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতা বিজয়ী রাজার হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল, যিনি পাথরের উপর অবিনশ্বর ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছিলেন পরাজিতদের কষ্ট, বিজয়ীর অনুশোচনা এবং তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস যে একমাত্র প্রকৃত বিজয় হল ধর্ম বা ধার্মিকতার নীতি দ্বারা, “অস্ত্রের বলপ্রয়োগ” দ্বারা নয়।
এরপর সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ মন্ত্রে নিজেকে সমর্পণ করেন। তাঁর রাজত্বকালে বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর আনুগত্য ও পৃষ্ঠপোষকতা সমগ্র ভারতবর্ষে এই ধর্মের প্রসারকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। উড়িষ্যায় বৌদ্ধধর্মের শিকড় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং রাজ্যে বৌদ্ধ কার্যকলাপের অনেক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। এরকম কেন্দ্র হল ললিতগিরি, উদয়গিরি, রত্নগিরি এবং বিরূপা-ব্রাহ্মণী নদী উপত্যকায় অবস্থিত লাঙ্গুদি পাহাড়ের চারপাশে। বিশ্বের অনন্য বৌদ্ধ মঠ কমপ্লেক্স এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। ললিতগিরির সঙ্গে অন্য দুটি পাহাড়, উদয়গিরি এবং রত্নগিরি একসঙ্গে উড়িষ্যা পর্যটনের জন্য হীরক ত্রিভুজ গঠন করেছে।
হিউয়েন সাং কলিঙ্গ এসেছিলেন এবং তিনি উল্লেখ করে গেছেন যে কলিঙ্গে কয়েক হাজার বৌদ্ধবিহার ছিলো। কিন্তু ওড়িশায় বৌদ্ধধর্মের এত প্রচার কীভাবে হয়েছিল? আসলে, সম্রাটের ধর্মপালন জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল। রাজানুগ্রহ না থাকলে কোনও ধর্মই বিকশিত হয় না।
উদয়গিরি আমাকে বিস্মিত করেছে, স্তম্ভিত করেছে। দূরে সবুজরঙে সুসজ্জিত শান্ত পাহাড়, তার পাদদেশে ছড়িয়ে থাকা বৌদ্ধবিহারের করুণ ভগ্নাবশেষ এক আশ্চর্য বৈপরীত্য প্রকাশ করে চলেছে।
এখানে গেটে টিকিট নেই। কিন্তু ঢোকার সময় আমার হাতে ক্যামেরা দেখে প্রহরী জানালো, ভিতরে ছবি তোলা যাবে না।
— সে কি! কেন? আমি তো ললিতগিরির মিউজিয়ামের ভিতরেও ছবি তুলেছি।
— আসলে এখানে স্থানীয় ছেলেরা আসে ও কেবলই সেলফি তোলে, সেইজন্যই বারণ। আপনারা কোত্থেকে এসেছেন?
বললাম, কলকাতা।
— তাহলে ছবি তুলুন।
গেট থেকে লম্বা রাস্তা ঢুকে গেছে, দুপাশে সবুজ ঘাসে মোড়া প্রান্তর। সেখানে গাছের ছায়ায় তরুণ-তরুণীদের জটলা চলছে। দূরে উঁচিয়ে আছে সবুজ পাহাড়।
বৌদ্ধবিহারের কাছে যেতেই একটি লোক আমার সঙ্গে জুটে গেল। সে বলতে লাগল, দেখুন এখানে একটা গভীর কুয়ো আছে। দেখুন কেমন সিঁড়ি নেমে গেছে, দেওয়ালে পালিভাষায় কিছু লেখা আছে।
আমি নির্বিকারে হেঁটে বেড়াচ্ছি, সে বলছে, ওই দেখুন পাহাড়ের গায়ে পাকশালা। এখানে দেখুন ছাত্রদের ঘর!
সবশেষে বললো, আমি এখানকার কর্মচারী, কিছু বকশিস দেবেন আমাকে।
সবুজ প্রান্তরের মধ্য দিয়ে লম্বা পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম উদয়গিরি বৌদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (ASI-এর) ফলক লাগানো আছে, সেটা মন দিয়ে পড়লাম। সেখানে ইংরেজিতে লেখা আছে —
উদয়গিরি বৌদ্ধক্ষেত্র
স্থান : চান্দিয়া (উদয়গিরি)
জেলা : জাজপুর
তারিখ/কাল : ১ম-১৩শ শতাব্দী।
উদয়গিরি বৌদ্ধক্ষেত্রটি জাজপুরের চান্দিয়া এলাকার আশিয়া পাহাড়শ্রেণীতে, বিরূপা নদীর ডান তীরে অবস্থিত। ১৮৭০ সালে বাবু চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি উদয়গিরি বা “সূর্যোদয় পাহাড়” নামে একটি অর্ধচন্দ্রাকার পাহাড় আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত উদয়গিরি-১ এবং ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত উদয়গিরি-২-এ দুটি পর্যায়ে এই স্থানে বৈজ্ঞানিক খননকাজ পরিচালনা করে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া।
ওই ফলক পুরোটা পড়ে জানা গেল, দুটি পর্যায়ে এখানে খনকার্য চালানো হয়েছিল। [ক্রমশ]