ললিতগিরি
গেটে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই ডানদিকে সুসজ্জিত মিউজিয়াম। সেখানে বুদ্ধের মূর্তি আছে, আছে বুদ্ধের শিষ্য-শিষ্যাদের মূর্তি। সেগুলোর ছবি তুলতে বাধা নেই। কিন্তু একটি কক্ষে তিনটি পাথরের কাস্কেট রক্ষিত আছে, যার মধ্যে বুদ্ধের দেহাবশেষ ও দাঁত আছে,— সেগুলো দূর থেকে দেখতে হয়, কাছে যাওয়া যায় না।
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে, যেদিকেই তাকাই, এক গৌরবোজ্জ্বল নগরের ভগ্নস্তূপ মন খারাপ করে দেয়। ধীরে ধীরে রাস্তা উঠেছে উপরের দিকে — ওড়িশার খররৌদ্রে হেঁটে যাওয়া বেশ পরিশ্রমের কাজ।
চারটি বৌদ্ধস্তূপ আছে, তাদের মধ্যে তিনটির কাছে যেতে পারলাম। অন্যটির দূরত্ব ও সামান্য চড়াই অতিক্রম করা গেল না। কিন্তু যে প্রাপ্তি ঘটলো, তা অবিশ্বাস্য। এতটা বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, এখানে আসার আগে এতটা কল্পনা করিনি।
কটকে আমার হোটেল থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে ললিতগিরি। যাওয়ার পথে মহানদীর বুকে সুদীর্ঘ সেতু পার হলাম। নদীতে জল নেই, শুধুই ধু ধু বালি। তারপরে আরও একটা নদী এলো, তার নাম বিরূপা। ভারি অদ্ভুত নাম। বিরূপার একপ্রান্ত মহানদীতে ও অন্যপ্রান্ত ব্রাহ্মণী নদীর সঙ্গে জুড়ে আছে। এই নদীপথেই নৌকা ভাসিয়ে একদা বৌদ্ধভিক্ষুরা শ্রীলঙ্কা ও জাভা যেতেন।
১৮৬৯ সালে, জাজপুরের সাব ডিভিশনাল অফিসার চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি উদয়গিরি এবং ললিতগিরি পরিদর্শন করেছিলেন এবং এই দুটি স্থানে অপূর্ব বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল জার্নালে তাঁর আবিষ্কারের একটি প্রাণবন্ত বিবরণ দিয়েছিলেন যা প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ এবং বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল।
বাংলাভাষায় ললিতগিরি-উদয়গিরির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সীতারাম’ উপন্যাসে। ১৮৮৩ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য জাজপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন, ফলে ললিতগিরি-উদয়গিরি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘সীতারাম’ উপন্যাসে লিখেছেন — “এক পারে উদয়-গিরি, অপর পারে ললিত-গিরি, মধ্যে স্বচ্ছসলিলা কল্লোলিনী বিরূপা নদী নীল বারিরাশি লইয়া সমুদ্রাভিমুখে চলিতেছে।”
কিন্তু ললিতগিরি-উদয়গিরি আদতে বৌদ্ধধর্মের পীঠস্থান, মূর্তিগুলি বুদ্ধদেব ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কিত, তার উল্লেখ বঙ্কিমচন্দ্র করেননি। তিনি এগুলিকে হিন্দুধর্মের পুরাকীর্তি বলেই প্রবল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
১৯২৮ সালে কলকাতার বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ হারাণচন্দ্র চাকলাদার এবং নির্মলকুমার বসু অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেন এবং চিত্রসহ একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
হারাণচন্দ্র চাকলাদার মহাশয় “উড়িষ্যায় সুবৃহৎ প্রাচীন বৌদ্ধপীঠ” শিরোনামে লিখেছেন —
“শ্রীযুক্ত চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বীমস সাহেব (John William Beames, ICS — তিনি বালাশোর ও কটকে জেলাশাসক ছিলেন — Jamil Sayed) উদয়গিরি ও ললিতগিরি সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ বিবরণ বাঙ্গালা এশিয়াটিক সোসাইটীর পত্রিকায় ১৮৭০ ও ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত করিয়াছিলেন এবং বীমস সাহেব কয়েকটি প্রতিমূর্ত্তি প্রভৃতির স্বহস্তাঙ্কিত চিত্রও দিয়াছিলেন। রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয় স্বয়ং এস্থানে গমন করেন নাই। কিন্তু তাঁহার উড়িষ্যার প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থে (Antiquities of Orissa) বীম্স কর্তৃক অঙ্কিত চিত্রের প্রতিরূপ প্রদান করিয়াছিলেন। …
“মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের প্রথমাবস্থায় এত প্রকার মূর্ত্তি পূজার প্রচলন দেখা যায় না। পরবর্তীকালে তন্ত্রযান অথবা বজ্রযান রূপে বিকাশ প্রাপ্ত হইলে নানা প্রকার মূর্ত্তির বাহুল্য লক্ষিত হয়। এ স্থানে বজ্রযানের মূর্ত্তি সমূহই দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। বিশেষ ভাবে অনুসন্ধান করিলে বজ্রযান সম্প্রদায়ের আরও বহুমূর্ত্তি এ স্থানে দেখিতে পাওয়া যাইবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ স্থানের মূর্ত্তি সমূহ অতি দ্রুত নষ্ট অথবা বিক্রীত হইয়া যাইতেছে। …
“ললিতগিরির বিশাল বুদ্ধমূর্ত্তি মাত্র এক শত টাকায় বিক্রীত হইয়াছিল, কিন্ত ক্রেতা এই গুরুভার মূর্ত্তি পর্বতশিখর হইতে বহন করিতে অসমর্থ হওয়ায় ইহা রক্ষা পাইয়াছে। উদয়গিরির পূর্বতন জমিদার কয়েকটি মূর্ত্তি তাহার স্বভবন কেন্দ্রাপাড়ায় লইয়া গিয়াছিলেন, রায় রমাপ্রসাদ চন্দ মহাশয় সরকারের পক্ষ হইতে তাহা এবং রত্নগিরি প্রভৃতি স্থান হইতে আরও কতিপয় মূর্ত্তি ক্রয় করিয়া কলিকাতা মিউজিয়মে রক্ষা করিয়াছেন, এজন্য তিনি সর্বসাধারণের বিশেষ ধন্যবাদার্হ। কিন্তু সরকারী প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এবিষয়ে বিশেষ তৎপর হইয়া শীঘ্রই মূর্ত্তিগুলি রক্ষার ব্যবস্থা না করিলে এই সকল অমূল্য শিল্পসম্ভার নষ্ট হইবার ও বিদেশে চলিয়া যাইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা।” (হারাণচন্দ্র চাকলাদার লিখিত “উড়িষ্যায় সুবৃহৎ প্রাচীন বৌদ্ধপীঠ)
১৯৮৫-১৯৯২ সালের মধ্যে খননকার্যের ফলে এখানে একটি বিশাল বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছিল যা কমপক্ষে ১২০০ বছর ধরে টিকে ছিল। ললিতগিরিতে আবিষ্কৃত বেশিরভাগ ভাস্কর্যই বিভিন্ন ভঙ্গি এবং আকারের বুদ্ধের মূর্তি।
৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এসেছিলেন ওড়িশায়। তাঁর বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে যে ওড়িশায় ষষ্ঠ শতাব্দীতে একটি বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ‘পুষ্পগিরি’ নামে খ্যাতি লাভ করেছিল। এখন পুরাতত্ত্ববিদগণের ধারণা, ওই ‘পুষ্পগিরি’ আসলে ললিতগিরি-উদয়গিরি।
ললিতগিরির মিউজিয়ামে রক্ষিত মূর্তিগুলির ছবি তোলার আগে, জিজ্ঞেস করলাম, ছবি তুলতে পারবো তো? রক্ষী হেসে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, মূর্তির ছবি তুলতে পারবেন, শুধু মূর্তির সঙ্গে সেল্ফি বারণ।
প্রত্নতত্ত্ববিদ হারাণচন্দ্র চাকলাদার প্রায় ১০০ বছর আগে ৯টি মূর্তির ছবি ছেপেছিলেন। সেই ছবির সঙ্গে আমার তোলা ছবির কোনও মিল নেই। তাহলে ওই মূর্তিগুলি কি অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কে জানে!!!! [ক্রমশ]