ললিতগিরি
সন্ধ্যাবেলায় কটকের হোটেলে বসে বিভিন্ন Car rental agency-তে ফোন করতে লাগলাম। বললাম, কাল সকালে ললিতগিরি, উদয়গিরি ও রত্নগিরি ঘুরতে যাবো, গাড়ি চাই, শুধু দুটি দাবি— টুরিস্ট-ফ্রেণ্ডলি ড্রাইভার ও ভালো এসি।
সবাই বলতে থাকল, ললিতগিরি-রত্নগিরি ঠিক আছে। কিন্তু স্যার উদয়গিরি তো অন্যদিকে, ভুবনেশ্বরে, উদয়গিরি-খণ্ডগিরি!!! … বুঝলাম, এদেরকে নিয়ে আমার চলবে না। আমি ভুবনেশ্বরের উদয়গিরি নয়, যেতে চাইছি জাজপুর জেলার উদয়গিরি।
সবশেষে ফোন করলাম স্ম্রুতি প্রকাশ ঢল সামন্ত-কে। সে প্রথমবারেই বুঝতে পারলো আমি কোথায় যেতে চাই। আমি বললাম, উদয়গিরি কোথায় তা বুঝতে পারছ তো? স্ম্রুতি বললো, হ্যাঁ, জাজপুরে!
পরদিন সকাল পৌনে ৯টায় এসে গেল বাহন। ড্রাইভার দিপু খুব ভদ্র ছেলে। সে অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেল ছাতিয়াবট মন্দিরে, সেই মন্দির হলো পুরীর জগন্নাথদেবের দ্বিতীয় গৃহ। … কিন্তু সেখান থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিয়ে চললাম ললিতগিরি।
১৮৬৯ সালে, জাজপুরের সাব ডিভিশনাল অফিসার চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি উদয়গিরি এবং ললিতগিরি পরিদর্শন করেছিলেন এবং এই দুটি স্থানে অপূর্ব বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল জার্নালে তাঁর আবিষ্কারের একটি প্রাণবন্ত বিবরণ দিয়েছিলেন যা প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ এবং বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে পাহাড়ের নিচে ঢিবি এবং ইট-পাথর ও বিভিন্ন স্থাপত্যের টুকরো ছড়িয়ে থাকা ব্যতিত আর কিছুই ছিলো না। জাজপুরে এবার এসডিও হয়ে আসেন মনোমোহন চক্রবর্তী যিনি ১৯০৬ সালে কলকাতার বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে রত্নগিরি, ললিতগিরি এবং উদয়গিরির বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ নিয়ে একটি লেখায় পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১৯২৭-২৮ সালে, কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরের রমাপ্রসাদ চন্দ ললিতগিরিতে এসেছিলেন জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য কিছু ভাস্কর্য সংগ্রহ করতে।
ওড়িশা হিস্টোরিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি শ্রী বীরেন্দ্রনাথ রায়ের অনুরোধে কলকাতার বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ হারাণচন্দ্র চাকলাদার এবং নির্মলকুমার বসু ১৯২৮ সালে অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেন এবং চিত্রসহ একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
১৯৬০-৬১ সালে, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ ললিতগিরি এলাকার আশেপাশে ছড়ানো ভাস্কর্যগুলিকে সংগ্রহ করতে উদ্যোগী হয়। তবে ঢিবিটি খনন করা হয়নি। উৎকল ইউনিভার্সিটি ১৯৭৭ সালে পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে একটি ছোট আকারের খননকার্য পরিচালনা করে এবং বিপুল সংখ্যক স্তূপের বেসমেন্টের অবশিষ্টাংশ উন্মোচিত করে।
১৯৮৫ সালে খননের জন্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ার ভুবনেশ্বর সার্কেল দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে পাহাড়ের বিভিন্ন টিলায় পরপর ছয়টি সেশন জুড়ে খননের ফলে বৌদ্ধ স্থাপনার একটি বিশাল কমপ্লেক্স আবিষ্কার করা হয়েছে যা ওড়িশায় এখন পর্যন্ত বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম বৌদ্ধ সাইট। এটি কটক জেলার মধ্যেই পড়ে।
পাথরে খোদাই করা অসংখ্য শিলালিপি রয়েছে। খুঁজে পাওয়া গেছে পাত্র এবং সিলমোহর — যা খ্রিস্টপূর্বাব্দ তিন থেকে দুই শতাব্দীর সময়কালের সাইটের সাংস্কৃতিক অনুক্রম দেয়। খ্রিস্টীয় ১৪-১৫ শতক পর্যন্ত এই সাইটের উল্লেখযোগ্য চরিত্রটি মৌর্য যুগ থেকে গজপতি রাজাদের যুগ হয়ে মোগলদের উড়িষ্যায় আবির্ভাব পর্যন্ত ঐতিহাসিক কালের পুরো পরিসরকে জুড়ে রয়েছে। এই সাইটে বৌদ্ধ বসতি স্থাপনের সমস্ত চিহ্ন রয়েছে, যেমন উপাসনালয়, বিভিন্ন ভবন বা মঠ কমপ্লেক্স-সহ আবাসিক এলাকা এবং চারটি বিশাল স্তূপ এবং চৈত্য। পাথরে খোদাই করা অসংখ্য শিলালিপি রয়েছে, মৃৎশিল্পের টুকরো, এবং সিল আবিষ্কৃত হয়েছে যা খ্রিস্টপূর্ব ৩য়-২য় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ১৪শ-১৫শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী স্থানের সাংস্কৃতিক ক্রম নির্দেশ করে।
খননকার্যের ফলে যা পাওয়া গেছে, তাতে সবচেয়ে বিস্ময়ের জিনিস হলো, বুদ্ধের দেহাবশেষ! এবং বুদ্ধের দাঁত।
ললিতগিরিতে একটি ঢিবি খননের সময় ছোট স্তূপের আকারে নকশা করা তিন সেট কাস্কেট পাওয়া গেছে। এই তিনটির মধ্যে দুটিতে একটি হাড়ের টুকরো আকারে দেহাবশেষ রয়েছে। সংরক্ষণের পদ্ধতি ভারি অদ্ভুত। প্রথমটি স্তূপের আকারে নকশাকৃত খাণ্ডালাইট পাথর দিয়ে তৈরি যা দুটি পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরি। দ্বিতীয়টি স্টেটাইট ক্যাসকেটের ভিতরে রৌপ্য পাত্র রয়েছে এবং যখন রৌপ্য পাত্রটি খোলা হয়েছিল, তখন একটি সোনার কাসকেট সংরক্ষিত দেখতে পাওয়া যায় এবং সোনার পাত্রের ভিতরে সোনার ফয়েল দিয়ে বাঁধা পবিত্র নিদর্শন পাওয়া যায়। এটি ভগবান বুদ্ধের দেহাবশেষ বলে বিশ্বাস করা হয়। [ক্রমশ]