দেব দীপাবলি অর্থ্যৎ দেবতাদের দীপাবলি। কালী পুজো বা দীপাবলির ১৫ দিন পর কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে শুধু মর্ত্যই নয়, দেবলোকও দীপাবলির এই উৎসব পালন করে বলে বিশ্বাস। বিশেষ করে অযোধ্যা, বেনারস ও হরিদ্বারের গঙ্গা ঘাট এদিন লক্ষ লক্ষ আলোর সাজে সেজে ওঠে। কোটি কোটি ভক্তবৃন্দ জড়ো হন এই দেব দীপাবলি দর্শনে।
দেব দীপাবলি পালিত হওয়ার নেপথ্যে প্রচলিত রয়েছে বহু কাহিনি। তার মধ্যে শিবপুরাণে কথিত কাহিনী অধিক প্রচলিত।
কার্তিক মাসের প্রবোধিনী একাদশীর দিন থেকে শুরু করে কার্তিক পূর্ণিমা অব্দি পাঁচ দিনের এক উৎসব পালিত হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এটিকে বলা হয় ত্রিপুর পূর্ণিমা স্নান। এই স্নান হল শিবের উদ্দেশ্যে বিজয়স্নান। কথিত আছে, এই তিথিতে ত্রিপুর দুর্গ ধ্বংস করেন দেবাদিদেব মহাদেব। ত্রিপুর পূর্ণিমার স্নান হল শিবের উদ্দেশ্যে বিজয়স্নান।
শিবপুত্র স্কন্দ তারকাসুর নামক এক প্রবল শক্তিশালী রাক্ষসকে বধ করেছিলেন। তারকাসুরের তিন পুত্র ছিলো — তারকাক্ষ, কমলাক্ষ ও বিদ্যুন্মালী। এঁরা ত্রিপুরাসুর বলে পরিচিত। এই তিনজনেই মহাশক্তিমান, জিতেন্দ্রিয়, কর্মোদ্যমী, সংযমী সত্যবাদী এবং দেবতা বিদ্বেষী ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর শোকগ্রস্ত হয়ে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মেরু পর্বতে গিয়ে ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে ঘোর তপস্যা শুরু করলেন। হাজার হাজার বছর কেটে যাওয়ার পর ব্রহ্মা তাদের প্রার্থনায় খুশি হয়ে দেখা দিলেন এবং বর প্রার্থনার জন্য বললেন।

তিন অসুর প্রার্থনা করলেন — তারা যেন দেব দানব যক্ষ রাক্ষসের কাছে অবধ্য হয়। জরা ব্যাধি ইত্যাদি তাদের যেন বিনষ্ট না করে এবং মৃত্যু যেন কখনো কাছে ঘেঁষতে না পারে।
ব্রহ্মা বলেন তিনি নিজেই অমর নন তাই এমন বর তিনি দিতে পারবেন না। তার পরিবর্তে অন্য বর প্রার্থনা করুক। তখন ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে দৈত্যরা বললেন, ‘আমরা প্রবল পরাক্রমী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের নিজস্ব কোন অবস্থান নেই যেখানে আমরা সুরক্ষিত থাকতে পারি। তাই এমন তিনটি নগর তৈরি করবেন যা হবে সর্বসম্পদসম্পন্ন এবং দেবতারা যেন ধ্বংস করতে না পারেন। শুধু সহস্র বছর বিচরণ করার পর এই তিনপুর যখন মধ্যাহ্নের সময় অভিজিৎ মুহূর্তে চন্দ্রপুষ্য নক্ষত্রে স্থিত হলে একসঙ্গে মিলিত হবে এবং একই ভাব প্রাপ্ত হবে, তখন যদি ভগবান শিবশম্ভু যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রথ চড়ে কোন অলৌকিক বান দিয়ে আমাদের নগরগুলিকে আক্রমণ করে, তবেই আমাদের ধ্বংস করা যাবে।’
দৈত্যগণ জানতেন ভগবান শিবশম্ভু তাদের পূজনীয় তাই তিনি তাদেরকে ধ্বংস করবেন না। তাদের প্রার্থনা শুনে ব্রহ্মা বললেন — তথাস্তু।

ব্রহ্মার বরে ময়-দানব নির্মিত তিনটি বিমান-নগরীতে এরা বসবাস শুরু করলেন। তারকাক্ষ থাকলেন স্বর্গের স্বর্ণপুরীতে, অন্তরীক্ষে বিদ্যুন্মালী রইলেন রৌপ্যপুরীতে এবং ভূতলে কমলাক্ষ থাকলেন কৃষ্ণলৌহের দুর্গে।
তিন নগরীতে সমস্ত প্রকারের অভিষ্ট বস্তু ছিল। প্রতিটি পুরীতে ছিল শিবালয় এবং অগ্নিহোত্রশালা। ব্রহ্মার বরে এবং শিবের করুণায় তারা অত্যধিক বলিয়ান হয়ে উঠল।
ক্ষমতা বলিয়ান হয়ে তারা সমস্ত জগতকে অতিষ্ঠ করে তুললেন। এরপর তারা হানা দিল স্বর্গে দেবতাদের। তাদের অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়ে দেবতারা ছুটলেন ব্রহ্মার কাছে। কিন্তু ব্রহ্মাই তাঁদের বর প্রদান করেছেন, অতএব তিনি নিরুপায়। তখন ব্রহ্মার পরামর্শে দেবতারা ছুটলেন শিবের কাছে।
শিব বললেন, ‘আমি জানি তোমাদের কষ্টের কথা। কিন্তু এই দৈত্যগণ আমার ও ব্রহ্মার একনিষ্ঠ ভক্ত। তাই মিত্রদ্রোহের মতো পাপ করবো কি করে? এরা যতক্ষন আমার ভক্তিতে অটল থাকবে, ততক্ষণ আমার পক্ষে এঁদের বধ করা অসম্ভব। তোমরা বরং বিষ্ণুর কাছে গিয়ে উপায় জিজ্ঞাসা করো।’

দেবতারা এবার বিষ্ণুর কাছে গেলেন। বিষ্ণু সব শুনে এমন ব্যবস্থা করলেন যে শৈব অসুররা ধর্ম থেকে সরে এসে অত্যাচারী হয়ে উঠল। অসুরেরা শিবার্চনা ত্যাগ করল। তাদের অনাচারের প্রভাবে লক্ষ্মীদেবী সেখান থেকে অন্তর্ধান হলেন। সেখানে প্রবেশ ঘটলো অলক্ষীর। চারিদিক দুরাচারে ভরে উঠলো। সেই সুযোগে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে কৈলাসে গেলেন মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানাতে।
মহাদেব সব শুনে অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন এবং তার যুদ্ধের ব্যবস্থা করতে বললেন। শিব ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর আদেশে বিশ্বকর্মা তৈরি করলেন এক দিব্য রথ। মন ও বায়ুর মধ্যে দ্রুতগামী অস্ত্র দিলেন ব্রহ্মা। ব্রহ্মার উপদেশে দেবতারা মহাদেবকে তাঁদের অর্ধ তেজ দিলেন। সেই তেজে মহাদেব আরও বলিয়ান হলেন। তারপর অভিজিৎ মুহূর্তে তিনপুর একত্র হতেই অর্ধনারীশ্বর রূপ ধারণ করে মহাদেব ধনুকে জ্যা রোপন করে পশুপাত অস্ত্র শরসন্ধান করলেন। বানের মুখে বসে ছিলেন স্বয়ং অগ্নিদেব। বানটি ত্রিপুর দগ্ধ করে দিল। ত্রিপুরাসুরকে বধ করার পর মহাদেব ত্রিপুরারি নামে পরিচিত হন।
দৈত্য নিধনের আনন্দে দেবতারা লক্ষ লক্ষ প্রদীপ জ্বালালেন। সেদিন ছিল কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথি। দৈত্যবিজয় উৎসবে ধরাধামে মহাদেবের বাসস্থান কাশীতে শিবের তাণ্ডব রূপ আরাধনা হতে লাগলো। বিশ্বাস করা হয় এই দিনে ভগবান বিষ্ণু তার মৎস্য অবতার রূপ গ্রহণ করেছিলেন।
ধর্মীয় ভূমিকার পাশাপাশি, বারাণসীর উৎসব ঘাটে গঙ্গা পূজা ও প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি দর্শন করার মাধ্যমে যুদ্ধে নিহতদের স্মরণ করা হয়। এই সময় দশশ্বমেধ ঘাটে অমর জওয়ান জ্যোতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয় এবং পাশের রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘাটে বারাণসী জেলার পুলিশ কর্মকর্তা, ৩৯ গোর্খা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৯৫টি সিআরপিএফ ব্যাটালিয়ন, ৪টি বায়ুসেনা নির্বাচন বোর্ড ও ৭টি এনসিসি (নৌ) বাহিনী, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় (বিএইচইউ) এর ইউপি ব্যাটালিয়ন যুক্ত হয়। অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান, স্তোত্র ও ভজন গাওয়া হয় এবং ভগীরথ শৌর্য সম্মান পুরস্কার প্রদান করা হয়।
দশমেশ্বর ঘাটে আরতিটি ২১ জন তরুণ ব্রাহ্মণ পুরোহিত ও ২৪ জন তরুণী দ্বারা সম্পাদিত হয়। স্তবগান, ছন্দময় ঢাক বাজানো, শঙ্খ বাজানো এবং তাম্রকার জ্বালানো — আচার-অনুষ্ঠানটির বৈশিষ্ট্য।

দেব দীপাবলি উৎসবে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা দশাশ্বমেধ ঘাটে পণ্ডিত কিশোরী রমন দুবে (বাবু মহারাজ) ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যায় নদীতীরস্থ সমস্ত ঘাটে প্রদীপ প্রজ্বলিত অবস্থায় আরতি সময়ে নদীতে নৌকারোহণ পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। দক্ষিণের অসিঘাট থেকে উত্তরে রাজঘাট অবধি প্রদীপ ও আলোর মালায় সাজানো হয়।
কার্তিক পূর্ণিমার এই তিথিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই রাতে দেবতারা সূক্ষ্ম শরীরে দীপাবলি উদযাপন করতে আসেন পৃথিবীতে। এই উৎসব বিভিন্ন রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হয়। দেবী গঙ্গা ও অন্যান্য দেবদেবীর উদ্দেশ্যে গঙ্গার প্রায় প্রতিটি ঘাটেই জ্বালানো হয় কয়েক লক্ষ প্রদীপ। ঐদিন ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষীর বিশেষ কৃপা লাভের জন্য বাড়ির সদর দরজায় ঘি বা তেলের প্রদীপ, রঙিন নকশা দিয়ে সজ্জিত করা হয়।
যারা গঙ্গায় গিয়ে প্রদীপ জ্বালাতে পারবেন না, তারা ঘরে বসেও এই শুভ দিনটি পালন করতে পারেন। বিশ্বাস করা হয়, দেব দীপাবলির দিনে প্রদোষ কালের সময় — অর্থাৎ বিকেল ৫টা ১৫ থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটের মধ্যে — প্রদীপ জ্বালালে বিশেষ শুভ।
দীপাবলির তাৎপর্য হল মন থেকে অন্ধকার ও অজ্ঞানতা দূর করে কল্যাণে ভরে দেওয়া। প্রার্থনা করি, এই উৎসবের আলো সকল অন্ধকার দূর করে, আনন্দ ও সমৃদ্ধিতে আলোকিত করুক আপনার জীবন। শুভ দেব দীপাবলি!