কর্মসূত্রে পুত্রকে দিল্লি যেতে হয়েছিল এক মাসের জন্য। মাসের মাঝে পড়ে গেছিল ছেলের জন্মদিন। তাই কটা দিনের জন্য কর্তাগিন্নি মিলে পোঁটলা বেঁধে পৌঁছে গেলাম রাজধানী চড়ে ভারতের রাজধানীতে।
দিল্লিকে প্রাচীনকালে ইন্দ্রপ্রস্থ বলা হতো, যার উল্লেখ মহাভারতে পাওয়া যায়। দিল্লি বিভিন্ন সময়ে রাজপুত, সুলতান, মুঘল এবং ব্রিটিশদের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল। ফলতঃ এই স্থানের সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে স্থানীয় এবং বিদেশী উভয় দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দিল্লি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হল অক্টোবর থেকে নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ। এই ঋতুতে আবহাওয়া মনোরম থাকে, বাকি মাসগুলিতে দিল্লিতে হয় খুব গরম বা খুব ঠান্ডা আবহাওয়া থাকে। তাই হাতে সময় ও সুযোগ থাকলে ঘুরে আসুন দিল্লি।
যাইহোক, দিল্লিতে আসার আগে আমাদের ‘বঙ্গভবনে’ বুকিং ছিল। দিল্লি স্টেশন থেকে মাত্র ২.৯ কিলোমিটার দূরে বঙ্গভবন। অটোতে আপনার থেকে দেড়শ টাকা নেবে আর ফেরার সময় ১০০ টাকা। মেট্রো করেও আসতে পারবেন।
দিল্লিতে রাজ্য সরকারের দু-টি আলাদা অতিথি নিবাস রয়েছে। তার মধ্যে একটি রয়েছে ৩ নম্বর হেইলি রোডে আর একটি রয়েছে দিল্লির চাণক্যপুরীর ২ নম্বর উমাশঙ্কর দীক্ষিত মার্গে। আমরা ছিলাম হেইলি রোডে। আমি এর আগেও বঙ্গভবনে এসেছি কিন্তু আজকের বঙ্গভবনের সঙ্গে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি সঙ্গে নিয়ে নতুন করে সেজেছে দিল্লির বুকে নিট আন্ড ক্লিন এই এক টুকরো বাংলা। গেট দিয়ে ঢুকতেই দুধারে সাজানো বাগানের সামনেই রয়েছে বাংলার শাড়ির শোরুম। দোতলায় আছে একটা লাইব্রেরিও। বাংলা সমস্ত পুজো এখানে পালন করা হয়। যেহেতু বিশ্বকর্মা পূজার সময় গেছিলাম তাই এই পুজোর আনন্দ সম্পূর্ণভাবে নিতে পেরেছি।

এখানে ফাস্ট ফ্লোরে আপনি পেয়ে যাবেন বিজলী গ্রিল পরিচালিত শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁ। বিজলীগ্রিল এমন একটি ক্যাটারার যা বাঙালির সুস্বাদু খাবারের জন্য খুবই জনপ্রিয়। ফিশ ফ্রাই, ফিশ কবিরাজি, ফিশ ফিঙ্গার উইথ কাসুন্দি থেকে শুরু করে কষা মাংস, লুচি, ভেটকি পাতুরি, ডাব চিংড়ি, মিষ্টি দই, রসগোল্লা সবকিছুই পাবেন এক ছাদের তলায়। খাবারের দাম এখানে আবাসিকদের জন্য বেশ সস্তা কিন্তু বাইরে থেকে এসে খেলে কিছুটা এক্সপেন্সিভ।
দিল্লি এসেছি ঘুরতে না গেলে হয়। বঙ্গভবন থেকে ১০ মিনিট হাঁটা পথে প্রথমে আমরা গেলাম বাস্তবের ক্ষুধিত পাষাণকে চাক্ষুষ করতে — ‘অগ্রসেন কি বাওলি’। মহারাজ অগ্রসেন ছিলেন রামের পরে ৩৫তম প্রজন্মে জন্মগ্রহণকারী রামের পুত্র কুশের বংশধর তিনি। অগ্রসেন ছিলেন বণিক নগরী আগরোহার রাজা, শান্তির দূত এবং হিংসার ঘোর বিরোধী। তাঁর সময়ে যজ্ঞে পশু বলিও নিষিদ্ধ ছিল। তাঁর মহানুভবতার জন্য ১৯৭৬ সালে ভারত সরকার একটি ডাকটিকিটও জারি করেন।

এমনিতেই দিল্লিকে বলা হয় ‘জিনের শহর’, তাই রাজধানীতে এমন ঐতিহাসিক স্থাপত্য থাকবে তা বলা বাহুল্য। কিছু লোক এই স্থানটিকে ভুতুড়ে বলে মনে করে বিশেষ করে সূর্যাস্তের পর এখানে নাকি অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে বলে শোনা যায়।
বাওলি শব্দের অর্থ ‘ধাপকুয়ো’। মহারাজা অগ্রসেন প্রজাদের জলকষ্ট দূর করতে ১০৮ ধাপ বিশিষ্ট এই কুয়াটি তৈরি করেন। ঋতু অনুযায়ী নাকি কুয়োর জন্মস্থর ওঠানামা করত এবং সেই অনুসারে জল তুলে নিয়ে আসতে হতো। বর্তমানে ধাপ ধরে নিচে গেলেও জলের শব্দ আর শোনা যায়না। স্থানীয় লোক কাহিনী বলে, বাওলির এই কালো জল এক সময় সম্মোহন করতো সাধারণ মানুষকে আর সেই ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই নাকি মৃত্যুকে বরণ করেছে। তাদেরই অশরীরী আত্মা এখনো ঘুরে বেড়ায়। যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ এর স্বপক্ষে নেই।
বহু মতানৈক্যের মাঝে সবই ওই ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ ব্যাপার। ‘পিকে’, সুলতান, কাভি আলবিদা না কেহেনা এর মতো ছবির শুটিংয়ের পরে এই স্থান আরও বেশি এগিয়ে এসেছে জনপ্রিয়তার নিরিখে। ইয়ং জেনারেশনের কাছে এটা হল সেলফি পয়েন্ট।
গল্প যাই বলুক না কেন, দৈর্ঘ্যে ৬০ মিটার এবং প্রস্থে ১৫ মিটার লালবেলে পাথরের তৈরি এই জায়গাটি ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে রয়েছে। এর অনন্য নকশা এবং প্রাচীনত্ব আপনাকে আকর্ষণ করবেই। সকাল ন’টা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দর্শনাথীদের জন্য খোলা থাকে অগ্রসেন কি বাওলির দরজা। এন্ট্রি ফি নেই।
এখান থেকে বেরিয়ে একটা অটো নিয়ে আমরা চলে গেলাম মধ্য দিল্লিতে অবস্থিত ইন্ডিয়া গেটে। ইন্ডিয়া গেটের অবস্থান নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৫ কিমি, পুরানো দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন প্রায় ১১ কিমি দূরে আর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আনুমানিক ১৫ কিমি দূরে। এছাড়াও আপনি মেট্রো, বাস, অটোরিকশা বা যেকোনো ক্যাব পরিষেবা নিতে পারেন। নিকটতম মেট্রো স্টেশন কেন্দ্রীয় সচিবালয়।

দিল্লির অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান হলো ইন্ডিয়া গেট, ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। প্যারিসের আর্ক দে ত্রিম্ফের আদলে এই সৌধটির নকশা করেন স্যার এডউইন লুটিয়েনস। আগে এর নাম ছিল “অল ইন্ডিয়া ওয়ার মনুমেন্ট” বা অখিল ভারতীয় যুদ্ধ স্মারক। ১৯২১ সালে স্যার ডিউক অফ কনট এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় দশ বছর পর ১৯৩১ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইন প্রায় ৪২ মিটার উঁচু স্মৃতিস্তম্ভটি ভারতের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
এই ঐতিহাসিক গেটের দেওয়ালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহসী সৈন্যের নাম খোদাই করা আছে। গেটের ভিত্তি ভরতপুরের টেকসই লাল, হলদে, সাদা বেলেপাথর ও গ্র্যানাইট পাথর দিয়ে। এটি একটি নিম্ন ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং তারপরে স্তরে স্তরে উঠে গেছে। এই স্মৃতিস্তম্ভের শীর্ষে একটি অগভীর গম্বুজ আকৃতির বাটি রয়েছে। বিশেষ অনুষ্ঠানে, এই বাটিতে জ্বলন্ত তেলে ভরা হয়।
কাঠামোর শীর্ষে ভারত (INDIA) শব্দটি লেখা আছে এবং দুধারে রাজকীয় সূর্য খোদাই করা আছে। স্মৃতিসৌধে দুটি রোমান সংখ্যায় তারিখের পাশাপাশি বাম দিকে MCMXIV (১৯১৪) অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ডানদিকে MCMXIX (১৯১৯) ইঙ্গ আপনার যুদ্ধের সাল খোদাই করা রয়েছে।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ১২৫ তম জন্মবার্ষিকীর ঠিক দু-দিন আগে ২০২২ সালে ২১ শে জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেন যে ইন্ডিয়া গেটের ছাউনিতে সুভাষ চন্দ্র বসুর একটি মূর্তি স্থাপন করা হবে এবং ২৩ জানুয়ারী পরাক্রম দিবস হিসেবে পালিত হবে।
৮ সেপ্টেম্বর ২০২২-এ সুভাষচন্দ্র বসুর ২৮ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট প্রস্থের একটি ৩D হলোগ্রাফিক নবনির্মিত মূর্তি উদ্বোধন করা হয়।
এখানে পর্যটকরা ৩.৯০ লক্ষ বর্গ মিটার জুড়ে বিস্তৃত নয়নাভিরাম প্রচুর সবুজের দৃশ্যও উপভোগ করবেন। শহীদদের রক্তে রাঙা এই স্মৃতিসৌধ দেখতে এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অবশ্যই ঘুরে আসুন ইন্ডিয়া গেট।

ইন্ডিয়া গেটের পাদদেশে আগে ছিলো অমর জওয়ান জ্যোতি। এই শিখাটি ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শহীদ ভারতীয় সৈনিকদের স্মরণে উৎসর্গীকৃত। এই স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেছিলেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৬ জানুয়ারী, ১৯৭২ সালে। উল্টো করে বসানো রাইফেলের মাথায় সেনাবাহিনী পরিহিত হেলমেট বসানো হয় একটি স্তম্ভের উপর। তার পাশে রাখা হয় আগুনের শিখা। সেই থেকে বিগত ৫০ বছর ধরে ওই শিখা বহ্নিমান ছিলো, সচক্ষে যা দেখতে ভিড় করতেন দেশ-বিদেশের মানুষ।
অমর জওয়ান জ্যোতি ২১ জানুয়ারি, ২০২২ সালে ইন্ডিয়া গেট থেকে সরিয়ে জাতীয় যুদ্ধ স্মারকের (National War Memorial) কেন্দ্রীয় স্তম্ভে স্থানান্তর করা হয়েছে, যেখানে এটি এখন অন্যান্য শহীদদের শিখার সাথে মিলিত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে যে সেনা-জওয়ানেরা দেশ রক্ষায় জীবন দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতিতেই ৪০ একর জমিতে তৈরি হয়েছে এই যুদ্ধ-স্মারক। চারটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত বা চক্রের আকারে বানানো হয়েছে এর দেওয়াল, আকাশ থেকে যা অনেকটা চক্রব্যূহের মতো দেখাবে। চক্র চারটির নাম হল, অমর চক্র, বীরতা চক্র, ত্যাগ চক্র এবং রক্ষক চক্র। চক্রের দেওয়ালগুলিতে লেখা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৪২ জন নিহত সেনার নাম।
ভারতের ইতিহাসে যে সব লড়াই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, সেগুলির মুর্যালও থাকছে দেওয়ালে। সবচেয়ে ছোট চক্রটি অর্থাৎ অমর চক্রের মাঝে রয়েছে স্তম্ভ। শহিদ সেনানীদের স্মৃতিতে অগ্নিশিখা জ্বলছে এখানে। আর তাতেই এ বার মিশে গেছে ‘অমর জওয়ান জ্যোতি’।
চলবে….
বেশ বেশ হয়েছে লেখাটি। খুব সুন্দর হয়েছে।
থ্যাঙ্ক ইউ