নগরোন্নয়নের ধাক্কায় ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। আধুনিক নগরোন্নয়ন আর অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিয়েই আহ্লাদিত ও ব্যস্ত প্রশাসন।
সমুদ্রতটের ভাঙন রোধ করতে প্রতিবছর তৈরি হচ্ছে কংক্রিটের বাঁধ। সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রপাড় থেকে চর পর্যন্ত আগাছার মত গজিয়ে ওঠা নিত্য নতুন হোটেল ব্যবসা। সৌন্দর্যায়নের নামে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন আলোয় মুড়ে দেওয়া হচ্ছে সৈকতকে। পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূলের দীঘা, মন্দারমণি, তাজপুর, শৌলা, শঙ্করপুর সর্বত্র ছবিটা একই।

আধুনিকতার ধাক্কায় ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। বিপন্ন বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক জীব। তার মধ্যে অন্যতম অলিভ রিডলে।
সমীক্ষা বলছে, এক সময় প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলে দল বেঁধে আসত অলিভ রিডলে প্রজাতির কচ্ছপ। মূলত সঙ্গম ও ডিম পাড়ার সময়টি এরা দীঘা, শঙ্করপুর, মন্দারমণির উপকূলে কাটিয়ে ফিরে যেত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে অলিভ রিডলে প্রজাতির সংখ্যা কমে গিয়েছে। গতিপথ বদলে অলিভ রিডলের দল এখন প্রতিবেশি রাজ্য ওড়িশার গহিরমাথা, ঋষিকূল্য উপকূলের দিকে চলে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের প্রফেসরও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. পূণ্যশ্লোক ভাদুড়ি এ বিষয়ে এক সমীক্ষা চালিয়ে ছিলেন। সমীক্ষা পত্রে ড. ভাদুরি উল্লেখ করেন, “অলিভ রিডলে প্রজাতির এই গন্তব্য পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূল জুড়ে সুসংহত উপকূল তটাঞ্চল (আই.সি.জেড.এম) গড়ে তোলার নামে অপরিকল্পিত নগরায়ন। সমুদ্রের বাঁধানো পাড় ক্রমাগত জন সমাগম আর সমুদ্রের পাড়ে উজ্জ্বল আলোয় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না অলিভ রিডলের দল। তাই এখন পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলে না এসে গতিপথ বদলে অলিভ রিডলে দলের গতিপথ ওড়িশার ঋষিকূল্য, গহিরমাথা উপকূলে।”

ড. পূন্যশ্লোক ভাদুরির সমীক্ষায় অবশ্য সেই সঙ্গে অভিযোগের আঙুল — যথেচ্ছ অলিভ রিডলে শিকার করার প্রবনতার দিকেও। বাস্তব চিত্রটাও মূলত সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। চলতি বছরেই বন দফতরের কাঁথি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার অতুলপ্রসাদ দে’র নেতৃত্ব বন দফতরের কর্মীরা রামনগর থানার ‘দেউলি বাংলো’ উপকূলে অভিযান চালিয়ে চোরা শিকারিদের আস্তানা থেকে ৪৬টি অলিভ রিডলে উদ্ধার ও আটক করা ছাড়াও একজন চোরা শিকারিকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বতর্মান ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত বন দফতরের কাঁথি রেঞ্জের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে ৮০টি মৃত ও ১৭টি মোট ৯৭টি অলিভ রিডলে উদ্ধার ও আটক করা হয়।

বন দফতরের কাঁথি রেঞ্জের রেঞ্জার অতুল প্রসাদ দে বলেন, “মৃত ৮০টি অলিভ রিডলের মৃতদেহে কোন আঘাতের চিহ্ন না থাকায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ না জানা গেলেও শ্বাসরোধ বা অন্য কোন কারণে মৃত্যু হতে পারে বলে অনুমান। জীবিত ১৭টি অলিভ রিডলেকে বন দফতরের পক্ষ থেকে নৌকায় করে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ফের সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” অতুলবাবুর কথায়, “বনদফতরের পক্ষ থেকে অলিভ রিডলে-সহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী সংরক্ষণের সচেতনতা মূলক প্রচার চালানো হয়। সাধারণ মানুষও আগের থেকে বন্যাপ্রানী সংরক্ষণের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। ফলে প্রকাশ্যে সামুদ্রিক কচ্ছপ শিকার ও সামুদ্রিক কচ্ছপের মাংস বিক্রি প্রায় নব্বই শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে।” পাশাপাশি কাঁথি মহকুমার জলধা ঘাট, জুনপুট, শৌলা, শঙ্করপুর, চেঁওয়াশুলি, দাদনপাত্রবাড় মন্দারমণির আশেপাশের সৈকত এলাকায় একশ্রেণির মানুষ গোপনে এখনও সামুদ্রিক কচ্ছপ শিকার ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত বলে স্বীকার করেছেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা মৎস্যজীবী ফোরামের সম্পাদক ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ তমালতরু দাস মহাপাত্র।

একসময় মহকুমার কাঁথি, খেজুরি, ভগবানপুর, পটাশপুর, এগরা, ভূপতিনগরের বিভিন্ন গ্রামীণ হাটগুলিতে প্রকাশ্যেই কচ্ছপের মাংস দেদার বিক্রি হত। বন দফতর ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সচেতনতা অভিযান চালানোর পর খোলা বাজারে প্রকাশ্যে কচ্ছপের মাংস বিক্রি বন্ধ হলেও গোপনে চোরাপথে কচ্ছপ ধরা ও বিক্রি চলছে বলেও তমালতরু দাসমহাপাত্র জানান। একই অভিমত নিউ জলধা মৎস্যখটির মৎস্যজীবী অশ্বিনী বর, আখতার হোসেন, কমল বর ও প্রশান্ত খামারীর। তাদের দাবি, সমুদ্রে মাছ শিকাররত মৎস্যজীবীদের জালে কচ্ছপ ধরা পড়লে অধিকাংশ মৎস্যজীবী তা পুনরায় সমুদ্রের জলে ছেড়ে দিলেও একশ্রেণির অসাধু মৎস্যজীবী বাড়তি মুনাফার লোভে সে কচ্ছপ গোপনে বিক্রি করে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কিছু মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, রামনগর থানার চেঁওয়াশুলি থেকে মন্দারমণি পর্যন্ত সমুদ্রের পাড়ে প্রায় শ’খানেক হাইব্রিড মাগুর মাছের ভেড়ি রয়েছে। মাগুর মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ভেড়ি মালিকরা সামুদ্রিক কচ্ছপের মাংস হাইব্রিড মাগুরের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেন। কাঁথি মহকুমা খটি মৎস্যজীবী সমিতির সম্পাদক লক্ষ্মীনারাণ জানার অভিযোগ, চোরাশিকারিরা রাতের অন্ধকারে বিস্তীর্ণ উপকূলের ধারের ঝোপঝাড়ের মধ্যেই কচ্ছপ ধরে লুকিয়ে রাখে। পরে সুবিধা মত বিক্রি করে দেয়। এনিয়ে বন দফতরের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের যুক্ত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও ব্যপকভাবে সচেতনতা প্রচার চালানোর উপর আরও বেশি জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন লক্ষ্মীনারাণ জানা।

সামুদ্রিক ও দেশীয় কচ্ছপ-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রানী সংরক্ষণ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ছোটদের মধ্যে সচেতনতা অভিযান চালান খেজুরির স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জোনাকি চ্যারিটেবল ট্রাস্টের কর্ণধার সেক আসমত। বোঝান, পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রে মানুষ, উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণী এই তিনটি স্তম্ভের কোন একটি স্তম্ভের অস্তিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবগুলোর অস্তিত্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্ব সংকটের কিছু প্রাকৃতিক কারণ যেমন আছে, তেমনি বহু কারণে জন্য মানুষই দায়ী।
মানুষের কারণেই আজকের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই পরিবেশ নিয়ে যথেচ্ছ অপব্যবহারের লাগাম টানার ভাবনা ছোটদের মধ্যে ধরিয়ে দিতে পেরেছেন সেক আসমত। সারা বছর ধরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা বনবিভাগ এবং পশ্চিমবঙ্গ বন বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন জায়গায় সেমিনার সচেতনতা শিবির থেকে শুরু করে প্রচার অভিযানে সামিল হচ্ছেন। আনন্দের কথা, জোনাকি ছোট ছোট সদস্যরাও প্রচুর দেশীয় কচ্ছপ উদ্ধার করে বনদপ্তর সহ বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে নিয়ে মুক্ত করছে। প্রথম প্রথম দিকে গ্রাম-গঞ্জে বাজারে কচ্ছপ বিক্রি হত। কিন্তু লাগাতার প্রচার অভিযানের ফলে মানুষেরা এখন আস্তে আস্তে সচেতন হয়ে উঠেছে। এটাই উপকূলীয় ক্ষয়িষ্ণু বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় আশার কথা।