ঊনত্রিশটা বছর অলস সময় কাটিয়ে দেননি নন্দিনী। কাজের ফাঁকে চোখে ধরা পড়েছে প্রকৃতির রূপ, রস ও গন্ধ। আর সেই সঙ্গে প্রাচীন আদিবাসীদের জীবনশৈলী। যা দিনের দিন ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে না জানা অনেক কথা। আর সেই ডায়েরির পাতাগুলো আজ সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে বই আকারে প্রকাশ পেল। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনার আগের দিন শুভক্ষণে বিশ্বের বৃহত্তম কলকাতা বইমেলায় গুণীজনদের উপস্থিতিতে বিশিষ্ট লেখিকা নন্দিনী অধিকারীর ‘ছত্তীশগড়ের ছত্তীশকথা’ বইটির আত্মপ্রকাশ হল।

প্রসঙ্গত, বইটির সাতটি অধ্যায়ের প্রতিটি পাতায় পরতে পরতে রোমহর্ষক বর্ণনা ও ঘটনা পাঠক মনকে আবিষ্ট করবে নিঃসন্দেহে। লেখিকার ছত্তীশগড়ের সঙ্গে পরিচয় উৎসবের আঙিনায়। এখানেই লেখিকা নন্দিনী অধিকারী থেমে থাকেননি। এখানকার পুরাণ ও ইতিহাস নিয়ে খুঁজে বেরিয়েছেন। তুলে ধরেছেন আদিবাসীদের চোখের জল। কিম্বা মাতা রামদের কথা। তাছাড়া রয়েছে আরও হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য কাহিনী। বিশিষ্ট লেখিকা প্রতিভা সরকার জানান, ‘আমি যেটা পারিনি, নন্দিনী সেই কাজটা করেছে।’ ছত্তীশগড়ের ছত্রিশকথা’র পাতায় পাতায় মানুষের কথা অকোপট তুলে ধরেছেন লেখিকা। এ যেন লেখিকার ঊনত্রিশ বছরের ছত্তীশগড় বাসের খতিয়ান। ভারতের এই স্বল্পখ্যাত রাজ্যটি শুধুমাত্র বস্তার, চিত্রকোট জলপ্রপাত, দন্ডকারণ্যের উদ্বাস্তু আর সন্ত্রাসবাদের পরিচয়ে পরিচিত হবার নয়। অরণ্য, পাহাড়, নদীনালায় সজ্জিত সে ভূমিতে পৃথিবীর প্রাচীনতম বাসিন্দা আদিবাসীদের বাসস্থান। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস, সুখ-দুঃখের গান এ বইয়ের অন্যতম সম্পদ। সেই অরণ্যঘেরা জীবনের ছবি এ বইতে কখনো কথা, কখনো কাহিনী হয়ে ধরা দিয়েছে। লেখিকা জীবনে যে সুযোগ পেয়েছেন, সেটার উনি পূর্ণ সদব্যবহার করেছেন; পাঠকদের স্বদেশকে জানার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই জানা জনাকীর্ণ শহরের আলো-জ্বলা খুপরি-বাড়িতে হয় না, অট্টালিকাতেও না। কেউ নেশায়, কেউ বা পেশার কারণে কদাচিৎ মুখোমুখি হন সেই হৃদয়-হরণীর! নন্দিনী হয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতাই ধরা আছে তাঁর বইটির প্রত্যেক পৃষ্ঠায়। প্রকৃতিকে এবং মানুষকে জানা যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যাঁর চোখ দিয়ে দেখা, সেই মানুষটির ছবিও।

বইটিতে ছত্তিশগড়ের হাট আর দেহাতি মানুষের বর্ণনা মন ভরে দেয়। এ বইয়ের যেমন চমকপ্রদ শুরু, তেমনি তার শেষ! কী আশ্চর্য মানুষের মন, যার ধমনীতে বইছে পাণ্ডবানী, তাকে কি ঘরসংসার টানে? মারণ-রোগ যেমন লুকিয়ে থাকে দেহ কোষে, তেমনি এই প্রবণতা, সব ছিঁড়েখুঁড়ে সে তার ছাপ রেখেই যাবে। নারী পুরুষ, ধনী নির্ধনের ভেদাভেদ বুঝি এইখানে খাটে না।
রাজ্যের পরিবেশ দপ্তরের আধিকারিক ও বিশিষ্ট লেখক সসীমকুমার বাড়ৈ বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে জানান, নন্দিনী অধিকারীর অভিজ্ঞতার ফসল হল ‘ছত্তীশগড়ের ছত্তীশকথা’ বইটি । পাঠকরা বইটি থেকে অনেক অজানা-অচেনা কাহিনী জেনে ঋদ্ধ হবেন। নন্দিনী যে কাজটা করেছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। লেখিকা নন্দিনী বইটি সম্পর্কে জানান, ‘বেশ ছিলাম আদরে-আব্দারে-প্রশ্রয়ে। মাছের ঝোলভাত খাওয়া মেয়েটার দুনিয়া বদলে গেল কয়লাখনির দেশে এসে। অনভিজ্ঞ ও অপরিণত চোখের সামনে ভারতের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ ক্রমশঃ ভেসে উঠল। সেখানে স্পষ্ট মানুষের তখন পদে পদে হোঁচট আর শেখা। শিখতে শিখতেই পরিণত হয়ে উঠছে। প্রতিদিন দুপুর আডাইটেয় মাইনসের নিয়ম করা ব্লাস্টিংয়ে জগতের মানুষগুলো তাদের অনাবিল হাসি, সহজ-সরল কৌতূহল নিয়ে চমকে উঠছি। কেঁপে উঠছে বাড়িঘর। এরমধ্যে শাল-সেগুন-মহুয়ার ছায়াঘেরা পদ্মকুঁডি নিয়ে দুয়ারে হাজির হয়েছে’।

এইসব আটপৌরে অথচ অভিনব উপলব্ধির দিনলিপি জমা হচ্ছিল মনের খাতায়! পিসিমা (পণি) আক্ষেপ করতেন আমার এই অবাক করা অভিজ্ঞতা খাতা-কলমের সাক্ষাৎ পায়না কেন? মাস তারিখের হিসেব নেই গুটি গুটি একদিন কলম ধরলাম। আমার এ অলিখিত আবেগ গোপনে ছলকে উঠল এখানে সেখানে। অথচ পিসিমা জানলেন না। অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই একটা সময় আমার স্বামী প্রতিমই ছিল আমার লেখার প্রথম পাঠক। অধ্যাপক বাবার কাছে পেয়েছিলাম লেখাপড়া করার আমার ছিটেফোঁটা অভ্যেস। মা ঘেঁটি ধরে আমাকে পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করিয়েছে। গল্প লিখিয়ে আমার দুই ভাসুর (প্রলয় অধিকারী, দীপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য) ইদানিং আমার গল্পের মস্ত বড় সমালোচক। এদের সবার দেখানো পথেই আমার এ অনুগত অনুগমন। এছাড়াও আমার পরম আত্মীয়, বন্ধু, সর্বোপরি প্রিয় পাঠকদের অল্পবিস্তর উৎসাহে আমার লেখালেখি এখনো সচল। তাদের সবার জন্যে আমার লেখার এই প্রথম সংকলিত প্রকাশ।

ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন। প্রান্তিক মানুষদের সুখদুঃখ বেদনা নিয়ে যাঁর লেখালেখি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, সেই আমাদের প্রিয় লেখিকা প্রতিভাদি এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন। তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। প্রচ্ছদ করেছে আমার স্নেহের প্রিয় শিল্পী স্বাতী বিশ্বাস। তার কাজ এবং মানুষটির প্রতিও আমার অগাধ আস্থা। পেজফোর নিউজ পত্রিকার জ্যোতিদাদার (জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়) উদ্যোগে এ গ্রন্থ প্রকাশ। তাঁকেও আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। অনুপমা প্রকাশনীর সৌম্যা আমার সন্তানসমা। সে এই বই মুদ্রণ আর প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাকে আমার ভালোবাসা।
উল্লেখ্য, ২২ জানুয়ারি কলকাতা বইমেলার শুভ উদ্বোধনের দিনটিতে প্রকাশ পাবার সঙ্গে সঙ্গে এটি এখানকার বৈদেশিক (৬০০নং স্টল)-এ বইটি পাওয়া যাবে।