বিহার বিধানসভা নির্বাচনের বুথ ফেরত সমীক্ষার হিসাব মিলে গিয়েছে। বিরোধী ‘মহাগাঁটবন্ধন’কে ভোট যুদ্ধে ধরাশায়ী করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি-জেডিইউ, ভাল ফল করেছে এলজেপি (আরবি) এবং অন্যান্য জোটসঙ্গীরা। প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিল ৭৪-এর বুড়ো নীতীশ আর এবার পেরে ঊঠবেন না, কিন্তু সবার ধারণা ওলট-পালট করে দিয়ে বুড়ো হাড়েও তিনি ভেল্কি দেখিয়ে ছেড়েছেন। ভোটের আগে বিজেপির তরফে ‘চাণক্য’ অমিত শাহ বিহারে ২০০ আসন পেরনোর যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন, এনডিএ ২০২টি আসন ঝুলিতে ভরে সেটা করে দেখিয়েছে। অন্যদিকে ভরাডুবি হয়েছে বিরোধী মহাগঠবন্ধনের, ক্ষমতাসীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট এনডিএ-র অন্যতম বিজেপি ৮৯টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাদের শরিক নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড পেয়েছে ৮৫টি আসন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস গোষ্ঠী) ১৯টি আসন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জিতেন রাম মাঝির হিন্দুস্তানী আওয়াম মোর্চা (সেকুলার) পেয়েছে ৫টি আসন। উল্টোদিকে মহাজোটের ৩৫টি আসনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় জনতা দল ২৫টি, কংগ্রেস ৬টি, সিপিআই (এমএল) লিবারেশন ২টি, সিপিআইএম ও ইন্ডিয়ান ইনক্লুসিভ পার্টি একটি করে আসন জিতেছে।
বিহার ভোটে এনডিএ-র এই বিপুল জয় বা বিজেপির গেরুয়া ঝড় তার কারণ যে ডবল ইঞ্জিন এনডিএ সরকারের বিভিন্ন স্কিমের সুবিধা, বিহারের নিরাপত্তার ‘গ্যারান্টার’ হিসেবে নীতীশ কুমারের ভাবমূর্তি, মহিলা ভোটারদের একচেটিয়া সমর্থন, সেইসঙ্গে দলিত, অ-যাদব সম্প্রদায় এবং পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর জাতির ভোটারদের এক তরফা সমর্থন তা অস্বীকার করার আর জায়গা নেই। মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মতো বিহারেও এনডিএ সরকার মহিলা ও যুবসমাজের জন্য একাধিক প্রত্যক্ষ নগদ সুবিধা প্রকল্প চালু করে। সরকারি এইসব প্রকল্পের মাধ্যমে ভোটারদের হাতে সরাসরি অর্থ দেওয়া হয়। এইসব প্রকল্প ভোটবাক্সে খুবই কার্যকরি হয়েছে। কারণ এই ধরনের ওয়েলফেয়ার স্কিম থেকে ভোটারদের হাতে সরাসরি টাকা আসছে। তবু এবারের ফলাফল আরও ভাল ভাবে বুঝতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতেই হয়। শুরু করা যায় ২০১০ সালের নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে, সে বছর বিহারে নাটকীয়ভাবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছিল। ভোটে এনডিএ জিতেছিল ২০৬টি আসন, এর মধ্যে বিজেপির ছিল ৯১টি আসন আর জেডি (ইউ) ১১৫টি। বিহারের উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে বছর ভোটারদের মন জিতে নিয়েছিল এনডিএ। ২০২৫-এ ৪টি আসন কম কিন্তু মোদী-নীতীশ ‘যুগলবন্দি’-তে এবারও তারই পুনরাবৃত্তি।
নীতীশ কুমার বরাবরই বিহার ভোটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর প্রমাণ তিনি নিজেই। তাই এবার স্লোগান উঠেছে, ‘১০ বার, নীতীশ কুমার’, ‘টাইগার আভি জিন্দা হ্যায়।’ বিরোধী আন্দোলনের মুখ হয়ে ক্ষমতায় আসা নীতীশ কুমার একটানা দু’দশক ধরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদে আছেন। নীতীশ কুমার নিজে একাই প্রায় ১৫% ভোট পেয়েছেন। তবু বিহারে এবার এনডিএ-র বিপুল জয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর এনডিএ জোটের অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে রাজনৈতিক মহলের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে আসন জয়ের হার নিয়ে। কারণ সেই হার এতটাই বেশি যে, তা শুধু রাজনৈতিক ভাবে জয়ের থেকেও গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পাশাপাশি বিরোধী শিবিরেরও একটিমাত্র বক্তব্য যে, এই ফলাফল ভোটারদের স্বাভাবিক প্রবাহ নয় কোনোমতে। কি কি কারণে ভোটের এই হারকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রবাহ বলে ব্যাখ্যা করা যায়, এর উত্তর মেলেনি। বরং এই ঘটনা বা ভোটের ফলাফলের পিছনে ভীষণভাবে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কারণ রয়েছে বলেই মনে হয়। ভোটের ঘোষিত ফলাফল জানিয়েছে বিজেপি ১০১টি আসনে লড়েছিল, জিতেছে ৮৯টি। পাশাপাশি একই সংখ্যক আসনে লড়ে জেডিইউ ৮৫টি আসনে জিতেছে। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই সাফল্যের হার এত বেশি হওয়ায় শুধু অবাক নয় অনেক প্রশ্ন এসে পড়ে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সরাসরি প্রশ্ন না করে আগের দশকের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন। যখন এনডিএ যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল, কিন্তু ভোটে কখনও এমন সাফল্যের হার দেখা যায়নি। তাহলে কি এবারের ভোটে জনসমর্থন ছাড়াও অন্য কোনো পরিস্থিতি যা অবশ্যই বিশেষ তার বড় ভূমিকা ছিল, যা এবারের ভোটকে প্রভাবিত করেছে।
তাছাড়াও বিহারের এবারের ভোট ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন ফলাফল প্রকাশের পড় এসেই পড়ছে। প্রথমত, ভোটের অল্প দিন আগে ভোটার তালিকা বিশেষ পুনর্গঠনে এমন কিছু পরিবর্তন হয়েছে, তা কি স্বাভাবিক? অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় যাদের নাম-ধামের হদিশ পাওয়া যায়নি নয় তারা সংখ্যালঘু অথবা অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল। কিন্তু সরকার বা নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ মানে না। তাতেও কিন্তু ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর যে ভাবে বহু কেন্দ্রে বিরোধীরা পরাজিত তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এনডিএ-র এই বিপুল জয় বা বিরোধীদের হারে কেবল বিতর্ক দেখছেন না, মনে করছেন এটা এনডিএ-র অনেককালের পরিকল্পিত সাংগঠনিক কৌশল। কারণ যে রাজ্যের অধিকাংশ ভোটে বহুস্তরের লড়াই এবং সামাজিক বিভাজন বড় ভূমিকা নেয়, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক আসন দখল সত্যিই কি শুধু জনসমর্থনের প্রতিফলন? নাকি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু ঘটেছে, যার প্রভাব ভোটবাক্সে পড়েছে?