ভোজশালা নামটি শুনেই মনে হয় যেন একটি অভিজাত ভোজনালয়। যেখানে ছাপ্পান্ন ভোগের বাটি সাজানো রাজসিক ভোজনের আয়োজন ।
জানিনা, এই নামের কোনো রেস্টুরেন্ট খ্যাতনামা হয়েছে কিনা, আদতে ভোজশালা কিন্তু মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য কীর্তি। যাকে ঘিরে ঐক্য এবং বিবাদ হাত ধরাধরি করে চলে।
মূল ভবনটিতে পৌঁছতে গেলে একটি ছোটো মাঠ পেরিয়ে যেতে হয়। সকাল বেলা সেই মাঠটিতে দু-তিনটে হৃষ্টপুষ্ট গোরু বর্ষায় গজিয়ে ওঠা নরম, সবুজ ঘাস দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারছিল। আমাকে দেখে তাদের ভাবখানা এমন ছিল যে মনে হল বলছে, কে হে তুমি, সকালবেলা আমাদের ঘাসের কাঁটা হয়ে এলে! যাই হোক, তারা খুঁটিতে বাঁধা ছিল বলে আমি নির্ভয়ে তাদের রোষকষায়িত দৃষ্টি এড়িয়ে ভেতরে যেতে পারলাম।

নামাজের জন্য কালো পাথরের মিম্বর।
মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীশগঢ়ের গাঁগঞ্জের আনাচ কানাচ দিয়ে যতবার যাওয়া আসা করেছি, দেখেছি সেখানে গোরুমোষের রমরমা। বাড়ির সামনে খাটাল আর খাটিয়া। এ ছবির কুড়ি তিরিশ বছরেও বিশেষ পরিবর্তন হয়নি।
যাই হোক এই গোবলয় পেরিয়ে ভোজশালার ভেতরে ঢুকতেই আমার চমৎকৃত হবার পালা। এটি একটি অসাধারণ কারুকার্য মন্ডিত স্থাপত্য শিল্প।

মন্দিরের ছাদ।
পরমার বংশের বিখ্যাত শাসক ও শিক্ষানুরাগী রাজা ভোজ (১০০০–১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) এখানে একটি শিক্ষা কেন্দ্র বা মহাবিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন। সে সময়টায় মালবের মালভূমিতে রাজত্ব করছে পরমার রাজবংশ। ধার সেই রাজত্বের রাজধানী। রাজা ভোজ পরমার রাজবংশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ইতিহাস বলছে একাদশ শতাব্দীতে রাজা ভোজের আমলে ভোজশালা মূলত এক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি স্বয়ং, সাহিত্য এবং সংস্কৃত ভাষার এক মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। রাজা ভোজের রচনাগুলি — যেমন “সরস্বতীকান্তাভরণ”, “শৃঙ্গারপ্রকাশ” আজও সাহিত্যবিশ্বে মূল্যবান রত্ন। ভোজশালায় সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাদান করা হত। সাহিত্য, ধর্ম, যোগ, স্থাপত্যবিদ্যা চর্চার অন্যতম কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল মধ্যভারতের এই প্রাচীন শহরটি। ভোজশালার বিভিন্ন অংশে ১১–১২শ শতকের সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় শাস্ত্রীয় লিপি ও স্তম্ভশিল্প সংরক্ষিত রয়েছে। বিষ্ণুর কুম্ভঅবতার বা ‘কুম্ভমঞ্জরি’ নিয়ে প্রাকৃত ভাষায় স্তব খোদিত হয়েছে।

ASI কর্তৃক সপ্তাহের প্রতিটি দিনের জন্য স্পষ্ট প্রার্থনার নির্দেশাবলী।
মালব মালভূমিতে রাজা ভোজের স্বর্ণিম সময়ের একদিন অবসান হয়। পরমার রাজবংশ এবং রাজধানী ধার তার কৌলীন্য হারাতে থাকে। ১৩০৫ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুরকে মধ্য ভারত জয় করতে পাঠান। এই অভিযানের সময় পরমার রাজবংশের শেষ স্বাধীন রাজা মাহলক দেব পরাজিত হন এবং তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর ধার অঞ্চলে দিল্লির সুলতান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরমার রাজবংশের শতাব্দীপ্রাচীন শাসনের অবসান ঘটে।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন খলজি কর্তৃক ১৪০৫ সালের আশপাশে ধারের ভোজশালায় নির্মিত হয় কামাল মৌলা মসজিদ। সুলতানি আমলের পরে দিল্লির মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে মালব মালভূমি। হয়তো তখনো পর্যন্ত ভোজ শালায় কোনো বিবাদের রঙ লাগেনি। ইংরেজদের বিভাজন নীতির সূত্র ধরেই ধারের ভোজশালা একটি বিতর্কিত স্থানে পরিণত হল। তাতে রাজনীতির রঙ লাগলো ।

ধর দুর্গ।
১৮৭৫ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যের সময় এখানে একটি দেবী সরস্বতীর মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। সেইসময় ভারতে বৃটিশ সরকারের কল্যাণে আমাদের বিদ্যাদায়িনী ইংরেজদের আশীর্বাদ দিতে পাড়ি দিলেন লন্ডনে। সেইথেকে আজ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়াম লন্ডনের শোভা বর্ধন করছেন।
ভোজশালা এখন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (ASI) অধীনে সংরক্ষিত একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান। ভোজশালায় ভিতরে ঢুকতেই দেখি পাশাপাশি একটি পূজাবেদী এবং ইমামের বসার জন্যে একটি উচ্চ স্থান। বিবাদ এড়াতে মহামান্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন মঙ্গলবার হিন্দুরা সেখানে দেবী সরস্বতী এবং গণপতির আরাধনা করবেন। জুম্মাবারে নমাজ আদা করবেন ইসলামধর্মীরা।

কমল মৌলা মসজিদ (ধর)
নিরাপত্তা রক্ষীকে বললাম, তাহলে তো আর সমস্যাই নেই। দুই পক্ষই শান্তিতে ঈশ্বরের আরাধনা করবেন। রক্ষীটির হাসিতে রহস্য ছিল। তিনি বললেন, এমনি তে সব ঠিক আছে। তবে ক্যালেন্ডারে বসন্ত-পঞ্চমীতে শুক্রবার, ঈদের দিনে মঙ্গলবার পড়লেই আমাদের সতর্ক থাকতে হয়!