আগামী বছর এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন, তার আগেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে তরজা তুঙ্গে উঠেছে। যা কেবল এ রাজ্যে নয়, গোটা দেশে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় বিহারে প্রায় ৬৫ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। যদিও সংবিধান মোতাবেক দেশের ভোটার তালিকায় একই নামের ভোটার দু’জায়গায় আছেন কি না, অথবা যে ভোটার মারা গিয়েছেন তার নাম তালিকায় রয়ে গিয়েছে কি না অর্থাৎ কোনো ভুঁয়ো ভোটার আছে কি না তা সংশোধন করে একটি নির্ভুল ও সংশোধিত ভোটার তালিকা তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের কাজ। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের কাজ হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা এবং প্রত্যেক মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু নাগরিকত্ব যাচাইয়ে তাদের কোনও এক্তিয়ার নেই, এই কাজ সম্পূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের। নির্বাচন কমিশন কোনও অবস্থাতেই নাগরিকত্ব সংশোধনের কাজ করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের সব বিরোধী দল থেকে শুরু করে বাংলার শাসকদল, বিভিন্ন নাগরিক অধিকার রক্ষা সংগঠন, বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, কেন্দ্র আসলে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব সংশোধন (সিএএ)-এর প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বারবার দাবি করেছে যে, স্বচ্ছতার সঙ্গে এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ হবে। কিন্তু তা কি আদতে বিহারে হয়েছে কিংবা বাংলাতে হবে?
এবার বুঝতে চেষ্টা করবো এ রাজ্যেও কেন এসআইআর। বাংলায় ভোটার তালিকা খুটিয়ে সংশোধন প্রথম নয়, তাহলে এবার বিতর্ক কেন? কারণ যেভাবে সাধারণত ভোটার তালিকা এতদিন ধরে সংশোধন হয়েছে, এবার কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেই প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি অর্থাৎ চালু ভোটার তালিকায় যাদের নাম আছে, তাঁরা বেঁচে আছে কিনা এবং যে ঠিকানার উল্লেখ আছে ভোটার সেই ঠিকানাতেই থাকেন কি না এইসব খুঁটিয়ে দেখা হত। যদি ভোটার বেঁচে থাকেন এবং তালিকায় উল্লেখিত ঠিকানায় বাস করেন তাহলে তাঁর নাম নতুন ভোটার তালিকাতে থেকে যেত। এমন পদ্ধতি যে যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ যার নাম ভোটার তালিকায় আছে, তিনি প্রমাণপত্র দিয়েই ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম আছে অথচ তিনি সেখানে থাকেন না, অথবা কারও নাম দু’জায়গায় রয়েছে তাহলে সেই নাম নতুন তালিকা থেকে বাদ যেত। ২০০২ সালে এইভাবে পশ্চিমবঙ্গের ২৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল। কিন্তু তখন কোনো হইচই হয়নি। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে বাংলায় যে দুটি তালিকা (২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ও ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারির ভোটার তালিকা) নিয়ে এসআইআর হবে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম নেই, তাদেরকে দেখাতে হবে যে তার বাবা বা মার নাম ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় আছে, তবেী তাঁদের নাম নতুন ভোটার তালিকায় থাকবে। অন্যদিকে এখন আপনি যেখানে থাকেন সেখানে আপনার বাবা মা হয়তো ২০০২ সালে সেখানে থাকতেন না, তাহলে আপনাকে বাবা-মার ২০০২ সালের বাসস্থানের ঠিকানায় গিয়ে ২০০২ সালের ভোটার তালিকা দেখতে হবে। প্রশ্ন, ১৯৮৪ সালে যার জন্ম, তার এখন বয়স ৪১, ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ভোটার তালিকায় তার নাম থাকা কী সম্ভব?
উল্লেখ্য, অটল বিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এনে বলেছিল যে ১৯৮৭ সালের পর যারা এদেশে জন্মেছে তারা সরাসরি দেশের নাগরিক নয়। তাঁদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের মা বা বাবা, কেউ একজন এদেশের নাগরিক ছিল। এখন নির্বাচন কমিশন বলছে যে ১৯৮৪ সাল বা তার পরে যারা জন্মেছেন, তাঁরা ভোটার কিনা তা তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের বাবা বা মা ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গের কোথাও ভোটার ছিল। এটা আসলে ২০০৩ সালের আইন অনুসারে নাগরিকত্ব প্রমাণের চেষ্টা। তার মানে ঘুরিয়ে ন্যাশানাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস বা এনআরসি। বাংলায় ২০০২ সালের এসআইআর-এ ভোটার ছিল ৪ কোটি ৯৬ লক্ষ, ২০১১ সালে হয় ৫ কোটি ৬২ লক্ষ আর ২০২৫ সালে হয়েছে ৭ কোটি ৬৩ লক্ষে। ২০০২ সালের হিসাবের ভিত্তিতে ২০২৫ সালে হওয়া উচিত ৬ কোটি ৮২ লক্ষ। কিন্তু তালিকায় দেখা যাচ্ছে ৮১ লক্ষ বেশি। প্রশ্ন এরা কারা? সহজ উত্তর যারা মারা গিয়েছেন তাদের অনেকের নাম রয়েছে, কেউ এক জায়গা অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার পর দু’জায়াগাতে নাম উঠেছে। তার মানে ভোটের সময় এই নামগুলি বা ভোটগুলি কাজে লাগানো হয়েছে। একের বেশি জায়গায় যাদের নাম আছে, তারা তো কাগজপত্র দেখিয়েই নাম তুলেছে। যদি তাদের বা তাদের বাবা-মার নাম ২০০২ সালের তালিকায় থাকে তাহলে একাধিক জায়গায় তাঁদের নাম থাকলেও কীভাবে বাদ পড়বে? এসআইআর-এর নিয়ম কী বলছে? বিরোধীরা বলছে বাড়তি ভোটার হল বাংলাদেশের মুসলমান অনুপ্রবেশকারী।
বেশ তাদের কথা মতো মুসলমান নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল, মুসলিম বিদ্বেষও ছড়ানো গেল। সেই ঘৃণা ও বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করাই তো আসল উদ্দেশ্য? নরেন্দ্র মোদী সহ সমস্ত বিজেপি নেতা বলেন মুসলমানদের চারটি বিয়ে আর অগুনতি বাচ্চার জন্যই জনসংখ্যা বেশি। কিন্তু দিল্লিতে দৈনিক জাগরণ পত্রিকার আলোচনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বললেন, বেশি বাচ্চা হওয়ার জন্য নয়, এ দেশে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ার কারণ — অনুপ্রবেশ। এবার তাহলে দেখতে হয় কি হারে মুসলিম এবং অনুপ্রবেশ বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০১১, সারা দেশে মুসলিম সংখ্যা বেড়েছে ২৪.৬ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে ২১.৮ আর অনুপ্রবেশে তা হয়নি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ীই, অনুপ্রবেশে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বেশি ভোটার বাড়ার কথা। কিন্তু সেখানে বাড়েনি। তাহলে? গরিব মানুষ সে হিন্দু, মুসলমান, তফসিলি, আদিবাসী, যাদের কাগজ গুছিয়ে রাখার জায়গাই নেই, তারা পুরানো কাগজ দেখাতে পারবে না তাই তাঁদের নাম বাদ যাবে। যেমন বিহারে ৬৫ লক্ষ লোকের নাম বাদ গিয়েছে, তার মধ্যে কতজন অনুপ্রবেশকারী, নির্বাচন কমিশন বা সরকার বলতে পারবে?
তবে হ্যাঁ, যে সকল ব্যক্তি ২০০২ ভোটার তালিকার সাথে নিজের কোন রূপ সম্পর্ক দেখাতে পারবেন না, তারা যদি Enumeration Form Submit করে তাহলে তাদের নাম ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত Draft Voter List-এ থাকবে। তবে পরবর্তীতে তাদের হিয়ারিং-এ উপস্থিত থাকতে হবে সেই সময় উল্লেখিত সব Documents দিতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে পরে Final Voter List-এ তাদের নাম থাকবে। [Point 2 (e) of Order No.23/2025-ERS(Vol. II) Dated 27.10.2025]