গত পর্বে স্বর্ণযুগের বাংলা গানের অগ্রহায়ণ জাতক গীতিকারদের মধ্যে শ্রদ্ধেয় প্রণব রায় ও শ্যামল গুপ্তের কথা আলোচনা করেছিলাম। এই পর্বে আরও দুজন অগ্রহায়ণ জাতক গীতিকারের কথা শোনাব। এঁরা হলেন শ্রদ্ধেয় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার : বাংলা আধুনিক গানের জগতে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা নাম। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা ছায়াছবি ও আধুনিক গানের জগৎকে যাঁরা উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত করে রেখেছিলেন, গৌরীপ্রসন্ন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। গীত রচনায় তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য শব্দচয়নে। যেমন ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি’, ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’, ‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার এই তোমাদের পৃথিবী’। তাঁর রচিত মান্না দে’র কন্ঠে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি ২০০৪ সালে বিবিসির বিচারে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের অন্যতম হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিল।
১৯২৫ সালের ৫ই ডিসেম্বর (২০শে অগ্রহায়ণ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ রবিবার) বাংলাদেশের পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল বাচ্চু। তাঁর পিতা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন।
শচীনদেব বর্মণ একদিন তাঁকে ডেকে বললেন যে এখনই একটা গান লিখতে হবে। গৌরীপ্রসন্ন শচীন কর্তাকে লিখে দিলেন ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তাঁর লেখা ‘বঁধু গো এই মধুমাস’ গানটিতে শচীন দেব বর্মণ নিজে সুর দিয়ে প্রথম রেকর্ড করেন। রেকর্ডে গান বেরোনোর পর গৌরীপ্রসন্ন জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখা শুরু করেন। একে একে অগ্নিপরীক্ষা, পথে হল দেরী, হারানো সুর, সপ্তপদী, মরুতীর্থ হিংলাজ, দেয়া নেয়া, আ্যন্টনি ফিরিঙ্গী ইত্যাদি আরও অনেক সিনেমায় তাঁর লেখা গান জনপ্রিয় হয়।

শৈশবেই তিনি কলকাতা চলে এসেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার পাবনা ফিরে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ পাশ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান অসামান্য। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের পাবনার জায়গায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর লেখা বিখ্যাত গান ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে… বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডেকে বাংলাদেশে নিয়ে গেছিলেন। তাঁর বিশাল সম্পত্তি ওখানকার মানুষ দখল করেছিলেন। উনি সম্পত্তি উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করেন নি। নিজের জন্মভূমির মানুষ ভালো থাক এটাই চেয়ে কলকাতা ফিরে আসেন। ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে “মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা” প্রদান করে।
১৯৮৩ সালে গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আশা ভোঁসলের জন্য প্রচুর প্রেমের গান লিখে চলেছেন আর সমস্ত গানই সাংঘাতিক হিট। পুজোর গান অন্য কারো জন্য লেখার সময় পাচ্ছেন না, এমনকি মান্না দে’র জন্যও লিখছেন না। মান্না দে’র গান তখন লিখছেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ নিয়ে গৌরীপ্রসন্নর মনেও আক্ষেপ ছিল।
সেই সময়ের সেরা জুটি ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন ও নচিকেতা ঘোষ। নচিকেতা ঘোষের পুত্র সুপর্ণকান্তির সঙ্গেও তাঁর সুন্দর সম্পর্ক ছিল। একবার সুপর্ণকান্তিকে অনেকক্ষণ পরে দেখতে পেয়ে গৌরীপ্রসন্ন বললেন, “কী বাইরে আড্ডা মেরে সময় কাটাচ্ছি?” এর উত্তরে সুপর্ণ বললেন, “কী সব গদগদ প্রেমের গান লিখছ। একটা অন্যরকম গান লিখে দেখাও না। এই আড্ডা নিয়েও তো গান লিখতে পারো।” গৌরীপ্রসন্ন বললেন, “তুমি তো অক্সফোর্ডের এম. এ। আড্ডা নিয়ে বাংলা গান গাইবে?” সুপর্ণ বললেন, “কেন নয়। কফি হাউসের আড্ডা নিয়েও তো একটা গান লিখতে পারো।” এই তর্কের মধ্যেই গৌরীপ্রসন্ন মনে মনে দুটি লাইন লিখে ফেললেন। তৈরি হল এক কালজয়ী গান-কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই /আজ আর নেই /কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই। সুপর্ণকান্তি তখনই সুর দিয়ে শুনিয়ে দেন। শক্তি ঠাকুর সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সুপর্ণকান্তিকে পুজোর জন্য গানটি গাওয়ার অনুরোধ করলেও সুপর্ণকান্তি রাজি হন নি। তিনি ঠিক করে নিয়েছিলেন তখনই এ গান মান্না দে গাইবেন।
তখন গৌরীপ্রসন্ন ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবু সারারাত জেগে গানটি লিখেছেন। শেষ স্তবকটি গৌরীপ্রসন্ন রাখতে চান নি। কিন্তু সুপর্ণকান্তি স্তবকটি যোগ করতে চাইলেন। শেষ পর্যন্ত গৌরীপ্রসন্ন লিখলেন — সেই সাতজন নেই, তবু টেবিলটা আজও আছে। শেষ তিনটি লাইন তিনি লিখেছিলেন চেন্নাইয়ে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার পথে হাওড়া স্টেশনে বসে একটি সিগারেট প্যাকেটের উল্টো দিকে। তারপর মান্না দে এটি রেকর্ড করেন। ইতিহাস তৈরি হয়।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রযোজিত ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে গান লেখার জন্য গৌরীপ্রসন্নকে ডেকেছিলেন। তিনি লিখলেন, ‘ও নদী রে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে। বলো কোথায় তোমার দেশ তোমার নেই কি চলার শেষ?’ চিরকালীন এক সঙ্গীত। লিখেছেন সুচিত্রা সেনের লিপে গীতা দত্তের কন্ঠে সেই কালজয়ী গান ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’। নচিকেতা ঘোষের সুরে নিশিপদ্ম ছবিতে উত্তমকুমারের ঠোঁটে কেউ কি ভুলতে পারে সেই গান,’ না, না, না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না।’ শোনা যায় শুধু এই গানটি রাখার জন্য গল্পেই পরিবর্তন এনেছিলেন পরিচালক স্বয়ং।
মহানায়ক ও মহানায়িকা দুজনেই ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যেকোনো ঘরোয়া গানের আসরে উত্তমকুমার সবসময় ডেকে নিতেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে। সুচিত্রা সেন নিজের কন্ঠে যখন গান রেকর্ড করলেন তখন সেই গান রচনা করেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন। সুর দিয়েছিলেন রবীন চট্টোপাধ্যায়। গান দুটি হল ‘আমার নতুন গানের নিমন্ত্রণে’ ও ‘বনে নয় আজ মনে হয়’। একবার কল্পনা করুন উত্তমকুমার বাইক চালাচ্ছেন, পিছনে বসে সুচিত্রা সেন, আর দুজনে গাইছেন, “এই পথ যদি না শেষ হয়…” কোনও বাঙালি আজও কি না গলা মিলিয়ে থাকতে পারে? এখনকার প্রজন্মের সকলেও জানে এই গান। যে গান যুগের পর যুগ থেকে যায় তার স্রষ্টা তো কালজয়ী হবেনই। ২০শে আগষ্ট ১৯৮৬ মাত্র ষাট বছর বয়সে তিনি অন্য এক সুরের ভুবনে যাত্রা করেন।
জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় : ১৯৩৪ এর ১৩ই ডিসেম্বর (২৮শে অগ্রহায়ণ ১৩৪১ বৃহস্পতিবার) চুঁচুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন গীতিকার, সুরকার ও গায়ক জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। আট ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন তিনি। তাঁর বাড়ি ছিল গানের বাড়ি। দাদারা অনেকেই খুব ভালো গাইতেন। তাঁর গানের অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা অন্নপূর্ণা ও দাদা কপিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, চিন্ময় লাহিড়ী ও সুধীন দাশগুপ্তর কাছে তিনি সঙ্গীতের তালিম নেন। ২০১৩ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত আকাডেমি কতৃক জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ পদকে ভূষিত হন। ‘দামু’ ও ‘নটী বিনোদিনী’ চলচ্চিত্রে সুরারোপ করে তিনি সেরা সঙ্গীত পরিচালকের পুরষ্কার পান।
১৯৩০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কিছু নবীন সংগীতকার ও গীতিকারদের থেকে জন্ম নিল সহজ কথা, মনকাড়া মেলডিতে ভরা সুরে আধুনিক গান। এঁদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ছিলেন যাঁরা নিজেরাই গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গান রেকর্ড করেছেন। এঁদের মধ্যে গিরীন চক্রবর্তী ও ড. যশোদাদুলাল মন্ডলের নাম উল্লেখযোগ্য। এই ধারা বজায় রেখে ১৯৬০এর দশকে এলেন জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। ১৯৯০ এর দশকে আসা নচিকেতা, কবীর সুমনের পূর্বসূরী বলা যেতে পারে যাঁকে। সেই হিসেবে ধরলে ১৯৩০ আর ১৯৯০ এর সঙ্গীতের সেতুবন্ধনকারী সংগীতস্রষ্টা বলে অবশ্যই চিহ্নিত করা যায়।
চুঁচুড়ার বাড়ি গানের বাড়ি। আট ভাইয়ের অনেকেই ভালো গান করতেন। একমাত্র দিদি ঊষা মুখোপাধ্যায় ভালো গাইতেন। গঙ্গার পারে আড্ডা জমত। এই আড্ডায় থাকতেন জটিলেশ্বর। সেখানেও গান হত। এইভাবেই অনুষ্ঠানে ডাক পেতে শুরু করলেন ‘সুদুদা’।

আর এক চুঁচুড়ার ভূমিপুত্র সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হল জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের। সতীনাথ তখন প্রায় আসতেন চুঁচুড়ায়। সেখানে ডাক পেতে লাগলেন জটিলেশ্বর। একদিন সতীনাথের একটি গান জটিলেশ্বর শোনালেন। সেই গান শুনে সতীনাথ তাঁর বন্ধু প্রফুল্ল গুপ্তকে বললেন, “এ ছেলেটি তো নিজের গলা হারিয়ে ফেলছে। বিভিন্ন শিল্পীর গান যখন করছে, তখন তাঁদের মত এক্সপ্রেশন, তাঁদের মত দম নেওয়ার কায়দা নকল করছে।… যাই হোক, আমার মনে হয় ছেলেটি হয়ত গান গাইতে পারবে।”
এই প্রথম গান সম্পর্কে একটা ধারণা জন্ম নিল জটিলেশ্বরের মনে। তার মানে রেকর্ড শুনে একটা গান তুলে ফেলে গাইলেই সেটা গান নয়? তার জন্য অনেক সাধনার প্রয়োজন? তবেই প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়! এইবার শুরু হল সুরের যাত্রা। একটানা দশ বছর সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নিলেন। সুধীন দাশগুপ্ত ও চিন্ময় লাহিড়ীর কাছেও সাধনা করলেন। তবু সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যেই যেন তিনি নিজেকে খুঁজে পেতেন। এই খোঁজই শিল্পীকে একের থেকে অনন্য করে তোলে। গানের মধ্যে নিজস্ব অনুভব না মিশলে তা গান হয়ে ওঠেনা। ক্রমশ আলাদা হয়ে উঠলেন জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।
১৯৬০ এর দশকে রেকর্ড করলেন ‘বঁধূয়া আমার চোখে জল এনেছে, হায় বিনা কারণে’। প্রথম গানই হিট হয়ে গেল। অন্য ধরনের কথা ও সুরের জন্য জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অমিতাভ নাহা, সুরকার অশোক রায়ের মত মানুষের বন্ধুত্ব হয়েছিল। সবথেকে বড় কথা হল জটিলেশ্বরের ভিতরে ছিল শক্তিশালী কবি চেতনা। না হলে এরকম গান কেউ রচনা করতে পারে না। একটা সুন্দর গল্প আছে। জটিলেশ্বর একখানা গান লিখেছেন। তখনও কাকে ওই গান দেবেন সেটা ঠিক হয় নি। এর মধ্যে জটিলেশ্বর, পিন্টু ভট্টাচার্য ও শ্যামল মিত্র গঙ্গার বুকে নৌকাভ্রমণে বেরিয়েছেন। নৌকো যখন মাঝ গঙ্গায়, তখন পিন্টু ভট্টাচার্য জটিলেশ্বরকে বললেন, “এই আকাশ আর গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে তুমি কথা দাও ওই গানটা পুজোয় আমাকেই দেবে।” শ্যামল মিত্র মিটিমিটি হাসছেন। জটিলেশ্বর সম্মত হলেন। গানটি হল “আমি ফুলকে যেদিন ধরেবেঁধে সাজি ভরেছি…”। এমনই সুন্দর সম্পর্ক ছিল তখন এঁদের মধ্যে।
ওঁর লেখা ও সুর করা গানের বৈশিষ্ট্য হল যে মুখরাতেই পুরো গানের ভাব পরিষ্কার হয়ে যায়। যেমন – ‘আমার স্বপন কিনতে পারে এমন আমীর কই/ আমার জলছবিতে রঙ মিলাবে এমন আবীর কই?’ অথবা ‘আমি ফুলকে যেদিন ধরেবেঁধে আমার সাজি ভরেছি/ আমি সেদিন থেকে জেতা বাজি হেরেছি।’ অথবা ‘আমি শিশিরের চোখে চেয়ে থেকে থেকে সাগর দেখতে পাই /তুমি কতটুকু দিলে না দিলে কিছু আসে যায় না যে তাই।’ অসাধারণ এই প্রতিভার মৃত্যু ২১শে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে ৮৩ বছর বয়সে। মৃত্যুটা শুধু দেহের হয়। সুরে সুরে গানে গানে এঁরা রয়েছেন চিরকালের জন্য।