বাঙালি মননে, বাঙালি চেতনায় আধুনিক গান বলতে বোঝায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, গীতা দত্ত, শিপ্রা বসু, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, শ্যামল মিত্র, সুবীর সেন, বনশ্রী সেনগুপ্ত এঁদের কালজয়ী গান। একটু পরবর্তী কালে এসেছেন হৈমন্তী শুক্লা, আরতি মুখোপাধ্যায় এঁরা। পুজোর সময় তখন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে চোঙামুখ মাইকের তীব্র আওয়াজ মুহূর্তে পেলব সুরেলা ঝর্ণার মত ঝরে পড়ত গ্রামে গঞ্জে, মফঃস্বল, শহর ও শহরতলীতে। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলে সেই কোন সুদূর থেকে ভেসে আসত এক একটি গানের কলি “আমি যামিনী তুমি শশী হে ভাতিছ গগন মাঝে” অথবা “এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলো তো!” বৃষ্টি হওয়ার পরবর্তী ভিজে নরম বাতাস বয়ে নিয়ে আসত এই সমস্ত গান অনেক দূরের কোনও এক বিয়ে বাড়ি থেকে। আর সন্ধ্যা নামার আগে কোনো এক আইবুড়ো কালো কুচ্ছিত মেয়ে, যে উঠতে বসতে সংসারে গঞ্জনা সহ্য করে সেও ভেবে নিত এ গান তাকে ঘিরেই কেউ লিখেছে।
১৯৩০-এর দশক। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে দৈনন্দিন সংসারে নিত্য অভাব নিত্যি অনটনের বাধা টপকে টপকে জীবনের জয়যাত্রা। জয়যাত্রা এই কারণেই বলা যে এই নিত্য অভাবের মধ্যেই সৃষ্টির বীজ থেকে চারাগাছের মহীরুহ হয়ে ওঠা তখন খুব সহজ একটা ব্যাপার ছিল যেন। সৃষ্টিসুখের আনন্দে মেতে ওঠা বাঙালির অভাব তখন ছিল না। আর সেজন্যই সেসময় থেকে ১৯৭০ এর দশকের শেষ অবধি জীবনবোধে ভরপুর কালজয়ী সব গানের সৃষ্টি হয়েছে। যে সময় একটা রেডিও কেনার পয়সা ছিল না বেশির ভাগ পরিবারের কর্তার, সেই সব পরিবারের ছেলে মেয়েদের দুপুরবেলার কোনো সামান্য বিত্তবান পরিবারের রেডিও থেকে ভেসে আসা গানের কথা সুর সব মুখস্থ হয়ে যেত। কারণ সেসব গানের সুর এবং কথার সৃষ্টিই হয়েছে মনে থেকে যাবার জন্য, দুদিনে মুছে যাবার জন্য নয়।
কথা এবং সুরের মেলবন্ধনে তৈরি হয় গান। কথা বা কবিতা ভীষণ ভালো কিন্তু সুর সেরকম না হলে গান দাঁড়ায় না, আবার কথা যদি সেরকম না হয়, সুর খুব ভালো হলেও মানুষের মনে সে গান দাগ কাটবে না। সুতরাং কালজয়ী গান হতে গেলে কথা ও সুর দুটোই উৎকর্ষতার শিখরে থাকতে হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে কবি ও গীতিকার এবং সুরকারদের এক স্বর্ণযুগ। গীতিকারদের মধ্যে প্রণব রায়, শ্যামল গুপ্ত, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়- এঁরা চারজনেই অগ্রহায়ণ জাতক।
প্রণব রায় বাংলা গানের স্বর্ণযুগের এক বিখ্যাত কবি ও গীতিকার। প্রণব রায়ের জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯১১ (১৭ই অগ্রহায়ণ ১৩১৮ বৃহস্পতিবার) পরাধীন ভারতে কলকাতার বেহালা বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশে। পিতা দেবকুমার রায়চৌধুরী। প্রণব রায় ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ভাবশিষ্য ছিলেন। কলেজ জীবনে স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ‘বিশ্বদূত’ পত্রিকায় তিনি কবিতা লিখে কারাবাস করেন।
জেল থেকে বের হবার পর তিনি গান লিখতে শুরু করেন। কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শ তো ছিলই। তাঁর রচিত চারটি গান কাজী নজরুলের অনুমোদনে ১৯৩৪ সালে শারদীয়ায় হিজ মাস্টার্স ভয়েস রেকর্ডে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে কমলা ঝরিয়ার কন্ঠে তুলসী দাস লাহিড়ীর সুরে দুটি ভাটিয়ালি গান ‘ও বিদেশী বন্ধু’ এবং ‘যেথায় গেলে গাঙের চরে’ অসাধারণ জনপ্রিয় হয়। তাঁর আরও দুটি গান যূথিকা রায়ের কন্ঠে ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ এবং ‘আমি ভোরের যূথিকা’ সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই গানের পরে শিল্পী এবং গীতিকার দুজনেই খ্যাতি অর্জন করেন। সহজ কথায় অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার অসামান্য ক্ষমতা ছিল প্রণব রায়ের। দীর্ঘ চল্লিশ বছরে তিনি দু-হাজারের বেশি গান লিখেছেন।
বাংলা আধুনিক গানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছায়াছবির জন্যও গান লিখেছেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘পন্ডিত মশাই’ ছায়াছবিতে একটি গান লেখেন যেটি কমল দাশগুপ্ত সুর করেন এবং ভবানী দাস কন্ঠ দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি লেখাতেই জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতি ধরা পড়ে। শিল্পী জগন্ময় মিত্রের কন্ঠে তাঁর লেখা ‘চিঠি’ ও ‘সাতটি বছর আগে পরে’ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে “তীর বেঁধা পাখি আর গাইবে না গান”, “মধুমালতী ডাকে আয়”, “আর ডেক না সেই মধুনামে”, “চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে (এন্টনি ফিরিঙ্গী)” এই সমস্ত গানই যে কালজয়ী সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়াও অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা তিনি। যেমন — ‘আমার সোনা চাঁদের কণা’, ‘মনের দুয়ার খুলে কে গো তুমি এলে বলো না’। ‘এমনি বরষা ছিল সেদিন’ এই গানটি অনেকেই নজরুলের বলে অনেকে ভুল করেন কিন্তু এটি প্রণব রায়ের লেখা অসম্ভব জনপ্রিয় একটি গান। মান্না দে র কন্ঠে অসামান্য গান ‘আমি সাগরের বেলা তুমি দুরন্ত ঢেউ’ কেউ কি কোনোদিন ভুলতে পারবে?
প্রণব রায়, অজয় ভট্টাচার্য ও শৈলেন রায় এই প্রবাদপ্রতিম তিন ব্যক্তিত্বকে তখন ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ বলা হত। প্রণব রায় শুধু গীতিকারই ছিলেন না। বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন তিনি। চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার হিসাবে কয়েকটি কথাচিত্রের কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায়ের বিখ্যাত কমেডি ছবি ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ এর কাহিনীকার ছিলেন প্রণব রায়। তাঁর পরিচালনায় ‘রাঙামাটি’ মুক্তি পায়। তিনি ‘বসুমতী’ পত্রিকায় এক বছর বার্তা সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। ব্রিটিশ বিরোধী পত্রিকা ‘নাগরিক’ এর সম্পাদক ছিলেন একসময়।
১৯৭৫ সালে মাত্র তেষট্টি বছর বয়সে এই অসামান্য প্রতিভাবান মানুষটির জীবনাবসান ঘটে।
শ্যামল গুপ্ত — এই প্রজন্মের কাছে এই নাম হয়ত অজানা অচেনাই ঠেকবে। কিন্তু এই প্রজন্মেরও যখন ভালো গান শোনার ইচ্ছে জাগে তখন এঁদের লেখা গানই একমাত্র আশ্রয়।
শ্যামল গুপ্ত জন্ম গ্রহণ করেন ১৯২২ সালের ৩রা ডিসেম্বর (১৯শে অগ্রহায়ণ ১৩২৯ বৃহস্পতিবার)। ইনিও পরাধীন ভারতের কলকাতায় জন্মেছিলেন। আদি বাড়ি ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার হালিশহরে। পৈতৃক আবাস ছিল বিহারের জামালপুরে। শ্যামল গুপ্তের পিতা এবং পিতামহ মুঙ্গের কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। শ্যামল গুপ্তের পড়াশোনা স্কটিশ চার্চ স্কুল ও কলেজে। ১৯৪৫ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে রসায়নশাস্ত্রে অনার্স সহ স্নাতক হন। স্নাতক হবার পর মহারাষ্ট্রের পুণায় ভারত সরকারের মিলিটারি এক্সপ্লোসিভ ল্যাবরেটরিতে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে কর্মজীবনে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। তারপর এক বিজ্ঞাপনের কপি লেখার কাজ নেন।
সঙ্গীত জীবন তিনি আরম্ভ করেছিলেন গায়ক হিসাবে। হিজ মাস্টার্স ভয়েস গ্রামাফোন কোম্পানিতে তিনটি গান রেকর্ড করেন। তারপর গান গাওয়া ছেড়ে গান লিখতে শুরু করেন। এছাড়াও চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখতে শুরু করেন। ‘বধূবরণ’ ও ‘পুতুলঘর’ ছায়াছবির কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন তিনি। প্রায় দু-হাজার গানের স্রষ্টা তিনি। তার মধ্যে চলচ্চিত্রের জন্য লেখা গান প্রায় তিনশো। ১৯৬৩ সালে তাঁর প্রকাশিত গীত-সংকলন ‘আধুনিক গান’ প্রকাশিত হয়।
গীতিকার শ্যামল গুপ্তর লেখাকে এক জাদুর কাঠি ছুঁইয়ে অসামান্য করে তুলেছেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৬ সালে যিনি শ্যামল গুপ্তের ঘরনী হন। এঁদের বিয়ের দিনের গল্পটি ভারি মজার। বিয়ের দিন হঠাৎ করেই রাজ্যজুড়ে ধর্মঘট ডাকে একটি রাজনৈতিক দল। অচল হয়ে যায় কলকাতা শহর। বরের গাড়ি আটকে যায়। প্রচন্ড চিন্তায় পড়ে যান দুই বাড়ির মানুষ জন। মুশকিল আসানের বুদ্ধি বের হয় বরের মাথা থেকে। যত ধর্মঘটই হোক অ্যাম্বুলেন্সকে কেউ আটকাতে পারে না। সুতরাং শ্যামল গুপ্ত কয়েকজন বরযাত্রী সঙ্গে করে অ্যাম্বুলেন্সে চেপে বসেন। এইভাবেই বিবাহ হয় দুই কিংবদন্তীর।
ভি বালসারার সহায়ক রবীন সরকার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মেজ দাদা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে এই বিবাহের ঘটনার কথা জানতে পেরেছিলেন। শ্যামল গুপ্তের পরিবারের ছিল রাসায়নিকের ব্যবসা। শ্যামল গুপ্ত নিজেও ছিলেন একজন কেমিস্ট। কিন্তু সেটা তাঁর পেশা হয়ে ওঠেনি।
সন্ধ্যা ও শ্যামলের আলাপ হয় সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মাধ্যমে। গ্রামাফোন কোম্পানিতে একটি অ্যালবাম বের করার কথা হয় যাতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গাইবেন এবং সুরও করবেন। সন্ধ্যা এতে ইতস্তত করছিলেন। তখন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় শ্যামল গুপ্তকে নিয়ে আসেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ঢাকুরিয়ার বাড়িতে। সেই প্রথম দেখা তাঁদের।
গ্রামাফোনের জন্য ৭৬ আরপিএমের রেকর্ডের জন্য চারটি বেসিক বাংলা গান লেখেন শ্যামল গুপ্ত। সেই সুরু গীতিকার ও সুরকার হিসেবে পথ চলা শ্যামল গুপ্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। গানগুলো হল — ‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে’, ‘স্বপ্ন ভরা অন্ধকারে’, ‘ঝরা পাতা ঝড়কে ডাকে’। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে শ্যামল গুপ্তের লেখা আরও অজস্র গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে আজও। তার মধ্যে অন্যতম হল ‘ওগো সিঁদুর রাঙা মেঘ’।
একই সঙ্গে যাঁদের পথ চলা শুরু হয়েছিল পথ শেষও তাঁরা করলেন। ২০১০ সালের ২৮শে জুলাই ৮৭ বছর বয়সে অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন গীতিকার শ্যামল গুপ্ত। তাঁর সৃষ্টি রয়ে গেল, রয়ে যাবে যতদিন মানুষ গান ভালবেসে শুনবে।
ভীষণ প্রাঞ্জল ও সাবলীল লেখা। খুব ভালো লাগল।
অনেক ধন্যবাদ।
খুব সুন্দর লেখা।