বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীতের কাতরতা বাড়লেও তীব্র শীতকে রীতিমতো কাঁচকলা দেখিয়ে বাজারে যাচ্ছি আমি। কারণ ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর টমেটো পেঁয়াজকলি, মটরশুঁটি, শিম, বিন বরবটি ক্যাপসিকাম, বিট শীতকালীন সবজির ভরা মরশুমে বাজার করার মজাই আলাদা। শীতকালীন সবজি শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিগুনেও ভরপুর। লক্ষ্য করে দেখলাম, শীতের এই বাজারে উজ্জ্বল লাল রঙের চমৎকার কন্দজাতীয় যে সবজিটি সকলের নজর কাড়ে তা হল বিট। যদিও বাঙালির বিট মানেই ‘ভেজিটেবিল চপ’ কিন্তু আপনি জানেন কি আয়রন ফলেট ম্যাঙ্গানিজ ভিটামিন সি পটাশিয়াম ইত্যাদি বিভিন্ন নিউট্রিয়েন্টসের আধার এই বিট বা বিটরুট।মহিলাদের জন্য বিটরুটের উপকারিতা দুর্দান্ত। তাহলে দেখে নেওয়া যাক শীতের এই সবজিটির উপকারিতা ও তার সঙ্গে বিট দিয়ে কিছু রান্নার কথা।
প্রথমেই বলি প্রতি ১০০ গ্রাম বিটরুটের পুষ্টিগুণ : ক্যালোরি : ৪৩, প্রোটিন : ১.৬ গ্রাম, ফ্যাট : ০.২ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট : ৯.৬ গ্রাম, ফাইবার : ২.৮ গ্রাম, চিনি : ৬.৮ গ্রাম, ভিটামিন সি : ৩.৬ মিলিগ্রাম, ফোলেট: ১০৯ mcg, পটাসিয়াম : ৩২৫ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম : ২৩ মিলিগ্রাম, আয়রন ১.১৯ মিগ্রা। বিটে বিটালিনস (Betalains) নামে একগুচ্ছ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যার রোগ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং এটির জন্যই বিটের রং লাল। সাধারণত ন্যাচারাল কালার এজেন্ট এবং চিনি তৈরির জন্য বিটের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার আছে।

এবার বলবো বিটরুটের ১০টি শীর্ষ স্বাস্থ্য উপকারিতা:
১. হার্টের স্বাস্থ্য বাড়ায় : বিট নাইট্রেট সমৃদ্ধ, শরীর যেটিকে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত করে। নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালীগুলিকে শিথিল এবং প্রসারিত করতে সাহায্য করে, রক্তপ্রবাহ উন্নত করে এবং রক্তচাপ কমায়।গবেষণায় দেখা গেছে যে বিটের রস খেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রক্তচাপ কমে যায়। হৃদরোগীরা কতটা বিট খাবেন জেনে নিন ডায়েটিশিয়ানের কাছ থেকে।
২. এনার্জি বুস্টার : অ্যাথলিট এবং যারা নিয়মিত শরীর চর্চার সঙ্গে যুক্ত তারা দেহের অক্সিজেন লেভেল ঠিক রাখতে এবং পেশীর সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য ওয়ার্কআউটের পরে নিয়মিত তাজা বিটে রস পান করেন।
৩. হজমে সাহায্য করে : বিটরুটের ফাইবার পেটের জন্য উপকারি। ফাইবার অন্ত্রের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে এবং উপকারী অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
৪. প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে : বিটে বিটালাইন থাকে। এটি এক ধরণের ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট যা তাদের প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। এই যৌগ বিভিন্ন রোগ যেমন হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিস..থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ নির্মূলে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।
৫. মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সমর্থন করে :
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানসিক সতর্কতা এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতা (cognitive function) স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পায়। তবে, বিটের নাইট্রেট মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ উন্নত করতে পারে, যা ডিমেনশিয়া এবং অন্যান্য জ্ঞানীয় দুর্বলতার অগ্রগতি ধীর করে দিতে পারে।
৬. ডিটক্সিফিকেশন সমর্থন করে : আপনার লিভার আপনার শরীরকে বিষমুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বিট এই প্রক্রিয়াটিকে সমর্থন করে। জন্ডিস, ফ্যাটিলিভার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিট খুব উপকারি।
৭. রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে : বিটের গ্লাইসেমিক সূচক মাঝারি হলেও এতে ফাইবার বেশি থাকে, যা রক্তে চিনির শোষণকে ধীর করতে সাহায্য করে। এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে এবং সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত এবং সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে খাওয়া ভালো।
৮. ডিপ্রেশন : বিটের বিটালাইন ও ট্রিপটোফ্যান মুড বুস্টিং হরমোন ও ডোপামিনের ক্ষরণ ও সক্রিয়তা বাড়িয়ে অবসাদের মোকাবিলা করে।
৯. চোখের স্বাস্থ্যের উন্নতি : গোল্ডেন বিটে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ রয়েছে, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখার জন্য অপরিহার্য।
১০. সর্দিকাশি ও ঠান্ডা লাগার প্রবণতা : শীতের মরশুমে যারা বারবার ফ্লু ভাইরাসের সংক্রমণে যেরবার হয়ে পড়েন, তারা নিজেকে ফিট রাখতে ডায়েটে কিছু পরিমাণ এই উপকারী সব্জিটি অবশ্যই রাখুন।
প্রসঙ্গত বলে রাখি বাজারে সোনালী বিট (Golden Beet) পাওয়া যায়, বিশেষত বড় সুপারমার্কেট, কৃষকের বাজার (Farmers’ Market) এবং অনলাইনে। তবে এটি লাল বীটের মতো সহজলভ্য নাও হতে পারে; এটি মৃদু স্বাদযুক্ত এবং সালাদ বা ভাজা পদ হিসেবে জনপ্রিয়, যা প্রায় সারা বছরই, বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও শরৎকালে বেশি মেলে।
মহিলাদের জন্য বিটরুটের উপকারিতা —
মহিলাদের জন্য বিটরুট বেশ কিছু অনন্য উপকারিতা প্রদান করে, বিশেষ করে হরমোন, মাসিক এবং সামগ্রিক সুস্থতার সাথে সম্পর্কিত।
পিরিয়ডের সময় : বিটরুট মাসিকের সময় হারিয়ে যাওয়া আয়রন পূরণ করতে সাহায্য করে, ক্লান্তি এবং দুর্বলতা কমায়।
অ্যান্টিএজিং প্রপার্টি : বয়স করার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ক্ষয়, ত্বকের বলিরেখা, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার মোকাবিলায় বিট চমৎকার কাজ দেয়।

প্রাকৃতিকভাবে হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে : এটি ইস্ট্রোজেন ডিটক্সিফিকেশনকে সমর্থন করে, বিশেষ করে পিএমএস বা পেরিমেনোপজের সময় কার্যকর।
হিমোগ্লোবিনের মাত্রা উন্নত করে : এর আয়রন এবং ফোলেট উপাদান মহিলাদের রক্তাল্পতা প্রতিরোধ বা পরিচালনায় সহায়ক করে তোলে।
সাবধানতা : ডায়াবেটিস ও গাউটের রোগীরা বিট খাবেনা না। যাদের অক্সালেট জাতীয় কিডনি স্টোনের হিস্ট্রি আছে তারা এই সবজিটিকে এড়িয়ে চলুন।রক্তচাপ কমানোর ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তিরা,যারা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিতে আছেন তারা অবশ্যই বিশেষজ্ঞর মতামত নিন।পালংশাক, রেউচিনি, বাদাম ইত্যাদির সঙ্গে বিটরুট খাবেন না।
বিট দিয়ে সহজেই নানা ধরনের পদ বানিয়ে ফেলা যায়। বিটরুট দিয়ে জুস, বিটের স্মুদি, বিটের স্যালাড, স্যুপ, হালুয়া, পরোটা বা গোলা রুটি, চপ….. চাইলেই বানিয়ে ফেলতে পারেন হরেক রকমের খাবার। বিট গ্রিল করা যেতে পারে, আর এর মিষ্টি-মাটি স্বাদ অনেক পদের সাথে মেশে, যেমন চকোলেট কেক, হুমাস, বা চিকেন।
কয়েকটা সহজ ও জনপ্রিয় রেসিপি বলি—
বিটরুট জুস : ব্লেন্ডারে কাটা বিটরুট, জল, সামান্য চিনি, লেবুর রস, এবং বরফ দিয়ে ব্লেন্ড করে নিন (ঐচ্ছিক : আদা বা পুদিনা)।
বিটরুট সালাদ : সেদ্ধ বা কাঁচা বিটরুট গ্রেট করে শসা, গাজর, কড়াইশুটি, পিয়াঁজ, লেবুর রস, লবণ, গোলমরিচ এবং ধনে পাতা দিয়ে মিশিয়ে নিন। এর সাথে দই বা ফেটা চিজ যোগ করতে পারেন।
বিটরুট হালুয়া : গ্রেট করা বিটরুট দুধ, চিনি, এলাচ, ও ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করে তৈরি হয়।
বিটের পরোটা : পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, এবং শুকনো খোলায় জিরে ও ধনে ভেজে গুঁড়িয়ে সিদ্ধ করা বিট ও আলুর সাথে চটকে মেখে পুর দিয়ে পরোটা তৈরি করা যায়। গরম গরম পরোটা আর সঙ্গে নিন সস কিম্বা ধনেপাতার চাটনি। বিশ্বাস করুন সন্ধেবেলার জলখাবার এর থেকে আর ভালো কিছু হতে পারে না।
বিটরুট চপ/টিক্কি : সেদ্ধ ও ম্যাশ করা বিটরুট, আলু, মশলা, এবং ব্রেডক্রাম্বস মিশিয়ে টিক্কি বা চপ তৈরি করুন।
বিটরুট স্যুপ : বিটরুট, গাজর, আলু, টমেটো, পেঁয়াজ দিয়ে ঘন স্যুপ, সাথে ক্রিম যোগ করতে পারেন।
বিটরুট হুমাস/ডিপ : সেদ্ধ বিটরুট, ছোলা, তাহিনি, লেবুর রস দিয়ে তৈরি।
বিটরুট রাইস/পোলাও : বাচ্চারা খুব সহজে বিট খেতে চায় না। ওদের জন্য পোলাও এর মধ্যে কুচো কুচো করে বিট দিয়ে দিন। রংটাও দুর্দান্ত হবে, স্বাস্থ্যকর বটে।
বিটরুট ফ্লাওয়ার/গার্নিশ : সালাদ বা অন্যান্য পদের সৌন্দর্য বাড়াতে পাতলা করে কাটা বিটরুট ফুল বা পাতা তৈরি করা যায়।
সারা বছর আমরা যা সব্জি দেখি তার বেশিরভাগই পাই শুধু শীতকালেই। আজকাল কোল্ডস্টোরেজের জন্য গরমকালে হয়তো শীতের সব্জি পাওয়া যায় তবে তার স্বাদ গন্ধ বা পুষ্টিগুণ কিছুটা হলেও কম। চিকিৎসকদের মতে, স্যালাড হোক বা স্যুপ, আমিষ বা নিরামিষ ঝাল তরকারি, শীতের ডায়েটে বিট রাখা বেশ স্বাস্থ্যকর।