শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | সকাল ১১:৫৫
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

জলাভূমির আত্মকথা : অনুপম পাল

অনুপম পাল / ৭৭৫ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫

গোড়ার কথা

জংগলের খাদ্য সংগ্রহের বদলে মানুষ চাষবাসের সঙ্গে বসবাস শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে কিছু মানব গোষ্ঠি চাষবাস না করে জংগলের ফলমূল সংগ্রহ ও শিকার করাকেই জীবিকা বলে মেনে নিয়েছেন। মানব সভ্যতা শুরু হয়েছিল জলকে কেন্দ্র করে। নদী বা হ্রদের তীরে বসবাস ও চাষবাস, মৎস চাষ ও পশুপালন ভালো ভাবেই করা যায়। সিন্ধু নদী, তাইগ্রিস/ ইউফ্রেটিস, নাইল, গঙ্গা, আমাজন নদী, আফ্রিকার চাদ হ্রদ, মধ্য এশিয়ার আরল সাগর, বলিভিয়া ও পেরুর টিটিকাকা হ্রদ ইত্যাদির তীরেই মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। টিকিকাকা লেকের পার্শবর্তী এলাকাই হল আলুর জন্মস্থান। জমিতে লাঙ্গল চষার জন্য গরু বা মহিষের প্রয়োজন। তৃষ্না ও সেচের চাহিদা মেটাতে জলই পারে। “শহুরে সভ্যতার বিকাশের” সাথে সাথে ফসলের চাহিদা বাড়ল। অল্প সময়ে বেশী উৎপাদনের জন্য সেচ সার ও বিষের দরকার হল। রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাই চাইছে। শহরে কৃষি অনুৎপাদক মানষের ভিড় বাড়ছে। জলাভূমিকে অনুৎপাদক মনে করে বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। যারা প্রকৃতিকে ধ্বংস না প্রকৃতিকে নিয়ে চলে তাদের বলা হচ্ছে আদিম, পশ্চাৎপদ ও অসভ্য। এই বিচ্ছিনতাই নাকি সভ্যতার লক্ষন।

আমি কে?

পৃথিবীর সৃষ্টির সময় থেকেই বিস্তীর্ণ জলরাশির সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে সমুদ্র ও মহাসমুদ্র, অজস্র নদ-নদী, হ্রদ, উপহ্রদ ও জলাভূমি।‌ জলাভূমিতে (আমি) সারা বছরই জল থাকে আর সেই জলকে নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে এক বিশেষ বাস্ততন্ত্র যেখানে আমরা দেখতে পাই জলজ শ্যাওলা, জলজ উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণী। ছোট বড় না ধরনের, ডোবা থেকে শুরু করে বড় জলাশয়। এরমধ্যে বহু জলজ উদ্ভিদ মানুষের খাদ্য হিসেবে, ঔষধ ও কুটির শিল্পে কাজে লাগে। আর জলজ প্রাণী বলতেই আমাদের মাছের কথা মনে আসে।‌ যদিও মাছ ছাড়া কাঁকড়া, চিংড়ি, কচ্ছপ ও আরো অনেক জলজ প্রাণী পাওয়া যায়। ভারতে মোট ভূমির ৪.৬ শতাংশ জলাভূমি এবং পরিমান হচ্ছে ১৫.২৬ মিলিয়ন হেকটার। এই রাজ্যে পরিমান হল ১২.৪৭%; দুই ২৪ পরগণায় সর্বাধিক। পৃথিবীর ৬ শতাংশ এলাকা জলাভূমির আওতায়। আমার অনেক প্রকার ভেদ। বিভিন্ন রকমের হতে পারে দেশের অভ্যন্তরের জলাভূমি, লবণাক্ত জলাভূমি, চিলকা উপহ্রদ (লেগুন), বিল, বাদাবন সমৃদ্ধ, বড় পুকুর, জলমগ্ন ধানের জমি ইত্যাদি।

শীতল পাটি গাছ

আমি কাদের জন্য

ব্যাঙ এবং সালামান্ডার, বিভিন্ন মাছ, পাখি- ডাহুক, মাছরাঙা, জলপিপি, পানকৌড়ি, শামুকখোল, বালি হাসের নানা জাত, সাপ, কচ্ছপ, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, ভোদড়, হরিণ এবং ভাল্লুকের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা আমাকে ব্যবহার করে বেঁচে থাকে। আসলে আমাদের রাজ্যে বিপন্ন প্রজাতির ৭০% বেঁচে থাকার জন্য জলাভূমির উপর নির্ভর করে! জলাভূমি তাদের বসবাস ও খাবার পেতে সহায়তা প্রদান করে। মনিপুরের লোকতাক হ্রদে মানুষের বসতি ও অনিয়ন্ত্রিত চাষবাসের জন্য আমার ভাসমান দ্বীপে বিশেষ হরিনের (রুসেরভাস এলডি এলডি) জীবন বিপন্ন। এছাড়া চোরাগোপ্তা শিকারতো আছেই। গোটা পৃথিবীর প্রায় চল্লিশ শতাংশ প্রজাতিকে ধারণ করে বহু মানুষের মাছ ধরে জীবিকার সন্ধান হয়। মনে করা হচ্ছে গোটা পৃথিবীর আমার বন্ধুরা সম্মিলিত ভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা মানুষকে প্রদান করে তার মূল্য ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার প্রতি বছরে এবং এক বিলিয়নের উপর মানুষ এই আমার উপর নির্ভরশীল। জীবন জীবিকার জন্য প্রায় ২০০ ধরনের মাছ এখানে পাওয়া যায়।

আমি বিপন্ন

আমি সর্বত্রই বিপন্ন। আমি প্লাস্টিক, কারখানার বর্জ্য পদার্থ, ভারীধাতু, রাসায়নিক সার, কীট নাশক বিষে জর্জরিত। ভারতের চিলকা হ্রদের বিভিন্ন জলজ প্রাণী বিপন্ন এবং সেখানকার এলাকা ও কমে আসছে। আমাজনের রেইন ফরেস্টের বহু অংশ শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বহু মানুষের জীবিকা চলে যাচ্ছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আরব সাগরে জল অতিরিক্ত ব্যবহার করার জন্য মৎস্যজীবীদের অবস্থা শোচনীয়। আবার সামুদ্রিক ঝড় বাংলাদেশে সিডার এর জন্য বাদাবন ব্যাপক পরিমাণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সেখানকার পরিবেশ বিপন্ন। অনুরূপভাবে ইন্দোনেশিয়ায় বাদাবন কেটে ফেলার জন্য আজকে সেখানকার ইকোসিস্টেম ব্যাহত হয়েছে এবং সমুদ্র তল সহজেই বেড়ে গিয়ে জনমানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।

আমার কি কাজ:

আমার উপকারিতা বলে শেষ করা যায় না। ভূপৃষ্ঠের জল সংরক্ষণ করি, প্রাকৃতিকভাবে জলে নোংরা পরিষ্কার করি পানীয় জল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই আমার কাজ। খুব সহজে কার্বন ধরে ধরে রাখতে পারি। ঝড় বৃষ্টি দুর্যোগের সময় প্রচুর জল ধারণ করতে পারি এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করি। কিন্তু আজ আমি বড়ই বিপন্ন এবং এই বিপন্ন হওয়াটা জঙ্গল ধ্বংস হওয়ার থেকে তিনগুণ বেশি। পৃথিবীর ৩ শতাংশের কম পরিমাণ জল হচ্ছে পানীয় জল এবং দশমিক তিন শতাংশ পানীয় জল পাওয়া যায়, বিভিন্ন হদ নদী এবং আমার কাছে। আমি মাটি এবং জল পরিশুদ্ধ করতে পারি, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ভারী ধাতু ও আমি পৃথিবীর জলচক্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গে ভাবে জড়িত। এই বছর ২রা ফেব্রুয়ারীর বিশ্ব জলাভূমি দিবসের স্লোগান হল জলাভূমি ও মানুষের ভালো থাকা। কিন্ত আমাকে নিয়ে আদ্যিখেতার অন্ত নেই। কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না। ছোট খাটো জলাশয় বুজিয়ে বাড়ি তৈরী হচ্ছে। মশার লার্ভার সাথে গাপ্পি মাছ, ব্যাঙাচির একটা খাদ্য খাদক সম্পর্ক আছে। সেই সম্পর্ক আজ বিচ্ছিন্ন।

হোগলা

রামসর কনভেনশন

১৯৭১ সালে ইরানের রামসরে এক আলোচনা সভা হয়েছিল যাকে রামসার কনভেনশন বলা হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গোটা পৃথিবীর আমার বিভিন্ন রিস্তেদারদের চিহ্নিত করা হয়। সেইভাবে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ও সুন্দরবন ভারতবর্ষের বিভিন্ন জলাভূমি এর আওতায় এসেছে। তামিলনাড়ুতে সর্বাধিক এই রামসর চিহ্নিত জলাভূমি রয়েছে প্রায় ১৬ টি এবং তার পরবর্তী স্থান উত্তর প্রদেশে- ১০টি। ভারতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ৮০টি জলাভূমিকে চিহ্নিত করা হয়েছে রামসর সাইট হিসেবে।

পূর্ব কলকাতার মানে ধাপার পার্শ্বস্ত জলাভূমিকে রামসর সাইট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট। এলাকা প্রায় ১২৫ বর্গ কিলোমিটার। কলকাতার বাস্তুকার ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ আমাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তার ফলেই আমার স্বীকৃতি হয়। কিন্ত আমার উপর অত্যাচার অব্যাহত। বহু অংশই আজকে জবরদখল হয়ে গেছে এবং সেখানে স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়েছে। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমাকে কেন্দ্র করেই প্রচুর মৎস্যজীবীরদের জীবিকা ছিল। লোকে বলে আমি নাকি কলকাতার একটি প্রাণকেন্দ্র। কিন্ত কেউই আমাকে ভালো চোখে দেখে না সবাই আমাকে ভরাট করে বাড়ী ও হোটেল বানাচ্ছে। ২০০৮ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যচ্ছে ধাপার মাঠে প্রায় ১৫০ টন সবজি ওঠে এবং বছরে ১ হাজার টন মাছ ওঠে। কিন্ত ধাপার নালায় এত বর্জ্য পদার্থ ফেলা হয় তার জন্য সবজিতে ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। আমার কি দোষ, মানুষ যদি অত্যাচার করে! তবে আমাকে নিয়ে অনেক মামলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলাতেই আমার উপস্থিতি চোখে পড়বে। আমি ছাড়া ছোটখাটো পুকুর ছাড়া বড় হ্রদ ও বিল সবই আছে। যেমন উত্তর চব্বিশ পরগনার বল্লী বিল, কোচবিহারের রসিক বিল, মিরিকের মিরিক মিল, কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর ও সাঁতরাগাছি ঝিল, মেদিনীপুরের সারাসংকা, মুর্শিদাবাদের চাঁদ বিল, নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জে টুঙ্গী বিল ইত্যাদি। অনেক বিলেই মাছ চাষ, পাট পচানোর কাজ চলছে। উত্তরাখন্ডের নৈনীতালের হ্রদে আমি আপনাদের দেখি।

আমি ও কৃষিকাজ

আমি ধারন করি অনেক উদ্ভিদ। সেগুলি হল শীতলপাটি, হোগলা, শোলা, মাদুরকাঠি, মাখনা, পানীফল, পদ্মফুল, শ্যাপলা, কচুড়িপানা, নলখাগড়া, ধনচে ছাড়া বিভিন্ন পানা, বিভিন্ন শ্যাওলা, ফার্ন, পতঙ্গভুক উদ্ভিদ, আমার কর্দমাক্ত পাড়ে ঢোলকলমি ও কিছু উভচরী উদ্ভিদও পাবেন। এছাড়া বাদাবনের বিভিন্ন প্রজাতি যেমন গরান, গেওয়া, বান, কাঁকড়া, গোলপাতা, খলসে, সুন্দরী ইত্যাদি।‌ এই বাদাবনই ঝড় আটকায়। বাদাবনের বিভিন্ন গাছের ফুল থেকে সুন্দরবনের বিখ্যাত মধু পাওয়া যায়। আমার উপর জন্মানো অনেক উদ্ভিদ মানুষ খায়, ওষধি গাছ হিসেব ব্যবহার করে, কুটির শিল্পে যায়। এখন সবই কমে আসছে। বিভিন্ন বন্য প্রানীতো আমার সাহচর্য্যে আছেই। রাজ্যের প্রাণী বাঘরোল আমার কাছেই থাকে। সেও বড় বিপদে আছে। আমন মরশুমে ৪০ লক্ষ হেক্টরের বেশী ধান জমিতে অল্প বিস্তর জল থাকে। মাস ৫/৬ এর জন্য জলা জায়গা তৈরী হয় কোন কোন জায়গায়। ধানজমির জলমগ্ন জায়গায় কত প্রাণ ছিল, ধানের সাথে প্রায় ২২ রকমের সহযোহী উদ্ভিদ, ৪৭ রকমের মাছ। ধানের সাথে মাছ চাষ অর্থনৈতিক ও বাস্ততান্ত্রিক দিক থেকে সব থেকে বেশী লাভজনক। এক বিঘা জলমগ্ন ধানের জমিতে মাগুর মাছ চাষ করলে ধানের থেকে মাছের দাম বেশী হয়, বিঘায় লক্ষাধিক টাকা রোজগার হতে পারে। কিন্ত বিজ্ঞানের নামে মানুষকে শেখানো হয়েছে ফসলে ও খাবারে বিষ মিশিয়ে খেতে। তার জন্য ধান ক্ষেতে মাছ নেই, মানুষের সহজ লভ্য প্রোটিনের উৎস শঙ্কুচিত হয়ে গেল। সহযোহী উদ্ভিদ থেকে মানুষ পেতে পারত বিভিন্ন শাক, ওষধি গাছ, গবাদি পশুর খাদ্য। তাও শেষ, গাছ মারা বিষ দিয়ে শেষ। সব ঝক্কি আমাকেই পোয়াতে হচ্ছে। জানি না কতদিন পারব। কিছু পাট হয়। পাট পচাতেও জল লাগে। নদীয়া উত্তর ২৪ পরগনার সব বিলের জলেই পাট পচানো হচ্ছে।

আমার উপর জন্মানো কয়েকটি গাছের কথা বলে নেই তবে বিস্তারিত পরিসংখ্যান দিতে পারবা না।

পদ্ম

রেল লাইনের পাশের নয়নজুলি, বিভিন্ন জলাভূমিতে পদ্ম হয়ে থাকে। বাঁকুড়ার সোনামুখী ও ছাতনাতে যেমন পাওয়া যায় সেরকম হুগলি, হাওড়া, বর্ধমানেও পদ্মের চাষ হয়ে থাকে। একটা পদ্ম গাছ মোটামুটি কুড়িটা ফুল দেয়, আর এক বিঘায় প্রায় পাঁচ হাজারের মতো ফুল মানুষ পেতে পারে। বছরে পদ্ম চাষে প্রায় খরচ হয় বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পদ্মফুল তোলাও খুব বিপদজনক এবং সেটা তো যথেষ্ট খরচ সাপেক্ষ। পদ্মফুল বিক্রি করে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। সাধারণত দুর্গাপুজো অন্য পূজোর অনুষ্ঠানে এবং বিদেশেও রপ্তানি হয়ে থাকে। পদ্মের বীজ কাঁচা খাওয়া যায়, ভেজেও খাওয়া যায়, পদ্মের কান্ড সবজি হিসেবে খাওয়া যায়, পদ্ম মধুরও বাজারে দাম আছে।

শীতল পাটি (স্কুমানিয়াথাস ডাইকোটমাস)

কোচবিহারের এক নম্বর ব্লকের ঘুঘুমারি এবং বারোকোদালীতে শীতল পাটির চাষ হয়ে থাকে। এটি একটি জলজ উদ্ভিদ জলাভূমিতে সারা বছরই হয়ে থাকে। কোচবিহারে প্রায় ২০ হাজার শীতল পাটির বুননকারী রয়েছেন। একটি শীতল পার্টির দাম ন্যূনতম হাজার টাকা। এটি একটি উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্প।

কৃষ্ণনগরের টুঙ্গী বিল

মাদুর কাঠি (সাইপেরাস পাঙ্গোরেই)

দুই ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর ও কোচবিহারে মাদুর কাঠির চাষ হয়। মাদুরকাঠি মেদিনীপুর জেলার জি আই ট্যাগ প্রাপ্ত একটি কুটিরশিল্প জাত পণ্য। নরম মাদুরকাঠি দিয়ে মাদুর তৈরি করা হয়।

হোগলা (টাইফা এলিফ্যান্টা)

মেদিনীপুর, হাওড়া, ২৪ পরগনা হোগলা জলাজমিতে এমনি হয়ে থাকে। বিশেষ কোনো খরচ হয় না। তবে হোগলা দিয়ে “মাদুর” তৈরি হয় অস্থায়ী ছাউনি করার কাজে লাগে। সাগর মেলাতে হোগলার ছাউনি খুব জরুরী। বাড়িতে ফলস সিলিং করার জন্য হোগলা ব্যবহার করা যেতে পারে, হোগলার মাদুর যথেষ্ট নরম এবং আরামদায়ক। রাজ্যে মোটামুটি ভাবে বছরে প্রায় চার কোটি টাকার ব্যবসা হয় হোগলা থেকে।

মাখনা (ইউরাইল ফেরক্স)

মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরে জলাভূমিতে চাষ হয়ে থাকে এটা খই হিসেবে খাওয়া হয়।‌ বছরে প্রায় ১০ টনের মত উৎপাদন হয়।

শোলা (এসকইনোমিনি এসপ্যারা)

বর্ধমান, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের জলাভূমিতে শোলা গাছ দেখতে পাওয়া যায়। শোলা গাছের ব্যবহার মূলত কুটির শিল্পে এবং পূজোর সামগ্রী ডাকের সাজ তৈরি করতে শোলার জুড়ি মেলা ভার। বছরে প্রায় এক কোটি টাকার অর্থনৈতিক উৎপাদন হয়। শোলা থেকে জমিতে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে এটি একটি অর্বুদ জাতীয় উদ্ভিদ। ধানের জমিতেও দেখতে পাওয়া যেত। আগাছা নাশকের ঠ্যালায় তাও নিশ্চিহ্ন।

পানিফল

পানিফল (ট্রাপা বিসপিনোসা)

বর্ষজীবী ভাসমান জলজ উদ্ভিদ। বর্ধমান দুই মেদিনীপুর জেলা, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনা এবং দিনাজপুরের কিছু অংশে পানিফলের চাষ হয়ে থাকে। পানিফল বাজারে আ্শ্বিন কার্তিক মাসে। পানি ফল যথেষ্ট পুষ্টিকর। পানিফল শুকিয়ে আটা তৈরি করা যায়। পানিফল প্রতি হেক্টরে পাওয়া যায় প্রায় ৫২ কুইন্টাল এবং খরচ হয় প্রায় ৫৫ হাজার টাকা এবং লাভ হয় প্রায় ২৬ হাজার টাকা। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্গী মন্ডল ও অসিত মাইতি ২০১৯ সালের একটি প্রবন্ধে এই তথ্য পাওয়া গেল।

এছাড়া জলাভূমিতে পাওয়া উদ্ভিদ গুলোর নাম হল কচুরি পানা (পশু খাদ্য ও জৈবসার ও কুটির শিল্প) বিভিন্ন কচু, আমরুল,শুষনী, কুলেখাড়া, দুর্বা, শ্যামা, কাঞ্চিরা (কমেলিনা বেঙ্গলেনসিস), এজোলা, কেশুত, ব্রাম্ভী, শালুক (লাল ও নীল), টোপা পানা, খুদিপানা, জলধনে, সালকানি, নলখাগড়া ইত্যাদি প্রায় ৫০ রকমের গাছপালা।

সুন্দরবনের লবণাম্বু উদ্ভিদ

বাদাবনের বিভিন্ন ধরনের লবণাম্বু উদ্ভিদ যেমন গরান, গেওয়া, কেওড়া, বান, কাঁকড়া, গোলপাতা, খলসে, সুন্দরী ইত্যাদি স্বাভাবিক ভাবেই হয়ে থাকে।‌ ঝড় যেমন ঠেকায় সেই ভাবে নদীর তটের ভূমিক্ষয় রক্ষা করে। গভীর জঙ্গলে মৌলিরা যায় মধু সংগ্রহ করতে। উৎকৃষ্ট মধু হয়। তাছাড়া বিভিন্ন মাছ, চিংড়ি সংগ্রহ করা বহু মানুষের জীবিকা। কেওড়া ফলের চাটনি হয়। গোলপাতা দিয়ে ঘরের ছাউনি হয়, গুড় তৈরী হয়।

শেষের কথা

ভবিষৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে আমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করুন। আমি সবাইকে সৌন্দর্য প্রদান করি। মনে করুন ঝাড়গ্রামের খাঁদারানী বিল, রায়গঞ্জের কুলিক বিল, বর্ধমানের বাঁশদহ ও চাঁদাবিলের কথা। আমাকে কলুষিত করবেন না। আমি আপনাদের মন্দ করব না। বহ মানুষের রুজি রোজগার, পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদন বজায় থাকবে। কেউ আমাকে বোজাতে আসলে রুখে দাড়ান।

কভারের ছবি : পূর্ব কলকাতার জলাভূমি 

অনুপম পাল, অবসর প্রাপ্ত অতিরিক্ত কৃষি অধিকর্তা, কৃষি অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ।

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন