রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে ১১০ টি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা যানের শুভ সূচনা হল। ২০১১ সালের পর থেকে মা-মাটি-মানুষের সরকারের ঐকান্তিক উদ্যোগে বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবা গোটা দেশের মধ্যে তথা বিশ্বের মানচিত্রে এক অনন্য স্থান অধিকার করেছে। সেই স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত, পাহাড়ি দুর্গম, পশ্চাৎপদ ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় উন্নতমানের স্বাস্থ্য পরিষেবার লক্ষ্যে ১১০টি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা যান (মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট) – এর শুভ সূচনা হল। এই ইউনিটগুলি হল একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য ক্লিনিক, যা চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে সরাসরি রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। এই ইউনিটগুলোতে প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা, শিশুদের চিকিৎসা-সহ আরো নানান রোগের চিকিৎসা হবে এবং প্রয়োজনে রেফার করে অন্যত্র পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হবে। এই গাড়িগুলোতে রোগ নির্ণয়ের জন্য হিমোগ্লোবিন, প্রেগন্যান্সি পরীক্ষা, ম্যালেরিয়া, ইসিজি, ব্লাড সুগার-সহ প্রায় ৩৫টি ডায়াগনস্টিক টেস্টের সুবিধাও মানুষ বিনামূল্যে পাবেন। এই টেস্টগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি গাড়িতেই থাকবে। এমনকি জঙ্গলমহল, সুন্দরবন-সহ বিভিন্ন জেলায় গর্ভবতী মহিলাদের জন্য আল্ট্রাসোনোগ্রাফি পরিষেবা দেবার জন্য ব্যবস্থা থাকবে।তাই প্রতিটি ইউনিটেই মেডিকেল অফিসার, প্রশিক্ষিত নার্স, ফার্মাসিস্টের পাশাপাশি ল্যাব টেকনিশিয়ান, ইসিজি টেকনিশিয়ান, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর থাকবেন।
সূত্রের খবর, বাংলার মানুষের কাছে এই ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে প্রাথমিকভাবে গাড়ি বাবদ খরচ হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা। আর এই পরিষেবা চালানোর জন্য প্রতিমাসে প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা খরচ হবে। মোট ২১০টি এমন ইউনিট চালু হবে যাতে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরাও ঘরের দুয়ারে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা পরিষেবা পান। প্রথম ধাপে চালু হয়েছে ১১০টি ইউনিট। বাকিগুলোও ধাপে ধাপে শীঘ্রই চালু হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য , গত ১৪ বছরে, সারা বাংলাজুড়ে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যে বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে , তাতে আর একটা যুগান্তকারী মাইলফলক যুক্ত হল। রাজ্যে শিশু মৃত্যু, মাতৃ মৃত্যুর হার আগের তুলনায় অনেক কমেছে। যেমন শিশু মৃত্যুর হার ২০১১ সালে ছিল ৩৪। সেটা এখন কমে হয়েছে ১৯। বিগত ১৪ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০-১১ সালে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রোগনির্ণয়, চিকিৎসা ও ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু এর জন্যই বছরে ২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালেও নিখরচায় ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা হচ্ছে । এ রাজ্যের ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবারের ৮ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবেন। এছাড়া ‘স্বাস্থ্য ইঙ্গিত’ টেলিমেডিসিন প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে ৯০ হাজার মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে বিনামূল্যে টেলি কনসাল্টেশন পরিষেবা পাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই উপকৃত হয়েছেন ৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ। তাছাড়াও
‘চোখের আলো’ প্রকল্পে বিনামূল্যে ২৬ লক্ষ ছানি অপারেশন করা হয়েছে এবং বয়স্ক মানুষ ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ৩৪ লক্ষ বিনামূল্যে চশমা বিতরণ করা হয়েছে। এরজন্য খরচ হয়েছে ১৮১ কোটি টাকা। ‘শিশুসাথী’ প্রকল্পে প্রায় ৬৪ হাজার বাচ্ছা ছেলেমেয়ের হার্ট বা অন্যান্য অপারেশন করা হয়েছে। খরচ হয়েছে ৩০৭ কোটি টাকা।
এর পাশাপাশি ১৪টি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ, ৪২টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, ১৩ হাজার ৫০০টিরও বেশি সুস্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৭৬টি সিসিইউ, ৩টি এইচডিইউ, ১৭টি মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব, ১৩টি মাদার্স ওয়েটিং হাট, ১১৭টি ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান, ১৫৮টি বিনামূল্যে রোগনির্ণয় কেন্দ্র তৈরি হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে বেড বেড়েছে ৪০ হাজার। এখন বেডের সংখ্যা প্রায় ৯৭ হাজার। ব্লাড ব্যাঙ্কের সংখ্যা ৫৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯। ৪৯টি ট্রমা কেয়ার সেন্টার চালু হয়েছে। এসএসকেএম হাসপাতালে লেভেল-১ ট্রমা কেয়ার ফেসিলিটি চালুর পাশাপাশি ট্রপিক্যাল মেডিসিনে কর্ড ব্লাড ব্যাংক এবং ‘মধুর স্নেহ’ নামে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। বেলুড়ে যোগা অ্যান্ড ন্যাচ্যুরপ্যাথি ডিগ্রি কলেজ ও হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। তাছাড়া রাজ্যে ক্যান্সার চিকিৎসার পরিকাঠামো বাড়ানোর জন্য আইপিজিএমইআর, কলকাতা এবং উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে দুটি স্টেট অফ আর্ট ক্যান্সার হাব স্থাপন করার জন্য মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের সঙ্গে মৌ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এছাড়া, তুলনায় ছোট আকারে মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজেও অত্যাধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য সেন্টার শীঘ্রই চালু হয়ে যাবে।

নার্সিং ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের সংখ্যা ৫৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৫১। ফলে নার্সিং ট্রেনিং ইন্সটিটিউটগুলিতে মোট আসন সংখ্যা ২ হাজার ২৬৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৫৪৭। সরকারি হাসপাতালগুলিতে অনুমোদিত মোট নার্সিং স্টাফ ৩৩ হাজার ৮৩১ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৯ হাজার ১১৩। প্যারামেডিকেল স্টাফ ৩ হাজার ৪৮৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৩৩০।
ডাক্তারদের জন্য আর জি কর, পিজি এবং মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে হোস্টেল তৈরি করা হচ্ছে। লেডি ডাক্তারদের জন্য ১৫০ কোটি টাকা দিয়ে ৭টি হস্টেলও করা হচ্ছে। ‘রাত্তিরের সাথি’ প্রকল্পে ১৩০ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করা করেছে। রাজ্যের সকল অঙ্গনওয়াড়ি ও আশা কর্মীরা যাতে আরো সুষ্ঠুভাবে নিজেদের কাজ করতে পারেন এবং উন্নততর পরিষেবা আমাদের মা ও শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, তার জন্য প্রত্যেককে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে একটি মোবাইল ফোন কেনার জন্য ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এর জন্য বাজেটেই ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।